ধর্ম ও জীবন

স্রষ্টার অস্তিত্ব

মুন্সি আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৯-২০১৮ ইং ০০:৪২:৩১ | সংবাদটি ৮৩ বার পঠিত

প্রখর রোদ। আবির ও আরিফ দুই বন্ধু হাঁটছে। ছাতা নেই। বাতাসও যেন আজ রাগ করেছে, একটি পাতাও নড়ছে না। পাশের গ্রামে তাদের এক বন্ধু খুব অসুস্থ। কয়েকদিন হল যায় যায় করে যাওয়া হয়নি। আজ দুই বন্ধু চিন্তা করলো, যেহেতু আজ কলেজ বন্ধ, যে করেই হোক, আজ যেতে হবে।
ঘর থেকে বের হওয়ার পর একটু দূরে গিয়েই বুঝতে পারল, গরম খুব ভয়াবহ। কিন্তু যেতে তো হবে।
পায়ে হাটা পথ। একটু পর পর আরিফ বলছে, কী যে গরম, আর পারা যাচ্ছে না। আবির মুচকি হাসে। আবিরের মুচকি হাসি দেখে আরিফ রেগে আগুন। আবির বলে, দেখ দোস্ত, শান্ত হ। এই যে তুই বার বার গরমের জপ করছিস, তাতে কী গরম সামান্যতম কমছে? না, বরং তোর নিকট গরমের যন্ত্রণা আরো তিব্রতর হচ্ছে। আবিরের কথায় আরিফ আরো রেগে যায়। বলে, মোল্লাদের এই সমস্যা, তারা কোন সমস্যা দেখলেই ধৈর্যের ওয়াজ শুরু করে দেয়। আবির ভাবে, এখন আর তাকে কিছু বলে আর ক্ষ্যাপাবে না।
আবির ও আরিফ দু’জনের বাড়ি পাশাপাশি। দু’জন দু’বংশের এবং চিন্তায়ও দুই মেরুর। ছোটকাল থেকেই একসাথে চলা। দু’জনের বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও একটু পরেই আবার সব ভুলে যায়। তারা খুব ভাল বন্ধু। আবির আর আরিফের দু’জনের বাবাই শিক্ষক। দু’জন দু’জনার প্রতিবেশী বন্ধু।
দু’জনে রোদে পুড়ে হাঁটতে হাঁটতে অসুস্থ বন্ধু সাকীবদের বাড়ির নিকট চলে এসেছে। আর একটু গেলেই সাকীবদের বাড়ি। রাস্তার পাশে বিরাট একটি আমগাছ। আরিফ বলে আর পারছিনা। গাছের নিচে একটু বসি। আবির বলে, ঠিক আছে চল। গাছের নিচে গিয়ে মনে হল আগুন থেকে যেন এখন পানিতে এসে পড়েছে। আরিফ বলে ওঠে, আলহামদু লিল্লাহ। আরিফ আবারও রেগে যায়। আবির বলে, দোস্ত এখন আর কথা নয়, চল আগে সাকীবদের বাড়িতে যাই। তুই রাগ দেখালেও আমি তোর সাথে এখন কোন তর্ক করবনা। ওখানে গিয়ে কথা বলব।
সাকীবদের বাড়িতে গিয়ে আরিফ সালাম দেয়। সাকীবকে তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তার চিকিৎসার খোঁজখবর নেয়। সাকীবের শরীর আগের চেয়ে অনেকটা ভাল হয়েছে। দু’জনেই আরো আগে দেখতে না আসতে পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে। সাকীব বলে, তোরা অনেক ব্যস্ত। প্রতিদিন ক্লাসে যাস। পড়ার ব্যস্ততা। এটা তোদের কোন দোষ নয়। আমি তো আগের চেয়ে অনেক ভাল। এই কয়দিন অসুস্থ থাকায় ক্লাসে যেতে পারিনি। অনেক পিছিয়ে গেছি। তোরা আমাকে হারিয়ে যাওয়া ক্লাসগুলোর ব্যাপারে সাহায্য করবি। আবির বলে আলহামদু লিল্লাহ, আল্লাহ তোমাকে অনেকটা সুস্থ করেছেন। ইনশাআল্লাহ অল্প কয়েকদিনের মধ্যে তুই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবে। কোন চিন্তা করিসনা। আল্লাহর উপর ভরসা রাখ। তিনিই রোগ দিয়েছেন আর তিনিই একমাত্র আরোগ্য দানকারী।
আরিফ আরিবকে ঘা দিয়ে বলে, এই হুজুরদের নিয়ে আর পারা গেল না। রাস্তায়ও গরম নিয়ে আমাকে নসিহত করা হয়েছে। আবার এখানেও ওয়াজ শুরু করা হয়েছে। তবে জনাব আপনার ওয়াজ কী থামবেনা?
আবির বলে, দেখ দোস্ত, অসুস্থ সাকীবকে দেখতে এসেছি। এখানে তর্কের জায়গা নয়। তবে সাকীব যেহেতু অনেকটা সুস্থ, গল্পের ছলে আলাপ করা যায়। আচ্ছা শোন, তোর মা বাবা তোকে খুব আদর করেন, তাই না? তুই যা চাস, তোকে তা দিতে কার্পণ্য করেন না। তুই রাগ করলে তারা তোর রাগ ভাঙ্গানোর সকল চেষ্টা করেন। মনে আছে, গত সপ্তাহে তুই রাতে রাগ করে খাবার খাচ্ছিলি না, চাচা এসে তোর রাগ ভাঙ্গানোর জন্য আমাকে উকীল হিসাবে খানিকক্ষণের জন্য নিয়োগ দিয়েছিলেন। আচ্ছা, তারপরও তো অপরাধ করলে বাবা-মা শাসন করেন। কখনও বেত্রাঘাত করেন। কারণ তারা সকল মানুষের মধ্যে আমাদের সবচেয়ে বেশি ভাল চান। আমাদের দ্বারা যেন ভবিষ্যতে এরূপ অপরাধ আর না ঘটে, আমরা যেন নিজেকে শুধরে নেই। আমাদের রোগশোক অনেকটা তেমনই।
আবিরের এই কথাগুলো শুনে আরিফ বলে আচ্ছা মশাই, আপনি কথায় কথায় আল্লাহ, রাসুল, আখেরাত, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেন। এগুলো আবার আছে নাকি ! সেই পুরান কালের কীচ্ছা কাহিনি বাদ দেন তো। সাকীবও দুই বন্ধুর কথা উপভোগ করছে। অনেকদিন থেকে অসুস্থ। গল্প করা হয়ে ওঠেনা। ভালই লাগছে।
আবির বলে, দোস্ত তোকে অনেকদিন আগের একটি ঘটনা বলি। নাস্তিক আগেও ছিল এখনও আছে। তুই যেমন আল্লাহতে বিশ্বাস করিসনা, এমন বহু লোক এখনও আছে। আস্তিক আর নাস্তিকদের মধ্যে আগেও বহুবার বিতর্ক হয়েছে। এখনও হচ্ছে। ভবিষ্যতেও হবে। নাস্তিকরাও বিপদে পড়লে আল্লাহকে ডাকে। মনে আছে গতবছর যখন তোর খুব জ্বর হয়েছিল, জ্বরের কারণে প্রলাপ করার সময় কিন্তু আল্লাহ আল্লাহ ডেকেছিলি। মানুষ জাগ্রত হয়ে যদি কোন সত্যকে অস্বীকার করে, অচেতন মনে কিন্তু তখন সত্যটাকেই স্বীকার করে। যেমন তুই করেছিলি।
আচ্ছা শুন। অনেকদিন আগের কথা। এক নাস্তিক আর একজন ইসলামী পন্ডিতের মধ্যে বিতর্কের আয়োজন করা হল। সেখানে অনেক মানুষ উপস্থিত। মানুষজন দু’দুলেই বিভক্ত। আবার কেউ এসেছে জানার জন্য। মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ। যথাসময়ে নাস্তিক পন্ডিত উপস্থিত। কিন্তু ইসলামী পন্ডিতের দেখা নেই। উপস্থিত মুসলমানদের মুখ মলিন। নাস্তিকরা আনন্দে ফেঁটে পড়ছে। নাস্তিক পন্ডিত মুচকি হেসে স্টেজে পায়চারী করছেন। আর তিনি তর্ক ন্ াকরেই বিজয়ী। তার ভয়ে ইসলামী পন্ডিত বিতর্কে হাজিরই হয়নি।
হঠাৎ দেখা যায় দূরে টুপি মাথায় আলখাল্লা পরা এক লোক আসছে। আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে। কাছে আসার পর দেখা গেল, তিনিই সেই পন্ডিত ব্যক্তি। নাস্তিক লোকটি প্রশ্ন করল। জনাব, আমরা এতক্ষণ যাবত আপনার জন্য অপেক্ষা করছি। আপনার কোন খবর নেই। আপনি না পারবেন তো সময়ের ওয়াদাটাও অন্তত ঠিক রাখার প্রয়োজন ছিল। উপস্থিত জনতা কান পেতে সব শুনছে। মুসলমানদের মুখ যেন আষাঢ়ে মেঘ।
ইসলামী পন্ডিত বলল, আমার একটি ওজর আছে মহাশয়। আমি ঠিক সময়েই রওয়ানা হয়েছিলাম। আমার আসার পথে একটি নদী রয়েছে। ভেবেছিলাম নদীতে তো নৌকা সব সময় পাওয়া যায়। কিন্তু এসে দেখি কোন নৌকা নেই। এদিক ওদিক ঘুরাঘুরি করেও কোন নৌকার সন্ধান পেলাম না। কী করব ভাবছি। এদিকে সময়ও চলে যাচ্ছে। কঠিন চিন্তায় পড়ে গেলাম। নাস্তিক পন্ডিত বললেন, এই কথা বাদ দিয়ে আসল কথায় আসুন। ইসলামী ব্যক্তিটি বললেন, মহাশয়, আমাকে আমার ওজর পেশ করতে দিন। নাস্তিক পন্ডিত বলল, ঠিক আছে বলুন। ইসলামী ব্যক্তিটি বলতে লাগলেন, এই পেরেশানীতে যখন আমি হয়রান, চিন্তায় মাথা খারাপের অবস্থা। আপনাদের সাথে বিতর্ক, এতো জনতার উপস্থিতি, এখানে উপস্থিত হতে না পারাটা কত যে লজ্জার বিষয়, এখানে উপস্থিত হতে না পারলে জীবনে আর সমাজে মুখ দেখানো যাবে না, এই ভাবনার মধ্যে দেখি কোথা থেকে একটি বীজ এসে পড়ল, বীজ থেকে একটি চারা উঠে দ্রুত বড় হতে লাগল এবং একটি বিশাল গাছে পরিণত হল। কী আশ্চর্য, বলুন তো। আবার কোথা থেকে যেন একটি করাত এসেও হাজির আমি তো হতভম্ব। দেখছি আর ভাবছি। করাত গাছ কেটে ফেলল এবং চিরানো হয়ে গেল। সুন্দর সুন্দর তক্তা বের হল। কোথা থেকে হাতুড়ি, বাটাল, লোহা সব হাজির হয়ে গেল, নৌকা বানানোর কাজও শুরু হয়ে গেল। দেখতে দেখতে নৌকা বানানোও হয়ে গেল। কী যে সুন্দর নৌকা। জীবনে কখনোও এরূপ নৌকা দেখিনি চড়িনি। কী আর বলব, তার সৌন্দর্য বর্ণনা করা অসম্ভব। আমার সামনে এসে নৌকা হাজির। আমাকে আহবান করছে নদী পার হওয়ার জন্য। যেখানে এই মজলিসে উপস্থিত হওয়ার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম, সেখানে এই প্রাপ্তি বুঝেন তো কী খুশি হয়েছি। আপনার এই বিতর্কে হেরে গেলেই কী আসে যায়।
আলেমের এই কথা শুনে নাস্তিক পন্ডিত বলে ওঠে আপনারা শুনলেন তো আলেম সাহেব কী সব বলছে। আলেম সাহেব পাগল হয়ে গেছে। আপনারা উপস্থিত জনতা বলুন তো এরকম কী করে হতে পারে?
তখন আলেম সাহেব ঐ পন্ডিতকে লক্ষ করে বললেন জনাব, থামুন আমার কথা শুনুন, সম্মানিত উপস্থিত জনতা, আপনারা বলুন তো কোন লোক ছাড়া কোন কারিগর ছাড়া যদি একটি গাছ ওঠা, কাঠ হওয়া, নৌকা তৈরি, নদী পারাপার কোন কীছুই হতে না পারে, যে এরূপ বলবে, তাকে পাগল হতে হয়, তাহলে আপনি, আমি এই পৃথিবী, বিশাল আকাশ, নদী নালা খাল বিল, গাছ গাছালী পাখপাখালি, বন বনানী, সাগর, নদী, পশুপাখি এমনিতে তৈরি হয়ে গেছে? কোন কারিগর বা স্রষ্টা লাগে নাই? এমনটি যারা বলবে তাদেরকে আমরা কী বলব? উপস্থিত জনতার মধ্যে সবাই বলে উঠলো, সে মস্ত বড় এক পাগল। নাস্তিক পন্ডিত মাথা নিচু করে বসে রইল। আর অন্য নাস্তিকরা কোন উত্তর না দিয়েই উক্ত সভা থেকে প্রস্থান করল।
সাকীব বলল, দোস্ত তোকে ধন্যবাদ ভাল একটি শিক্ষণীয় গল্প শুনানোর জন্য। অসুস্থতায় মনটা পানশে হয়ে গেছে। তোদের আসাতে আজ অনেকটা ভাল লাগছে। আসলে বন্ধুরা বন্ধুদের প্রাণ। তারা বিপদে সাহায্য করে। দুঃখ পেলে সান্ত¦না দেয়। মন খারাপ হলে আনন্দ দেয়। আগে সুস্থ হয়ে নেই। তারপর তোর কাছ থেকে আরোও অনেক গল্প শুনব। আরিফও মাথা নেড়ে সায় দেয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT