সাহিত্য

বসন্তের প্রথম দিন

ডা. এম এ সালাম প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৮-২০১৮ ইং ২৩:৩৭:৪০ | সংবাদটি ৩৯ বার পঠিত

আজ পহেলা ফাল্গুন। হেমন্ত ঋতুর শুভাগমন। মৌসুমী ফুল ফোটা ও কচিকচি কিশলয় গজানোর প্রতিযোগিতা। মৃদুমন্দ বাতাসে গ্রীষ্মের আগমনি বার্তা। এই শীত-বসন্তের আগমন এবং বিদায় লগ্নের সুখ-দুঃখের বার্তা মানুষের মনকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। প্রতিটি ঋতু বদলের সাথে মানুষের মন-মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা, সুখ-দুঃখ ও প্রেম ভালোবাসার এক অজানা উন্মেষ থাকতেই পারে। এখন বিকেল পাঁচটা বাজে। বসন্তের দ্রুত পালিয়ে যাওয়া রোদ গায়ে মেখে খুব সুদর্শন, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তরুণ ডাক্তার হারুন রসিদ পলাশ তার বস্ প্রফেসর ডাক্তার মোহসীন আহমেদ সাহেবের বাসায় এসে কলিংবেল টিপে দাঁড়িয়ে রইল। ভিতরে কোন সাড়া শব্দ নেই। কিছুক্ষণ পর মিষ্টি চেহারার অসাধারণ সুন্দরী একজন তরুণী এসে দরজা খুলে বলল: স্লামালিকুম। আপনি নিশ্চয়ই ডাক্তার পলাশ? পলাশ হেসে বলল: বাহ্, আপনি আমার নাম জানলেন কি করে? মেয়েটি নিঃশব্দে হাসল। মনে হলো একটি গোলাপ এইমাত্র তার পাঁপড়ি মেললো। কোন কোন মেয়েদের হাসি এতসুন্দর, এত মধুর হয় নিজ চোখে না দেখলে কথায় বুঝিয়ে বলা বড় মুশকিল। পলাশ হেসে বলল: জ্বি, ঠিকই ধরেছেন, আমি ডাক্তার পলাশ। আপনি নিশ্চয়ই স্যারের মেয়ে। স্যার আছেন, আমাকে পাঁচটার দিকে আসতে বলেছিলেন। সন্ধ্যা সাতটায় আমাদের ও-টি আছে। আমি তার এসিসটেন্ট। তা আপনার নামটা কি? মেয়েটি হেসে বলল: বাবা গোসল করছেন। আমি তার একমাত্র মেয়ে। আমার নাম জান্নাত নাসরিন তনুজা। বাবা ¯েœহ করে শুধু তনুজা বলে ডাকেন। পলাশ বলল: বাহ্ তনুজা, নামটি আমারও প্রিয়। বলিউডের সুপারস্টার সুন্দরী তনুজা। আমার খুব প্রিয় নায়িকা। তনুজা বলল: ঠিকই বলেছেন। আপনার আর আমার পছন্দ দেখছি একই রকম। তনুজার অভিনয় আমার খুব ভালো লাগে। পলাশ বলল: চমৎকার, রূপালী পর্দা ছেড়ে তনুজা এখন সশরীরে আমার সামনে দৃশ্যমান। সৌভাগ্য আর কাকে বলে। বোম্বের তনুজার চেয়ে আপনি এক ধাপ এগিয়ে মোহনীয়, এটা আমার নিরীক্ষা। আমি ভালো পছন্দ করতে জানি। তনুজা আবারও নিঃশব্দ হাসল। মনে হলো গুচ্ছ গুচ্ছ জ্যোৎ¯œা ঝরে ঝরে পড়ছে। বলল: খুব বুঝতে পারছি, আপনার বাড়িয়ে বলার প্রবণতা খুব বেশি। তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আর কত প্রশংসা করবেন। আসুন, ভিতরে আসুন। বসে বসে গল্প করলে বন্ধুত্ব জমবে ভালো। পলাশ মুচকি হেসে বলল: দেখুন, আপনি ভিতরে আর আমি বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাজ্যের যত কথা বলেই যাচ্ছি। আপনি তো ভিতরে আসার অনুমতি দেননি। তাই একজনের বাসায় তো জোর করে ঢুকে পড়তে পারি না। তা করলে এটা হতো চরম অভদ্রতা এবং ব্যাপারটি মাস্তানীর পর্যায়ে পড়ে যেত। কি, ঠিক বলিনি? তনুজা বলল: না, একটুও ঠিক বলেননি। অভদ্রতা আর মাস্তানী আপনার বেলায় একটুও প্রযোজ্য নয়। কারণ, আপনি খলনায়ক নন, আপনি রোমান্টিক হিরো। আর রোমান্টিক হিরোরা ন¤্র-ভদ্র হয়, কখনো রাফ্ হয় না। সোফায় বসতে বসতে বলল: কি খাবেন? চা না কফি? পলাশ বিনীত কন্ঠে বলল: না, না, আমি কিচ্ছু খাব না। আপনি ব্যস্ত হবেন না। বসুন গল্প করি। তনুজা মুচকি হেসে বলল: পলাশ, বেশি বিনয় দেখাবেন না। চা, কফি কিচ্ছু খাবেন না। কেন, এখন তো ইভনিং-টি-টাইম। আপনি রোজা আছেন বুঝি? পলাশ তৎক্ষণাৎ বলল: মনে হচ্ছে আপনি আমার কথায় রাগ করেছেন। ও-কে তনুজা ম্যাডাম, আপনার যেটা পছন্দ সেটাই আনতে বলুন। যেটা আপনার পছন্দ সেটা অতি অবশ্যই আমার পছন্দ না হয়ে যাবে কই। তনুজা হেসে বলল: থ্যাঙ্ক ইউ, এবার সৎ পথে এসেছেন। তনুজা ডাক দিয়ে বলল: ঝি দু’কাপ চা আর হোটেল সোনারগাঁ থেকে দুপুরে সে স্যান্ডউইচ্ এনেছি, ওটা দু’পিস এবং ফিল্টারের পানি দু’গ্লাস নিয়ে এসো। ঝি বলল: জ্বি, আপা, নিয়ে আসছি। চা খেতে খেতে পলাশ বলল: তনুজা, আপনি স্টুডেন্ট? তনুজা বলল: ঢাকা ভার্সিটি থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করেছি। এখন থিথিস্ লিখছি। ডক্টরেট করব। পলাশ হাসিমুখে বলল: শুনে খুব ভালো লাগল। আমার দোয়া রইল। তনুজা আবারও মোহনীয় হৃদয় ছোঁয়া নিঃশব্দ হাসল। বলল: আপনার আশীর্বাদ-এর জন্য ধন্যবাদ। তা ডক্টর পলাশ, নিশ্চয়ই বিয়ে করেছেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বউটি নিঃসন্দেহে খুব সুন্দরী। পলাশ ম্লান হাসি দিয়ে বলল: না, সে কাজটি এখনও করে উঠতে পারিনি। কারণ, দীর্ঘদিন থেকে খুঁজছি কিন্তু মনের মতো পছন্দের পাত্রী পাচ্ছি না। আমার চাহিদার যে মাপকাঠি তেমনটি এখানে আসার আগ পর্যন্ত পাইনি। আপনি বিশ্বাস করবেন কি-না জানি না, কিন্তু আমি আমার মনের সত্যি কথাটি বললাম। তনুজা মুক্তা ছড়ানো হাসি দিয়ে বলল: না, না, বিশ্বাস করব না কেন। আপনার অনুভূতির কথা; পছন্দের কথা নিঃসঙ্কোচে বিশ্বাস করছি। কারণ, বিজ্ঞ লোকেরা কখনো হেয়ালী করে কথা বলে না। তো আপনার কথার সারাংশটি কি একটু বুঝিয়ে বলবেন। পলাশ তড়িৎ জবাব দিল: তনুজা, আমার সীমাহীন আকাক্সক্ষার দাবিতে তোমাকে ‘আপনি’ না বলে শুধু তনুজা বলে ডাকলে মাইন্ড করবে? তনুজা প্রফুল্লচিত্তে হেসে জবাব দিল: মোটেই মাইন্ড করব না। তুমি তনুজা বলে যতবার ডাকবে ততবারই আমি সানন্দে সাড়া দেব। পলাশ মুগ্ধচিত্তে জবাব দিল: তনুজা আমার এত আনন্দ লাগছে তোমাকে বলে বুঝাতে পারব না। আমার মনের উপর থেকে একটা প্রচন্ড ভীতির বোঝা নেমে গেছে। আমি দারুন আশংকায় ছিলাম তুমি আমাকে মেনে নিচ্ছ কি-না। কারণ, সুন্দরী মেয়েরা দারুণ অহংকারী হয় এবং এরা সহজে ডিসাইড করতে পারে না, কাকে ছেড়ে কাকে গ্রহণ করবে! এরা প্রায়ই সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে বসে যার জন্য সমস্ত জীবন পস্তাতে থাকে। আর অনুজা, তুমি তো আবার অসাধারণ সুন্দরী। তাই আমার যথেষ্ট সন্দেহ ছিল, কি থেকে কি হয়ে যায়। ¯্রস্টাকে অশেষ ধন্যবাদ, তিনি আমার মনোবাঞ্ছনা শতভাগ পূরণ করেছেন। তনুজা খিলখিল করে হেসে বলল: দেখ পলাশ, আমি আগেই বলেছি তোমার কথা বাড়িয়ে এবং রাঙিয়ে বলার প্রবণতা খুব বেশি। তুমি হলে বলিউডের মেগাস্টার শাহরুক খান। তোমাকে পাওয়া যে কোন মেয়ের পক্ষে একটা পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমি ভাগ্যবতী, তাই চাইতেই পেয়ে গেছি। দেখ পলাশ, গত রাতটি ছিল শীতের শেষ রাত আর আজ বসন্তের প্রথম দিন, এই বসন্তের মৌসুমী ফুল ফোটার শুভলগ্নে তোমার-আমার পরিচয় এবং বন্ধুত্ব এক শুভসূচনার ইঙ্গিত বহন করছে। আমার বিশ্বাস, আমরা বিয়ে করলে চিরসুখী হব। পলাশ গভীর আবেগ নিয়ে বলল: মাই সুইট তনুজা, তোমার প্রত্যয় যেন হয় আমাদের দাম্পত্য জীবনে সুখ-সমৃদ্ধির পাথেয়। আমি গর্বিত, তনুজা তোমাকে সীমাহীন হৃদয় উজাড় করে ভালোবাসা দিলাম। বলে উঠে এসে তনুজার কপালে একটি মায়াচুম্বন এঁকে দিল। তনুজাও পলাশের ডানহাত ধরে চুমু খেল। এমনি সময় প্রফেসর ডাক্তার মোহসীন সাহেব তৈরি হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বললেন: মা, তনুজা, কার সাথে কথা বলছিস? ও, পলাশ, তুমি এসে গেছ। বস, আমাদের তো ও-টি সাতটায়, সময় আছে। বসো, একটু চা-টা খেয়ে যাই। আমার মা-মণির সাথে পরিচয় হয়েছে? জ্বি, স্যার। সী ইজ এন এক্সেলেন্ট ইয়ং লেডি। উনার সাথেই আলাপ করছিলাম। আমি এসেছি ঠিক পাঁচটায়। এখন সাড়ে পাঁচটা বাজে। এই আধ ঘন্টা সময় আমাদের আলাপের মধ্য দিয়ে যে কিভাবে কেটে গেল টেরই পাইনি। স্যার, জীবনে একটা চমৎকার বিকেল কাটালাম। চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে; ওহ্ গড। আমার মনে হচ্ছে ইতিমধ্যে তোমরা দু’টিতে বন্ধুত্ব জমে গেছে। খুব ভালো, সুসংবাদ। দেখ পলাশ, তনুজাকে আমি মা বলে ডাকি। ওর মাঝে আমি আমার মা’র প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাই। ওর মতো বিদোষী মেয়ে জগৎ-সংসারে খুব কমই আছে। তার মন সুন্দর, কথাবার্তা সুন্দর, ¯েœহভরা হৃদয় এবং আমার বিশ্বাস পরীরা আমার তনুজার চেয়ে সুন্দরী নয়। গর্বিত কন্ঠে সুখের হাসি দিয়ে মোহসীন সাহেব বললেন। পলাশ তৎক্ষণাৎ বলল: স্যার, আপনার সাথে আমি একটু এড করতে চাই। তা-না-হলে বক্তব্যটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মোহসীন সাহেব বললেন: সেটা কী, পলাশ বলল: স্যার, পরীরা বই-কেতাবে সুন্দরী, ওরা অধরা, দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না, কিন্তু আমাদের তনুজা বাস্তবে সুন্দরী, দেখা যায়, ধরা যায়, ভালোবাসা যায়। ও, ইয়েস, পলাশ তোমার এ্যজামশন ষোল আনা ঠিক। বাঁধা দিয়ে তনুজা বলল: বাবা, তোমাকেও পলাশের ধু¤্রজালে পেয়ে বসেছে। পলাশও বাড়িয়ে বাড়িয়ে কথা বলতে ভালোবাসে। ইতিমধ্যে টের পেয়ে গেছি; হা-হা করে হেসে মোহসীন সাহেব ললেন: ও, তাই বুঝি? তা মা সত্যি করে বলতো পলাশকে তোর পছন্দ হয়েছে। তনুজা মুক্ত ঝরা হাসি দিয়ে বলল: বাবা, পলাশকে পছন্দ না করার মতো কোন খুঁৎ এখনও পাইনি আর ভবিষ্যতেও পাব না বলে আমার বিশ্বাস। মোহসীন সাহেব তৃপ্তির হাসি দিয়ে বললেন: আলহামদুলিল্লাহ। মা তনুজা, খুশিতে আমার মন ভরে গেছে। আমি বড় দুশ্চিন্তায় ছিলাম। আমার হৃদয়ের টুকরা, নয়নের-মণি অসাধারণ রতœটি কার হাতে তুলে দেব। মা, তোর নিঃসঙ্কোচ সিদ্ধান্তে আমি মুগ্ধ হয়েছি। আমার সার্বক্ষণিক মানসিক চিন্তার বুঝা হাল্কা হল। আমি একজন গর্বিত পিতা। আজ আমার সুযোগ্য মেয়ের সঠিক সিদ্ধান্তে সীমাহীন আনন্দে উদ্বেলিত। আমি বিশ্বাস করি তোর জীবনে পলাশ এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। আমি দোয়া করি তোমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষণ সোহাগ-আনন্দে পরিপূর্ণ থাকুক। হাসি-খুশিতে সারাক্ষণ-সারাবেলা জীবন সমৃদ্ধ থাকুক। মা, তনুজা এটাই ছিল আমার জীবনে একমাত্র প্রত্যাশা। হাঁ, ভালো কথা, আমি তো কেবল বলেই যাচ্ছি। পলাশ, তোমার মনের কথাটি তো একবারও জানতে চাইলাম না। এটা কি ঠিক হচ্ছে। পলাশ বিনীত কন্ঠে বলল: বাবা, আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা আমি হারিয়ে ফেলেছি। তনুজা শুধু সুন্দরী নয়, একজন বিচক্ষণ মহিলা। আপনার নয়নের মণিকে আমার হাতে তুলে দিয়েছেন, এত আনন্দ আমি রাখবো কোথায়। আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছি, চিরটাকাল হৃদয় দিয়ে তাকে আগলে রাখব। কষ্ট নামক বস্তুটি ইহকালে তার কাছে ঘেঁষতে দেব না। মোহসীন সাহেব বললেন: বাবা পলাশ, তোমার ¯িœগ্ধ ভালোবাসা ও প্রত্যয়ের কথা শুনে আমার মন ভরে গেছে। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে মোহসীন সাহেব বললেন: মা-তনুজা, আমি আবার একলা হয়ে গেলাম। তনুজা ও পলাশ দ্রুত এসে মোহসীন সাহেবের পা জড়িয়ে ধরে বলল: বাবা, আমার প্রিয় বাবা, তুমি একা কোথায়? আমরা দু’জন চিরকাল ছায়ার মতো তোমার পেছনে থাকব। এটা আমাদের অঙ্গীকার। মোহসীন সাহেব ওরা দু’জনের মাথায় হাত রেখে বললেন: তনুজা, পলাশ তোমরা দীর্ঘজীবী হও। চিরসুখী হও। তোমাদের প্রত্যাশার প্রতিটি অঙ্গন ফুলে-ফলে ভরে উঠুক। আমার আশীর্বাদ রইল।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT