ইতিহাস ও ঐতিহ্য

একটি হাওরের অতীত ঐতিহ্য

আব্দুশ শহীদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৮-২০১৮ ইং ০০:৪৩:৪৮ | সংবাদটি ১০০ বার পঠিত

হাওর বিল-বাদাল আর নদ-নদীর দেশ এ বাংলাদেশ। সবুজ শ্যামল এদেশকে বৈচিত্রময় রূপ দান করেছে এদেশের হাওর আর নদ-নদী। হাওরের সাথে রয়েছে মানুষের আত্মার সম্পর্ক। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক হাওর আর নদ-নদীর চমৎকার দৃশ্য। মোগলাবাজার ও ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় ভাগ বসিয়েছে যে হাওরটিতে তার নাম হচ্ছে ‘শাইলকার হাওর’, শাইলকা বিলের নামানুসারেই এ হাওরের নামকরণ।
মোগলাবাজার থানাধীন নেগাল, গোপালগাঁও ও হোসেনপুত্র গ্রামের সোজা দক্ষিণ দিকে তাকালে কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলো কালো রেখার মত দৃশ্যপটে জেগে ওঠে। তবে প্রস্থে তার অর্ধেকের চেয়ে বেশি হবে না। এ হাওরটিতে অনেক সুপ্রসিদ্ধ খাল-বিল ছাড়াও রয়েছে বহুল আলোচিত একটি ঐতিহাসিক স্থান। ঐ স্থানটির নাম হচ্ছে ‘বাতির টুক’। ঐ বাতির টুকের নির্মাণের পিছনে রয়েছে অনেক বেদনা আর হাস্যরসের কাহিনী।
“মাছে ভাতে বাঙালি” এ কথাটির বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া যায় হাওর আর নদ-নদীর মধ্যে। এ হাওরটির উত্তরাংশ আউশ-আমনের মাঠ, আর দক্ষিণে বিস্তৃত এরিয়া হলো খাল-বিল আর বুরো ফসলের বৃহৎ অঞ্চল। অনুরূপভাবে বর্ষার মৌসুমে মানুষের মাছের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে এ হাওরটি যেন একটি বড় অংকের পূঁজি। আদিকাল থেকেই এতোদঅঞ্চলের লোক প্রয়োজনীয় কাজে হউক আর ব্যবসার উদ্দেশ্যেই হউক দক্ষিণাঞ্চল বা ফেঞ্চুগঞ্জে যাতায়াত করতে হলে বছরের প্রায় অধিকাংশ সময় এ হাওরের মধ্য দিয়ে নৌকাযোগে যাতায়াতের ছিল প্রধান রাস্তা। কারণ তখন রেলওয়ে ছাড়া সড়ক পথে যোগাযোগের কোন ব্যবস্থা ছিল না।
সিলেট ফেঞ্চুগঞ্জ আবার ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে সিলেট যাতায়াতের জন্য এ হাওরটির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। বন্যার সময় সকল পেশার মানুষ মাছ শিকারের জন্য যাবতীয় উপকরণ সাথে নিয়ে নৌকাযোগে প্রবেশ করতেন এ হাওরটিতে। কিন্তু সবচাইতে বড় ধরনের যে বিড়ম্বনার বিষয়টি ছিল এ হাওরে, তা হল যখন বাড়িতে ফেরার পালা আসতো অন্ধকার রাত হলে অনেকেই দিক হারিয়ে ফেলতেন। সারা রাত ঘুরপাক খেতে খেতে ভোরের আলো প্রস্ফুটিত হলেই তারা নিজ গন্তব্যে ফিরতেন। প্রবীণদের মুখ থেকে শুনেছি, এ হাওরে ছিল একটি দানব (দেও) এর অবাদ বিচরণ, জিন, দেও-দানব ওরা আগুনের সৃষ্টি। এজন্যই তারা যে কোন সময় যে কোন আকৃতি ধারণ করতে পারে। এ দানবটির নাম ছিল ‘আতারাম’। এ হাওরে অনেক মানুষের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়েছে। সে দানবটি ছিল গম্ভীর ও শান্ত মেজাজের। কেহ তার পরিচয় জানতে চাইলে ঘাড় বাঁকিয়ে বলতো আমি ‘আতারাম’। সেও মাছ শিকারের জন্য এ হাওরে চরে বেড়াতো। তার জাতি সত্তা ত্যাগ করে মানুষ সেজেই ছিল তার চলাফেরা। তাকে কেউ মামা বলে ডাকলে সে তাকে আদরের চোখে দেখতো।
এ হাওরের উত্তর-পূর্ব কোণে ছিল একটি উঁচু ভিটা, সে ভিটার নাম রাজাপুতা। ঐ রাজাপুতায় এক সময় ছিল বিশাল আকারের দুটি গাছ। মানুষের ধারণা ঐ গাছ দুটিতেই ছিল সেই দানবের আস্তানা। অনেকে মনে করতেন তার অবাধ বিচরণে কেউ ব্যাঘাত ঘটালে শাস্তিস্বরূপ মানুষকে ধাঁধা লাগিয়ে এ হাওরেই সারারাত বিভ্রান্তিতে ফেলে রাখতো।
বাতির টুকটি নির্মাণের পিছনে আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণ হল, মোগলাবাজারের নিকটবর্তী গোপালগাঁও গ্রামের বেবী বাবু নামে একজন সুপরিচিত ব্যক্তি ছিলেন। আত্মীয়তা শেষে ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে নৌকাযোগে নিজ গ্রামে আসবেন। হাওরের পানি তখন খাল বিলে নেমে গেছে। দীর্ঘ হাওর পাড়ি দিয়ে কেশরখালি নদীতে প্রবেশ করেই মোগলাবাজার আশা ব্যতিত বিকল্প কোন পথ ছিলনা। এ হাওরের বিড়ম্বনার আরেকটি ফাঁদে তিনি পড়ে গেলেন, কেশরখারি নদীর প্রবেশদ্বার আঁকাবাঁকা থাকার কারণে বহু খোঁজাখুঁজির পরও আর নদীতে প্রবেশ করা সম্ভব হলোনা। তিনি জানতে পারলেন এখানে এ ধরনের বিড়ম্বনা মাঝে মধ্যে হয়ে থাকে। তাকে সবুর করে মশা আর পোঁকা মাকড়ের কামড় খেয়ে সারা রাত এখানে কাটাতে হল। পরিকল্পনা করলেন এ হাওরের দীর্ঘ মেয়াদী এ সকল বিভ্রান্তির অবসান ঘটাতে হবে। জনাব রায় বাহাদুর রমেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য্য তখন সিলেটের অনারারী ম্যাজিস্ট্রেট। এ সকল বিভ্রান্তির কথা শুনানোর পর তার কাছে আবদার পেশ করা হলো এখানে একটি বাতি চাই। রায় বাহাদুর সাহেবের প্রচেষ্টায় নির্মাণ করা হলো একটি উঁচু টুক তার উপর দাড় করানো হলো দীর্ঘকার একটি লোহার খুঁটি। খুঁটির আগায় চতুর্ভুজ আকারে গ্লাস বেস্টনি তৈরি করা হলো। যাতে একটি কেরেসিনের মশাল ঝড়-বৃষ্টিতে নিভাতে না পারে। প্রতিদিন সন্ধ্যা বেলা মশালটি জ¦ালানোর কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল একলাল নামক এক ব্যক্তিকে। এটাই সে ঐতিহাসিক ‘বাতির টুক’। এ বাতিকে লক্ষ্য করেই হাওরের মানুষ গন্তব্যে পৌঁছার দিক নির্ণয় করতেন।
শুধু তাই নয় মিটমিট করে জ¦লতে থাকা এ বাতিটি সত্যিই মানুষের নজর কাড়তো। বৈরী আবহাওয়ায় হাওর উত্তাল হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলেই মাঝিরা নৌকা নিয়ে এখানেই একত্রিত হতেন, যেন এটি একটি আশ্রয় কেন্দ্র। বৃটিশ আমলের শেষের দিকে নির্মিত হয়েছিল এই ঐতিহাসিক স্থানটি। ঊনবিংশ শতাব্দির প্রায় আশি সাল পর্যন্ত স্বগৌরবে যেন এ স্থানটি বিদ্যমান ছিল। যুগের বিবর্তনে সেই কেশরখালি নদী এখন চিকন খালে রূপান্তরিত। ঐতিহাসিক সেই ‘বাতির টুক’ এখন শুধু মাত্র রেকর্ড পত্রে বন্দী। বাস্তবে সামান্য আলামত ব্যতিত আর কিছুই নেই। শাইলকার হাওরের অপরূপ সৌন্দর্য্য বিলীন হতে চলেছে। কারণ, আউষ-আমনের মাঠে তৈরী হচ্ছে গুচ্ছ, গুচ্ছ অগণিত ঘর-বাড়ী।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • জাতীয় স্মৃতিসৌধ
  • বাংলাদেশের লোকশিল্প
  • উৎলারপাড়ের পোড়া পাহাড় আর বুদ বুদ কূপ
  • চেলা নদী ও খাসিয়ামারা মোহনা
  • সিলেটে মুসলমান সম্পাদিত প্রথম সাহিত্য সাময়িকী
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • Developed by: Sparkle IT