মহিলা সমাজ

তারপরেও প্রতীক্ষা

নার্গিস মোমেনা প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৯-২০১৮ ইং ০০:২৩:৩৭ | সংবাদটি ১০৪ বার পঠিত

প্রায় দু’বছর আগের কথা। ফেইসবুকে দু’জনের সাথে বন্ধুত্ব। বন্ধুত্বের এক পর্যায়ে প্রকাশ্যে দেখাদেখি। দু’জনেই আবার একই স্কুলের একই কলোনীর ছেলে মেয়ে। পরিচিত বিধায় খুব সহজেই এরা একে অপরকে জানতে ও বুঝতে পেরেছে। ফলে অতি দ্রুত ঘনিষ্ট হয়ে বন্ধুত্ব থেকে সম্পর্কটা গড়িয়েছে মন দেয়া নেয়ার পর্যায়ে। এরপর থেকে প্রতিনিয়ত নাবিল (ছদ্মনাম) আর টগর (ছদ্মনাম) দু’জনের দেখা হওয়া, ঘুড়ে বেড়ানো, রেস্তরাঁয় খাওয়া, ছবি তোলা, ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প গুজবে কাটিয়ে দেয়া কোনোটাই বাদ থাকেনা। অতিরিক্ত খোশ গল্পের মাঝেই নাবিল আর টগরের কথা কাটাকাটি হয়ে দু’জনের মধ্যে ব্রেকআপও হয়ে যায়।
নাবিলের বাবা নেই, মা আছেন, চাকুরিজীবী। ছোট সংসার। নাবিল পড়াশোনা শেষ করে একটি টিভি চ্যানেল-এ চাকরি করছে। চাকরিটা আহামরি তেমন কিছুনা। তবে অল্পতে যে খুশি থাকে তার জন্য এটা অত্যন্ত ভালো একটি চাকরি। রাজধানী শহরে নিজস্ব ছোট একটি আবাসস্থল। ভালোই চলছে নাবিলের দিনকাল।
অপরদিকে টগর একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভালো একটি সাবজেক্ট নিয়ে অনার্স করছে। অন্য সব ছাত্রীদের সাথে হলে থাকে। বাবা-মা, ভাই নিয়ে ওরও একটি ছোট পরিবার। মেয়েটি আধুনিক যুগের হলেও বর্তমান মেয়েদের মতো অতি আধুনিক নয়। রুচিশীল তবে উচ্চাকাক্সক্ষী আর স্পষ্টবাদী।
যাকে ভালোবাসা যায়, যার সাথে প্রেম করা যায় তাকে রাস্তাঘাটে হঠাৎ অপমান অপদস্ত করা যায় কি না তা জানা নেই। কোনো এক জুন মাসের কথা। হঠাৎ একদিন নাবিল আর টগরের মাঝে কি যেন বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে পড়ন্ত বিকেলে লোকে লোকারণ্য ব্যস্ত রাস্তায় টগর নিজের পায়ের চটি খুলে ইচ্ছেমতো মনের সাধ মিটিয়ে চপেটাঘাত করেছে নাবিলকে। রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশ ছাড়াও অন্যান্য জনতা হতভম্ব। শুধুমাত্র নাবিলের মুখাবয়ব, চলাফেরা, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং অফিসের আইডির পরিচয়ে সেদিন সে জনতার ধোলাই হতে রক্ষা পেয়েছে। ক্রোধ, হিংসা এবং অহংকার এই তিনটি যে কোনো মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। টগর এর মধ্যে কি এমন ক্রোধ সৃষ্টি হয়েছিল যে সে মুহূর্তেই তার ভালোলাগা আর ভালোবাসার মানুষটির প্রতি এমন উগ্র আচরণ করে প্রতিশোধ নিতে উদ্যত হয়েছিল এটা বোধগম্য নয়। জুন মাসটি নাবিলের জন্ম মাস। অথচ এই রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসকে টগর উপেক্ষা করে নাবিলকে অপমান অপদস্ত করেছে তাও আবার পায়ের চপ্পল দিয়ে, কিন্তু কেন?
কয়েকটা দিন ওদের দু’জনের চরম উত্তেজনার মধ্যে সময় অতিবাহিত হয়েছে। টগরের এরূপ আচরণে নাবিল প্রচন্ড মর্মাহত হয়েছে। মানসিক আঘাতে জর্জরিত হয়ে নিশ্চুপ থেকেছে। বিষয়টি নাবিল তার মায়ের সাথে শেয়ার করেছে। মা তাকে যথেষ্ট সান্ত¦না দিয়েছেন। কিন্তু মায়ের মন কিছুতেই বিষয়টি স্বাভাবিক ভাবতে পারছে না। বিশেষ করে ছেলের জন্মদিনের মাস। কয়েকদিন পর জন্মদিনে সবাই আনন্দ করবে। অভিনন্দন জানাবে অথচ তার উল্টো ঘটলো সব। ইতোমধ্যে টগর তার নিজের ভুল বুঝতে পেরে কাউকে কিছু না জানিয়ে নাবিলের বাসায় এসে উপস্থিত। একদিকে নাবিলের মনটা খারাপ, দুঃখে ভরাক্রান্ত অন্যদিকে টগরকে দেখে সে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। টগর সেদিন নাবিলের সাথে ঐরূপ আচরণে দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং সমঝোতা করতে এসেছে। যতো কিছুই হোক স্বশরীরে যেহেতু টগর বাসায় এসেছে তাই নাবিল তাকে উপেক্ষা করতে পারেনি। স্বাভাবিক কথা বার্তা বলেছে, যতোটুকু সম্ভব আপ্যায়ন করেছে। কিছুটা সময় অতিবাহিত করার পর তাকে হাসিমুখে এগিয়ে দিয়ে বিদায় জানিয়েছে।
নাবিল টগরের সম্পর্কটা স্বাভাবিক হলেও মনের কোন এক স্থানে আঁচড় লেগেই আছে। তাদের সম্পর্ক জোয়ার ভাটার মতো চলছে। কখনও আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। আবার কখনও কৃষ্ণচূড়ার রং এ রঙিন হয়ে ওঠে। হলুদ গাঁদায় প্রজাপতির ছুটে বেড়ানোর মতো পিজ্জা, আইসক্রিম আর চটপটি খাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে ওঠে দু’জনে।
ওদের মাঝে মধ্যে যে খুনসুটিটা হয় তার কারণ একটাই। দু’জনের ফেসবুক। এই ফেসবুকে কথোপকথন ম্যাসেজ আদান প্রদান তাদের একে অপরের প্রতি সন্দেহটা আরো বৃদ্ধি করো সম্পর্কে পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ^াসের ঘাটতি এই অবিশ^াসকে আরো উসকে দেয়। সম্পর্কের শীতলতা, মানসিক দূরত্ব, পরস্পরের উদাসীনতা মনের গহীনে এক ধরণের শূন্যতা সৃষ্টি করে। সন্দেহকে আলিঙ্গন করে এক রকম স্বস্তি আর সান্ত¦না তারা খুঁজে ফিরে। প্রতিটা মানুষ আলাদা। চলনে, বলনে, ব্যক্তিত্বে, কাজেই সন্দেহের বিষয়টি ডালপালা ছড়াতে না দিয়ে আস্তা, বিশ^াস আর ভালোবাসা নিয়ে মুখোমুখি হওয়া উচিত।
এরই মধ্যে টগরের বাসায় মা-বাবা কন্যার জন্য পাত্র খুঁজতে শুরু করেছে। কোনোটাই তাদের পছন্দ মতো হচ্ছে না। অন্যদিকে টগর তার পছন্দের পাত্রটির কথা বাসায় প্রকাশ করতে পারছেনা। কেননা তার পছন্দের পাত্রটি কোনো বিসিএস ক্যাডার নয়, ডাক্তার নয়, পুলিশ সুপারও নয়। ছেলেটি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার মাঝে চাকরিতে প্রবেশ করেছে। ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অপরদিকে নাবিল টগরের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। এবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার দায়িত্ব এখন টগরের। এরই প্রতিক্ষায় প্রহর গুনছে নাবিল।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT