ইতিহাস ও ঐতিহ্য

যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়

মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৯-২০১৮ ইং ০১:১৭:৩৮ | সংবাদটি ৩৮ বার পঠিত

টিলা আর হাওর বেষ্টিত জনপদ দোয়ারাবাজার উপজেলা পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো এক অতুলনীয় এলাকা। দোয়ারাবাজারের উত্তর দিকে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের মেঘালয় পাহাড়। মেঘালয় থেকে নেমে এসেছে ছোট-বড় অনেক নদ-নদী। এখানে রয়েছে টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ড, ব্রিটিশ ট্রামরোড, পান্ডারখাল বাঁধ, বাঁশতলা হকনগর শহীদ স্মৃতিসৌধ, আদিবাসী পাহাড়, মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সমাধি।
সীমান্তঘেঁষা বাংলাবাজার ইউনিয়নের কলাউড়া গ্রাম পেরুলেই আকাশের সঙ্গে পাহাড়ের মিলন চোখে পড়ে। তখনই গানের কথাগুলো মনে পড়ে- ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়, যেথায় কোকিল ডাকে কুহুকুহু, দোয়েল ডাকে মুহুর্মুহু, নদী যেথায় ছুটে চলে আপন ঠিকানায়...’। গানের এই পঙক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পূর্ণ মিল রয়েছে এখানে।
বাঁশতলা হকনগরে রয়েছে ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধকালীন ১৩ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সমাধি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ১১টি সেক্টরের অন্যতম ৫ নং বাঁশতলা সাব-সেক্টর এটি।
ভারত থেকে নেমে আসা চিলাই নদীর ওপর নির্মিত মনোরম স্লুইচ গেট, তিন দিকে মেঘালয় পাহাড়ে ঘেরা বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ, পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি ¯্রােতস্বিনী নদীর কলতান আর পাখির কোলাহলে মুখরিত হয়ে ওঠে সমগ্র এলাকা। এক কথায়, মনোমুগ্ধকর এক পরিবেশ এখানে বিদ্যমান। তিন দিকে পাহাড়বেষ্টিত এই এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্যাপ্টেন হেলাল ৫ নং বাঁশতলা সাব-সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন। ’৭১-এর শহীদদের স্মরণে তাদের স্মৃতি ধরে রাখতে নির্মাণ করা হয়েছে বাঁশতলা হকনগর স্মৃতিসৌধ। পাশাপাশি সরকারি অর্থায়নে পর্যটকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে একটি বিলাসবহুল রেস্ট হাউস, কমিউনিটি ক্লিনিক ও মসজিদ। স্মৃতিসৌধের পাশে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করা যায় ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের নয়নাভিরাম দৃশ্য।
বাঁশতলা-হকনগর শহীদ স্মৃতিসৌধ এলাকাটি এখন পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিত। এটা প্রকৃতি প্রেমিদের মন কেড়ে নেয়। এখানে ভারতীয় সীমানার কোল ঘেঁষে জুমগাঁও পাহাড়ের উপর গারো সম্প্রদায়ের বসবাস। তাদের সাজানো-গোছানো ঘর-বাড়ির পরিবেশ অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন। গারো পাহাড়ের পাদদেশে ভারতের সীমান্ত। এখানের চারদিকে সবুজের সমারোহ। বিকেল বেলা পাখিদের কলরব ও বাতাসের মনমাতানো শব্দে প্রাণ জুড়ায়। ছোট ছোট টিলা আর পাহাড়ে সাজানো বিস্তীর্ণ এলাকা। দেখলে মনে হবে কেউ যেন চারদিকে সবুজ রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে। ভারত সীমান্তে পাহাড়ি ঝরনা চোখে পড়ার মত। এখান থেকে ফিরে হকনগরস্থ মৌলা নদীর উপর সøুইস গেট দর্শন না করে যাওয়া যায় না। ১ কোটি ২৬ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০০৫ সালে এটি নির্মিত হয়। যদিও নদী শাসন প্রকৃতি বিরোধী, তবুও বয়ে চলা পাহাড়ি ঝরনার মাঝে এ সøুইস গেট আলাদা সৌন্দর্য্যরে সৃষ্টি করেছে। এখানে ঠান্ডা ও শীতল স্বচ্ছ পানিতে সাঁতার কাটলে সহজেই শরীরের ক্লান্তি দূর করে। সøুইস গেট ছাড়িয়ে কিছুটা সামনে গেলেই দেখা মিলবে তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধের ৫ নং সদর দপ্তর। এখানে কিছুটা ত্রিভুজ আকৃতির শহীদ মিনারের বেদিতে বসলে প্রাকৃতিক ঠান্ডা বাতাস মন ছুঁয়ে যাওয়ার মত। এখানকার আশপাশের পরিবেশ খুবই মনোরম। সবুজ পাহাড় আর নীল আকাশের মিতালি দেখে মনে হবে যেন ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায়।’
এখানে যাবার দু’টি রাস্তা হচ্ছে, (১) ছাতক শহরের নোয়ারাই বাজার থেকে এবং (২) দোয়ারাবাজার সদর থেকে সিএনজি অটোরিক্সা, অটো টেম্পু ও ভাড়ায় মোটর সাইকেল পাওয়া যায়।
দোয়ারাবাজারের অদূরে বাংলাবাজার ইউনিয়নের বৃহত্তর গ্রাম কলাউরা। গ্রামটি পাড়ি দিলেই চোখে পড়ে আকাশের সাথে যেন পাহাড়ের মিতালী। এখানে ভারত থেকে নেমে আসা মৌলা নদীর উপর নির্মিত সøুইস গেট, তিন দিকে মেঘালয় পাহাড়ে ঘেরা বাঁশতলা স্মৃতি সৌধ, পাহাড়ি ঝরনার কলরব, পাখ-পাখালির কুহু কুহু ডাকে মনের মণিকোঠায় স্পন্দন জাগে। বলতে গেলে বাঁশতলায় মনোমুগ্ধকর অসাধরণ এক পরিবেশ বিরাজমান। যা পর্যটকদের নজর কাড়ার মতো। মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্যাপ্টেন হেলাল পাহাড় বেষ্টিত এই এলাকায় ৫নং সাব-সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন।
বাঁশতলাসহ এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় একাত্তরে যারা শহীদ হয়েছেন এখানেই তাদের সমাহিত করা হয়। এসব শহীদের স্মৃতি অমøান করে রাখার জন্যে হকনগর স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। সরকারী অর্থায়নে স্মৃতিসৌধ এলাকায় পর্যটকদের জন্যে নির্মাণ করা হয়েছে একটি রেষ্ট হাউজ, হকনগর কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনা। স্মৃতি সৌধের পাশে রয়েছে দু’শতাধিক বছরের পুরোনো আদিবাসী পাহাড়। এখানে রয়েছে গারোদের বসবাস। পাহাড়ে উঠলে প্রকৃতির প্রকৃত চেহারা অবলোকন করতে প্রত্যহ হাজারো প্রকৃতি প্রেমী এখানে এসে জড়ো হয়।
ঝুমগাঁও এলাকায় বসবাস করে আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের প্রায় ২৫টি পরিবার। তারা নিজ হাতে তৈরী করে নিজেদের ব্যবহার্য যাবতীয় আসবাবপত্র। গারো পাহাড়ে রয়েছে একটি মিশনারী স্কুল, একটি উপাসনালয় ও পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার জন্যে রয়েছে একটি সিঁড়ি।
কিন্তু সব কিছুকে মøান করে দিয়েছে নাজুক যোগাযোগ ব্যবস্থা। দু’টি রাস্তাই চলাচলের ক্ষেত্রে এখন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। সুরমা ব্রিজের কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় গোবিন্দগঞ্জ-ছাতক-দোয়ারাবাজার ও ছাতক-বাংলাবাজার-বাঁশতলা সড়কে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়নি।
ছাতকের জিয়াপুর নিবাসী তৎকালীন এমএলএ মরহুম আব্দুল হকের মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্যে তার জীবদ্দশায়ই এলাকাবাসী তার নামানুসারে গ্রামের নাম হকনগর রাখেন। এসময় মুক্তিযুদ্ধ চলছিল। যুদ্ধচলাকালীন সময়ে তিনি এখানে প্রতিষ্ঠা করেন একটি হাসপাতাল। এখানে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাসহ এলাকার বিপুল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসা সেবা দেয়া হতো। হকনগর প্রাথমিক বিদ্যালয় নামেও তিনি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এখনও মরহুম আব্দুল হকের নামানুসারে হকনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হকনগর গ্রাম ও হকনগর স্মৃতিসৌধসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থাকলেও কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে হকনগর হাসপাতালটি। এক সময়ে হকনগর হাসপাতালে নরসিংপুর, বাংলাবাজার, বগুলা, লক্ষীপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের বিপুল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসা সেবার একমাত্র আশ্রয়স্থল ছিল। কিন্তু এখন এটি বন্ধ করে হকনগর কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করলেও প্রায়ই এটির দরজায় তালা ঝুলে। এখানে পরিবার পরিকল্পনাসহ অন্যান্য বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হলেও চিকিৎসা সেবার জন্যে কোন ডাক্তার নেই। এজন্যে এলাকার বিপুলসংখ্যক লোক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। এলাকাবাসী মরহুম এমএলএ আব্দুল হক প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ন্যায় এখানে হকনগর হাসপাতাল পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • উনিশ শতকে সিলেটের সংবাদপত্র
  • হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশঝাড় চাষের নেই উদ্যোগ
  • হারিয়ে যাচ্ছে বেদে সম্প্রদায়ের চিকিৎসা ও ঐতিহ্য
  • একটি হাওরের অতীত ঐতিহ্য
  • বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক
  • বানিয়াচংয়ের ভূপর্যটক রামনাথ
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন
  • সিলেটের গৌরব : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রকৃতিকন্যা সিলেট
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ক্ষেত্র
  • ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ জামালপুর
  • সুনামগঞ্জের প্রথম নারী সলিসিটর
  • Developed by: Sparkle IT