ইতিহাস ও ঐতিহ্য

উনিশ শতকে সিলেটের সংবাদপত্র

সেলিম আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৯-২০১৮ ইং ০১:১৫:৫৭ | সংবাদটি ১৪৯ বার পঠিত

সিলেটে সংবাদপত্রের সূচনা হয়েছিলো ঊনিশ শতকে। প্রথম বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সাপ্তাহিকী’ প্রকাশের ৫৮ বছর পর সিলেট থেকে সংবাদপত্র বের হয়েছিলো।
উনিশ শতকের চল্লিশের দশকের শুরু থেকে বাংলাদেশে মফস্বল সাংবাদিকতা বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সময়। উনিশ শতকের প্রথম ভাগটি ছিল সংবাদপত্র সংহত করার যুগ। এক্ষেত্রে সহায়তা করে অধিকাঠামো ও প্রযুক্তির বিকাশ। দ্বিতীয়ার্ধ সংবাদপত্র বিস্তারের সময়। এ সময়টা থেকেই সংবাদপত্র কলকাতার গন্ডি ছাড়িয়ে ছোটো বড়ো শহরে ছড়িয়ে পড়ে। এই ধারাবাহিকতায় পূর্ববঙ্গে সংবাদপত্র প্রকাশের তোড়জোড় শুরু হয়। তখন বাংলার গ্রামাঞ্চল থেকেও সংবাদপত্র বের হওয়া শুরু হয়। কলকাতার বাইরে প্রথম পত্রিকাটি বের হয় ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মে মুর্শিদাবাদ থেকে। নাম ছিলো ‘মুর্শিদাবাদ সম্বাদপত্রী’।
কলকাতায় সংবাদপত্র বের হবার এতো দীর্ঘ সময় পর পূর্ববঙ্গে পত্রিকা বের হবার কারন হিসেবে গবেষক জুলফিকার হায়দার যা উল্লেখ করেছেন তা হচ্ছেÑপ্রথম: ব্রিটিশ শাসনের শুরুতে কলকাতা নগরীর গুরুত্ব বেড়ে যায়। উনিশ শতকেই কলকাতা প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠে। এজন্যে মোগল আমলে গড়ে উঠা ঢাকা প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক দুটো ক্ষেত্রেই তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। সেই সময়ে কলকাতার সৌন্দর্য বাড়াতে পূর্ববঙ্গ ‘হিন্টারল্যান্ড’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে যা চিহ্নিত করা হয়, তা হচ্ছে-তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিলো অনুন্নত। লেখাপড়া জানা মানুষের পরিমানও ছিলো খুব কম। তৃতীয় কারণ হিসেবে যা বলা হয়Ñতা হচ্ছে পূর্ববঙ্গে মধ্য শ্রেণীর বিকাশ হতে বিলম্ব হয়েছে। এজন্যে সংবাদপত্র বের হতেও হয়েছে বিলম্ব। উনিশ শতকের চল্লিশ দশকে পাটের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে পূর্ববঙ্গে স্বচ্ছল মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। একই সাথে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ার ফলে এ অঞ্চলে ছোট ছোট শহর গড়ে উঠতে শুরু করে। এই সময়টায় ঢাকাও আবার জেগে উঠতে শুরু করে। ষাটের দশকেই ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি স্থাপিত হয়। মুদ্রণ শিল্পও প্রসার হতে শুরু করে। পূর্ববঙ্গে স্বচ্ছল পরিবারের লোকজন তাদের আয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হলেও সন্তানদেরকে ইংরেজি শিক্ষা দিতে আগ্রহী হয়ে উঠে। এই সময়ে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন স্থানে অনেকগুলো মধ্য ইংরেজি এবং মধ্য বাংলা স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। জেলা ও মহকুমা শহরে এইসব ইংরেজি শিক্ষিতদের নিয়ে মধ্য শ্রেণী গড়ে উঠতে থাকে। এ ছাড়া, পূর্ববঙ্গের শহরগুলোতে তখন মহাজন, মুৎসুদ্দি, ব্যবসায়ী, উকিল, সরকারি কর্মচারী, কেরানি, শিক্ষক ও ক্ষুদে ব্যবসায়ীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এইসব কারণেই সংবাদপত্র প্রকাশের পথ প্রসারিত হয়।
১৮৭৬ থেকে ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দ এই স্বল্প সময়ে সিলেট থেকে বের হওয়া পত্রিকার সংখ্যা খুব বেশী নয়। তবে এইসবগুলো পত্রিকাই পূর্ণাঙ্গ সংবাদপত্রের রূপ লাভ করতে পারেনি। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষায় অনগ্রসরতা, সংবাদদাতার স্বল্পতা ইত্যাদিই ছিলো সিলেটের সংবাদপত্রের দ্রুত বিকাশের অন্তরায়। গবেষক মুনতাসির মামুন উল্লেখ করেছেন ঊনিশ শতকের সংবাদপত্রগুলো ছিলো প্রধানত: রচনাভিত্তিক। অর্থাৎ ছোটখাট সংবাদ ছাড়া প্রায় ক্ষেত্রেই যে কোন একটি সংবাদ বা বিষয়কে নিয়ে ছাপা হত বিস্তারিত আলোচনা বা মতামত। খবরের মধ্যে থাকতো স্থানীয় কিছু খবর আর বিদেশী বা উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে প্রকাশিত কাগজ থেকে সংগৃহীত খবর। সাথে সাথে ছাপা হত মফস্বল থেকে পত্রিকার ভক্তের পাঠানো সংবাদ। ছিল চিঠিপত্রের কলামও। বিষয়ভিত্তিক রচনা বা কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করেই সম্পাদকরা তুলে ধরতেন নিজস্ব মতামত। এসব পত্রিকায় সংবাদের চেয়ে সাহিত্য গুণ সম্বলিত লেখাই বেশী মুদ্রিত হতো।
শ্রীহট্ট প্রকাশ : সিলেট থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্রটি হচ্ছে ‘শ্রীহট্ট প্রকাশ’। এর আগে হাতেলেখা বেশ কয়েকটি দেয়ালপত্রিকা এ অঞ্চল থেকে বের হয়েছে। তবে শ্রীহট্ট প্রকাশই ছিলো সিলেট থেকে প্রকাশিত প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্র। এর সম্পাদক প্যারীচরণ দাস ছিলেন একজন কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
১৮৭৬ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে প্যারীচরণ সিলেটের প্রথম সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ‘শ্রীহট্ট প্রকাশ’-এর সম্পাদনা শুরু করেন। এর আগে সিলেট থেকে কোন সংবাদপত্র বের না হলেও সিলেটের শিক্ষিত সমাজ ঢাকা ও কলকাতা থেকে বের হওয়া পত্রিকা নিয়মিত পড়তেন। সিলেটে সংবাদপত্রের একটি পাঠকশ্রেণি থাকায় খুব কম সময়েই শ্রীহট্ট প্রকাশ খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠে। তখন শ্রীহট্ট প্রকাশ-এর প্রচার সংখ্যা ছিলো ৪৪০ কপি। সিলেটের লেখাপড়া জানা মানুষের সংখ্যা ছিলো কম এবং অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাও খুব ভালো ছিলো না, এই বিবেচনায় শ্রীহট্ট প্রকাশ-এর এই প্রচার সংখ্যা খুব কম নয়।
শ্রীহট্ট প্রকাশ প্রথম দিকে কলকাতা থেকে ছেপে আনা হতো। পরে প্যারীচরণ সিলেটে একটি প্রেসও বসিয়েছিলেন। প্যারীচরণ সমাজের বিভিন্ন বিষয় তার পত্রিকায় তুলে ধরতেন। এ পত্রিকা সম্পর্কে ১৮৭৬ সালে আসামের বার্ষিক শাসন বিবরণীতে লেখা হয়েছিলো-‘এ পত্রের প্রচার প্রধানত সরকারি অফিসের কেরানি ও আদালতের উকিলদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মুদ্রণযন্ত্রের কোন প্রভাব সাধারণ লোকের মধ্যে আদৌ অনুভূত হয় না।’
প্যারীচরণের পত্রিকাটি ছ’বছর টিকেছিলো। ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে বিপিন চন্দ্র পালের পরিদর্শক বের হবার পর ‘শ্রীহট্ট প্রকাশ’-এর প্রকাশনা ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে।
পরিদর্শক : সিলেট থেকে বের হওয়া দ্বিতীয় সংবাদপত্রের নাম পরিদর্শক। সিলেটের এই দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক হচ্ছেন বাগ্মী বিপিন পাল। তিনি ছিলেন সেই সময়ের ভারতবর্ষের প্রথম সারির একজন রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, বাগ্মী ও সাংবাদিক। ১৮৮০ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিপিনচন্দ্র পাল সাপ্তাহিক পরিদর্শক পত্রিকাটি বের করেন। পরিদর্শক পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়ে উঠে।
বিপিন পাল অসুস্থ হয়ে পড়ায় ১৮৮০ সালের জুলাই মাসের শেষাশেষি তিনি কলকাতায় ফিরে যান। বিপিনচন্দ্র সিলেট ছেড়ে চলে যাবার পর রাজচন্দ্র চৌধুরীর সম্পাদনায় ‘পরিদর্শক’ প্রকাশিত হয়। রাজচন্দ্র চৌধুরী চলে গেলে সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন করিমগঞ্জের আগিয়াররামের রাধানাথ চৌধুরী। রাধানাথ চৌধুরী সিলেটের কয়েকজনকে নিয়ে সম্মিলিত সমিতি THE UNITED CO নামে একটি কোম্পানি গঠন করেন। এই কোম্পানি দ্বারা পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকেন। কিন্তু দীর্ঘদিন অর্থনৈতিকভাবে এ ধরনের একটি অলাভজনক খাতে অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে অনেকে নিরুৎসাহী হয়ে পড়েন। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই পরিদর্শক প্রেস ঋণের দায়ে নিলাম হয়ে যায়। এর সাথে সম্মিলিত সমিতির অস্তিত্বও শেষ হয়ে যায়। মোক্তার দীননাথ দাশ নামে একজন সমাজ হিতৈষী ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ‘পরিদর্শক’ প্রেস নিলামে কিনে নেন। তিনি নিজের নামে প্রেসটির নামকরণ করেন ‘দীননাথ প্রেস’। আবার পরিদর্শক বের করার ব্যবস্থা করেন। পরিদর্শক বের হবার কিছুদিনের মধ্যে আবার অর্থ সংকট শুরু হলে এক পর্যায়ে সম্পাদক ও প্রেসমালিক প্রেস বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। রাধানাথ বুঝতে পারলেন নিজের প্রেস না থাকলে পত্রিকা বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। তারও তেমন টাকা পয়সা নেই। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের বাপদাদার সম্পত্তি বন্ধক রেখে প্রেসটি কিনে নেবেন। শেষমেষ তাকে অবশ্য জমি বন্ধক দিতে হয়নি। তার ভাইদের চেষ্টায় তিনি প্রেসটি কিনেছিলেন। চরম অর্থসংকটের মধ্যেও রাধানাথ চৌধুরী পরিদর্শকের প্রকাশনা চালিয়ে যান। রাধানাথ চৌধুরী মৃত্যু পর্যন্ত সকল প্রতিকূলতার সাথে একা সংগ্রাম করে ‘পরিদর্শক’ কে বাঁচিয়ে রাখেন। ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দের ২০ আগস্ট তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পর তার ভাই আইনজীবী পার্বতীচরণ চৌধুরী প্রেসটি বিক্রি করে দেন। তখন প্রেসটি কিনে নেন ড. ভারত চন্দ্র দাস। তখন ‘পরিদর্শক’ বন্ধ হয়ে যায়। কিছু সময়ের জন্য সিলেটে কোন সংবাদপত্র ছিলো না। সম্ভবত ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে ডা. ভারতচন্দ্র দাসের সম্পাদনায় ‘পরিদর্শক’ নতুন জীবন ফিরে পায়। তবে সেই সময়ে এটি সাপ্তাহিক না পাক্ষিক ছিলো জানা যায়নি। অধ্যাপক যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য বলেছেন, সিলেট শহরের মির্জাজাঙ্গালের প্রফুল্ল মোহন দাস, শেখঘাটের প্যারী মোহন দাস ও মৌলভীবাজারের নলজুড়ার গোপেন্দ্রনাথ অর্জুন সাপ্তাহিক ‘পরিদর্শক’ সম্পাদনা করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, প্যারীমোহন দাস ও গোপেন্দ্রনাথ অর্জুন কিছুদিন পত্রিকাটির যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। তবে তারা কখন পত্রিকাটি সম্পাদনা করেছেন, তা তারা উল্লেখ করেননি। সম্ভবত: রাধানাথ চৌধুরীর মৃত্যুর পর থেকে পত্রিকাটি বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন।
সাপ্তাহিক ‘জনশক্তি’র সর্বশেষ সম্পাদক নিকুঞ্জবিহারী গোস্বামী বলেছেন, ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সুদীর্ঘ প্রায় ৬০ বছর পরিদর্শক পত্রিকা চালু ছিলো। কিন্তু এটি সাপ্তাহিক না পাক্ষিক ছিলো তা তিনি উল্লেখ করেননি।
পরিদর্শক পত্রিকার লগোর নীচে লেখা থাকতো ‘নানা বিষয়ক সংবাদপত্র’। উন্নত যোগাযোগ ও শিক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিলেটের পিছিয়ে থাকার কারণে প্রথমদিকে পত্রিকাগুলোর প্রচারসংখ্যা খুব একটা বেশি ছিলো না। প্রকাশিত এই পত্রিকাগুলোর মূখ্য উদ্দেশ্য ছিলো জনগণের মধ্যে শিক্ষা, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা।
ফুলতত্ত্ব প্রকাশিকা : প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে এবং ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৪ বছর চালু ছিল। এই পত্রিকাটিও ব্যঙ্গবার্ষিকী। এর সম্পাদক ছিলেন সিলেট শহরের জিন্দাবাজারের গিরিজাভূষণ দে। তার জন্ম ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি গদ্য কবিতা লেখতেন। ‘ফলতত্ত্ব প্রকাশিকা’ প্রতি বছর পহেলা এপ্রিল বের হত।
শ্রীহট্ট মিহির : সিলেটের কাজলশাহ নিবাসী লালাপ্রসন্ন কুমার দে সম্পাদিত ‘শ্রীহট্ট মিহির’ ১৮৮৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি বেশিদিন টিকেনি। সম্পাদক নিজে একটি প্রেসও কিনেছিলেন। তিনি সুনামগঞ্জ জুবিলি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষকেরও দায়িত্ব পালন করেন।
শ্রীহট্ট সুহৃদ : সিলেট শহর থেকে ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি (পৌষ-১২৯৫) মাসে প্রকাশিত হয়। মুনতাসির মামুন এটিকে ‘শ্রীহট্ট সুহৃদ’ সমিতির মুখপত্র বলে উল্লেখ করেছেন। সম্পাদকের নাম জানা যায়নি। প্রকাশনা প্রায় এক বছর অব্যাহত ছিল। ‘বাংলা সাময়িকপত্র’ বইয়ে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘শ্রীহট্ট সুহৃদ’-এর প্রকাশনা নিয়ে মন্তব্য করেছেনÑ‘আজকাল স্কুল কলেজের বালক ও যুবকদিগের মধ্যে অধিকাংশের চরিত্র অতি হীন হইতেছে, ঐ সকল হীন চরিত্র বালক ও যুবকদিগকে সৎপথে আনাই শ্রীহট্ট সুহৃদ’য়ের ব্রত। এই ৮ পৃষ্ঠা পরিমিত মাসিক পত্রিকা (বার্ষিক।।.) বালকদিগকের যতেœ পরিচালিত (পৌষ ১২৯৫) হইত।’
সিলেট শহর থেকে ‘শ্রীহট্ট সুহৃদ’ প্রকাশের ঠিক এক বছরের মাথায় বিয়ানিবাজারের লাউতা গ্রাম থেকে ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে ‘শ্রীহট্ট সুহৃদ’ নামে আরো একটি মাসিক বের হয়। সম্পাদক ছিলেন কৈলাস চন্দ্র বিশ্বাস। দেড় বছর চলার পর পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। প্রতি সংখ্যার মূল্য ছিল এক আনা এবং বার্ষিক চাঁদা ছিল আট আনা।
রসরাজ : ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে এটি বের হয়েছিল। এর সম্পাদক ছিলেন লালাপ্রসন্ন কুমার দে। কয়েক সংখ্যা বের হবার পর বন্ধ হয়ে যায়। নাম থেকে বুঝা যায় ‘রসরাজ’ হাস্যকৌতুক বা ব্যঙ্গ বিদ্রুপ জাতীয় মাসিক ছিল।
গদাধর : একটি ব্যঙ্গরসাত্মক পত্রিকা ছিল গদাধর। এটি ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। সম্পাদনা করতেন মহেন্দ্রনাথ দাস (১২৬৬-১৩০৪ বাংলা)। তিনি সিলেট শহরের তেলিহাওরের বাসিন্দা ছিলেন। মহেন্দ্রনাথ দাশ ‘পরীক্ষার্থী ছাত্রদের প্রতি উপদেশ’ নামে একটি ছোট্ট বই এবং ‘শ্রীচৈতন্য চরিত’ গ্রন্থ লিখেছিলেন। ১৩০৪ বাংলার ভূমিকম্পে তার সবগুলো পান্ডুলিপি নষ্ট হয়ে যায়।
শ্রীহট্টবাসী : শ্রীহট্টবাসী ১৮৯২ সালে গিরীশচন্দ্র দাসের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকার লগোর নীচে লেখা থাকতো ‘নানা বিষয়ক সংবাদ পত্র’। এর অগ্রিম বার্ষিক মূল্য ছিল দেড় টাকা। পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় সম্পাদকীয় ছাপা হতো। শেষের পাতায় থাকতো বিজ্ঞাপন। মুনতাসির মামুন শ্রীহট্টবাসীকে পাক্ষিক পত্রিকা বলে উল্লেখ করেছেন। যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য লিখেছেন পত্রিকাটি ৪/৫ বছর চলেছিলো।
মহিউদ্দিন শীরু উল্লেখ করেছেনÑ‘শ্রীহট্টবাসী’ ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে নগেন্দ্রনাথ দত্তের সম্পাদনায় সিলেট থেকে প্রকাশিত হয়। এটি সিলেট থেকে প্রকাশিত চতুর্থ পত্রিকা বলে জানা যায়। শ্রীহট্টবাসীর দ্বিতীয় খন্ড ১৫শ সংখ্যায়, চৈত্র ১ম পক্ষ, ১৩০১ বঙ্গাব্দ সংখ্যায় পরিদর্শকের মতো প্রথম পৃষ্ঠায় লোগোর নীচে ‘নানা বিষয়ক সংবাদপত্র’ বাক্যটি লেখা আছে। একই সংখ্যার শীর্ষে ‘হংসোহি ক্ষীরমাদত্তে তম্মিশ্রা বর্জয়ত্যপঃ’ বাক্যটি মুদ্রিত রয়েছে।’
শ্রীহট্টবাসী’র চৈত্র প্রথম পক্ষ ১৩০১ বাংলা সংখ্যাটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়। এই পত্রিকাও অনেকটা পরিদর্শক-এর মতোই। উনিশ শতকের সাংবাদিকদের সচেতনতা ও স্পর্শকাতরতার প্রমাণ পাওয়া যায় পত্রিকার একটি সম্পাদকীয় মন্তব্যে। সরকারের কাছ থেকে সাহায্য নেয়াকে তারা অন্যায় মনে করতেন।
‘পরিদর্শক’ ও ‘শ্রীহট্টবাসী’ দেখে মনে হয় তখন সম্পাদকের নাম ছাপার রেওয়াজ ছিলো না। মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, ঊনিশ শতকের পূর্ববঙ্গেও পত্রিকায় প্রায় ক্ষেত্রেই সম্পাদকের নাম উল্লেখ করা হতো না। ফলে কখন কে পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তা নির্ণয় করা অসম্ভব হয়ে উঠে।
লাউতা প্রকাশ : সাপ্তাহিক জ্ঞানশক্তির অন্যতম সম্পাদক সতীশ চন্দ্র দেব তরুণ বয়সে বিয়ানিবাজারের অজপাড়া লাউতা গ্রাম থেকে ‘লাউতা প্রকাশ’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। এর প্রকাশকাল জানা যায়নি। তবে অনুমান করা যায় উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে লাউতা প্রকাশ আত্মপ্রকাশ করেছিলো। পত্রিকাটির সম্পাদক সতীশ চন্দ্র দেব লাউতা গ্রামের লোক ছিলেন। তিনি ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে ভুবন মোহন বিদ্যার্ণবের সাথে করিমগঞ্জ থেকে যৌথভাবে ‘শ্রীভূমি’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করেছিলেন। তিনি স্কুলের পাঠ্যবইও রচনা করেছিলেন।
শ্রীহট্ট হিতৈষী : ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে সিলেট থেকে এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। এর সম্পাদকের নাম জানা যায়নি।
মূলত উনিশ শতকের শেষ দিকে সিলেটের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নেতৃত্বে ও তাগিদেই পত্রিকা প্রকাশ শুরু হয়। অনেকটা শখের বশবর্তী হয়ে এবং সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে এ সকল পত্রিকা প্রকাশিত হতো।
উনিশ শতকে সিলেট থেকে প্রকাশিত পত্রিকার সংখ্যা কম হলেও এগুলো সিলেটের সমাজ জীবনে যথেষ্ট প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। পরবর্তী বিশ শতকে সিলেট থেকে প্রচুর পরিমানে সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে। জনশক্তি, যুগবাণী, যুগভেরী, আল ইসলাহ-র মতো পত্রিকার জন্ম হয়েছে। এইসব পত্রিকার ধারাবাহিকতায় জন্ম হয়েছে আরো অনেকগুলো পত্রিকা-সাহিত্য সাময়িকীর। শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে জনমত গঠন, জনমনে চেতনা সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছে এইসব সাময়িকী-সংবাদপত্র। ব্রিটিশের শাসন থেকে মুক্তির সংগ্রাম, সিলেটকে সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের সাথে যুক্ত করার আন্দোলন, ভাষা আন্দোলনের সিঁিড় বেয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যূদয়ে এইসব পত্রিকার গৌরবোজ্জ্বল অবদান। (সিলেট প্রেসক্লাব ফেলোশিপ প্রবন্ধ)

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • উনিশ শতকে সিলেটের সংবাদপত্র
  • হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশঝাড় চাষের নেই উদ্যোগ
  • হারিয়ে যাচ্ছে বেদে সম্প্রদায়ের চিকিৎসা ও ঐতিহ্য
  • একটি হাওরের অতীত ঐতিহ্য
  • বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক
  • বানিয়াচংয়ের ভূপর্যটক রামনাথ
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন
  • সিলেটের গৌরব : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রকৃতিকন্যা সিলেট
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ক্ষেত্র
  • ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ জামালপুর
  • সুনামগঞ্জের প্রথম নারী সলিসিটর
  • Developed by: Sparkle IT