সাহিত্য

শিরুলের ছড়ার সংসার

ফকির ইলিয়াস প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৯-২০১৮ ইং ০০:৪৯:১২ | সংবাদটি ২৩২ বার পঠিত

ছন্দে ছন্দে মানুষকে আনন্দ দেয়া যায়। বলা যায় অনেক কথা। যে কথা মানুষের যাপিত জীবনচিত্র। অথবা হতে পারে কোনও অসঙ্গতি, অন্যায়, অসত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। হতে পারে অধিকারের কথা। হতে পারে দাবি-চাওয়া-পাওয়া।
ছড়ায় ছড়ায় লিখিত হতে পারে প্রেম-বিরহ-মিলনের মহাকাব্য। আমরা অন্নদাশঙ্কর রায়ের সেই প্রখ্যাত ছড়াটি এখনও আওড়াই। কেন আওড়াই? কারণ এর সাথে লেগে আছে আমাদের মাটি ও স্বপ্নের দ্যোতনা।
‘তেলের শিশি ভাঙল বলে/ খুকুর পরে রাগ করো/ তোমরা যে সব বুড়ো খোকা/ ভারত ভেঙে ভাগ করো!/ তার বেলা?/ ভাঙছ প্রদেশ ভাঙছ জেলা/ জমিজমা ঘরবাড়ী/ পাটের আড়ত্ ধানের গোলা/ করখানা আর রেলগাড়ী!/ তার বেলা?’
এর চেয়ে বড় ব্যঙ্গ কিংবা ঐতিহাসিক প্রজ্ঞাপন আর কী হতে পারে! ছড়া এমনভাবেই মানুষের মানে দাগ কাটে। রেখে যায় রঙিন রেখা।
সিরাজ উদ্দিন শিরুল এই সময়ের অত্যন্ত প্রতিভাবান একজন ছড়াশিল্পী। তিনি লিখেন মানুষের মনের কথাগুলোকে একান্তই ভালোবাসার রঙে। আমি তার শব্দছবিতে যতই ডুবেছি-মনে হয়েছে এই কথাগুলো আমার। কেন আমি তা বলতে পারিনি কিংবা পারছি না। তিনি লিখেন-আগুনের ফুলকি জড়োতা/ শব্দের সমাবেশ বড়োতা,/ ছন্দের মিছিলের সভা হয়/ তাল লয়ে মাত্রার ঝড়োতা।/ ঠনঠনে মিছিলের অক্ষর/ রাজপথে রেলপথে চক্কর,/ প্রতিবাদি তীব্র চিৎকার/ মসনদে ছড়া দেয় টক্কর।/ ছন্দরা মিছিলের যাত্রায়/ মন্দরা পিছিলেই কাতরায়,/ শব্দের হাত, হয় যদি শক্ত/ মোড় ঘুরে মিছিলের মাত্রায়।’ [ছন্দের ফুলকি]
ধ্যানী মানুষের ভাব ও ভাষা ভাবনার সাথে নিজেকেই বিনির্মাণ করে। শব্দচর্চাকে বৃত্তের বাইরে এনে নতুন মাত্রা সংযোজন করারসাধ্য সবার থাকে না।
ছড়া সাহিত্যের অন্যতম শক্তি হচ্ছে সমসাময়িক ভাবনার রসদ।মানবিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয় মানবিকতার শক্তি নিয়ে। ছড়ামেন হতে হয় যা কাঁপিয়ে তুলে জোর-জুলুমবাজের হাত। ছড়া প্রতিবাদের প্রাসঙ্গিক ভাষা।
সিরাজ উদ্দিন শিরুল তা রপ্ত করেই এই বীজতলায় এসেছেন।
বিষয় নির্বাচন, শব্দ প্রয়োগ ছন্দের ব্যবহার এবং অন্তমিলের ক্ষেত্রে অন্যান্য ছড়াকারদের চেয়ে উজ্জ্বল তিনি। রাতের আঁধার চিরে লক্ষ কোটি নক্ষত্রের আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে মানুষের মনের জমিনে শিরুল এঁকেছেন নিজস্ব শব্দ-প্রতিমা।
যারা আছে ছিন্নমূলে/ যারা পথের শিশু/ তাদের দুঃখ কে বুঝিবে/ বলুন জগত যীশু।/ যারা আছে দীনদুখী আর/ যারা পথে ঘুমায়/ আকাশ তলে থাকে তারা/ সুরুজ এসে চুমায়।/ ঘর বাড়িহীন মানুষ যারা/ দুঃখ জীবন সারথি/ সুখের পরশ বিলাস বহুল/ বেঁচে থাকাই আরতি।’ [পথের মানুষ]
সিরাজ উদ্দিন শিরুল কাজ করে যাচ্ছেন। তার এই পথ চলা তাকে শেখাচ্ছে নতুন নতুন বাঁক। আমরা জানি, ছড়াশিল্প সাহিত্যের একটি পুরনো শাখা। সেই আদি ঐতিহ্যের বটবৃক্ষে প্রতিদিন একটি করে পাতা সংরক্ষণ করে রাখেন এই ছড়াকার। যা সময়ের নতুন ভাবনার গতিতে নতুন প্রাণ এনে দেয়। শিরুল সেজন্যেই ফিরে তাকান প্রাচীন লোক সাহিত্যের দিকে তার ছন্দ-পসরায়।
‘সোনাবানের কিচ্ছা হইতো/ পুঁথির সুরে সুরে,/ দল বান্ধিয়া সবাই যাইতো/ তিন গেরামের দুরে।/ পরথমে বন্দনা করে/ গায়েন উঠে দাঁড়ান,/ ঢোল করতাল মন্দিরাতে/ বেহালায় সুর বাড়ান।/ ঝুমুর ঝুমুর বাদ্যি বাজায়/ বাদ্যি যন্ত্রি যারা/ সুরের তালে কোমর দোলায়/ আবাল বৃদ্ধ সারা।/ পালাকারের সাজুগুজো/ দেখলে পরান জুড়ে,/ চম্পাবানুর কিচ্ছা শুনে/ মাথা যায় যে ঘুরে।/ কোথায় গেলো গাও গেরামের/ কিচ্ছা পুঁথির আসর,/ রাস্তা ধারের পাশা খেলা/ গাজীর গানের বাসর।’ [কিচ্ছা পুঁথি]
ছড়াকাররা এভাবেই শিকড়ের সন্ধান করেন। আলো আঁধারির লুকোচুরি খেলার ফাঁকে প্রতিবাদ করেন সাবলীল ভাষার মাধুর্যে। ছড়া সাহিত্যে উদীয়মান এই শ্রমিকের সাধনা সত্যিই আশা জাগানিয়া। শিরুলের একটি বই আছে, যার নাম ‘হাওয়ার গাড়ি’। দুই ফর্মার এই গ্রন্থটি পুরোটাই আধ্যাত্মিক ঘরানার ছড়ার সংকলন। পরা যাক গ্রন্থ-শিরোনামের ছড়াটি।
হাওয়ার গাড়ি চলছে রোজই/ দমের বাতাস হাওয়া,/ দম ফুরালেই বন্ধ গাড়ির/ বন্ধ আসা যাওয়া।/ থাকবে পড়েই জীবন গাড়ি/ রাস্তা যাবে শেষ হয়ে,/ মরণ স্বাদে বরণ হবেই/ শুন্য হাতেই খেশ বয়ে।/ কেউ কাঁদিবে বিলাপ করে/ কেউ কাঁদিবে মন দিয়ে,/ বিকল গাড়ি হয় না ভালো/ মালিক থাকেন ধন নিয়ে।/ সিরাজ শিরুল ভাবছে বসে/ দিন ফুরালেই ডাক পড়ে,/ রঙের জগত সাঙ্গ হলেই/ পরের জীবন বাঁক ধরে।’ [হাওয়ার গাড়ি]
আমরা দেখেছি,পূর্বেকার সময়ের লেখা ছড়াগুলোতে ননসেন্স ছড়া, ঘুমপাড়ানি ছড়ার পাশাপাশি ইতিহাস, গভীর বক্তব্য কিংবা ভবিষ্যৎ লুকায়িত থাকতো। কিছু ছড়া ছিল প্রায় পুরোই অর্থহীন। যা থেকে শেখার কিছু ছিল বলে আমি মনে করি না। এই সময়ের ছড়াকাররা সাধারণ মানুষের নিপীড়িত হওয়ার দিকে নজর দিয়ে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের চোখ খুলে দিতেও সচেষ্ট থাকছেন। যা ছড়াসাহিত্যে একটি উলেখযোগ্য দিক।
বলে রাখি, চলমান সময়ের ছড়া স্পর্শে, রূপে, রসে, রঙে গণমানুষের অভিব্যক্তির শক্ত বাহন। শিল্প সংস্কৃতি ও সাহিত্যের অনন্য মুখপাত্র। ছড়ায় ছড়ায় আজকাল বর্ণমালা শিক্ষা থেকে শুরু করে ছড়ার মাধ্যমেই আধুনিক শিশুর মনোরাজ্যে অভিযাত্রী হয়ে ঢুকে পড়েছেন আধুনিক ছড়াকাররা। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির বদৌলতে আজকাল অনলাইন ছড়া, ব্লগের ছড়া,ফেসবুক ছড়া, ইত্যাদুর পাশাপাশি প্রতিবাদের ছড়া, ঈদের ছড়া, গ্রীষ্মের ছড়া, বর্ষার ছড়া,হেমন্তের ছড়া, বসন্তের ছড়া, একুশের ছড়া, স্বাধীনতার ছড়া, বিজয়ের ছড়া-জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ঋদ্ধ হয়ে উঠেছে। সিরাজ উদ্দিন শিরুল ছড়া সাহিত্যের সব শাখাতেই তার কররেখা রেখে যাচ্ছেন। তার ছড়ায় তাল, চিত্রকল্প, অপুপ্রাস, উৎপ্রেক্ষা, অলংকার এবং নান্দনিক ভাবনা আমাদের সমৃদ্ধ করে।
তার লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মাঝে রয়েছে-‘মিটিং চিটিং’, ‘লাগ ভেলকি লাগ’, ‘পুতুল তুতুল’, 'হাওয়ার গাড়ি', ‘পাখির ছড়া ফুলের হাসি’ অন্যতম। এছাড়াও তিনি লিখেছেন যৌথ ছড়াগ্রন্থ ‘রাজাকার’, ‘ছড়া নয় ছড়ি’, ‘হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু’ ইত্যাদিতে।
শিরুল নিসর্গ প্রেমিক শব্দসৈনিক। প্রকৃতি তার আরাধনার প্রথম পাঠ। তা তার লেখাগুলো পড়লেই বুঝা যায়।/ রাতের গায়ে চাঁদের তিলক/ মন আকাশে উড়ে/ প্রিয়ার চোখে স্বপন সাগর/ বুক সীমানা জুড়ে/ স্বপন থাকিস প্রিয়ার ঘরে/ জোসনা আলো নিয়ে/ রাতের গায়ে সোহাগ বিলাস/ শুকতারাকে দিয়ে।’ [রাতের গায়ে]
যে কথাটি না বললেই নয়, তা হলো-একজন শব্দজনকে অনেক পথ পেরোতে হয়। আর তাই সাধনা অব্যাহত রাখাটি খুব দরকারি কাজ। আমার বিশ্বাস, পূর্ণ শক্তি ও প্রত্যয় নিয়ে শিরুল তার আগামী পথে এগিয়ে যাবেন। তিনি নিজেই লিখেছেন-‘ঐ যে নিশান মুক্ত নিশান/ রক্তেমাখা লাল,/ ঐ নিশানে আঁকা আছে/ একাত্তরের সাল।/ রণাঙ্গনে দামাল ছেলে/ সেদিন নিশান হাতে,/ শত্রু দলে ঝাঁপিয়ে পড়ে/ লড়লো দিনে রাতে।/ ঔ নিশানের মূল্য দিতে/লক্ষ নর ও নারী,/ মান দিয়েছে প্রাণ দিয়েছে/ শপথ নিলাম তারই।’ [নিশান]
তার এই শপথ সার্থক হোক। সৃজনের আনন্দ মানুষকে ধ্যানী করে তোলে। বাংলাদেশ ও বহির্বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়ায় তার ছড়া প্রকাশিত হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকুক। তার হাতে লিখিত হোক, কোটি মানুষের প্রেম-কোটি মানুষের অধিকারের উচ্চারণ।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT