ধর্ম ও জীবন

প্রতিবেশীর অধিকার : ইসলাম কী বলে

আহমদ যাকারিয়া প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০৮-২০১৮ ইং ০০:৫৭:৪৩ | সংবাদটি ৪২২ বার পঠিত

সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে মানুষ পরস্পর একতাবদ্ধ হয়ে বসবাস করে আসছে। বাড়ির পাশাপাশি বসবাসকারী আত্মীয়-স্বজনই প্রতিবেশী। কাজেই এই প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ করা জরুরি। প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ককে সৌহার্দ্যপূর্ণ, আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল করার লক্ষ্যে ইসলাম বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছে। এই নির্দেশ প্রতিটি মানুষের জন্য অবশ্যই পালনীয়।
মন্দ প্রতিবেশী থেকে আমরা আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। কারণ একজন মন্দ প্রতিবেশী সাধারণ জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা মন্দ প্রতিবেশী থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাও। (সুনানে নাসায়ী, হাদীস-৫৫০২, শুআবুল ঈমান, বায়হাকী হা. ৯১০৬)
আমি কারো জন্য মন্দ প্রতিবেশী হব না। যেমনিভাবে আমি চাই না যে, আমার প্রতিবেশীটি মন্দ হোক, তেমনিভাবে আমাকেও ভাবতে হবে, আমিও যেন আমার প্রতিবেশীর কষ্টের কারণ না হই। হযরত নাফে রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, উত্তম প্রতিবেশী হলো ব্যক্তির সৌভাগ্যের কারণ। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস-১৫৩৭২, আল আদাবুল মুফরাদ, বুখারী, হাদীস-১১৬)
প্রতিবেশীর হক নষ্ট করা বা তাকে কষ্ট দেওয়া অনেক বড় অন্যায়। কখনো দুনিয়াতেই এর সাজা পেতে হয় আর আখিরাতের পাকড়াও তো আছেই। আমার অর্থবল বা জনবল আছে বলে আমি প্রতিবেশীর হক নষ্ট করে পার পেয়ে যাব এমনটি নয়। হ্যাঁ, দুনিয়ার আদালত থেকে হয়তো পার পেয়ে যাব, কিন্তু আখেরাতের আদালত থেকে আমাকে কে বাঁচাবে? হযরত উকবা ইবনে আমের রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন প্রথম বাদী-বিবাদী হবে দুই প্রতিবেশী। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস-১৭৩৭২, আল মু’জামুল কাবীর, তবারানী, হাদীস-৮৩৬)
প্রতিবেশীকে কষ্ট দিব না। প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার বিষয়টিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈমানের দুর্বলতা বলে চিহ্নিত করেছেন। কোনো ব্যক্তি মুমিন, আবার প্রতিবেশীকে কষ্টও দেয় তা ভাবা যায় না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন; যে আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে ও আখেরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন স্বীয় প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। (দ্র. সহীহ বুখারী হা. ৬০১৮)
কষ্ট দেওয়ার বিভিন্ন রূপ হতে পারে। যেমন, জানালা দিয়ে উঁকি দেয়া, চলাফেরার ক্ষেত্রে দৃষ্টি অবনত না রাখা, প্রতিবেশীর বাসার সামনে ময়লা ফেলা, জোরে গান-বাজনা করা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সময় প্রতিবেশীর ঘুম বা বিশ্রামের ক্ষতি করা, প্রতিবেশীর চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া, গৃহপালিত পশুর মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া ইত্যাদি। নিজের গৃহপালিত পশু ছেড়ে দিলাম আর পশুগুলো প্রতিবেশীর ফসলের ক্ষতি করল। এসকল ক্ষেত্রে সচেতন হওয়া উচিত। মুমিন তো সর্বদা ভালো আচরণ করে। মুমিনের গুণ তো তোমার সাথে যে মন্দ আচরণ করে তুমি তার সাথে ভালো আচরণ কর। সে তো কুরআনের ঐ আয়াত শুনেছে। প্রকৃতপক্ষে যে সবর অবলম্বন করে ও ক্ষমা প্রদর্শন করে, তো এটা বড় হিম্মতের কাজ। (সূরা শূরা : ৪৩)
হাদীসে এসেছে, আল্লাহ তিন ব্যক্তিকে পছন্দ করেন, তাদের একজন ঐ ব্যক্তি, যার একজন মন্দ প্রতিবেশী রয়েছে, সে তাকে কষ্ট দেয়। তখন ঐ ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর সওয়াবের আশা রাখে। এক পর্যায়ে ঐ প্রতিবেশীর ইন্তেকালের মাধ্যমে আল্লাহ তাকে মুক্তি দেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২১৩৪০, আলমুসতাদরাক, হাকেম খ. ২ পৃ. ৮৯, শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস ৯১০২)
আল্লাহ তা’আলা বলেন, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর, আর সদ্ব্যবহার কর নিকটাত্মীয়, ইয়াতিম-মিসকিন, নিকটতম প্রতিবেশী ও দূরের প্রতিবেশীর সাথে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জিবরাইল সব সময় আমাকে প্রতিবেশী সম্বন্ধে উপদেশ দিয়ে আসছেন, যার ফলে আমার এ ধারণা হলো যে, হয়তো শিগগিরই তাকে উত্তরাধিকারী রূপেও গণ্য করা হবে। (বুখারি ৬০১৫, মুসলিম ২৬২৫)
একজন প্রতিবেশীর উপর তার অপর প্রতিবেশীর অধিকার হচ্ছে এই যে, উক্ত প্রতিবেশী যেন তার সাধ্যানুসারে তার ধন-সম্পদ এবং মর্যাদা ও কল্যাণকারিতার মাধ্যমে তার সাথে সদ্ব্যবহার করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নিকট সেসব প্রতিবেশীই উত্তম বলে বিবেচিত, যারা তার প্রতিবেশীর নিকট উত্তম বলে গণ্য। (তিরমিযি ১৯৪৪)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং আখেরাতের ওপর বিশ্বাসী সে যেন তার প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করে। (মুসলিম ৪৮)
একজন প্রতিবেশীর ওপর আরেকজন প্রতিবেশীর অধিকার এই যে, তাকে কথা ও কাজে কোন প্রকার কষ্ট দেওয়া থেকে সে নিজেকে বিরত রাখবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন আল্লাহ্র কসম! সে ব্যক্তি মুমিন নয়, আল্লাহ্র কসম সে ব্যক্তি মুমিন নয়, আল্লাহ্র কসম সে ব্যক্তি মুমিন নয়। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, কে সে ব্যক্তি হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, যার অত্যাচার থেকে তার প্রতিবেশী মুক্ত নয়। (বুখারি ৬০১৬, মুসলিম ৪৬)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যার প্রতিবেশী তার অত্যাচার থেকে মাহফুজ নয় সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। (মুসলিম ৪৬)
অতএব, যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীর কুকর্ম ও অন্যায় আচরণ থেকে মুক্ত নয় সে প্রতিবেশী মুমিন হতে পারে না। অতএব সে জান্নাতেও প্রবেশ করতে পারবে না। বর্তমানে অনেক লোকই প্রতিবেশীর অধিকারগুলোকে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যতœবান নয়, এমনকি তাদের প্রতিবেশীগণ তাদের অন্যায় আচরণের কারণে শান্তিতে বসবাসও করতে পারছে না। অতএব, তুমি দেখতে পাবে যে, তারা সব সময়ই ঝগড়া-ফাসাদে লিপ্ত রয়েছে এবং প্রতিবেশীকে কথা ও কাজে ব্যথা দিচ্ছে। আর এরূপ আচরণ নিঃসন্দেহে আল্লাহ এবং তার রাসূলের হুকুমের পরিপন্থী, আর মুসলিমদের মধ্যে বিচ্ছেদ, তাদের অন্তরের দূরত্ব এবং একে অন্যের সম্মান বিনষ্টকরণের জন্য এতটাই হচ্ছে বড় কারণ।
প্রতিবেশীর প্রতি ভালো-মন্দ ব্যবহারের পরিণতি :
সমাজে এক শ্রেণির নর-নারী আছে, যারা নামায রোজা হজ্ব যাকাত দান সাদকাহ ইত্যাদি পুণ্যময় আমল করেন অথচ প্রতিবেশীর প্রতি নিকৃষ্ট আচরণ করেন। প্রতিবেশীকে গালমন্দ করেন, অশ্লীলভাষা কটূবাক্য দ্বারা প্রতিবেশীর অন্তরে কষ্ট দেয়। সামান্য বিষয় নিয়েও প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হয়। প্রতিবেশীর ব্যাপারে কুৎসা রটনা করে সমালোচনা করে। প্রতিবেশী দুর্বল হলে কূটকৌশলে তার সম্পত্তি আত্মসাৎ করতেও পিছপা হয় না। বিভিন্নভাবে প্রতিবেশীকে হয়রানি করে এ ধরনের ধার্মিকতা কোনো কাজে আসবে না, বরং তার করুণ পরিণতি হবে ভয়াবহ জাহান্নাম। আর কোনো বান্দার মধ্যে নামায রোজা দান সাদকার পরিমাণ কম হলেও তিনি যদি প্রতিবেশীর হক বা দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় করেন এর উত্তম প্রতিদান হিসেবে তার জন্য রয়েছে জান্নাতের সুসংবাদ।
হাদীস শরীফে আছে- হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল ইয়া রাসূলাল্লাহ! অমুক মহিলার সঠিক নামায রোজা ও দান সাদকার কারণে তাকে স্মরণ করা হয়, তবে সে তার জিহ্বা দ্বারা তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দিয়ে থাকে। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, সে জাহান্নামী। উক্ত ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো ইয়া রাসূলাল্লাহ! অমুক মহিলার স্বল্প রোজা, স্বল্প দান-সাদকা ও স্বল্প নামাযের বিষয় মানুষের মধ্যে আলোচনা করা হয়, তবে সে পনিরের টুকরা বিশেষ দান করে থাকে এবং তার জবান দ্বারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। তিনি এরশাদ করেন সে জান্নাতী। (আহমদ)
প্রতিবেশীর অধিকার প্রসঙ্গে হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস সালাম-এর তাকিদ প্রতিবেশীর হক সম্পর্কে জিব্রাঈল আলাইহিস সালাম প্রতিনিয়ত গুরুত্বারোপ করতেন।
হাদীসে এরশাদ হয়েছে- হযরত আয়েশা ও হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, জিব্রাঈল আলাইহিস সালাম সর্বদা আমাকে প্রতিবেশীর হক সম্পর্কে তাকিদ দিচ্ছিলেন, এমনকি আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম যে, তিনি অনতিবিলম্বে প্রতিবেশীকে আমার ওয়ারিশ করে দেবেন। (মুসলিম শরীফ)
প্রতিবেশীর মূল্যায়ন ভাল-মন্দের মাপকাঠি :
নিজের ভাল-মন্দ কর্মের স্বীকৃতি অন্যজনের মূল্যায়ন ও মতামতের উপর নিভর্রশীল। অনেকেই প্রতিনিয়ত অন্যায় অপরাধ ও মন্দ কর্মের তথা অপকর্মে নিমজ্জিত থাকার পরও মোটেই অনুতপ্ত নন, দোষী হওয়ার পরও নিজেকে নির্দোষ মনে করেন, অন্যজনের মতামত ও মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেয় না। অন্যায় করার পরও প্রশংসা পেতে চান। এ শ্রেণির মানুষ অহংকারী দাম্ভিক। তারা অপরের মতামতকে সম্মান করে না। নিজের সংশোধন হওয়ার চেষ্টা করে না। কেউ সংশোধনের পরামর্শ বা মতামত ব্যক্ত করলে তাদেরকে শত্রু মনে করে। অন্যজনের বিশ্লেষণ পর্যালোচনা মূল্যায়ন ও প্রদর্শিত পন্থা গ্রহণ করতে পারা মহানুভবতার পরিচায়ক। প্রতিবেশীর পক্ষ থেকে ভাল স্বীকৃতি পাওয়া গৌরবের ও আনন্দের।
নিম্ন বর্ণিত হাদীসে এরশাদ হয়েছে- হযরত আবদল্লাহ ইবনে মসউদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি এরশাদ করেন, যখন তুমি তোমার প্রতিবেশীকে বলতে শুনবে যে, তুমি ভালো করছ, তবে প্রকৃতই তুমি ভালো করেছ। আর যখন প্রতিবেশীকে বলতে শুনবে যে, তুমি মন্দ করছ, তবে মনে করবে যে, তুমি মন্দই করেছ। (ইবনে মাযাহ)
সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম আদর্শ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত পথে সত্যান্বেষী মুক্তিকামী মানুষের সর্বাঙ্গীন সুখ শান্তি মঙ্গল ও কল্যাণ নিহিত। তাই আসুন মহানবীর হাদীসের আলোকে সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠায় প্রতিবেশীর প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করি। প্রতিবেশীর প্রতি সু-সম্পর্ক করুন। প্রতিবেশীর প্রতি দূরত্ব নয় নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করুন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT