ধর্ম ও জীবন

কুরবানীর দর্শন

ফখরুল ইসলাম মাসরুর প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৮-২০১৮ ইং ০১:৫৪:৫১ | সংবাদটি ১০৫ বার পঠিত

কুরবানীর ইবাদতের সামগ্রিক ফালসাফা আর দর্শনের তথ্যানুসন্ধানে যে বিষয়টি বেরিয়ে আসে তা হলো কুরবানীর শাব্দিক অর্থ আল্লাহ নৈকট্য অর্জনের বস্তু। কুরবানী শব্দটি মূলত আরবী ‘কুরবান’ ধাতু থেকে নির্গত। আর কুরবানী শব্দটি নির্গত হয়েছে ‘কুরব’ শব্দ থেকে । যার অর্থ হলÑনৈকট্য । এ হিসাবে কুরবানীর সারমর্ম দাঁড়ায়Ñ যে বস্তু দ্বারা আল্লাহ তাআ’লার নৈকট্য অর্জিত হয়। কুরবানীর পুরো বিষয়টিতেই মুসলমানদের এ শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহ নির্দেশ পালনের নামই হচ্ছে দ্বীন। আল্লাহর নির্দেশ আসার পর বিবেক বুদ্ধির পাগলা ঘোড়ার কোন দৌড় চলবে না। এমনকি তাতে কোন প্রকার চুঁ-চেরা করারও কোন সুযোগ থাকবে না। একজন মুমিনের কর্তব্য হলো। খোদায়ী নির্দেশ আসার সাথে সাথে তা পালনের জন্য নিজের সর্বসাধ্য ব্যয় করা। অবনত শিরে আল্লাহর হুকুম মেনে নেয়া।
হযরত ইবরাহীম (আ.) স্বপ্নে নির্দেশ প্রাপ্ত হলেন। কী ছিল সেই নির্দেশ! নির্দেশটি ছিল- ছেলে ইসমাঈলকে আমার নামে কুরবানী করো। স্বপ্নে একটি নির্দেশ। আল্লাহ তো সরাসরি অহী পাঠিয়েও নির্দেশ দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি এমনটি করলেন না। স্বপ্নেই বন্ধু ইবরাহীমকে নির্দেশ দিলেন নিজ সন্তান ইসমাঈলকে কুরবানী করার জন্য। আমাদের কাছে এ জাতীয় নির্দেশ আসলে গুরুত্ব না দিয়ে টালবাহানা শুরু করতে দ্বিধা করতাম না। বলে দিতাম এটি স্রেফ একটি স্বপ্ন। স্বপ্নেপ্রাপ্ত নির্দেশ পালনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু এটিই ছিল হযরত ইবরাহীম (আ.) এর জন্য একটি পরীক্ষা। কেননা নবীদের স্বপ্নও ওহী। আল্লাহ তাআলা পরীক্ষা করেছিলেন হযরত ইবরাহীম (আ.) স্বপ্নের অহী বাস্তবায়েন করছেন কি না। হযরত ইবরাহীম (আ.) খুব সর্তক খোদাপ্রেমিক এক বান্দা। তিনি প্রশ্ন করতে পারতেন প্রভু হে! আমার প্রতি তোমার এতো কঠোর নির্দেশ কেন? কী ফালসাফা আর কী দর্শন রয়েছে তোমার এ নির্দেশে? অথচ দুনিয়ার কোন আইন বা বিধানই এই নির্দেশকে সমর্থন করবে না। সকল বিধানের দৃষ্টিতেই এটি বিবেচিত হবে একটি বর্বর ও জঘন্য কাজ হিসাবে। আকল আর বিবেকের দাড়িপাল্লায় এটি কোনো সময়ই সমর্থনযোগ্য হবে না।
হযরত ইবরাহীম (আ.) কিন্তু আল্লাহর দরবারে এই নির্দেশের কোনো ফালসাফা বা দর্শনের ব্যাখ্যা চাননি। বরং সন্তানকে তিনি পরীক্ষা করার উদ্দেশে প্রশ্ন করে বসলেন বেটা! আমি তো স্বপ্নে তোমাকে জবাই করতে দেখলাম। এবার তুমি বল এ বিষয়ে তোমার অভিমত কী? হযরত ইবরাহীম (আ.) এর প্রশ্নের তরিকা দেখলে বোঝা যায় এক্ষেত্রেও তিনি কত সর্তক ছিলেন। তিনি এভাবে বলেননি যে, তুমি রাজি থাকলে তোমাকে জবাই করব আর রাজি না থাকলে তোমাকে জবাই করব না। বরং তিনিও ছেলেকে এমনভাবে প্রশ্ন করেছেন যে, খোদার প্রেমের টান তার অন্তরে কতটুকু স্থান করেছে। আল্লাহ্র নির্দেশ পালনের মনোভাব তার মাঝে কী পরিমাণ আছে? হযরত ইসমাঈল (আ.) তো আর সাধারণ কোন সন্তান ছিলেন না। তিনি তো ছিলেন হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর সন্তান। আল্লাহর খলীলের সন্তান! তিনি তো সেই সৌভাগ্যশীল সন্তান যাঁর ঔরসে জন্ম নিবে সায়্যিদুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
ছেলে ইসমাঈলও পাল্টা এ প্রশ্ন করেননি ‘আব্বাজান! আমি কী দোষ করলাম? কী অন্যায় করলাম? কোন অপরাধে আমাকে মৃত্যুর দুয়ারে টেনে নেয়া হচ্ছে? এর ফালসাফা বা দর্শনই কী? বরং পুত্র ইসমাঈল নির্ভয়ে জবাব দিলেন আব্বাজান! আপনার কাছে যে নির্দেশ এসেছে, আপনি তা বাস্তবায়ন করে ফেলুন। আমার ব্যাপারে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমাকে আপনি ইনশাআল্লাহ্ ধৈর্যধারণকারী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। আমি এ বিষয়ে আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি-‘আমি হা হুতাশ বা কান্নাকাটি করব না। আপনাকে বাধা দিব না। আপনি আল্লাহন নির্দেশ নির্দ্বিধায় পালন করুন।’
খোদায়ী নির্দেশ পালনে পিতা ইবরাহীম (আ.) অটল, অবিচল। পুত্র ইসমাঈল দৃঢ়চিত্তে এ নির্দেশ বাস্তবায়নে সংকল্পবদ্ধ। উভয়ে এ নির্দেশ পালনে প্রস্তুত। পিতা পুত্রকে কুরবানী করার জন্য মাটিতে শায়িত করলেন। ঠিক এই মুহূর্তে পুত্র ইসমাঈল (আ.) পিতা ইবরাহীম (আ.) এর উদ্দেশে বললেন আব্বাজান! আমাকে উপুড় করে শুইয়ে দিন। সোজা করে শোয়ালে আমার চেহারা আপনার নজরে পড়বে। এমনটি হলে ছেলের মহব্বতে ছুরি চালাতে আপনার কষ্ট হতে পারে।’ আল্লাহর জন্য নিজেকে সমর্পণের এমন একটি অকল্পনীয় দৃশ্য আল্লাহর কাছে ছিল খুব পছন্দনীয়। তাই তো আল্লাহ তাঁর সন্তুষ্টির কথা কুরআনে কারীমে এভাবে ব্যক্ত করেছেন- ‘হে ইবরাহীম! তুমি তোমার স্বপ্নের নির্দেশ বাস্তবে পরিণত করে দেখিয়েছ। সুতরাং তুমি আমার কুদরত প্রত্যক্ষ করো।’ খোদায়ী এ ঘোষণার পর হযরত ইবরাহীম (আ.) নয়নযুগল মেলে তাকিয়ে দেখতে পেলেন ছেলে ইসমাঈল পাশে বসে মুচকি হাসছেন। আর জবাই হয়ে পড়ে আছে একটি বেহেশতী দুম্বা।
মূলত এ ঘটনাই হল কুরবানীর মূল ভিত্তি । এই ঘটনার প্রথম পর্ব থেকেই মানব জাতিকে এ শিক্ষাই দেয়া হয়েছে যে, তার অন্তরে যেন এই অনুভূতি জ্ঞান ও বিবেক জাগ্রত হয় যে, সবকিছুর উর্ধ্বে আল্লাহ তাআলার নির্দেশ। দ্বীনের সারকথাই হল-আনুগত্য-অনুসরণ। খোদায়ী নির্দেশ আসার পর বিবেকের পাগলা ঘোড়া দৌড়িয়ে াঁচাই বাছাই করার সুযোগ নেই। হেকমত, ফালসাফা আর দর্শনের পিছনে ছোটাছুটি করারও কোন অধিকার নেই।
আজকের সমাজ ভ্রষ্টাচার ও গোমরাহীতে নিমজ্জিত। সবকিছুতেই দর্শন, ফালাসাফা অনুসন্ধান করা হয়। অনুসন্ধান করা হয় এই কাজের উপকারিতা কী? এর অর্থ তো এটিই দাঁড়ায় যে উপকারের আশায় কাজটি করা হবে, অন্যথায় নয়। এর অর্থ কি দ্বীন? আর একেই কি বলা হবে অনুসরণ? আনুগত্য? আনুগত্য বা অনুসরণ তো তাকেই বলা যায়, যা বাস্তবে হযরত ইবরাহীম (আ.) আর হযরত ইসমাঈল (আ.) করে দেখিয়েছেন। আল্লাহ তাআলার কাছেও তাদের এই আমলটি এতো পছন্দনীয় ছিল যে, কিয়ামত পর্যন্ত আগত মানব সন্তানের জন্য তা শিরোধার্য করে দিয়েছেন। এ সম্পর্কে খোদায়ী ঘোষণা হলো-আমি পরবর্তীদের জন্য এর অনুসরণকে অপরিহার্য করে দিয়েছি। বর্তমান সময়ে আমরা কুরবানীর যে নির্দেশ পালন করছি, তা মূলত হযরত ইবরাহীম (আ.) এর সেই অমর কুরবানীরই অনুকরণ অনুসরণ মাত্র। আর এই অনুসরণের মূল দাবি হলো যেভাবে তিনি খোদায়ী নির্দেশের সামনে বিনা প্রশ্নে সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিলেন, কোন দর্শন ফালসাফার পিছনে না ছুটে দৃঢ়চিত্তে নিঃসংকোচে আল্লাহর হুকুম পালন করেছিলেন, আজ আমাদেরকেও তার সেই শিক্ষা গ্রহণ করে খোদার সামনে সবকিছু উজাড় করে দিতে হবে। কুরবানী আমাদেরকে এ শিক্ষাই দিয়ে যায়। আনুগত্যের পরম পরাকাষ্টাই হোক আমাদের কোরবানীর শিক্ষা।

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  • প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান (রাহ.) ও সাদাকায়ে জারিয়া
  • রাসূলের সাথে জান্নাত
  • মাতা-পিতার অবাধ্যতার শাস্তি
  •  তাফসিরুল কুরআন
  • বিশ্বনবীর কাব্যপ্রীতি
  • শতবর্ষের স্থাপত্য সিকন্দরপুর জামে মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  •  আত্মার খাদ্য
  • মানব জীবনে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা
  • সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ : ইসলাম কী বলে
  • মৃত্যুর আগে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করি
  •   তাফসীর
  • ইসলামে বিনোদনের গুরুত্ব
  • কুরআনে হাফিজের মর্যাদা
  • মদীনা রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকা-ের কেন্দ্র ছিল মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  • এতিম শিশু
  • বার্মিংহামে আল কুরআনের হাতে লেখা প্রাচীন কপি
  • রাসুলের সমগ্র জীবন আমাদের জন্য অনুকরণীয়
  • মৌল কর্তব্য আল-কুরআনের বিধান
  • Developed by: Sparkle IT