ধর্ম ও জীবন

কৃপণতা একটি আর্থসামাজিক অপরাধ

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০৮-২০১৮ ইং ০১:০০:১২ | সংবাদটি ৪৭ বার পঠিত

‘যারা আল্লাহর দেয়া ধন-সম্পদের বেলায় কৃপণতা প্রদর্শন করে তারা যেন এ ভুলের মধ্যে নিমজ্জিত না থাকে যে, তা তাদের জন্য কল্যাণকর বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকর। যে সম্পদের বেলায় তারা কৃপণতা প্রদর্শন করেছে সে সম্পদ কিয়ামতের দিন তাদের গলায় হার রূপে পরিয়ে দেয়া হবে।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৮০)
কৃপণতার সংজ্ঞা : আরবী ভাষায় ‘বখিল’ অর্থ কৃপণ। বুখল অর্থ কৃপণতা, ব্যয়কুণ্ঠতা বা অর্থ ব্যয়ে কাতরতা। আমাদের সমাজে বহুকাল থেকে আরবী বহুল প্রচলিত। যার দরুণ বাংলা ক্রিয়ারূপে বখিলী বা ‘বখিলতা’ ব্যবহার হয়ে থাকে। বুখল বা কার্পণ্যের শরীয়ত নির্ধারিত অর্থ হল-‘যা আল্লাহর রাহে ব্যয় করা কারো ওপর ওয়াজিব তা না করা।’ এ কারণেই কার্পণ্য বা বুখল হারাম এবং এ জন্য আল কুরআনে জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। যে সব ব্যয় ওয়াজিবের আওতাভুক্ত নয়, সেসব ক্ষেত্রে কার্পণ্য করা হারামের অন্তর্ভুক্ত নয়। অবশ্য সাধারণ অর্থে তাকেও কার্পণ্য বলা হয়ে থাকে। এ ধরণের কার্পণ্য অর্থেই আরও একটি শব্দ কুরআন ও হাদীসে ব্যবহৃত হয়েছে। তা হলো ‘শুহ্’। এর আভিধানিক অর্থ হলো: কৃপণ হওয়া, কমে যাওয়া, লোভ করা ইত্যাদি। এ শব্দটিকে যখন নাফসুন শব্দের সাথে সম্বন্ধযুক্ত করে ‘শুহ্হান নাফস’ বলা হয় তখন তা দৃষ্টি ও মনের সংকীর্ণতা, পরশ্রীকাতরতা এবং মনের নীচতার সমার্থক হয়ে যায় যা বখিলী বা কৃপণতার চেয়েও ব্যাপক অর্থ বহন করে। এ বৈশিষ্টের অধিকারী ব্যক্তি অন্যের অধিকার স্বীকার করে না। সে চায় দুনিয়ার সবকিছু সে-ই লাভ করুক, অন্য কেউ যাতে কিছু না পায়। নিজে তো দান করেই না বরং সে অন্যের দান করাটাও পছন্দ বা সহ্য করতে পারে না। তার লালসার দৃষ্টি নিজ সম্পদের বাইরে অন্যের সম্পদের ওপর গিয়েও পড়ে। সে চায় চারদিকে যত ভাল বস্তু আছে তা সে দু’হাতে লুটে নেবে অন্যেরা কিছুই পাবে না।
এ কারণেই রসূল স. বলেছেন: ‘শুহ্ বা কৃপণতা থেকে নিজেকে রক্ষা করো। এটিই তোমাদের পূর্বের লোকদের ধ্বংস করেছে। এটিই তাদেরকে রক্তপাত ঘটাতে এবং অপরের মর্যাদাহানিকে নিজের জন্য বৈধ করতে প্ররোচিত করেছে। এটিই তাদের জুলুম করতে উদ্বুদ্ধ করেছে তাই তারা জুলুম করেছে। পাপের নির্দেশ দিয়েছে তাই পাপ করেছে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করতে বলেছে তাই তারা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করেছে। (বুখারী, মুসলিম, নাসাঈ, আহমদ) আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘যারা শুহ্ বা মনের সংকীর্ণতা, কার্পণ্য থেকে মুক্ত থেকেছে, তারাই সফলকাম হয়েছে।’ (সূরা তাগাবুন: ১৬)
কৃপণতার পরিধি : কৃপণতার আওতা অনেক ব্যাপক। কৃপণ ব্যক্তি ব্যয়ের ক্ষেত্রে কৃপণতা প্রদর্শন করে এমনই সংকীর্ণতার অন্ধকার কুটিরে আবদ্ধ হয় যে তখন এর বহিপ্রকাশ তার সার্বিক চরিত্রে দৃশ্যমান হয়। তার সাথে কয়েক মিনিট কথা বললে সহজেই বুঝতে পারে লোকটি হাড়কৃপণ। শরীয়তের নির্ধারিত ব্যয় ছাড়াও নিজের ও তার পরিবারের প্রাত্যহিক প্রয়োজনীয় ব্যয়ে যেমন সে কৃপণতা প্রদর্শন করে, তেমনি আর্থিক ব্যয়ের বাইরে অন্যান্য ক্ষেত্রেও কৃপণতা ছড়িয়ে পড়ে। সার্বিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা সহমর্মিতা চাই তা কাজে-কর্মে হোক, চাই মৌখিক, সেখানেও কৃপণ তার স্বাভবসিদ্ধ আচরণই করে থাকে। কৃপণ মুসলমান হোক বা অমুসলিম কৃপণতা তাকে এমনই অন্ধ করে তোলে যে, সে আখিরাতের পুরস্কার ও শাস্তিকে মিথ্যা বলছে। সে-ই তো এতিমকে ধাক্কা দেয় এবং মিসকিনকে খাবার দিতে উদ্বুদ্ধ করে না। তারপর সেই নামাযীদের জন্য ধ্বংস, যারা নিজেদের নামাযের ব্যাপারে গাফিলতি করে, যারা লোক দেখানো কাজ করে এবং মামুলী প্রয়োজনের জিনিসপাতি (প্রতিবেশীদের) দিতে বিরত থাকে। (সূরা মাউন ১-৭) এ সূরার শেষের আয়াতের ব্যাখ্যায় বিভিন্ন হাদীস বিশারদ. রাবী ও মুফাস্সিরগণ ফরয যাকাত থেকে শুরু করে মানুষের গৃহস্থালীর কাজে লাগে এ ধরণের হীন মনোবৃত্তির কিছু কিছু কৃপণ ব্যক্তিদের দেখতে পাই, যারা এ ধরণের ছোট্ট জিনিসও তার প্রতিবেশীকে ধার দিতে চায় না। মানুষ সামাজিক জীব। তাই সমাজের প্রতিটি বাসিন্দাই পরস্পর নির্ভরশীল। আর ও নির্ভরশীলতার ভিত্তি হলো সামাজিক ভ্রাতৃত্ব। এ জন্য কারো বাড়িতে মেহমান এলে প্রতিবেশীর কাছে খাটিয়া বা বিছানা-বালিশ চাইবে, প্রতিবেশীর চুলোয় একটু রান্না-বান্না করে নেবে, এক বাটি লবণ বা চিনি চাইবে এটিই স^াভাবিক। কিন্তু কৃপণেরা তাও দিতে চায় না। এরা সমাজের আলাদা এক জীব্ সামাজিক বন্ধন বা ভ্রাতৃত্ব এদের কাছে মূল্যহীন। ইসলামের শাশ্বত বিধান হচ্ছে পৃথিবীর সকল সম্পদের একচ্ছত্র মালিক আল্লাহ তাআলা। মানুষ এর ট্রাস্ট্রি মাত্র। কাজেই আল্লাহ তাআলাই এ সম্পদ হতে মানুষ সমান ভাবে উপকৃত ব্যক্তিও সমাজের স্বার্থকে এক সাথে দেখে। একদিকে ব্যক্তিকে তার সমৃদ্ধির উৎসাহ দেয়, অন্য দিকে ব্যক্তিকে সমাজের অংশ হিসাবে সামাজের অন্যদের সুখ ও সমৃদ্ধি সাধনের দায়িত্ব অর্পণ করে। সুতরাং এ ধন-সম্পদ নিজেদের হিফাজতে থাকাকালীন সময়ে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখার অধীনে তা থেকে নিজেদের কাজে ব্যয় করবে এবং অন্যদেরকেও দান করবে। আল্লাহর সীমারেখা হলো :
এক. ধন-সম্পদ আহরণের জন্য সকল প্রকার অবৈধ পন্থা পরিহার করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘একে অপরের সম্পদ অবৈধ পন্থায় ভোগ করো না। তবে তোমাদের মধ্যে পরস্পরের রাজি-খুশির ভিত্তিতে ব্যবসার মাধ্যমে তা হতে পারে।’ (সূরা নিসা: ২৯)
দুই. বৈধ পন্থায় উপার্জিত সম্পদ অপচয় বা অবৈধ পন্থায় ব্যবহার করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘সম্পদ ব্যয়ে সীমা অতিক্রম করো না। আল্লাহ তাআলা অপব্যয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। (সূরা আনয়াম: ৪১) ‘অপব্যয় করো না। অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই, আর শয়তান হচ্ছে তার প্রভুর প্রতি অকৃতজ্ঞ।’ (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৬-২৭)
তিন. বৈধ পন্থায় উপার্জিত সম্পদ শুধু নিজের আয়ত্বাধীনে সঞ্চিত বা পুঞ্জিভূত করে রাখা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘অধিক ধন-সম্পদ, আয়-উপার্জন ও সঞ্চয়ের চিন্তা তোমাদেরকে নিমজ্জিত করে রেখেছে। এভাবে চিন্তা করতে করতে শেষ পর্যন্ত তোমরা কবরে চলে যাবে। অতি সত্ত্বর তোমরা এর পরিণতি জানতে পারবে।’ (সূরা তাকাসুর: ১-৩) আল্লাহ তাআলা আরো বলেন: ‘যারা স্বর্ণ-রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা থেকে আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে না তাদের কষ্টদায়ক আযাবের সংবাদ পাঠিয়ে দাও।’ (সূরা তাওবা : ৩৪)
কৃপণতা একটি সামাজিক ব্যাধি। এটি সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধ, প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধন ছিন্ন করে। একটি সুস্থ সামাজের মৌলিক বৈশিষ্ট হলো ভ্রাতৃত্ববোধ। এটি ছাড়া কখনো একটি সুস্থ-সুশীল সমাজ গঠিত হতে পারে না। আর ইসলামই একমাত্র এ ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষে যথোপযুক্ত কর্মসূচি দিয়েছে। মুসলামদের আল্লাহর পথে দান করার সাধারণ নির্দেশ দিয়ে তাদের অর্থসম্পদে সমগ্র সমাজ ও রাষ্টের অধিকার কায়েম করেছে। এর অর্থ হচ্ছে মুসলমানকে দানশীল, উদার সহানুভূতিশীল ও মানব-দরদী হতে হবে। স্বার্থসিদ্ধির প্রবণতা পরিহার করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য প্রতিটি সৎকাজে এবং ইসলাম ও সামাজের বিভিন্ন প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য ব্যয় করতে হবে। ইসলাম শিক্ষা ও অনুশীলন এবং ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার সামষ্টিক পরিবেশ কায়েমের মাধ্যমে প্রতিটি মুসলমানের মধ্যে এ নৈতিক বল সৃষ্টি করতে চায়। এ ভাবে কোন প্রকার বল প্রয়োগ ছাড়াই হৃদয়ের ঐকান্তিক ইচ্ছায় মানুষ সমাজের কল্যাণে সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করবে। ইসলামী সমাজে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে পরস্পরকে আর্থিক সাহায্য সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করবে। ইসলামী সমাজে এ ধরণের কর্তব্যবোধ একটি সমাজের সুস্থতার পরিচায়ক। যদি কোন সমাজে এর অনুপস্থিতি পরিলক্ষিত হয় তবে বুঝতে হবে সেখানকার পরিবেশ দূষিত হয়ে গেছে এবং সেখানকার অধিবাসীদের বিশ্বাস ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিক ইবাদতগুলোর মধ্যে শিথিলতা দেখা দিয়েছে। মুসলমানকে দানশীল, উদার হৃদয়, সহানুভূতিশীল, মানব-দরদী ও পারস্পরিক কল্যাণকামী হিসাবে গড়ে তোলার জন্য নামাযসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিক ইবাদাতগুলো সামষ্টিকভাবে কাজ করে থাকে, তবে বুঝতে হবে তার বিশ্বাস ও আনুষ্ঠানিক ইবাদাতগুলোতে গলদ আছে।
কৃপণতা একটি জঘন্য অভ্যাস্। আল-কুরআনের একাধিক আয়াতে এটিকে অকল্যাণকর বলে অভিহিত করা হয়েছে এবং কুরআনে কৃপণ ব্যক্তিকে কষ্টদায়ক শাস্তি প্রদানের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘যারা আল্লাহর দেয়া ধন-সম্পদের বেলায় কৃপণতা প্রদর্শন করেছে যে সম্পদ কিয়ামতের দিন তাদের গলায় বেড়ি হবে।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৮০) ‘যারা স্বর্ণ-রৌপ্য জমা করে রাখে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে কষ্টদায়ক শাস্তির সংবাদ দাও।’ (সূরা তাওবা: ৩৪) এ দুটি আয়াতে এটি একটি অকল্যাণকর ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রসূল স. বলেছেন: কৃপণ ব্যক্তি জান্নাত হতে দূরে, আল্লাহ হতে দূরে, কিন্তু জাহান্নামের নিকটবর্তী।’ (তিরমিযী)
সামাজে যারা কৃপণ তারাই সাধারণত কায়েমী স্বার্থবাদী হয়ে থাকে। সমাজের মানুষকে শোষণ করতে করতে এরা সম্পদের পাহাড় জমা করে। একদিকে শোষণের ধারাকে অব্যাহত রাখা এবং অন্যদিকে সম্পদের পাহাড়কে ধরে রাখার জন্য এরা কায়েমী স্বার্থবাদীর ভূমিকায় আবতীর্ণ হয়। সম্পদের লোভে এতটাই অন্ধ হয়, যে কোন পরিবর্তনের এরা বিরোধীতা করে থাকে। এ জন্য যুগে যুগে আম্বিয়ামে কেরাম পরিচালিত ইসলামী আন্দোলনকে যে সকল ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর চরম বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছে, তাদের অন্যতম হলো কায়েমী স্বার্থবাদী। তারা কখনোই ইসলামী আন্দোলনকে সহ্য করতে পারেনি। কৃপণতা এমন ধরণের কায়েমী স্বার্থবাদী সৃষ্টি করে থাকে যে এরা অবশেষে ইসলামের দুষমণে পরিণত হয়।
ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের পরিবেশ সৃষ্টি হবে। যাকাত হবে এ সমাজে বিরাজমান ব্যাপক পার্থক্য হ্রাসের একটি কার্যকরী প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়াও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার জন্য ইসলামী রাষ্ট্রের হাতে রয়েছে শরীয়ত সম্মত আরো কয়েকটি ঞড়ড়ষং যেমন : সাদাকা, মীরাস, ওশর, খারাজ ও জিযিয়া ইত্যাদি। কৃপণেরা এর একটিকেও স্বীকার করে না। কৃপণ ব্যক্তিদের দ্বারা গঠিত সমাজ ব্যবস্থায় যাকাত নামক মৌলিক ইবাদতের কোন মূল্য থাকে না। ফলে সমাজ ব্যবস্থায় সম্পদের সুষম বণ্টন ব্যাহত হয় এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য হুমকির সম্মুখীন হয়। অথচ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমাজে বিরাজমান ব্যাপক পার্থক্য হ্রাসের জন্যই যাকাত ফরয করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন: ‘তাদের ধন-সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।’ (সূরা আল জারিয়াহ-১৯) কিন্তু কৃপণ ব্যক্তিদের কাছে এর কোনটিরই মূল্য নেই। ফলে সমাজ ব্যবস্থায় ধনী ও গরীবের মধ্যে পাহাড় সম বৈষম্য সৃষ্টি হয়। এবং সম্পদ গুটিকয়েক কৃপণ ব্যক্তি বা পরিবারের হাতে কুক্ষিগত হয়। জাতীয় উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়ে।
সুদ কৃপণ শ্রেণী গোষ্ঠীদের শোষণের প্রধান হাতিয়ার। যারা সুদখোর তারাই কৃপণ আবার যারা কৃপণ তারাই সুদখোর। কৃপণ ও সুদখোর পরস্পরের পরিপূরক। কৃপণেরা যেমন টাকা আর সম্পদের লোভে মানসিক বিকারগ্রস্ত ব্যক্তিতে পরিণত হয়, অনুরূপভাবে সুদখোরও টাকার পিছনে পাগলের মতো ছুটে ভারসাম্যহীন ব্যক্তিতে পরিণত হয়। এদের স্বার্থপরতার মাত্রা এতটুকু বৃদ্ধি পায় যে, তারা তখন পৃথিবীর কোন কিছুর পরোয়া করে না। তাদের সুদখোরীর কারণে এক পর্যায়ে মানবিক প্রেম-প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব ও সহানুভূতির মাত্রা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এমনকি তার নিজের লোককেও চরম বিপদের সময়ে বিনা সুদে ধার দিতে কুণ্ঠাবোধ করে। সুদ তাকে এতটুকু অন্ধ করে তোলে যে, জাতীয় সামষ্টিক কল্যাণের উপর কোন ধ্বংসকর প্রভাব পড়লো এবং কতলোক দুরবস্থার শিকার হলো এসব বিষয়ে তাদের কোন মাথা ব্যথাই থাকে না। বিত্তবৈভব জমানোর নেশায় এরা অহর্নিশ ব্যস্ত থাকে। আর যেহেতু মানুষকে আখেরাতে সেই অবস্থায় হবে যে অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করেছে তাই কিয়ামতের দিন সুদখোর ব্যক্তি একজন পাগল ও বুদ্ধিভ্রষ্ট লোকের চেহারায় আত্মপ্রকাশ করবে। সুদের মাধ্যমে সমাজের নিম্ন আয়ের লোকদের অবশিষ্ট সামান্য সম্পদটুকুও জোঁকের ন্যায় শুষে নেয়। ফলে ধনী ও গরীরের মধ্যে পাহাড় সম বৈষম্য সৃষ্টি হয়।
সমাজে এমন কিছু মূল্যবোধ বিবর্জিত লোকও দেখা যায়, যারা কৃপণ এবং দানশীল কোনটিই নয়। তবে বেহুদা কাজে টাকা পয়সা ঠিকই খরচ করে থাকে। যাকাত ও ইসলামের অন্যান্য আবশ্যিক ব্যয়ের প্রতি তারা ভ্রুক্ষেপই করে না। বিভিন্ন পার্টি ও অনুষ্ঠানে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে। খ্যাতি, সুনাম অথবা আবেগের বশবর্তী হয়ে ক্লাব, নাটক বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে লক্ষ লক্ষ টাকা ডোনেশন প্রদান করে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে নিজের মিল-ইন্ডাষ্ট্রির স্বল্পবেতন ভোগী সাধারণ শ্রমিকটির বেতন মাসের পর মাস বাকি পড়ে আছে। তার বিবেকের কঠিন দরজায় শ্রমিকের কষ্ট ও করুণ কান্নাও বিবেকের কড়া নাড়াতে পারে না। এটি কৃপণতাজনিত একটি বদ অভ্যাস। এ ধরণের আচরণ ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ শ্রমিকের গা-এর ঘাম শুকানোর আগেই মজুরী পরিশোধের তাগিদ দিয়েছেন মানবতার বন্ধু মুহাম্মাদুর রসূল স.। তাছাড়া এদের কঠিন হৃদয়ের কাছে রসূল স. এর আরেকটি বাণী উপস্থাপন করতে চাই। রসূল স. বলেছেন : ‘তোমাদের চাকর-চাকরানী ও দাস-দাসীরা প্রকৃতপক্ষে তোমাদের ভাই। তাদেরকে আল্লাহ তাআলা তোমাদের অধীনস্থ করেছেন। সুতরাং আল্লাহ যার ভাইকে তার অধীন করে দিয়েছেন সে তার ভাইকে যেনো তাই খাওয়ায় যা সে নিজে খায়, তাকে তাই পরিধান করায় যা সে নিজে পরিধান করে। আর তার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ যেনো তার ওপর না চাপায়। একান্ত যদি চাপানো হয়, তবে তা সম্পাদনের ব্যাপারে তাকে সাহায্য করা উচিত।’ (বুখারী-মুসলিম)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT