সাহিত্য

মুক্তিযোদ্ধার জবানবন্দী

আবদুস সবুর মাখন প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৯-২০১৮ ইং ০০:৪৭:১১ | সংবাদটি ৬৩ বার পঠিত

মৃত্যুশয্যায় মুক্তিযোদ্ধা সাজু। হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছেন তিনি। গুলি বের করা হয়েছে দেহ থেকে; কিন্তু ডাক্তাররা বলছেন- অবস্থা ক্রিটিক্যাল। রাত দু’টায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে রক্ত ঝরেছে প্রচুর। প্রথমে উপজেলা হাসপাতালে নেয়ার পর সেখানকার ডাক্তাররা পাঠিয়ে দেন জেলা সদরে। এতে করে রাস্তায়ই কেটে গেছে কয়েক ঘন্টা। এখন ভোর সাড়ে পাঁচটা এতোক্ষণে পুর্বাকাশে সূর্য উঁকি দেওয়ার কথা। কিন্তু ঝড় ঝঞ্ঝার মওসুম; আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢাকা। রাতে শুরু হয়েছিলো প্রবল বর্ষণ। থামেনি, এখনও ঝরছে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। মেঘের চাঁদর সরিয়ে সূর্য আদৌ আলো ছড়াতে পারবে কি-না, এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। হাসপাতালের বাইরে রাতের অন্ধকার। তিনশ’ সাত নম্বর কেবিন বৈদ্যুতিক বাতির আলোয় ঝলমল করলেও সবার চোখেই এখন ঠেকছে রাজ্যির অন্ধকার। ডাক্তার বলেছেন এই অবস্থা থেকে সাজুর উত্তরণ প্রায় অসম্ভব। চারদিকে ঘিরে আছেন মানুষজন। মা, বাবা, ভাই-বোন, নিকটাত্মীয়, বন্ধু স্বজন, আছেন ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ কর্মকর্তা। মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির জবানবন্দী রেকর্ড করা হবে। সাজু কোনমতে জবাব দিচ্ছেন প্রশ্নগুলোর।
পুলিশ কর্মকর্তা জিজ্ঞাসা করলেন- আপনি কি চিনতে পেরেছেন তাকে, যে গুলি করেছে?’
: জ্বি না।- পুলিশ কর্মকর্তা তাকালেন একবার ম্যাজিস্ট্রেটের দিকে। তিনি আর কোন প্রশ্ন করতে পারলেন না; তার আগেই রবিন পুলিশ কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন করে ব্যতিব্যস্ত হয়ে- ‘রশীদ কি তোমাকে গুলি করেছে?’
: না; সে নয়।
: তাহলে কে?- পুলিশ কর্মকর্তার তীক্ষè প্রশ্নবান। কিন্তু আর কোন কথা বলতে পারে না সাজু। ডান হাত একটু নেড়ে ‘না’ সূচক জবাব দেয়। আর এভাবেই নিস্তেজ হয়ে আসে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজিদুর রহমান সাজুর দেহ।
॥ দুই ॥
সাজু জনগণের ভোটে নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান। একাত্তরে যুদ্ধে গিয়েছিল টগবগে তরুণ সাজু। মায়ের আঁচল, বোনের মায়া কিংবা মিনা’র দু’চোখের কোনের চিকচিক করা জলের ফোটা পথ আগলাতে পারেনি তার। অন্য দশজন মুক্তিযোদ্ধার মতোই চোখে স্বপ্ন ছিলো তার একটি স্বাধীন ভূমি; যেখানে সবাই শান্তিপূর্ণ সুন্দর পরিবেশে সুখে শান্তিতে বসবাস করবে। যুদ্ধে তার সঙ্গে গিয়েছিলো প্রতিবেশী বন্ধু রশীদ, আব্দুর রশীদ। দুই বন্ধু মিলে একসঙ্গে ভারতে ট্রেনিং নিয়ে নামে যুদ্ধমাঠে। জীবনবাজি যুদ্ধ। পশ্চিমা হানাদার ও তাদের এদেশীয় দোসর আলবদর রাজাকার আলশামস বাহিনী হার মানে বীর বাঙালিদের কাছে। যুদ্ধে জয়ী হয় বাংলা মায়ের বীর সন্তানেরা।
মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ। মুক্তিযোদ্ধা দুই বন্ধু গ্রামে ফেরে বিজয় পতাকা হাতে। যুদ্ধজয়ী দুই মুক্তিযোদ্ধা তখন এলাকায় ‘হিরো’। গ্রামের সবাই তাদের মান্য করে, ¯েœহ করে। শুধু নিজেদের গ্রাম নয়, আশপাশের অন্যান্য গ্রামেও সুনাম ছড়িয়ে পড়ে দুই বন্ধু মুক্তিযোদ্ধার। জনসেবামূলক নানা কাজকর্ম ছাড়াও তারা ছোট খাটো সালিশ মীমাংসায়ও ভূমিকা রাখতো। যে কারণে যে কোন সমস্যায়ই মানুষজন ডাকতো এই দুই বন্ধুকে। সাজু-রশীদ জুটি হয়ে ওঠে সবার চোখের মণি। যুবক-বৃদ্ধ-শিশু এক নামে চেনে তাদের। এলাকার উন্নয়নে দিনরাত অতিবাহিত হয় তাদের। যুদ্ধ পরবর্তী দেশটা গড়ার দায়িত্বতো এই মুক্তিযোদ্ধাদেরই নিতে হবে- এমন একটা বদ্ধমূল বিশ্বাস পোষণ করে তারা।
এক পর্যায়ে আসে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু হয় ব্যাপক তোড়জোর। এখানে ওখানে গুঞ্জন রাস্তার মোড়, চায়ের দোকান সর্বত্র আলোচনার বিষয় একটাই নির্বাচন। এলাকাবাসী চেপে ধরলো সাজুকে চেয়ারম্যান পদে দাঁড়াতেন সাজু প্রথমে আপত্তি জানালেও পরবর্তীতে সকলের অনুরোধে সম্মতি দিতে বাধ্য হয়। শুরু হয় নির্বাচনী প্রচারণা। প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু রশীদ। দুই বন্ধুর সম্মিলনী প্রচারণায় জমে ওঠে নির্বাচন। সরগরম নির্বাচনী মাঠ। এলাকায় এমনিতেই খুবই জনপ্রিয় দুই বন্ধু; নির্বাচনী প্রচারণায় সেই জনপ্রিয়তার মাত্রা বেড়ে যায় আরও একধাপ। যার ফলে সাজুর প্রতিদ্বন্দ্বী যারা ছিলো নির্বাচনী মাঠে, তারা রীতিমতো কোনঠাসা হয়ে গেলো। অবশেষে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় অনুষ্ঠিত হলো ভোটগ্রহণ। মানুষ ব্যাপক আগ্রহে বিপুল ভোটে বিজয়ী করলো তরুণ সমাজসেবী মুক্তিযোদ্ধা সাজিদুর রহমান সাজুকে। ইউনিয়নবাসী একজন প্রাণোচ্ছল তারুণ্যদীপ্ত ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করতে পেরে দারুণ খুশী। যেন তাদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। পাড়ায় পাড়ায় হচ্ছে বিজয় মিছিল, আনন্দ উৎসব। চলতে থাকলো কয়েকদিন এই আনন্দ-উল্লাস। মানুষ ফুলে ফুলে বরণ করলো এই নতুন জনপ্রতিনিধিকে।
সহযোদ্ধা-বন্ধু রশীদকে সঙ্গে নিয়ে আগের চেয়ে দ্বিগুণ উদ্দীপনায় ইউনিয়নবাসীর সেবায় আত্মনিয়োগ করে চেয়ারম্যান সাজু। সেই একইভাবে হাতে হাত ধরে দু’জনের পথচলা। একজন আরেকজনের কাঁধে হাত রেখে তারা সমস্বরে উচ্চারণ করে- ‘আমাদের এই বন্ধুত্ব অটুট থাকবে- স্মরণীয় হয়ে থাকবে সমাজের কাছে পৃথিবীর কাছে চিরদিন; কেউ এতে ভাঙ্গন ধরাতে পারবে না।’- সে সময় সাজুর মনে পড়ে যায় মিনার কথা। মিনা গ্রামেরই মেয়ে। যুদ্ধে যাওয়ার সময় সাজুকে বলেছিলো- ‘যুদ্ধ শেষে বিজয়ীর বেশে ফিরে এসো, মুক্ত স্বাধীন দেশেই আমরা গড়বো নতুন ঘর।’- কিন্তু যুদ্ধতো শেষ হলো দেশও স্বাধীন হলো- সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি এখনও। যুদ্ধ পরবর্তী গত প্রায় দু’বছর তো কেবল জনসেবা, নির্বাচন ইত্যাদিতেই কেটে গেলে। নিজেকে নিয়ে ভাবার, মিনাকে নিয়ে স্বপ্নের ঘর সাজানোর ফুরসত ছিলো না এতোদিন। অনেকদিন দেখাও হয়নি মিনার সাথে। তখন তার সামনে ভেসে ওঠে মিনার অনিন্দ সুন্দর অবয়ব। সেই সঙ্গে একটি প্রশ্ন তাকে তীরের মতো আঘাত করে। ‘মিনা কতোদিন আমার জন্য পথ চেয়ে বসে থাকবে?’ পরক্ষণেই সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে অন্য কাজে।
বন্ধুত্বের বন্ধন দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হতে থাকে সাজু ও রশীদের। এক পর্যায়ে সমাজে দুষ্ট লোকদের চোখে ভালো ঠেকেনি তাদের এই সুনিপুণ বন্ধন। মানে, তারা সহ্য করতে পারেনি এই বন্ধুত্বকে। তারা আঁটতে থাকে নানা ষড়যন্ত্রের জাল। তাদের উদ্দেশ্য হলো, যেভাবেই হোক দু’জনের বন্ধুত্ব ছিন্ন করতেই হবে। তাই কুচক্রী লোকজন সব সময়ই এই দু’জনের আশেপাশে থাকে। তারা প্রথমে দুই বন্ধুর অতি নিকটজন শুভাকাংখী হিসেবেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। এভাবেই চেয়ারম্যান সাজু আর রশীদের তথাকথিত বন্ধুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ঘরে বাইরে অফিসে আড্ডায় তাদের সরব উপস্থিতি সমাজের সচেতন মহলে চিন্তার খোরাক এনে দেয়। কারণ এলাকার চিহ্নিত সমাজবিরোধী ও মুখোশধারী কিছু লোক চেয়ারম্যানের পিছু নিয়েছে। এদের দ্বারা ভালো কিছু আশা করা যায় না, এটাই স্বাভাবিক। এলাকার বিশিষ্টজনদের পক্ষ থেকে চেয়ারম্যানকে বলা হয়- এদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে। কিন্তু কোন লাভ হয় না।
অনেকেই বলে থাকেন, একটা মিথ্যাকে দশবার বললে তা সত্যি হয়ে যায়। আসলেই কি তাই! মিথ্যা তো মিথ্যাই; দশবার বললেই কী, আর একশ’ বার বললেই কী। আর সত্য চিরকালই সত্য। সাজু-রশীদের বন্ধুত্বে খাদ নেই, স্বার্থপরতার বালাই নেই; নেই চাওয়া পাওয়ার কিছুই। এটাই সত্য। আর সত্যিটাকেই মিথ্যা প্রমাণিত করতে ওঠে পড়ে লেগেছে দুষ্ট লোকেরা; তাদের আশে পাশেই এরা বন্ধুর লেবাসে ঘুরাফেরা করছে। এই দলের নেতৃত্বদানকারী চতুর লোকটি হচ্ছে রবিন। মেকি হাসিমুখে কথা বলে সব সময়। প্রথম আলাপে কেউ বুঝতে পারবে না তার স্বভাব চরিত্র সম্বন্ধে। দুই বন্ধুর মধ্য থেকে সে বেছে নেয় রশীদকে। একদিন রাতে রশীদের বাড়িতে যায় রবিন তার সহযোগী দু’জনকে নিয়ে। তারা এটা ওটা আলাপ করে। আড্ডা হয়। এভাবে প্রায়ই তারা যায় রশীদের বাড়িতে; সকাল দুপুর রাত। এভাবে রশীদের সঙ্গে রবিনদের সম্পর্কের গভীরতা বেড়ে যায়। সেখানে অনুপস্থিত সাজু। অর্থাৎ সাজু-রশীদের বন্ধুত্বের আড়ালে নতুন একটা শাখা তৈরী হলো; সেটা হলো রশীদ-রবিন বন্ধন। রশীদের মধ্যেও একটা দুর্বলতা তৈরি হয় রবিনের প্রতি। সময় সুযোগ পেলেই সে রবিনকে খবর দিতো... গল্প করতো। এমনি করেই একদিন রবিন তার মনের বাসনাটি প্রকাশ করার সুযোগ পেয়ে বসে। বলে-
: রশীদ, তুমি তো আমার একজন খুবই কাছের বন্ধু। সাজু যেমন তোমার কাছে, আমিও তেমনি; কী বলো তুমি?
: হ্যাঁ, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
: খুশি হলাম। তো এই যে আমরা একে অন্যের এতো কাছের মানুষ, আমরা তো সবাই সবার উন্নতি চাই, সমৃদ্ধি চাই। এটা তো চাই যে, প্রতিষ্ঠার শিখরে তুমিও উঠো, আমিও উঠি?
: তাই তো।... কিন্তু কীভাবে?
: ধরো, সাজু আর তুমি একসঙ্গে যুদ্ধে গেলে, যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরলে; এক সুতোয় বাধা দু’জন। আগে যেমন ছিলো এখনও তেমনি বন্ধুত্বের বন্ধন। কিন্তু সাজু এখন কোথায় আর তুমি কোথায়। সাজু এখন চেয়ারম্যান- সাধারণ মানুষের কাছে সে একজন ‘অসাধারণ’। জনগণের কাছে-সরকারের কাছে সে একজন হিসাবের মানুষ। কিন্তু তুমি?
রবিনের কথাগুলো শুনে কিছুটা সময়ের জন্য অন্যমনষ্ক হয়ে পড়ে রশীদ। চিন্তার ছাপ পড়ে তার চেহারায়। ভাবে- ‘রবিনের কথা তো একেবারে ফেলে দেয়ার মতো নয়।’- চলে যায় রবিন তৃপ্তি নিয়ে। তৃপ্তি এইজন্য যে, এতোদিন ধরে যে পরিকল্পনা করে আসছে, তার বাস্তবায়ন বুঝি হতে চললো বেশ ফুরফুরে মেজাজে সে যায় ইউনিয়ন অফিসে। দেখা হয় সবার সঙ্গে; খোশগল্প হয়, আড্ডা হয়। কিন্তু রশীদকে যেন তার থেকে একটু আলাদা মনে হলো। অন্যদিনের মতো প্রাণবন্ত- সপ্রতিভ নয় সে। বেরিয়ে পড়ে সেখান থেকে। লক্ষ করে চেয়ারম্যান; ডাক দেয় ‘যাচ্ছিস কোথায়?’ কোন জবাব দেয় না রশীদ। পেছনে একবার মুখই ফেরালো না সে।
পরদিন স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান মঞ্চে জেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে একই সারিতে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা সাজিদুর রহমান সাজুও। সামনের দর্শকের সারিতে সাধারণ মানুষদের সঙ্গে রশীদ, রবিনসহ অন্যান্যরা। অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিচ্ছেন একজন পরে আরেকজন। সবার মুখেই চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা সাজুর প্রশংসা। সবার বক্তব্যের সারমর্ম হচ্ছে- ‘মুক্তিযোদ্ধা সাজিদুর রহমান সাজু একজন করিৎকর্মা জনপ্রতিনিধি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যেমন অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছেন, তেমনি ইউনিয়ন চেয়ারম্যান হিসেবেও তিনি অল্প সময়ে সকল মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধার বীরত্ব নিয়েই তিনি সমাজ উন্নয়নে বেশ দাপটের সাথে ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন।’- গুণীজনদের কাছ থেকে বন্ধুর এতোসব স্তুতি শুনে খুশিতে বুক ভরে উঠছে না রশীদের বরং মনের যন্ত্রণা বাড়ছে; বাড়ছে কষ্ট ক্ষোভ। অস্বস্থি লাগছে তার। ওঠে পড়ে সে অনুষ্ঠানস্থল থেকে। চলে যাচ্ছে-মঞ্চ থেকে বন্ধু সাজু হাত ইশারায় বসতে বলে রশীদকে। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তার; একটু দ্রুত পায়েই হেঁটে চলে যায় রশীদ তার বাড়িতে। মিনিট কয়েক পরেই অনুষ্ঠানস্থল থেকে চলে যায় রবিনও। সে দেখেছে রশীদের চলে যাওয়া, দেখেছে চেয়ারম্যানের অনুরোধকে উপেক্ষা করার ‘দৃঢ়তা’। এই সবকিছু তো চেয়েছিলোই সে। চেয়েছিলো সে এভাবেই যাতে দু’জনের মধ্যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়। রাতে রবিনের বাড়িতে যায় রশীদ। বলে- ‘আমি আর পারছি না রে রবিন। এই অবজ্ঞা, অবহেলা, অপমান আর সহ্য হচ্ছে না। ভেবে পাচ্ছি না। কী করবো।- ভেতরে ভেতরে রবিনের খুশিতে আত্মহারা হয়ে যাবার যোগাড়। কিন্তু তা প্রকাশ করলো না। বরং কিছুটা অবজ্ঞার সুরে বলে- ‘কিছুই করতে পারবে না তুমি; যতো সময় যাবে ততোই তরতর করে এগিয়ে যাবে সামনে এই চেয়ারম্যান সাজু। সময় এখন তার। আর তুমি আমি আমরা সবাই তা চেয়ে চেয়ে দেখবো। সে এগোবে সামনে, আর শুধু পিছু হটবো আমরা।
: তাহলে উপায়?
: উপায় তো একটা বের করবোই। মাঠে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে দেবো না তাকে। ব্যারিকেড টপকে যেতে না পারলে ব্যারিকেড উপড়ে ফেলতে হয়। বুদ্ধিমানরা তা-ই করে। আর এই ব্রত নিয়েই আমাদের অভিযাত্রা।
গল্পে গল্পে অনেক রাত হয়ে যায়। রবিনের বাড়িতে খাওয়া দাওয়া শেষ করে বের হয়ে আসে রশীদ। ঘরে এসে ঘুমোতে পারে না। মনের মধ্যে তোলপাড়। তার দিনলিপি সব যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। দিন কয়েক ইউনিয়ন অফিসেও যায় না সে। সাজু খবর দিয়েও নিতে পারে না। একদিন নিজেই চলে আসে রশীদের বাড়িতে। দুয়েকটা কথা বলেই বিদায় দিয়ে দেয় চেয়ারম্যান বন্ধু সাজুকে। তার বাড়িতে আসায় যেন সাজুর প্রতি ঘৃণা বেড়ে গেলো আরও। চেয়ারম্যান বাড়িতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। বাড়ির বাইরের ঘরে জানালা একটু ফাঁক করেই ঘুমিয়ে পড়ে। গ্রীষ্মের রাত; বাইরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। মধ্যরাতে জানালায় কীসের আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় সাজুর। প্রথমে মনে হলো বাতাসের ঝাপটায় জানালার কপাটে শব্দ হচ্ছে। পরে কী যেন মনে করে বিছানায় ওঠে বসে। জানালার পাশেই বেড। চেয়ে দেখে জানালার বাইরে একজন মানুষের অস্তিত্ব। আকাশের বিদ্যুতের আলোতে তার চেহারা দেখে নিলো। হকচকিত সাজু একটু জোরেই উচ্চারণ করলো- ‘রশীদ তুমি? এতো রাতে? কী কোন সমস্যা?’- কথা শেষ হতে না হতেই রশীদ সাজুর বুকে পিস্তল তাক করে বলে- ‘আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা তো তুই।’ এর পরে দু’দু’টি আওয়াজ। আকাশের মেঘের গর্জন ছাপিয়ে পিস্তলের গুলির আওয়াজ পৌঁছে গেলো বাড়ির ঘুমন্ত লোকজনের কানে।
॥ তিন ॥
চেয়ারম্যান সাজিদুর রহমান সাজুর ঘাতক তারই প্রাণপ্রিয় বন্ধু সহযোদ্ধা আব্দুর রশীদ পলাতক। সে খবর পেয়েছে মৃত্যুর আগে হত্যাকারী হিসেবে তার নাম বলেনি সাজু। অবাক বিস্ময়ে ভাবতে থাকে সে- ‘সাজু তো দেখেছে আমাকে জানালা দিয়ে গুলি করতে; অথচ আমার নাম বললো না সে!... তাহলে আমি এ কী করলাম, কাকে মেরে ফেললাম। খুন করলাম কাকে? সাজু তো বন্ধুত্বের বিরল প্রতিদান দিয়ে গেলো, আর আমি? আত্মঅনুশোচনায় ভুগতে ভুগতে এক পর্যায়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে রশীদ। শেষ পর্যন্ত তার ঠাঁই হয় মানসিক হাসপাতালে।

বেসুরত
এম আশরাফ আলী
অবসর প্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা নাসিম হায়দার। পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন। এখন প্রাইভেট ফার্মে চাকরি। মোটা বেতনেরই মনে হয়। শুক্রবারে সৌদি রাজকীয় থুব পরে ভুড়ি দুলিয়ে ভাড়া করা ফ্ল্যাট থেকে মসজিদ পর্যন্ত একটু রাস্তা হেঁটে যেতেই অবস্থা বেগতিক। ঘেমে নেয়ে জবজবা। ডান হাতের কালো লাঠিটি টাল সামলায়। মসজিদে ঢুকেই আলাদা একটা জায়গায় এসি চলাকালীন সময়েও অন্তত দশ মিনিট ফ্যান ছেড়ে বাতাস খেতে হয়। মাথা থেকে পা পর্যন্ত মাংসপিন্ড থলথল করছে। হাঁটতে পা দুটো কাঁপে। মনে হয় দেহের ভার সাইতে পারছে না। তথাপি তার বিফ খাওয়ার অভ্যাস। এক বেলায় এক কেজি সাবাড়। সপ্তাহে দু’একবেলা খেতেই হবে। না খেলে মেজাজটাই যায় বিগড়ে।
দাড়ি-গোঁফ, বেশভূষায় মুসল্লিভাব। বাসায় থাকলে মসজিদেই নামায পড়েন। তাবলীগের গাশতেও শরীক হন। দু’একজনকে গোনাহ নেকীর ওয়াজ ফরমান। সেই সুবাদে আপন ইসলামের সাথে পরিচয়। ফজরের নামাযের পর একটু হাঁটতে চেষ্টা করেন। যদিও বেশি পারেন না তথাপি লাঠিতে টাল সামলে অন্তত আধা কিলোমিটার হাঁটেন অনেকটা মহিলা স্টেপে। আপন ইসলাম সময় দেন যতক্ষণ উনি চান। নাসিম হায়দারের সময় চাওয়াটা অত্যন্ত সীমিত। একটু হাঁটলেই পা চলে না। তাই বিদায় নিতে গিয়ে বলেন ‘আমি আর পারছি না ভাই।’ আপনারা যান। আমি বাসায় ফিরব।
আপন ইসলাম এই পাড়ারই লোক। সাধারণ শিক্ষিত। একটু লেখালেখির অভ্যাস আছে। তত মুসল্লি নয়। তবে নামায পড়েন নিয়মিত মসজিদে। তাবলীগের লোকেরা অনেকবার টার্গেট করে দাওয়াত দিয়েও বহুত ফায়দা ওয়ালা বৈঠকে বসাতে পারেনি। নামায পড়েই মসজিদ ত্যাগ করেন। সেমতে তাবলীগ পন্থীরা অনেকে বিরক্তও হন। ‘আরে বাবা মসজিদে যখন এলে তখন কিছু একটা সময় লাগিয়ে যাও দাওয়াতী কাজে। না তা নয়, কে যেন উঠিয়ে নিয়ে যাচ

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT