মহিলা সমাজ

মঙ্গলের আলোকবর্তিকা : কফি আনান

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৮-২০১৮ ইং ০২:০২:১৭ | সংবাদটি ১৭৪ বার পঠিত

মানবতার অন্যতম সেরা দৃষ্টান্ত কফি আনান। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব। তিনি আজ নেই। গত ১৮ আগস্ট শনিবার পরলোকগমন করেছেন। সুইজারল্যান্ডের বার্নে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ঘানার নাগরিক কফি আনান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। জীবনের শেষ মুহূর্তে কফি আনানের পাশে ছিলেন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ন্যানে এবং তিন সন্তান আমা, কেজো ও নিনা।
বিশ্বের যেখানেই মানবতা বিপর্যস্ত হয়েছে সেখানেই কফি আনানের সরব উপস্থিতি ছিল। যুদ্ধ বিধ্বস্ত, আশ্রয়হারা, দেশবঞ্চিত এবং দরিদ্র মানুষের অধিকার সুরক্ষায় আজীবন কাজ করে গেছেন এই ক্ষণজন্মা মানুষটি। তাঁর প্রয়াণে শূন্যতা অনুভব করছে বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলো। মানবাধিকার বঞ্চিত মানুষ তাঁদের দুঃসময়ে আনানকে আর পাশে পাবে না। কিন্তু তাঁকে দীর্ঘদিন মনে রাখবে। ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মহাসচিবের পদে দায়িত্ব পালন করেছেন কফি আনান। দারিদ্র্য আর শিশু মৃত্যু কমাতে বিশ্বব্যাপী কাজ করে গেছেন জনাব কফি আনান।
ঘানার দক্ষিণাঞ্চলীয় কুমাসি এলাকায় জন্ম কফি আনানের। কুমাসিতেই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ে বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান কফি আনান। মিনেসোটায় ম্যাকেলেস্টার কলেজে অর্থনীতিতে এবং ম্যাসাটুসেটম ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ব্যবস্থাপনায় ডিগ্রি নিয়েছেন কফি আনান। জেনেভায়ও লেখাপড়া করেছেন এই গুণী ব্যক্তিত্ব।
১৯৬৫ সালে নাইজেরিয়ার তিতি আলাকিজাকে বিয়ে করেন কফি আনান। এই দম্পতির আমা নামে একটি মেয়ে ও কেজো নামে একটি ছেলে রয়েছে। সত্তরের দশকে আনান ও আলাকিজার বিচ্ছেদ হয়ে যায়। তারপর ১৯৮৪ সালে জাতিসংঘে সুইডিশ আইনজীবি ন্যানে লেগারগ্রেনকে বিয়ে করেন কফি আনান। জাতিসংঘের সঙ্গে চার দশক কাজ করেছেন মানবতার আলোর এই ফেরিওয়ালা। জাতিসংঘের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত কৃষ্ণাঙ্গ মহাসচিব কফি আনান। মহাসচিবের দায়িত্ব নেওয়ার পর কফি আনান জাতিসংঘের সংস্কার ও মানবাধিকারকে অগ্রাধিকার দেন। এর স্বীকৃতি স্বরূপ ২০০১ সালে তিনি ও জাতিসংঘ যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পায়।
মানব শিষ্টাচার ও মাধুর্যের উজ্জ্বল প্রতীক কফি আনান হাজার মানুষের বন্ধু ছিলেন, নেতা ছিলেন লাখো মানুষের। ১৯৩৮ সালের ৮ এপ্রিল ঘানার কুমাসি এলাকায় কফি আনানের জন্ম হলেও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের মাঝে সম্পর্ক উন্নয়নে প্রচেষ্টা চালাতে কফি আনান জড়িত ছিলেন। তাঁকে প্রধান করেই মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা সম্পর্কিত কমিশন গঠন করেছিল। গত বছরের আগস্ট মাসের শেষের দিকে তিনি রাখাইন রাজ্যের ব্যাপারে গঠিত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন। অং সান সুচির কাছে তিনি কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নের অনুরোধ জানান।
কফি আনান তাঁর আত্মজীবনী ইন্টারভেনশনস : আ লাইফ ইন ওয়ার এ্যান্ড পিস-এ লিখেছেন, ‘জাতিসংঘকে এমনভাবে তিনি গড়তে চেয়েছিলেন, যাতে বিশ্ব সংস্থাটি কেবল সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নয়, জনগণের স্বার্থ দেখবে।’ ২০০৬ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে জাতিসংঘের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন কফি আনান। এরপর সুইজারল্যান্ডে বসবাস শুরু করেন মানবতার এই মহানায়ক।
শান্তি, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অসামান্য অবদানের জন্য বিশ্ববাসী কফি আনানকে মনে রাখবে। বিশেষ করে জোরপূর্বক-বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রতি সমর্থনের জন্য মানুষের হৃদয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন কফি আনান। বিজন লাল মৃত্তিকার মায়াবী বুকে তাঁর ঠাঁই হলেও অমূল্য বুনো ফুলের মুগ্ধতা দেখার জন্য লোকজন ছুটে যাবে তাঁর সমাধিস্থলে। কারণ, বেঁচে থাকতে তিনি ছিলেন, নিঃশব্দ, নিরুপদ্রব, শান্তির প্রতীক, শুভ্রতায় মোড়ানো ছায়ামালতীসম। অর্থাৎ কফি আনান ছিলেন মঙ্গলের আলোকবর্তিকা। হাজার হাজার জীবনে তিনি প্রদীপ জ্বালিয়েছেন। বেঁচে থাকার সাহস জুগিয়েছেন। পথের শেষ সীমানা দেখিয়ে দিয়েছেন। পৃথিবীর নির্মল বাতাসে কান পাতলে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া উপকারভোগীরা বিশাল শূন্যতা আর হাহাকারের গল্প শুনতে পাবে। মন খারাপ করা সেসব গল্প।
আনন্দলোকে!/ মঙ্গল আলোকে!/ সত্য সুন্দর হয়ে কফি আনান বেঁচে থাকবেন মানবাধিকার বঞ্চিত মানুষের পরানের গহীনে। কফি হাউজের মতো ‘কফি আনান’ নামটিও যুগে যুগে মানুষ মনে রাখবে। কফি আনান নয়ন সমুখে আজ নাই। কিন্তু নয়নের মাঝখানে নিয়েছেন ঠাঁই।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT