ধর্ম ও জীবন

হালাল-হারাম প্রসঙ্গ

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৯-২০১৮ ইং ০০:৩৯:২৫ | সংবাদটি ১২৭ বার পঠিত

প্রতারণা, ছলচাতুরি, দ্রব্যে ভেজাল দেয়া, ওজনে কম দেয়া, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, সুদ, ঘুষ এসবই হারাম। হারাম ভক্ষণের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছেÑ (১) ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিয়দংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে উহা বিচারকগণের নিকট পেশ করো না’ (সূরা : বাক্বারা, আয়াত : ১৮৮)। (২) ‘এতিমদেরকে তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দাও। খারাপ মালামালের সাথে ভালো মালামালের সংমিশ্রণ করো না। আর তাদের ধন সম্পদ নিজেদের ধন সম্পদের সাথে সংমিশ্রিত করে তা গ্রাস করো না। নিশ্চয়ই এটা বড়ই মন্দ কাজ’ (সূরা : নিসা, আয়াত : ২)। (৩) ‘যারা এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে তারা তাদের উদরে অগ্নি ভক্ষণ করে, তারা জলন্ত আগুনে জ্বলবে’ (সূরা : নিসা, আয়াত : ১০)।
(৪) ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না কিন্তু তোমাদের পরস্পর রাজি হয়ে ব্যবসা করা বৈধ’ (সূরা : নিসা, আয়াত : ২৯)। (৫) ‘তাদের অনেকেই তুমি দেখবে পাপে, সীমালঙ্ঘন ও হারাম ভক্ষণে (সুদ-ঘুষ-দুর্নীতিতে) তৎপর তারা যা করে নিশ্চয়ই তা নিকৃষ্ট’ (সূরা : মায়িদা, আয়াত : ৬২)। (৬) ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ খাইওনা এবং আল্লাহকে ভয় কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার’ (সূরা : আল-ইমরান, আয়াত : ১৩০)। (৭) ‘যারা সুদ খায় তারা সেই ব্যক্তির ন্যায় দাঁড়াবে যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে। ইহা এই জন্য যে, তারা বলে, ‘বেচাকেনা তো সুদের মতো’ অথচ আল্লাহপাক বেচাকেনাকে বৈধ ও সুদকে অবৈধ করেছেন। যার নিকট তার প্রতিপালকের উপদেশ এসেছে এবং যে বিরত হয়েছে, তবে অতীতে যা হয়েছে তা তারই; এবং তার ব্যাপারে আল্লাহর ইখতিয়ারে। আর যারা পুনরায় আরম্ভ করবে তারাই নরকের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে’ (সূরা : বাক্বারা, আয়াত : ২৭৫)।
(৮) ‘মন্দ পরিণাম তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়, যারা লোকের নিকট হতে মেপে লওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে, এবং যখন তাদের জন্য মাপে অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে মহা দিবসে’ (সূরা : মুতাফফিফীন, আয়াত : ১-৫)। উক্ত আয়াতগুলোতে হারাম ভক্ষণের ভয়াবহ পরিণামের কথা বর্ণনা করা হয়েছে এবং হারাম ভক্ষণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, ‘যখন সে নেক কাজ করবে সে আনন্দিত হবে এবং সে যখন পাপের কাজ করবে, তখন সে কষ্ট পাবে’ (আহমদ, মিশকাত শরীফ : পৃষ্ঠা-১৬)। অত্যন্ত দুঃখজনক বাস্তব ঘটনা হচ্ছে এই যে, আমাদের অনেকের মধ্যেই মুমিনের সেই বৈশিষ্ট্যটি নেই।
আমরা অনেকেই পাপ কাজে, হারাম কাজেই আনন্দ পাই, হারাম উপায়ে টাকা উপার্জন করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করি। শুধু তাই নয়, আমরা হারাম উপায়ে টাকা উপার্জনের সুযোগ পেলে বা হারাম টাকা উপার্জন করলে আনন্দ উল্লাস করি। উদাহরণ স্বরূপ বলতে পারি, ইউনিয়ন পরিষদ ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমরা দলীয় প্রার্থী অসৎ ও অযোগ্য হলেও তাকে নির্বাচিত করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠি। এর মূল উদ্দেশ্য হলো দলীয় লোক নির্বাচিত হলে তারই মাধ্যমে সরকারি মাল, সরকারি টাকা আত্মসাৎ করবো, রাতারাতি ধনী হবো, সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলবো। অর্থাৎ হারাম উপায়ে উপার্জনের পথ প্রশস্ত করার জন্যই দলীয় লোক নির্বাচনের সকল চেষ্টা করা হয়ে থাকে। অথচ সরকারি টাকা, সরকারি মাল হারাম উপায়ে ভক্ষণ বা আত্মসাতের পরিণাম যে অত্যন্ত ভয়াবহ তা যদি আমরা জানতাম তাহলে জীবনেও সরকারি টাকা হরাম উপায়ে ভক্ষণ করতাম না, আত্মসাৎ করতাম না। কেউ যদি কারো ব্যক্তিগত সম্পদ আত্মসাৎ করে বা চুরি করে তার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয় এবং সে সম্পদের মালিক ক্ষমা করে দেয় তাহলে আল্লাহপাকও তাকে ক্ষমা করে দেবেন। কিন্তু সরকারি টাকার মালিক হচ্ছেন জনগণ। এই টাকা সরকার জনগণকে দিয়ে থাকেন। এমতাবস্থায় মেম্বার, চেয়ারম্যান, এমপি-মন্ত্রী বা তাদের দালালরা সরকারের যেসব টাকা বা মাল আত্মসাত করেন তার জন্য সকল জনগণের নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হতে হবে। জনগণ ক্ষমা করলে আল্লাহপাকও তাদরকে ক্ষমা করে দিবেন। কিন্তু বিষয়টি এতই জটিল হয়ে যায় যে, সরকারি টাকা আত্মসাতকারী সেই মেম্বার, চেয়ারম্যান, এমপি-মন্ত্রীরা জনগণের নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হবে না এবং জনগণও তাদেরকে কখনও ক্ষমা করবে না। সরকারের টাকা আত্মসাতকারী সেই সরকারি অফিসার, শিক্ষক কর্মচারীর বিষয়টিও একই। তারা জনগণের নিকট কখনও ক্ষমাপ্রার্থী হবে না এবং জনগণও তাদেরকে কখনও ক্ষমা করবেন না। এরূপ ভয়াবহ পরিস্থিতি আর কি হতে পারে? আর এরূপ ভয়াবহ পরিস্থিতি হয়েছে একমাত্র হারাম ভক্ষণের কারণেই।
সুদ হারাম একথা আমরা সকলেই জানি। সুদের প্রতি আমরা প্রায় সকলেই আকৃষ্ট। কারণ সুদের মাধ্যমে ঘরে বসে বিনা পরিশ্রমে টাকা পাওয়া যায়। তাই তো জনে জনে, ঘরে ঘরে সুদের রমরমা ব্যবসা। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলোÑ আমরা যারাই সুদ খাই তারা জেনে শুনে সুদ খাই। সুদ দেয়া-নেয়া অত্যন্ত নিকৃষ্ট ধরণের পাপ। জেনেশুনে সগিরা গুনাহ করলে সেটা কবিরা গুনাহ হয়ে যায়। আর কবিরা গুনাহ জেনেশুনে বারবার করলে সেটা শিরক হয়ে যায়। আর শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় গুনাহ। এ মারাত্মক বড় গুনাহ আল্লাহপাক কখনও ক্ষমা করেন না।
এখন আমরা নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করি, সুদের ব্যবসার মাধ্যমে আমরা কিরূপ পাপের সাগরে নিমজ্জিত আছি। এখনও কি আমাদের টনক নড়বে না?
এখন ঘুষ দুর্নীতির বিষয়ে চলে আসি। ঘুষ-লেনদেন হারাম একথা আমাদের কারো অজানা নয়। অফিস আদালতে গেলে দেখা যায় অনেক ঘুষখোরদের উৎকট চেহারা। চাকুরি লাভের জন্য ঘুষ দেয়ার ব্যাপারে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। ঘুষের মাধ্যমে যিনি চাকুরি লাভ করলেন তিনি কি ভাবছেন তিনি কিসের বীজ বপন করলেন? তিনি তো ঘুষের মাধ্যমে হারামের বীজ বপন করলেন। তিনি যতোদিন চাকুরি করবেন ততোদিনই হারামের মধ্যে নিমজ্জিত থাকবেন। ঘুষ দেয়ার মাধ্যমে তিনি অন্যান্য যোগ্য প্রার্থীদের যে অধিকার হরণ করলেন সেজন্য তাকে পরকালে কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে।
হারাম ভক্ষণের বিষয়টি শুধু সুদ-ঘুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং হারাম আয় উপার্জনের বহু ক্ষেত্র রয়েছে। অনেকে নির্ধারিত বেতনে চাকুরি লাভ করেন কিন্তু কর্মক্ষেত্রে ফাঁকি দিয়ে থাকেন। আর অবিরাম ফাঁকি দিয়ে মাসের পর মাস বেতন নিয়ে থাকেন। কর্মক্ষেত্রে ফাঁকি দিয়ে বেতন নেয়াটাও হারামের মধ্যে পরিগণিত। শিক্ষকদের কথাই বলি। শিক্ষকদেরকে সরকার নির্ধারিত বেতন দিয়ে থাকে। কিন্তু অনেক শিক্ষকদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চরম অনিয়ম করতে দেখা যায়। তাদের অনিয়ম দুর্নীতির কথা জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকে অত্যন্ত ফলাও করে ছাপা হয়ে থাকে। এই শিক্ষকরা ক্লাস ফাঁকি দেন বলেই শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালোভাবে পাশ করতে পারে না। অনেক শিক্ষার্থী অকালে ঝরে পড়ে। এই শিক্ষকরাই সীমাহীন অনিয়ম করে মাসের পর মাস অবৈধভাবে বেতন নিয়ে থাকেন। এসব শিক্ষকদের ব্যাপারে কোনো তদারকি নেই বলেই এসব শিক্ষকরা দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে থাকেন। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা দুর্নীতির সুযোগ পান প্রতিষ্ঠান প্রধানের দুর্নীতির কারণে। প্রতিষ্ঠান প্রধান যেখানে দুর্নীতিগ্রস্ত তিনি দুর্নীতি দূর করবেন কিভাবে? আর এভাবেই ধ্বংস হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষার্থীদের জীবন। এটা হয়েছে হারাম উপায়ে উপার্জনের পদ্ধতি অবলম্বন করার কারণেই।
আমাদের সমাজে একটি প্রবাদ আছেÑ ‘হারামে আরাম নেই’। একথাটি পুরো সত্য। হারাম উপার্জন করে, হারাম ভক্ষণ করে কেউই আদর্শ মানুষ হতে পারবেন না। হারাম উপার্জনকারী, হারাম ভক্ষণকারী কখনও আদর্শ মানুষ, আদর্শ জাতিরও জন্ম দিতে পারবে না।
হারাম উপার্জন ও হারাম ভক্ষণের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে হাদিসে অনেক সতর্কবাণী উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত জাবের (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেনÑ ‘যে দেহের গোশত হারাম মালে গঠিত, তা বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। হারাম মালে গঠিত দেহের জন্য দোযখই সমীচীন’ (আহমদ, দারেমী বায়হাকী, মিশকাত শরীফ : পৃষ্ঠা-২৪২)। হযরত আবু বকর (রা.) বর্ণিত অন্য একখানা হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেনÑ ‘যে দেহ হারাম দ্বারা প্রতিপালিত, তা বেহেশতে প্রবেশ করবে না’ (বায়হাকী)।

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  • প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান (রাহ.) ও সাদাকায়ে জারিয়া
  • রাসূলের সাথে জান্নাত
  • মাতা-পিতার অবাধ্যতার শাস্তি
  •  তাফসিরুল কুরআন
  • বিশ্বনবীর কাব্যপ্রীতি
  • শতবর্ষের স্থাপত্য সিকন্দরপুর জামে মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  •  আত্মার খাদ্য
  • মানব জীবনে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা
  • সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ : ইসলাম কী বলে
  • মৃত্যুর আগে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করি
  •   তাফসীর
  • ইসলামে বিনোদনের গুরুত্ব
  • কুরআনে হাফিজের মর্যাদা
  • মদীনা রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকা-ের কেন্দ্র ছিল মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  • এতিম শিশু
  • বার্মিংহামে আল কুরআনের হাতে লেখা প্রাচীন কপি
  • রাসুলের সমগ্র জীবন আমাদের জন্য অনুকরণীয়
  • মৌল কর্তব্য আল-কুরআনের বিধান
  • Developed by: Sparkle IT