সম্পাদকীয়

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৯-২০১৮ ইং ০০:১৫:৫৬ | সংবাদটি ৬০ বার পঠিত

নিরক্ষরতা দূরীকরণে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে আজ দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। সাক্ষরতা আন্দোলনকে আরও বেগবান করার লক্ষে প্রতি বছর ৮ই সেপ্টেম্বর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এই দিনে আয়োজন করা হয় নানা কর্মসূচি। কিন্তু বাস্তবে সাক্ষরতা আন্দোলন তেমন জোরদার হচ্ছে না। বিভিন্ন কারণে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে এই কার্যক্রম। সবচেয়ে বড় কথা, বর্ধিত জনসংখ্যার তুলনায় সাক্ষর ব্যক্তির সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। সাক্ষরতা বলতে শুধু স্বাক্ষরজ্ঞান থাকলেই বোঝায়, এমন নয়। মূলত ১৫ ও তার বেশি বয়সী জনসংখ্যার যেকোন ভাষায় চিঠি লিখার ক্ষমতাকেই সাক্ষরতা বোঝায়। সে অনুযায়ী দেশে সাক্ষরতার হার কতো, তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। বিভিন্ন সময় বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়েছে পরিসংখ্যান। পরিসংখ্যানে একেক সময় একেক রকম তথ্য বেরিয়ে আসছে। তবে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, দেশে ১৫ বছরের বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি এখনও নিরক্ষর। যদিও এই নিরক্ষর ব্যক্তির সংখ্যা দিন দিন কমছে; কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় নিরক্ষরতা দূরীকরণের হার কম।
সাক্ষরতা বিষয়ক বছরে একাধিক দিবস পালিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু এর মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ নিরক্ষরতা দূরীকরণ-তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় সাক্ষরতার হার পাল্লা দিয়ে বাড়ছে না। দেশে নিরক্ষরতা দূর করতে প্রথমবারের মতো গণশিক্ষার কার্যক্রম শুরু হয় স্বাধীনতার পর থেকে। তখন গণশিক্ষা বা বয়স্ক শিক্ষার ওপর বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়। গঠন করা হয় পৃথক মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে বিভিন্ন পর্যায়ে চলতে থাকে এই গণশিক্ষা কার্যক্রম। তখন দেশের কিছু কিছু অঞ্চলকে নিরক্ষরমুক্ত বলেও ঘোষণা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতার এক পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিলো সকল শিশুর জন্য অন্তত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। আর সেটা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে আর কেউ নিরক্ষর হয়ে বেড়ে উঠবেনা বলেই সরকারের প্রত্যাশা ছিলো। কিন্তু দুই যুগের বেশি সময় পেরিয়ে এলেও সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি; এ প্রকল্পের অগ্রগতিও আশানুরূপ নয়। বয়স্ক নিরক্ষর লোকের সংখ্যা যেমন কমছে না, তেমনি সকল শিশু প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আসেনি।
উল্লেখ করা যেতে পারে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে গণশিক্ষা কার্যক্রমে গতি ফিরিয়ে আনতে পরিকল্পনা নেয়। প্রাথমিক স্তর থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনতে এবং প্রাপ্ত বয়স্ক নিরক্ষরদের সাক্ষর করতে নেয়া হয় এই উদ্যোগ। গণশিক্ষা কার্যক্রমের সমন্বয় সাধনের দায়িত্বে রয়েছে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এই প্রতিষ্ঠান সরকারি গণশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার মূল দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অর্থায়নেরও ব্যবস্থা করছে। বেসরকারী বিভিন্ন গণশিক্ষা কার্যক্রমগুলোও এই সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। গণশিক্ষা ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রসারে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য যথাযথ আইনগত কাঠামোও পরিবর্তন করা হয়। কিন্তু এর সুফল এখন পর্যন্ত আসেনি। যদিও সরকার দাবি করছে বর্তমানে দেশে সাক্ষরতার হার বেড়েছে ১৯ শতাংশ। অর্থাৎ সরকার দাবি করছে দেশে বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭০ শতাংশ। অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে প্রকৃত সাক্ষরতার হার আরও অনেক কম।
সরকার বেশ কিছু উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে গ্রহণ করেছে বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম। যেমন দেশের জনগণকে অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন করে তোলার পাশাপাশি লেখাপড়া ও হিসাব নিকাশে ন্যূনতম দক্ষ, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সচেতন করে তোলা। সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের প্রাপ্ত বয়স্ক সবাইকে সাক্ষর করে তোলা পর্যন্ত শিক্ষার এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। সরকারের সর্বশেষ লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ২০১৫ সালের মধ্যে সাক্ষরতার ক্ষেত্রে শতভাগ সফলতা অর্জন। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। এই কার্যক্রমের গতি না বাড়ালে লক্ষ অর্জন কিছুতেই সম্ভব নয়। সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে এই কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। অনিয়ম-দুর্নীতির কবল থেকে বয়স্ক শিক্ষাসহ সাক্ষরতা আন্দোলনকে মুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমে ঝরে পড়া রোধ করে শতভাগ প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত হলেই সাক্ষরতা আন্দোলন সফল হবে। তাই গণশিক্ষা ও বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সঙ্গে জোর দিতে হবে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার ওপরও।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT