সাহিত্য

রবীন্দ্রপত্রে চিত্রিত সিলেটের মানুষ

নৃপেন্দ্র লাল দাস প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৮-২০১৮ ইং ২৩:৩৯:০৬ | সংবাদটি ১৪৬ বার পঠিত

পৃথিবীতে সর্বাধিক চিঠি কে লিখেছিলেন?
এ প্রশ্নের উত্তরে গ্রিনিস ডাটা বুক’ কী বলে জানি না।
আমার অনুসন্ধান ও অন্বেষণ বলে স্বামী স্বরূপানন্দ লিখেছিলেন প্রায় এক লক্ষ চিঠি। হ্যারিম্যান হেম লিখেছিলেন ৩৫০০ চিঠি। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন গ্যাটের চেয়ে বেশি চিঠি লিখতে।
একজন গবেষক জানিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ সারাজীবনে ৯২৫ জন ব্যক্তিকে প্রায় ছয় হাজার চিঠি লিখেছিলেন। ১. মনে হয় তথ্যটি সঠিক নয়।
চিঠিপত্র বের হয়েছে ২০ খন্ড, সেখানেই ছয় হাজারের চেয়ে বেশি চিঠি রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের লেখা দুশোরও বেশি চিঠি পেয়েছেন চারজন নারী।
ক. ইন্দিরা ১৮৮৭-১৮৯৫ প্রায় আট বছরে পেয়েছেন ২৫২টি পত্র।
খ. রানু ১৯১৭-১৯২৫ পেয়েছেন ২০৮টি রবীন্দ্রপত্র।
গ. হেমন্তবালা ১৯৩১-১৯৪১ প্রায় এগারো বছরে পেয়েছেন ২৬৪টি।
ঘ. নির্মল কুমারী মহলনবীশ ১৯২৫-১৯৪১ প্রায় ষোল বছরে পেয়েছে ৫০৫টি রবীন্দ্রপত্র।
২. রবীন্দ্রনাথের চিঠি নানা পত্র পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। পত্রিকাগুলি হচ্ছে- প্রবাসী, দেশ, বিশ্বভারতী পত্রিকা, বঙ্গবাণী, বসুমতি, উত্তরা বিচিত্রা, শনিবারের চিঠি, রবীন্দ্র ভারতী পত্রিকা, শান্তি নিকেতন পত্রিকা, পরিচয়, আনন্দবাজার, কবিতা, যুগান্তর, মানসী, মমবাণী, ভারতবর্ষ ও জয়ন্তী। প্রবাসীতে ছাপা হয়েছে প্রায় ৪৫০ খানা পত্র। বিশ্বভারতী পত্রিকায় ছাপা হয়েছে ৪৫০টি। সর্বাধিক রবীন্দ্রপত্র প্রকাশিত হয়েছে দেশ পত্রিকায়। পত্র সংখ্যা-১৭০০
শ্যামাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় দেশ, ১০ জানুয়ারি ১৯৫০, ৫৭তম বর্ষ, ১১ সংখ্যায় অগ্রন্থিত রীন্দ্রপত্রের উপর একটি সমীক্ষা উপস্থাপন করেছেন। গ্রন্থাকারে বের হয়েছে অনেক চিঠি যেমন ছিন্নপত্র, ছিন্নপত্রাবলী, পথের সঞ্চয়, ভানুসিংহ, ঠাকুরের পত্রাবলি ইত্যাদি। মাভাযাত্রীর পত্র, রাশিয়ার চিঠি, জাপান যাত্রীর চিঠি ইত্যাদি বইকেও এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায়। তবে এই বিপুল আয়োজনে: শ্রীহট্ট সিলেটের মানুষের কাছে লেখা কোন পত্র গ্রন্থিত হয়নি। গৌরচন্দ্র সাহার ‘রবীন্দ্রপত্রাবলী, তথ্যপঞ্জি’ গ্রন্থের উত্তর পূর্ব অঞ্চলের মানুষ উপেক্ষিত হয়েছেন। রবীন্দ্র সাহিত্য পাঠের জন্য অতি জরুরী প্রাসঙ্গিক চিঠি রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন সিলেটের নানা জনের কাছে। সেগুলি অজানার অতলে তলিয়ে যেতে বসেছিল।
রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র নির্দেশিকা গ্রন্থেও সতী চট্টোপাধ্যায় ও দেবী রাণি ঘোষ সিলেট প্রসঙ্গ বাদ দিয়েছেন।
৩. এজরা পাউন্ডের ৩৮৪টি চিঠি প্রকাশ করেছেন ফেভার এ্যান্ড ফেবার ১৯৫০ সালে সিলেকটেড অফ এজরা পাউন্ড’ নামে ‘দি লেটারস অফ ভ্যানগক’ও তারা প্রকাশ করেছেন। সে সব পত্রে অনুভবের যে সত্যকে পাই তার চেয়ে গভীরতর হচ্ছে রবীন্দ্রপত্র। রবীন্দ্রনাথ নিজেই মূল্যায়ন করেছেন নিজের লেখা চিঠির এভাবে ‘পৃথিবীতে অনেক মূল্যবান উপহার আছে, তার মধ্যে সামান্য চিঠিখানা কম জিনিস নয়। চিঠির দ্বারা পৃথিবীতে একটি নতুন আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা মানুষকে দেখে যতটা লাভ করি, তার সঙ্গে কথাবার্তা করে যতটা লাভ করি, চিঠিপত্র দ্বারা তার চেয়ে আরো একটা বেশি কিছু পেয়ে থাকি। চিঠিপত্রে যে আমরা কেবল প্রত্যক্ষ আলাপের ভাব দূর করি তা নয়, ওর মধ্যে আরো একটু রস আছে যা প্রত্যক্ষ দেখা শোনায় নেই। মানুষ মুখের কথায় আপনাকে যতখানি যে রকম করে প্রকাশ করে, লেখার কথায় ঠিক ততখানি করে না। আবার লেখায় যতখানি করে, মুখের কথায় ততখানি করতে পারে না। এ কারণে চিঠিতে মানুষকে দেখায় এবং পাওয়ার জন্য আরো একটি যেন নতুন ইন্দ্রিয়ের সৃষ্টি হয়েছে। আমার মনে হয়, যারা চিরকাল অবিচ্ছেদ চব্বিশ ঘন্টা কাছাকাছি আছে, যাদের মধ্যে চিঠি লেখালেখির অবসর ঘটেনি, তারা পরস্পরকে অসম্পূর্ণ করেই জানে। যেমন বাছুর কাছে এলে গরুর বাটে আপনি দুধ জুগিয়ে আসে, তেমনি মনের বিশেষ রস কেবল বিশেষ বিশেষ উত্তেজনায় আপনি সঞ্চারিত হয়, অন্য উপায়ে হওয়ার জো নেই। এই চার পৃষ্ঠা চিঠি মনের ঠিক রস দোহন করতে পারে।
কথা কিংবা প্রবন্ধ কখনোই তা পারে না। আমার বোধ হয়, ওই লেখাকার মধ্যে একটি সুন্দর মোহ আছে- লেখাকাটি চিঠির প্রধান অঙ্গ, ওটা মর্ম আবিষ্কার। (উৎস- পূর্ণ ছবির মগ্নতা- সেলিনা হোসেন, ২০০৮, ঢাকা, পৃ: ১৭০)।
এই রবীন্দ্র ভাষ্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করে মাধুকরী বৃত্তিতে, মৌমাছি তন্ত্রের পন্থায় সিলেটের মানুষের কাছে লেখা রবীন্দ্রপত্র গুচ্ছ সংগ্রহ করে চলেছি গত বিশ বছর যাবৎ। নানা জনের সংগ্রহকে একত্র করে প্রাপক সিলেটীদের পরিচিতি স্বল্প পরিচিতি, অগ্রন্থিত অথচ অতি মূল্যবান পত্রাবলিকে দুই মলাটের মধ্যে স্থাপন করেছি। এখানে পত্র প্রাপক সংখ্যা-১৫, পত্র সংখ্যা-৩০। অধ্যাপিকা শামসুন নাহার জামান ‘রবীন্দ্রনাথের পত্রাবলী ১ম ও ২য় খন্ড প্রকাশ করেছে ১১১ সেন্ট্রাল রোড, বাসমতী, ঢাকা ১২০৫ থেকে। সেখানেও সিলেটীদের কাছে লেখা কোন পত্র সংকলিত হয়নি। এসব কারণে অবিলম্বে রবীন্দ্রপত্রাবলী প্রকাশ করা খুব জরুরী হয়ে পড়েছে। আঞ্চলিকতার প্রতি পক্ষপাত নয়, বিষয় গৌরবেই এই সব পত্র স্থান পরিধি অতিক্রম করেছে ভাব পরিধির অপূর্ব লাবণ্যে।
৪. ১৯৪১ সালে সিলেটের জামতলার বাণীচক্র ভবন থেকে প্রকাশিত কবি প্রণাম নামক অভিজাত সংকলনে প্রকাশিত হয়েছিল কিছু রবীন্দ্রপত্র। ওই গ্রন্থ থেকে সিলেটীদের কাছে লেখা পত্রগুলি সংগ্রহ করেছি। গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত গবেষক অধ্যাপক ড. ঊষা রঞ্জন ভট্টাচার্য্যরে রবীন্দ্রনাথ ও আসাম এবং ‘কবি ও কুইনী ও অন্যান্য’ গ্রন্থ কিছু চিঠি সংগ্রহ করেছি। অধ্যাপক যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য একটি পাঠিয়েছিলেন এস. রায়কে লেখা। নানাসূত্র থেকে আরো চিঠি সংগ্রহ। রবীন্দ্রভবনের সংগ্রহও আমার কাজে লেগেছে।
বিলীয়মান রবীন্দ্রপত্র সংগ্রহে নানাভাবে ক্ষেত্র গবেষণাও করতে হয়েছে। অসহযোগিতার মরুবালু গায়ে মেখে গ্রন্থিত করেছি চিঠি। সবচেয়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে সৈয়দ মুজতবা আলীকে লেখা চিঠি সংগ্রহ করতে গিয়ে। মূল চিঠিটি রক্ষিত হয়নি। সিলেটের বিবর্তন পত্রিকায় চিঠিখানি ছাপা হয়েছিল, সেখান থেকে আহরণ করেছি সুখ্যাত সেই রবীন্দ্রপত্র। রবীন্দ্র জীবনের শেষপ্রান্তে একটি চিঠি লিখেছিলে নিজের অক্ষমতার কথা জানিয়ে ছিলেন মোহাম্মদ সিকান্দর আলীকে। প্রায় অপরিচিত এ সব পত্রে বিচিত্র মননের রবীন্দ্রযোগকে আমরা তুলে ধরতে চাই। কয়েকটি পত্র রবীন্দ্র সাহিত্যের সোনার চারি যেন। এই চিঠিগুলির ব্যাপক পঠন পাঠন খুবই জরুরি।
‘গীতাঞ্জলি বিষয়ে উপেন্দ্র করকে লেখা চিঠিটি খুবই মূল্যবান। ‘আকাক্সক্ষা’ বক্তৃতার সূত্র ধরে সৈয়দ মুজতবা আলীর চিঠিও ঐতিহাসিক গুরুত্ববহ। রবীন্দ্র ছোটগল্পের ইংরেজি অনুবাদ বিষয়ে সত্যভূষণ সেনকে লেখা চিঠিটিও খুব তাৎপর্যপূর্ণ। কুইনী ও রেবা রায়কে লেখা রীবন্দ্র পত্র দ্যুতিময়। রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুসঙ্গে অনাদি দস্তিদারকে লেখা পত্রগুচ্ছ ভাবনার এক নতুন উপনিবেশকে স্থাপন করেছে। প্রাপকদের পরিচিতি সহ মন্তব্যকার হয়ে দেখাতে চাই উত্তর পূর্ব অঞ্চলের মানুষের কাছে লেখা রবীন্দ্রপত্র গুচ্ছ নানা কারণে হীরকদ্যুতি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
বিশ্বভারতীর আগ্রহের নেপথ্যে থাকা এই চিঠির সম্ভার ও আমাদের সারস্বতর্চ্চার ক্ষেত্রকে শুধু সম্প্রসারিত করেনি, রবীন্দ্র সভ্যতার দিগন্তকেও প্রসারিত করেছে। অনেক চিঠি বিনষ্ট হয়ে গেছে, কিছু আছে ব্যক্তিগত অলিন্দের অন্ধকারে। নানা রবীন্দ্রনাথের একটি মালা আমরা তৈরি করে দিলাম অক্ষম হাতে, অযোগ্যতার তখমার সাতটি তারার তিমিরে। একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ তাঁর রবীন্দ্রশোভন ভাষায় ও মননে লিখেছিলেন-
‘এই চিঠি পড়াটাই সৃষ্টির ¯্রােত- যে দিচ্ছে আর যে পাচ্ছে সেই দু’জনের মনের কথা এতে মিলেছে, সেই মিলনেই রূপের ঢেউ। সেই মিলনের জায়গাটা হচ্ছে বিচ্ছেদ কেন না, দূর নিকটজনের ভেদ না ঘটলে ¯্রােত বয় না। চিঠি চলে না। রবীন্দ্রনাথের এই মৌল প্রবণতাকে আমরা খুঁজে পাবো বক্ষ্যমান পত্রালিপুঞ্জে।
কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের পত্র আছে। সেগুলিতে মানুষ রবীন্দ্রনাথ হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে আভাময় হয়ে উঠেছেন। সেগুলিও উপভোগ্য। এক বালিকার কাছে লেখা চিঠিতে দেখা যায় মহান পুরুষ মহাকবি কত সহজেই না তার সমীপবর্তী হয়েছেন। বিচিত্রের দূত এই কবির মনের নানা জানালা অবারিত হয়েছে শ্রীহট্ট সিলেটের মানুষের কাছে লেখা পত্রে।  

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT