সাহিত্য

কবিতার নিমগ্ন অরণ্যে কবি ফজল শাহাবুদ্দীন

ফকির ইলিয়াস প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৯-২০১৮ ইং ০১:২২:৪৬ | সংবাদটি ১৪৪ বার পঠিত

কবি ফজল শাহাবুদ্দীন ছিলেন কবি শহীদ কাদরীর খুব প্রিয় একজন কবি। শহীদ কাদরী বলতেন, ‘আমাদের সময়ের একজন উজ্জ্বল কবি ফজল’। এ নিয়ে শহীদ কাদরীর সাথে আমার দ্বিমত ছিল না। তারপরও তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, হুমায়ুন আজাদ তো ফজল শাহাবুদ্দীনের কবিতা নেন নি তার সম্পাদিত ‘আধুনিক বাঙলা কবিতা’য়। শহীদ কাদরী উচ্চস্বরে হেসে দিয়েছিলেন।
বলেছিলেন- ‘তাতে কি হয়েছে! হুমায়ুন আজাদের ব্যক্তিগত পছন্দ হয়নি, তাই তিনি নেননি। এতে কি ফজল শাহাবুদ্দীনকে বাংলা কবিতা থেকে খারিজ করে দেয়া যাবে?’
আমরা পড়েছি, হুমায়ুন আজাদ তার সংকলনের মুখবন্ধে লিখেছিলেন- ‘এখানে সক্রিয় অজস্র কবিযশোপ্রার্থীর মধ্যে তাঁদেরই নিয়েছি, যাঁরা কবি; তবে কয়েকজনকে নিই নি, সেটা আমাদের সময়ের শোচনীয় দুর্ভাগ্য-সৈয়দ আলী আহসান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দীন, ও আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতা নিই নি, আমি নিতে পারি না, কেননা তাঁরা সামরিক একনায়কত্ব ও মৌলবাদে দীক্ষা গ্রহণ ক’রে মানুষ ও কবিতা ও আধুনিকতার বিপক্ষে চ’লে গেছেন। এ-সংকলনটিকে আমি ভবিষ্যতের জন্যে রেখে যেতে চাই, এক শতক পর আমার মতো কেউ এটি বিচার করবেন। আধুনিক কবি ও কবিতা শনাক্তিতে আমি কতোটা ব্যর্থ হয়েছি।’
কথাগুলো আমি শহীদ কাদরীকে মনে করিয়ে দিয়েছিলাম। শহীদ কাদরী বলেছিলেন, ‘ধর্মীয় দর্শন নিয়ে অনেকেই কবিতা লিখেছেন। অনেকে রাষ্ট্রীয় তোষামোদি করে হালুয়া-রুটিও বাগিয়েছেন সরকারি কোষাগার থেকে। তারপরও তাদের কবিসত্তাকে বিশ্বসাহিত্য থেকে খারিজ করা যায় নি।তবে কেউ যদি মানবতার বিপক্ষে দাঁড়ান- প্রজন্ম কিন্তু তার নামটি সেই কাতারেই লিখে রাখে।’
আমার মনে পড়ছে, ফজল শাহাবুদ্দীন প্রয়াত হওয়ার পর নিউইয়র্কে শহীদ কাদরী আয়োজিত ‘একটি কবিতা সন্ধ্যা'য় ফজল শাহাবুদ্দীন ও তার কবিতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন কবি শহীদ কাদরী। তিনি বলেছিলেন, সাময়িক স্খলন একজন কবিকে অন্যপথে নিয়ে যেতে পারে। তিনি ভুল করতে পারেন। কিন্তু তাই বলে তাঁর প্রকৃত সাহিত্যকর্মকে মুছে ফেলা যায় না। যাবেও না। ‘একটি কবিতা সন্ধ্যা’র আয়োজনটি ছিল ২২ মার্চ ২০১৪ শনিবার বিকেলে জ্যামাইকার একটি মিলনায়তনে। তিনপর্বে বিভক্ত অনুষ্ঠানটির প্রথমে ছিল- কবি ফজল শাহাবুদ্দীন স্মরণ। দ্বিতীয় পর্বে ছিল অনুষ্ঠানের মুখ্য কবি বুদ্ধদেব বসু’র কবিতা আবৃত্তি। তৃতীয় পর্বে ছিল স্বরচিত কবিতা পাঠ। কবি শহীদ কাদরী সঞ্চালনা করেন কবি ফজল শাহাবুদ্দীনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব। শহীদ কাদরী বলেন, আধুনিক কাব্য আন্দোলনে ফজলের সবিশেষ ভূমিকা রয়েছে। একপর্যায়ে আমার ঘনিষ্ট বন্ধু ফজল শাহাবুদ্দীন মননশীল ভূমিকা থেকে সরে গিয়েছিল। ওঁর, স্বৈরাচারী এরশাদের দোসর হওয়াটা ছিল আমাদের জন্য পীড়াদায়ক। প্রগতিশীল শিবির থেকে তাঁর সরে যাওয়াটা ছিল বাংলা সাহিত্যের ক্ষতি। কিন্তু তা ছিল সাময়িক। কবি শহীদ কাদরী বলেছিলেন, ফজল এখন প্রয়াত। বাংলা কবিতা ও সাহিত্যে ওঁর ভূমিকার যথেষ্ট মূল্যায়ণের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। শহীদ কাদরী স্মৃতিতর্পণ করে বলেন, ‘কবিকন্ঠ’ হচ্ছে সময়ের উল্লেখযোগ্য প্রথম সাহিত্য ত্রৈমাসিক। এটা সম্পাদনা করেন শামসুর রাহমান ও ফজল শাহাবুদ্দীন। আমার মনে আছে, ফজলের হাতের সোনার আংটি বিক্রী করে ‘কবিকন্ঠ’ প্রথম সংখ্যার কাগজ কেনা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ফজলের অনেক কবিতাই সংরক্ষণযোগ্য। ডঃ হুমায়ুন আজাদ সম্পাদিত ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’ গ্রন্থটিতে ফজল শাহাবুদ্দীনের কবিতা স্থান পায়নি। ভূমিকায় হুমায়ুন আজাদ এর কৈফিয়ত দিয়েছেন। শহীদ কাদরী বলেন, একজন বড় কবি এজরা পাউন্ড মুসোলিনীর পক্ষে ছিলেন। এর জন্য তাঁকে দ- ভোগ করতে হয়েছে। কিন্তু তার সাহিত্যকর্ম খারিজ করে দেয়া সম্ভব হয়নি। এটাই সাহিত্যের ভুবনে প্রতিষ্ঠিত সত্য।
কবি বলেছিলেন, বিভিন্ন কারণে একজন কবি রাষ্ট্র-সমাজ-স্বকাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতেই পারেন। কিন্তু তাঁর কালোত্তীর্ণ সাহিত্যযজ্ঞকে মুছে ফেলা যাবে না। প্রথম পর্বে ফজল শাহাবুদ্দীনের ‘ইদানীং বাংলাদেশ’ ও ‘সন্ধ্যা যদি’ কবিতা দুটি আবৃত্তি করেছিলেন প্রবাসের তরুণ আবৃত্তিকার হাসান শাহরিয়ার তৈমুর। শহীদ কাদরীর এই মূল্যায়ন ধরেই আমরা কবি ফজল শাহাবুদ্দীনের কবিতার অরণ্যে নিমগ্ন হয়ে হাঁটতে পারি। তিনি লিখেছেন- ‘তোমারি ক্লান্তির মধ্যে আবর্তিত চেনো কি আমাকে/ সমুদ্রের ব্যাপ্তি আমি অরণ্যের চির আন্দোলন/ আমার অস্থির গানে উচ্ছ্বসিত তোমার কঙ্কন-/ ধ্বনিত তোমার রক্ত বারংবার আমারি বৈশাখে।/ গোপন আর্তির মতো তুমি এক নিঃসঙ্গ কিঙ্কিনী/ তোমার সৌরভে নিত্য মগ্ন আমি অন্ধ ও মাতাল/ ধর্ম কর্ম স্বর্গ মর্ত মৃত্যুঞ্জয়ী তুমি মহাকাল/ তবুও আশ্চর্য শোনো সেইদিন তোমারে চিনিনি।/ সমাজ সংসার জানি মিছে সব শুধু তুমি একা/ আনন্দে নৈরাশ্যে এসে ইন্দ্রিয়ের খোলো শত দ্বার/ অযুত শিখায় জ্বালো অন্তহীন প্রদীপ আমারÑ/ আমার অস্তিত্বে তুমি বাসনার দীপ্ত প্রহেলিকা।/ আমার চৈতন্যে এসো আলিঙ্গনে ছিন্ন ভিন্ন পথে/ সয়ম্ভূ ইচ্ছার ক্লান্তি দীপ্ত হোক হৃদয় সৈকতে।’
[নিমগ্ন একজন]
‘আমি কবি ফজল শাহাবুদ্দীনের কবিতার মাঝেই খুঁজেছি বাংলাদেশকে। দেখেছি কী এক আরক্ত আলো তাকে ঘিরে রেখেছে। তিনি কন্ঠ হয়েছেন কোটি মানুষের। তিনি বাহু হয়েছেন অগণিত বৃক্ষের। পাখির ডানায় ভর করে উড়েছেন আকাশে, একটি মুক্ত শালিখের মতো। তার কবিতায় আমরা পেয়েছি এাকত্তরের বাংলাদেশের ছবি। দেখেছি মহান মুক্তিযুদ্ধকে ঘনিষ্টভাবে।
বাংলাদেশ আগুন লাগা শহর আর লক্ষ গ্রাম/ বাংলাদেশ শহীদ হলো রক্তে লাল লও সালাম/ বাংলাদেশ বুলেট নিয়ে হুমড়ি খায় দীপ্ত হয়/ বাংলাদেশ কার্ফুঘেরা লক্ষ কোটি কণ্ঠময়/ বাংলাদেশ রক্তে ভেজা মৌন এক অন্ধকার/ বাংলাদেশ শপথ নেয় তীক্ষ্ম এক স্বাধীনতার/ বাংলাদেশ বিশাল এক অগ্নিব্যুহ প্রজ্বলিত/ বাংলাদেশ মিছিল কাঁপা শ্লোগান দেয় আন্দোলিত/ বাংলাদেশ আগুন লাগা শহর আর লক্ষ গ্রাম/ বাংলাদেশ দুর্গময় ক্রুদ্ধ এক ভিয়েৎনাম।’
[বাংলাদেশ, একাত্তরে]
কবি ফজল শাহাবুদ্দীনের কবিতার বই ‘হে নীল সমুদ্র হে বৃক্ষ সবুজ’-এর কবিতা প্রসঙ্গে কবিকে নিয়ে কবি আল মাহমুদ বলেছিলেন, ‘আমি ফজল শাহাবুদ্দীনকে এক নির্বিরোধ গভীর প্রেমের কবি হিসেবেই জেনে এসেছি। এমনকি প্রকৃতির কবি হিসেবেও। এখন দেখছি তার কবিতায় আছে অন্য এক গূঢ় রহস্য, যা আমাদের কবিতার জন্য একান্ত দরকার।’
আল মাহমুদ যথার্থই বলেছিলেন।ফজল শাহাবুদ্দীন মাটির কাছাকাছি দাঁড়িয়ে যে আলোকিত সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা হয়তো তিনি দেখে যেতে পারেন নি। কিন্তু তার চোখের এই সবুজ স্বপ্ন অন্য কোনো নবীন কবির চোখে জেগে থাকবে। আর এটাই একজন প্রকৃত কবির মূল চাওয়া-পাওয়া।
ফজল শাহাবুদ্দীন নিজে সাংবাদিক ছিলেন। তাই রাষ্ট্রের ভেতর-বাহিরের অনেক কিছুই তিনি জানতেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘জীবন আর উপভোগ করা হলো কই!’ বলেছেন, মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ এসেছিল জীবনে। তা হতে পারলে হয়তো জীবনকে ভোগ করা যতো! আমি মনে করি একজন কবিই প্রকৃত জীবনের রস আস্বাদন করতে পারেন। আর্তুর রেবো, কিংবা শার্ল বোদলেয়ার কতদিনের জীবন পেয়েছিলেন? তারা তো অমর হয়েই আছেন। ফজল শাহাবুদ্দীন তার কবিতার জন্যেই বেঁচে থাকবেন বহুকাল। বিশেষ করে তার সনেটগুলো মানুষের প্রশ্বাসে ধ্বনি তুলবে অনন্তকাল।
আলোতে জন্মেছি আমি অন্ধকারে মৃত্যু নেমে আসে/ অনন্ত আঁধারে জন্ম অনিবার্য জ্যোতিতে নির্বাণ/ সকল অস্তিত্ব জুড়ে শরীরাভ আশ্চর্য নির্মাণ/ কবিতা সঙ্গীত আর চিত্রকলা আমার নিঃশ্বাসে/ আলোতে আঁধার আছে অন্ধকার আলোহীন নয়/ সমূহ ধ্বংসের থেকে জ্বলে ওঠে সৃষ্টির শরীর/ আলোতে আঁধারে মেশে মহাকাল তৃষ্ণার্ত সময়/ রাত্রির কালোতে আছে চিরদিন নক্ষত্রের ভীড়/ আলোর নিভৃতে জ্বলে অন্ধকার ইহ পরকাল/ একান্ত আঁধারে দেখি জ্যোতির্ময় সৃষ্টি ও বিলয়/ রৌদ্রের বিশাল অঙ্গে বাতাসেরা দেখি ছায়াময়/ কখনো প্রকৃতি জুড়ে চন্দ্রস্নাত তরুণ সকাল/ কবিতা সঙ্গীত আর চিত্রকলা আমার নিঃশ্বাসে/ অলোতে আঁধারে আমি রক্তাপ্লুত মৃত্যু নেমে আসে।
[অন্ধকার, আলোর নিভৃতে]
শহীদ কাদরী বলেছেন, ফজল শাহাবুদ্দীনের কবিতা বহুল পঠিত হওয়া দরকার। আমিও সেই কথাটি মনে করি। তার কবিতা পড়তে হবে। আজকের অনেক তরুণ কবিই এই অগ্রজ কবির নামটি পর্যন্ত জানেন না। এটা খুবই দুঃখজনক। আমরা যদি বাংলা কবিতার ধ্যানী বিবর্তনের দিকে তাকাই, তাহলে ফজল শাহাবুদ্দীনের নাম বার বার উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। তার বিশিষ্টতা সেখানেই।

 

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT