ধর্ম ও জীবন

রাগ মানুষকে ধ্বংস করে

আব্দুর রহমান জামী প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০৮-২০১৮ ইং ০১:০০:৫২ | সংবাদটি ১৮৩ বার পঠিত

মানুষের জীবনের একটি মন্দ দিক হলো রাগ বা ক্রোধ। কারও রাগ যখন মাত্রা ছাড়িয়ে যায় তখন সেটা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাগান্বিত মানুষ বেসামাল হয়ে যায়। তখন অন্যের ওপর অবলীলায় অত্যাচার করে। রাগ মানবিক আবেগেরই অংশমাত্র। তবে অনিয়ন্ত্রিত রাগ ক্ষতিকারক, যা মানুষের জন্য নানা সমস্যা সৃষ্টি করে। যে ব্যক্তি রাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, সে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রসহ সব অঙ্গনে সফল। মাত্রাতিরিক্ত রাগ কখনোই ভালো নয়। সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য জরুরি। রাগ নেই, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। জ্ঞানীরা বলেন, রাগ হলো বারুদের গুদামের মতো, যা মানুষের স্বাভাবিক অর্জনকে মুহূর্তে ধ্বংস করে দেয়। তাই রাগ নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। এক সাহাবি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে অল্প কথায় কিছু নসিহত করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, রাগ বর্জন করো। সাহাবি কয়েকবার বললেন, আরও নসিহত করুন। প্রত্যেকবারই রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, রাগ বর্জন করো। -বোখারি
মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় আছে, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত বাহাদুর সেই ব্যক্তি, যে ক্রোধের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।’ আল্লাহতায়ালা কোরআনে কারিমের এক আয়াতে নেককার মানুষের গুণাগুণ বর্ণনা করেছেন, ‘যারা সচ্ছলতায় ও অভাবের সময় ব্যয় করে, যারা নিজেদের রাগ সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, বস্তুত আল্লাহ সৎ কর্মশীলদেরই ভালোবাসেন।’ -সূরা আল ইমরান : ১৩৪
ইমাম বায়হাকি এই আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। একবার হজরত আলী বিন হোসাইন (রা.) অজু করছিলেন। তার এক বাঁদী পানি ঢেলে দিচ্ছিল। হঠাৎ পানির পাত্র হাত থেকে ফসকে গিয়ে হজরত হুসাইনের (রা.) পায়ে পড়ে যায়। এতে তার কাপড়-চোপড় ভিজে যায় এবং পায়ে ব্যথা পান। এমতাবস্থায় রাগান্বিত হওয়া স্বাভাবিক। বাঁদী বিপদের আশঙ্কা করে তৎক্ষণাৎ আয়াতটির প্রথম দুই শব্দ ‘ওয়াল কাজিমিনাল গায়জা’ পাঠ করল। আয়াতটির অংশটুকু শোনামাত্রই হজরত হোসাইনের (রা.) ক্রোধানল একেবারে নিভে গেল। তিনি নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। এরপর বাঁদী দ্বিতীয় অংশ পাঠ করল। তখন তিনি বললেন, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। বাঁদীও সুযোগ বুঝে আয়াতের শেষ অংশ পাঠ করল। হজরত হোসাইন (রা.) শেষাংশ শোনামাত্রই বললেন, ‘যাও আমি তোমাকে আজাদ করে দিলাম।’ -রুহুল মায়ানি
ইসলাম ধর্ম মানুষকে রাগ নিয়ন্ত্রণ করার নির্দেশ দিয়েছে। ইসলাম ধর্মমতে, রাগ মানুষকে জ্ঞান, বিবেক ও ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুত করে এবং মানুষের আচার-আচরণ ও চিন্তায় এর খারাপ প্রভাব পড়ে। রাগান্বিত অবস্থায় ক্ষমা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ইসলাম। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি যদি প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকার পরও প্রতিশোধ না নেয় এবং ক্ষমা করে দেয়, তাহলে তার এ কাজটি ইসলামের দৃষ্টিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, বড় বড় মনীষী ক্ষমা করার ক্ষেত্রে ছিলেন অগ্রগামী ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
তবে ইসলাম একেবারে রাগহীন জীবনকে উৎসাহিত না করে কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাগ বা ক্ষোভ প্রকাশের কথাও বলেছে। ইসলাম যেসব ক্ষেত্রে রাগ করার অনুমতি দিয়েছে তা হতে হবে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এবং অবশ্যই তা দ্বীনের উদ্দেশে, আল্লাহর উদ্দেশে, নিজের ব্যক্তিগত আক্রোশে নয়। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ঈমান পূর্ণ করার চারটি আমল, যা কিছু মানুষকে দেব আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য, যা কিছু নেব আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য। যাকে ভালোবাসব আল্লাহর উদ্দেশে ভালোবাসব। যার প্রতি রাগ করব তাও আল্লাহকে খুশি করার জন্য।’ -তিরমিজি
বস্তুত জাতীয়, ধর্মীয়, মানবিক আদর্শ ও মূল্যবোধ রক্ষার জন্য প্রয়োজনে ক্ষোভ ও রাগকে কাজে লাগাতে হবে। তবে অন্যায় দমন করতে গিয়ে অন্যায়কে যাতে প্রশ্রয় দেওয়া না হয়, সেদিকটিও কঠিনভাবে খেয়াল রাখতে হবে। মানবজীবনে রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা বড় সাফল্য। কোরআন-হাদিসে রাগ নিয়ন্ত্রণ করার অনেক পথ বর্ণিত আছে। এক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যখন তোমাদের কারও রাগ আসে, তখন সে দাঁড়িয়ে থাকলে যেন বসে পড়ে। তাতে যদি রাগ দমে না যায়, তাহলে সে যেন শোয়ে পড়ে।’ -তিরমিজি
যখন রাগ হয় তখন মনে করবে, আমার সৃষ্টিকর্তা আমার চেয়ে অনেক অনেক বড়। তিনি আমার প্রতি রাগ হলে আমার কী উপায় হবে? অতএব, আমি তাকে ক্ষমা করতে না পারলে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহও আমাকে ক্ষমা করবেন না। আমার রাগ হজম করে তাকে ক্ষমা করে দিলে আল্লাহও আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। এভাবে রাগ নিয়ন্ত্রণে এসে যায়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘মনে রাখবে অবশ্যই আল্লাহ সুমহান, সমুচ্চ অনেক বড়।’ -সূরা আন নিসা : ৩৪

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  • প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান (রাহ.) ও সাদাকায়ে জারিয়া
  • রাসূলের সাথে জান্নাত
  • মাতা-পিতার অবাধ্যতার শাস্তি
  •  তাফসিরুল কুরআন
  • বিশ্বনবীর কাব্যপ্রীতি
  • শতবর্ষের স্থাপত্য সিকন্দরপুর জামে মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  •  আত্মার খাদ্য
  • মানব জীবনে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা
  • সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ : ইসলাম কী বলে
  • মৃত্যুর আগে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করি
  •   তাফসীর
  • ইসলামে বিনোদনের গুরুত্ব
  • কুরআনে হাফিজের মর্যাদা
  • মদীনা রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকা-ের কেন্দ্র ছিল মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  • এতিম শিশু
  • বার্মিংহামে আল কুরআনের হাতে লেখা প্রাচীন কপি
  • রাসুলের সমগ্র জীবন আমাদের জন্য অনুকরণীয়
  • মৌল কর্তব্য আল-কুরআনের বিধান
  • Developed by: Sparkle IT