সাহিত্য

আহমদ ছফার উপন্যাসে নিম্নবর্গ

মোহাম্মদ আব্দুর রউফ প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৯-২০১৮ ইং ০১:৩০:১৭ | সংবাদটি ৩১ বার পঠিত

আহমদ ছফা সচেতন সমাজশিল্পী। তাঁর শিল্পসৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে এ দেশ, দেশের মানুষ, আর তার বিশাল জীবনাভিজ্ঞতার বাস্তববোধ- বুদ্ধির শৈল্পিক মাত্রাজ্ঞান। তার নিজস্ব একটি সমাজ আছে; একটি নির্দিষ্ট পরিমন্ডলে তিনি জীবনযাপন করেছেন। সেই যাপিতজীবনের ব্যাপ্তি ও তার গভীরতা তিনি নির্মমভাবে উপলব্ধি করেছেন। সমাজের প্রত্যেক মানুষই সমান নয়। অর্থের দিক থেকে, শিক্ষার দিক থেকে, সামাজিকতার দিক থেকে, বংশগৌরবের দিক থেকে, চিন্তনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও মানবিক বোধবুদ্ধির গভীরতার দিক থেকে- এভাবে নানাদিক থেকে মানুষে-মানুষে স্বাতন্ত্র্যসূচক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকে মানুষকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। মোটাদাগে উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত এই বিভাজনে সব মানুষকে চিহ্নিত করা হয়। আহমদ ছফার উপন্যাস নামক বয়ানশিল্পে আমরা সব প্রকৃতি ও স্বভাবের মানুষের সমাহার দেখতে পাই। তন্মধ্যে নিম্নবিত্তের প্রতি তার হৃদয়াকর্ষণ কিছুটা বেশি।
আহমদ ছফা তার বয়ানশিল্পে সামাজিক পরিবেশ থেকে যখন চরিত্র নির্বাচন করেন, তখন তিনি নিজের কাছে স্বচ্ছতার দাবি রাখেন। কোন রোমান্টিক কবিকল্পনাকে তিনি প্রশ্রয় দিচ্ছেন না। বরং সামাজিক ও জীবনবাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে চরিত্রগুলোর গভীরে প্রবেশ করতে সচেষ্ট থাকেন।
দুই.
সূর্য তুমি সাথী (১৯৬৭) তার প্রথম উপন্যাস। হাসিম-জোহরা-সুফিয়া এ উপন্যাসের কেন্দ্রমূলে সক্রিয় রয়েছে। আমরা হাসিমকে নিম্নবর্গীয় মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করি। এ উপন্যাসে হাসিমের জীবনের দুঃখকষ্টগুলোকে আশ্রয় করেই এ উপন্যাসের কল্পকাহিনি শৈল্পিকসংহতি অর্জনে একটি সফল পরিণতির পথে ধাবিত হয়েছে। হাসিমের দুঃখ উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত। তার মুসলমান পিতাই এ দুঃখের কারণ। হরিমোহন সনাতন ধর্মত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলো। সঙ্গে সঙ্গে হরিমোহন ও তার উত্তরপ্রজন্ম হাসিম সমাজে অপাঙ্ক্তেয় হয়ে রইলো। সেই থেকে হাসিমের জীবনের দুঃখের পর্ব শুরু।
হাসিম কপর্দকশূন্য মানুষ। সুফিয়াকে নিয়ে সংসার গড়েছে। স্বামী-স্ত্রী- এই দুজনের সংসারখরচও হাসিম নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। একজন সক্ষম লেবার হিসেবেও হাসিম মাঠেময়দানে-কৃষিখামারে শ্রম দিতে পারছে না। তার মতো আরো দশজন মানুষ হয়তোবা মাঠেঘাটে শ্রম বেঁচে দুমুঠো মোটা ভাতের আয়োজন করতে পারছে। কিন্তু হাসিম পারছে না। গেরস্তঘরে কাজে গেলেই সবাই তাকে ‘বান্যিয়ার পুত’ বলে সম্বোধন করে। কেউ তাকে পিতৃপ্রদত্ত নামে ডাকে না। এই অসম্মান ও খোঁচাটা তীরের মতো হাসিমের হৃদয়কে রক্তাক্ত করে। হাসিমের ভেতরটা জবাই করা মোরগের মতো ছটফট করে। হাসিম এ থেকে মুক্তি পেতে চায়। কিন্তু সমাজ তাকে মুক্তি দেয় না।
তাই হাসিম কৃষিকাজ পরিত্যাগ করে পাহাড়ে চলে যায়। সেখানের পথ অনেক বন্ধুর; বহু দুঃখকষ্ট সয়ে, অনেক কাটার যন্ত্রণা সয়ে তাকে লাকড়ি সংগ্রহ করতে হয়। তবু হাসিম পাহাড়ে যায়। তবু লাকড়ি সংগ্রহ করে। সেই লাকড়ি বেচাবিক্রি করে হাসিম চালডাল কিনে আনে। রান্নাবান্না হয়। এভাবেই হাসিম-সুফিয়ার দিন কাটে। কিন্তু প্রতিদিন কাটে না। কোনদিন কাটে; কোনদিন কাটে না। কোন দিন খায়; কোনদিন না-খেয়ে থাকে। কারণ ফোরম্যানের মতো বিত্তবান মানুষেরা যারা লাকড়ি কেনে তারা সময়মতো পাওনা টাকা পরিশোধ করে না। তাই সেদিন হাসিমের ঘরে চুলা জ্বলে না; রাতে সন্ধ্যাপ্রদীপও জ্বলে না। হাসিমের স্ত্রী সুফিয়ার উদর একদিকে ক্ষুধার জ্বালায় জ্বলে যায়; অন্যদিকে অন্ধকার তাড়াবার মতো কেরোসিনতেলও থাকে না। তাই সুফিয়ার সব ক্রোধ গিয়ে পড়ে হাসিমের ওপর। ফোরম্যানের বউ টাকা দিয়েছে কিনা- হাসিমের এ প্রশ্নের উত্তরে সুফিয়ার তীক্ষè জবাব-
‘টেঁয়ার নামে কাঁইচ কোলা দিব। নিষ্কর্মা মরদ, ভাত দিত ন পাইরলে বিয়া গইরত কনে লইয়ে?’ (৪র্থ খন্ড : ১৬) এই বক্রোক্তি প্রবলভাবে হাসিমের পৌরুষত্বে আঘাত করে। হাসিম আর সহ্য করতে পারে না। দৌড়ে গিয়ে সুফিয়ার মুখে চড় মারে। সুফিয়ার চোখ বেয়ে ঝরঝর ধারায় দুঃখের পানি ঝরে। সুফিয়া আসমানের আল্লাহর কাছে নালিশ করে। ‘আল্লা, তুই আঁরে নে, এই দুন্যাই বিষ অই গেইয়ে।’ (৪র্থ খন্ড : ১৬) এভাবে হাসিম-সুফিয়ার মধ্যে অভাব-অনটনের জন্য ঝগড়া লেগে থাকে।
হাসিম-সুফিয়ার সংসার সম্পর্কে ছফা বলছেন-
‘হাসিম ঘরের বাইরে চলে আসে। সুফিয়া ঘরের দাওয়ায় পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসে। অন্তরপোড়া দুঃখে অভিষিক্ত সে কান্নার সুর। আকাশ জুড়ে ধীর-মন্থর গতিতে সন্ধ্যা নামছে। আসমানে তারা ফুটছে। হাসিমের ঘর অন্ধকার।’ (৪র্থ খন্ড : ১৬)
হাসিমের কণ্ঠ ভালো, ভালো গান গাইতে পারে। জাহেদ সাহেবের বাড়িতে পালাগানের আসর। সেখানে গান গাওয়ার জন্য গনি ও সুলতান হাসিমের হাতে দুটি টাকার নোট গুঁজে দেয়। আরো দুই টাকা গান গাওয়ার পরে পরিশোধ করা হবে বলে গণিরা প্রতিশ্রুতি দেয়। হাসিম প্রস্তাব মেনে নেয়। সারিন্দাখানা কাঁধে করে জাহেদ সাহেবের উঠানো উপস্থিত। বিপুল স্রোতা; সিদ্দিক বয়াতি পুরুষের ভূমিকায়; আর হাসিম নারীর ভূমিকায়। সিদ্দিক বয়াতি গানের মাধ্যমে হাসিমের প্রতি নানা ধরনের অশ্লীল গালিগালাজ, ঘৃণা, অবজ্ঞামিশ্রিত বিদ্রুপের বাণ ছুড়ছে। দর্শক-স্রোতারা হাত তালি দিচ্ছে। কোন একজন বলে উঠলো- ‘বাঃ বাঃ সিদ্দিক, বান্যিয়ার জাতরে ধুই ফেলা, বাপের বেডা।’ (৪র্থ খন্ড : ১৯) হাসিমের অবমাননাকে এভাবেই মানুষ উপভোগ করছে।
যখন হাসিমের পালা আসল, হাসিম সবাইকে সশ্রদ্ধ সালাম নিবেদন করে মহান প্রভুর উদ্দেশ্যে তার আর্জি নিবেদন করছে এভাবে-
‘দয়া কর প্রভু তুমি দয়ার মহিমা
দীনহীন সন্তানের ডাকে পুরাও বাসনা গো।’ (৪র্থ খন্ড : ২০)
কিন্তু স্রষ্টা হাসিমের বাসনা পূরণ করেনি; দয়া করেনি। গণি-সুলতানরাও অবশিষ্ট দুটি টাকা পরিশোধ করেনি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কুবেরকে যেভাবে শেতলবাবুরা ফাঁকি দিয়েছে; এখানের হাসিমকে গণিরা ফাঁকি দিচ্ছে। নিম্নবর্গীয় প্রান্তজনেরা এভাবেই প্রতারিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
একদিন পাহাড়ে না গেলে হাসিমের ঘরে চুলা জ্বলে না। সমতল ভূমিতে শ্রম দিলে দিনে তিন টাকা উপার্জন হয়। আর পাহাড়ে গেলে দিনে দুই টাকা উপার্জন। তবু হাসিম পাহাড়ে যায়। পাহাড় তাকে শারীরিক কষ্ট দেয় কিন্তু মানসিক কষ্ট দেয় না। এ জন্যই হাসিম পাহাড়ে যেতে পছন্দ করে। একদিন সত্যি সত্যিই পাহাড় হাসিমকে বিষম কষ্ট দেয়। বৃষ্টি হয়েছে; রাস্তাঘাট পিচ্ছিল। অন্ধকার ধেয়ে আসছে। হাসিম তাড়াতাড়ি পথ চলতে থাকে। এ সময়-
‘চড়াই বেয়ে নামতে গিয়ে হাত দেড়েক লম্বা কাটা বাঁশের চোখা একটা ফালি তার পায়ের তলা দিয়ে সেঁধিয়ে পাতার ওপর দিয়ে বেরিয়ে আসে। উঃ করে বসে পড়ে! কাঁধ থেকে কাঁচা বাঁশের ভারটা সটকে পড়ে। চিরকি দিয়ে ছোটে রক্ত। ফিনকি দিয়ে প্রবাহিত হয়। টকটকে লাল তাজা রক্ত। জীবনের জীবনী রস। হাসিমের মাথা ঘুরতে থাকে। এ দৃশ্য দেখতে পারে না চোখ দিয়ে। কোমরের গামছা খুলল। দুহাতে শরীরের সমগ্র শক্তি জড়ো করে হেঁচকা টানে বিঁধে যাওয়া ফালিটি বের করে নিয়ে আসে। তারপর কিছু লতাপাতার রস চিপে গামছাতে ক্ষতস্থান বেঁধে পাথুরে পথ রক্তে রাঙিয়ে চলে এসেছিল।’ (৪র্থ খন্ড : ২৫)
এরপর হাসিমের গায়ে ভীষণ জ্বর আসে। গায়ের উত্তাপ এতো বেড়ে যায় যে ধান দিলে খই ফুটবে। হাসিম বিছানায় পড়ে যায়। তার চিকিৎসা দরকার। ডাক্তার দরকার, পথ্য দরকার; এই মুহূর্তে আরোগ্য লাভের জন্য হাসিমের কত কিছুই তো দরকার; ভীষণভাবে দরকার। কিন্তু হাসিম কীভাবে এগুলো পাবে? যার প্রতিদিনের খাবার প্রতিদিন সংগ্রহ করতে হয়; যাকে প্রতিদিন পাহাড়ে যেতে হয়; যাকে প্রতিদিন লাকড়ি বেচতে হয়; যাকে প্রতিদিন লাকড়ি বিক্রিত মূল্য দিয়ে চালডাল কিনতে হয়; কেরোসিন তেলের অভাবে যার ঘরে সন্ধ্যাবাতি জ্বলে না, যার বউ না খেয়ে অন্ধকার ঘরে উদাস হয়ে বসে থাকে- সেই হাসিম কীভাবে নিজের চিকিৎসা করাবে। হাসিমের স্ত্রী নানা রকম প্রাকৃতিক ভেষজ-চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করে। ঔপন্যাসিক বলছেন-
‘সুফিয়া অম্লান বদনে সেবা করে। পায়ের পট্টি বদলায়। গাছ-গাছড়ার পাতা, মূল, শেকড় পিষে ক্ষতস্থানে প্রলেপ লাগায়। সারাদিন বসে থাকে শয্যার পাশে। পায়ের ফুলাতে বাটা টোটকা ওষুধের প্রলেপ দেয়। মানকচু পাতা গরম করে সেঁক দেয়।’ (৪র্থ খন্ড : ২৫) এভাবে হাসিমের চিকিৎসা চলতে থাকে। প্রান্তজনেরা এভাবেই চিকিৎসা করে সেরে ওঠে।
চিকিৎসা ছাড়াও নিরাময় লাভের জন্য অনুকূল পরিবেশেরও তো প্রয়োজনীয়তা আছে। সেটি হাসিমের আছে? হাসিমের বাসস্থানের পরিবেশ প্রসঙ্গে উপন্যাসকার বলছেন-
‘বৃষ্টি থামার নামগন্ধ নেই। ঘরের শনের পচা চালের ফুটো দিয়ে জল ঝরছে। সমস্ত আঙ্গিনাটা থিকথিকে কর্দমাক্ত হয়ে গেছে। ফাঁকা জায়গা কোথাও নেই। দুচোখ বুঁজে বুক ভরা বেদনা আর শরীর ভরা ব্যথার গভীর আস্বাদ গ্রহণ করে হাসিম। কলজে ধরে টান দেয় বেদনার শৃঙ্খল। এ সেই বেদনা শরীর থেকে আলাদা করে পাথরে ছেড়ে দিলে পাথর ক্ষয় করে ফেলবে। তেমনি গভীর, চোখা সর্বব্যাপ্ত বেদনা।’ (৪র্থ খন্ড : ২৫)
এই রকম প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে সংগ্রাম করেই হাসিম-সুফিয়ারা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়।
সূর্য তুমি সাথী উপন্যাসে জোহরা একজন প্রান্তীয় সমাজের নারী। পিতা মারা গেছে। এখন পিতৃব্য খলু মাতব্বরই তার অভিভাবক। খলু মাতব্বর তিনবার জোহরাকে বিয়ে দিয়েছে। প্রতিবারই জোহরাকে স্বামীর বাড়ি থেকে ছিনিয়ে এনেছে আর খোরপোষের নামে টাকাপয়সা আত্মসাৎ করেছে। তৃতীয়বার জোহরার বিয়ে হয় সাতবাড়িয়া গ্রামের কবীরের সাথে। কবীর এক সপ্তাহে জ্বরে ভুগে মারা যায়। খলু মাতব্বর মামলাবাজ মানুষ। জমি আত্মসাৎ করার জন্য মামলা করে। বাড়িতে দারোগা-পুলিশ আসে। তারা আসামি ধরার অভিযানে নামবে। খলু মাতব্বর খাসি-মুরগি জবাই করে খাওয়াবে এতে কোন আপত্তি নেই। কিন্তু দারোগাবাবু রাতে সঙ্গী দাবি করে বসে। খলু মাতব্বর এ কাজের জন্য আপন ভাতিজি জোহরাকেই নির্বাচন করে। কারণ জোহরাই প্রান্তীয় নারী। তাই এ ব্যবস্থা।
লেখক বলছেন-
‘জোহরাকে জোরে ধাক্কিয়ে ধাক্কিয়ে দরজার কাছ অবধি নিয়ে যাচ্ছে। কাঁদছে জোহরা। কাঁদবার পালা এখন তার। খলু তাকে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে বাইরে থেকে শেকল তুলে দিল। এমনও হয়? এমনও হয়? চিন্তা করতে পারে না হাসিম। আপন চাচা নিজের ভাইয়ের মেয়েকে জোরে-জব্বরে দারোগার কাছে ঠেলে দিতে পারে?’ (৪র্থ খন্ড : ৪৬)
খলু মাতব্বর জোহরাকে ঠেলে দিচ্ছে এই কারণে যে, জোহরা প্রান্তীয় নারী। তার কেউ নেই এ সমাজে। এ নারীকে ব্যবহার করেই খলু মাতব্বরের মতো মানুষেরা নিজেদের সম্পদ গড়ে তুলছে। চলমান মামলায় জেতার জন্য খলু মাতব্বর দারোগাকে হাত করতে চায়। জোহরার মতো নারীরা এতটা অসহায় যে, নিজেদের সতিত্বটুকুও রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সা¤্রাজ্যবাদীরা ধনসম্পদের মতো সতিত্বকেও হরণ করছে। জোহরারা চোখের জলে-বুকের জলে ভেসে যাচ্ছে। এই হলো সমাজ।
হাজেরা এ উপন্যাসের আরো একজন প্রান্তীয় নারী। এ নারীর একমাত্র সম্বল সবেধন নীলমণি আবুল। এই ছেলে ওলাওঠায় মার যায়। হাজেরার এতই দারিদ্র্য যে মৃত সন্তানের দাফনের জন্য সাদা কাপড়টুকুও সংগ্রহ করতে পারেনি। এলাকার কোন বিত্তবান মানুষ সহায়তার জন্যও এগিয়ে আসেনি। সবশেষে কৃষক সমিতির কয়েকজন কর্মীসহ মুনির আহমদ এগিয়ে আসে। আবুলের দাফন সম্পন্ন হয়। কিন্তু নতুন কোন কাপড়ের ব্যবস্থা হয়নি। হাজেরার ছেলেকে পুরাতন ছেঁড়া কাপড়েই দাফন করা হয়। ডুকরে কেঁদে ওঠে জননী। এই নিম্নবর্গীয় নারীর দুঃখ সম্পর্কে ছফা আমাদের জানাচ্ছেন-
‘তারা কাজে লেগে গেল। কবর খুঁড়ে ফেলল দু’জনে। আরেকজন আবুলকে গোসল দিয়ে দিল। সে নিদারুণ অভাবের দিনে কোথায় পাবে কাফনের সাদা কাপড়। স্বামীহারা হাজেরার একমাত্র সন্তান আবুল ছেঁড়া কাপড়েই কবরে নামল। জননী ডুকরে কেঁদে উঠল। আকাশ-বাতাস ছাপিয়ে প্রতিধ্বনি জাগল।’ (৪র্থ খন্ড : ৫৫)
আবুল বেঁচে থাকতে নতুন কাপড় পড়তে পারেনি। মৃত্যুর পরেও তাকে ছেঁড়া পুরাতন কাপড়েই এই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিতে হলো। এই হলো নিম্নবর্গী প্রান্তীয় জনগোষ্ঠীর ভাগ্যলিপি।
তিন.
একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন উপন্যাসে দেখা যাচ্ছে আমরা নিম্নবর্গীয় চরিত্রের সন্ধান পাচ্ছি। ছমিরণ নামে একটি নারী চরিত্রকে দেখা যাচ্ছে- যার স্বামী একসময়ে চটকলে কাজ করতো। দু’বছর হলো ছমিরণের স্বামী মারা গিয়েছে। আনজুম নামে তার একটি যুবতী কন্যাসন্তান আছে। এই কন্যাটিকে নিয়েই ছমিরণ পাশের একটি বস্তিতে থাকে। মা-মেয়ে দু’জনেই পরের বাড়িতে কাজ করে কোন রকমে ঘরসংসার সামলায়। কিন্তু তারা নিজেদেরকে সামলাতে পারছে না। পাড়ার দুষ্টলোকেদের নজর পড়েছে আনজুমনের ওপর। তাই ছমিরণ মেয়েকে নিয়ে যারপরনাই শঙ্কিত। কোন একরাতে আট-দশজন গুন্ডা মেয়েটিকে লুট করে নেওয়ার জন্য বস্তিতে হানা দেয়। মা-মেয়ে পালিয়ে কোন রকমে নিজেদেরকে রক্ষা করেছে। ছমিরণ তাই আশ্রয় প্রার্থনা করছে আলী কেনানের মাজারে এসে। ছমিরণের ভাষায়-
‘গতরাতে আট দশজন মানুষ তার মেয়েকে লুট করে নিয়ে যাওয়ার জন্য হানা দিয়েছিল। তারা তাকে জানে মেরে ফেলবে বলে ভয়ও দেখিয়েছে। বহু কষ্টে ঘরের পেছনের বেড়া ভেঙ্গে চুপিচুপি আর একটা ঘরে গিয়ে রাত কাটিয়েছে। এখন বস্তির কেউ আর তাদের আশ্রয় দিতে রাজি নয়। বেহুদা পরের জন্য নিজের বিপদ ডেকে আনতে কে রাজি হবে! বাবা দয়া করে আশ্রয় না দিলে এই সংসারে তাদের আর যাওয়ার মতো কোন জায়গা নেই।’ (১ম খন্ড : ৪৩-৪৪)
এভাবে দেখা যাচ্ছে যে, ছমিরণের মতো অসহায় মানুষগুলো বস্তিতেও নিরাপদে থাকতে পারছে না। কারণ ঐ একটাই, আর্থিক অস্বচ্ছলতা। জোহরার মতো এই দুই নারীও অসহায়। সমাজের বখাটে শ্রেণির উৎপাতে মা-মেয়ে মাজারে এসে আশ্রয় প্রার্থনা করছে। সেখানে যে তাদের রক্ষা হয়েছে, তাও নয়। বাবা আলী কেনান ছমিরণকে আশ্রয় দিয়েছে নিজের স্বার্থে; কোন মানবিক বিচার-বিবেচনায় নয়। ছমিরণ আলী কেনানের রান্নাবান্না থেকে শুরু করে গৃহের যাবতীয় কাজ নিপুণ হাতে সম্পন্ন করছে। আলী বাবা খোরাসানি (রহঃ)-এর মাজার দখল করতে গেলে ব্যাপক প্রহৃত হয়। তখন ছমিরণ নারীর মমতা দিয়ে তার সেবা শুশ্রুষা করছে। ছফা বলছেন-
‘সেই রাতে মেয়েমানুষটি পরম যতেœ তার সেবা শুশ্রুষা করে। গরম পানিতে গামছা ভিজিয়ে সারা শরীরের রক্তের দাগ পরিষ্কার করে। শরীরের জখমি জায়গাগুলোতে ডাক্তারের দেয়া মলম লাগিয়ে দেয়। আলী কেনান ডান হাতটা নাড়াতে পারছিল না। মেয়েমানুষটি নিজের হাতে গ্রাস পাকিয়ে ভাত খাইয়ে দেয়।’ (১ম খন্ড : ৪৭)
তাছাড়া আলী কেনান ছমিরণকে যৌনসঙ্গী হিসেবেও ব্যবহার করছে। কন্যা আনজুমনের প্রতিও তার প্রবল লালসা ছিল। মুরিদের সঙ্গে আনজুমনের ভাব হতে দেখে আলী কেনান ক্ষেপে যায়। ছমিরণের কাছে অভিযোগ করে। তাছাড়া কোন কারণ ছাড়াই অন্যায়ভাবে বিনা অপরাধে আলী কেনান ছমিরণকে প্রহার করে। আলী কেনানের ভাষ্য ও কার্য নিম্নরূপ :
‘মাগি তর মাইয়া অত খারাপ নয়! কাপড় খুইল্যা দেখ। গাঙ বানাইয়া দিছে। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সে ছমিরণকে একটা চড় দিয়ে বসে। চড় খেয়ে মেয়েমানুষটি ঘুরে পড়ে যায়।’ (১ম খন্ড : ৫৯)
ছমিরণ সমাজের প্রান্তীয় নারী। তার আর্থিক ও সামাজিক কোন অবস্থান নেই। আলী কেনানের আশ্রয়ে থাকে। ছমিরণের মতো অসহায় মেয়েরা সর্বস্ব দিয়েও আলী কেনানের মন জয় করতে পারে না। ছমিরণের মতো দুর্বলেরা সবলের হাত থেকে নিজেদের সতীত্ব রক্ষা করতে পারছে না; কন্যাকেও বাঁচাতে পারছে না। দারিদ্র্যের করাল গ্রাসে তাদের জীবনযৌবন সবই পঙ্কে নিমজ্জিত হচ্ছে।
পুষ্পবৃক্ষ ও বিহঙ্গ পুরাণ উপন্যাসে বস্তিবাসীর যাপিতজীবনধারার উল্লেখ রয়েছে। ঢাকা শহরের বহুতল ভবনের বহু বাসিন্দা পাশ্চাত্য স্টাইলে বিলাসি জীবনযাপন করে। অনেকের সন্তান দেশ ছেড়ে বিদেশে পড়াশোনা করে। বিদেশের মা

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT