সাহিত্য

আফজাল চৌধুরীর কবিতার দার্শনিক স্বরূপ

শিকদার মুহাম্মদ কিব্রিয়াহ প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৯-২০১৮ ইং ০১:৩১:৪৯ | সংবাদটি ২২ বার পঠিত

কবিতা হচ্ছে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে কবির আত্মগত উপলব্ধির অন্তরঙ্গ ভাষায়ন। কবিতা এর অস্তিত্বের অবকাঠামো নির্মাণে প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করে প্রকৃতির জগৎ থেকে। প্রাথমিক পর্বে এটি প্রত্যক্ষলব্ধ ইন্দ্রিয় সংবেদন। এ-সংবেদন বৌদ্ধিক প্রকল্পে ভাবগত সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হয়ে অভিনব ও অনরঙ্গ এক আধ্যাত্মিক অনুভব সৃষ্টি করে। এটিই নান্দনিকতা। শিল্পের স্বরূপ বা প্রাণস্পন্দন। বিশুদ্ধ অর্থে এটি চরমসত্য বা পরমসত্তা থেকে উৎসারিত। এজন্য কবিতা ইন্দ্রিয়জ হয়েও ইন্দ্রিয়াতীত অভিজ্ঞতার পরম অনুভবে আত্মস্থ হয়। কালিক হয়েও উত্তীর্ণ হয় কালের সীমা। বিষয় থেকে হয় বিষয়াতীত। ধারণ করে মহাকাল- ভাবের বোধগম্য জগৎ। তাই প্রকৃত কবিসত্তা ঐন্দ্রিয়িক হয়েও ইন্দ্রিয়াতীত। ইন্দ্রিয়জাগতিক সত্য যেমন অস্বীকৃত হয় না, তেমনি প্রকৃত কাব্যসত্যে অনিবার্যভাবেই স্বীকৃত হয় অতীন্দ্রিয় চেতনার সত্য। ষাটের অন্যতম প্রধান কবি আফজাল চৌধুরীর কবিতা কবিতার এই মহাজাগতিক দর্শনকে আত্মস্থ করেই ভাষারূপ লাভ করে। নির্মাণ করে বস্তুগতভাবের বোধগম্য জগৎ।
আফজাল চৌধুরীর কবিতার দার্শনিক স্বরূপ উপলব্ধিতে তাঁর ‘সামগীত দুঃসময়ের’ কাব্যগ্রন্থটি সন্দেহাতীতভাবেই এক মাইলফলক। জাগতিক বা আপতিক ঘটনা বা বিষয়-আশয়ে তাঁর মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং এর প্রেক্ষিত অন্তর্গত অনুভব নিছক কালস্পর্শীই নয়, বরং কালোত্তীর্ণ মহাকালিক সত্যের স্পষ্টায়ন ঘটিয়েছে। সামগীত দুঃসময়ের গ্রন্থটিতে গ্রন্থবদ্ধ কবিতাগুলোর পাঠোত্তর প্রতিক্রিয়ায় একজন সচেতন পাঠক হিসেবে এ-মহাসত্য উপলব্ধির কথা আমাকে স্বীকার করতেই হবে। তাঁর কবিতার মহাজাগতিক আদর্শবাদী ঐক্যের অনুরণন আমাদের চেতনার জগতকে চমৎকৃত করে বিশুদ্ধ নান্দনিক ব্যঞ্জনায়। আমরা প্রত্যক্ষ করি আমাদের চারপাশের জগতকে এক অনন্য মহাজগতের নান্দনিক পাঠশালার প্রতীক বা চিত্রকল্পে। এ-প্রাতিভাসিক জগৎ মিথ্যে নয়, মিথ্যে নয় এর রূপ, রস, গন্ধ ও স্পর্শের অনুভব, বরং এ-হচ্ছে পরম অনুভূতির সূচকপাঠ। আমাদের চেতনার জগৎ কীভাবে চিন্তনের জগতকে আন্দোলিত করে, প্রভাবিত করে এবং ধাপে ধাপে নির্মাণ করে তা প্রত্যক্ষ করা যাক আফজাল চৌধুরীর কাব্যভাষ্যে’ ধ্যানের রশ্মিতে ফের কাঁপে দু’নয়ন/ জ্ঞানে ও মননে হয় সূচারু বয়ন, বেশ/ এ কোন্ আলোকডাঙা এ কোন্ এ্যাটলাস/ এ কার বাণিজ্যভার, এ কার মীরাস? (ইন্দ্রিয়ন, পৃষ্ঠা ৯)
এভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয় আমাদের ইন্দ্রিয়চেতনার জগৎ। কিন্তু আমাদের অনুসন্ধিৎসু মন এখানেই থেমে থাকে না। কারণ, দ্বন্দ্ব বা বিরোধ নামক বিপরীত বিষয়াবৃত্তে আটকে থাকে না জীবনের চলমান থিসিস। বিষয় থেকে বিষয়াতীত হতে চায় পরমসত্যের অন্তরঙ্গ অনুভবে। সেজন্যই কবি বলেন, ‘তাকিয়ে রয়েছি এই শহরের কম্পমান সন্ধ্যার আঁধারে/ মুয়াযযিন আযান দিচ্ছেন,/ বিস্ময় চিহ্নের মতো মিনারে দাঁড়িয়ে/ যেন/ আলপিনবিদ্ধ ওই ম্লান দূরাকাশে (অতীন্দ্রিয়ন, পৃ: ১০)। কী অসাধারণ দৃশ্যকল্প আর উপমার প্রয়োগ। আমাদের ইন্দ্রিয়জ সত্তা এই মৃত্তিকার জগতেই শুধু খাবি খায় না। ছড়িয়ে পড়ে’ অলৌকিক মাইক্রোফোনে/ কিংবা এক মূর্তিমান ঐশী ভায়োলিনে" (ঐ) ইন্দ্রিয় চেতনা আর অতীন্দ্রিয় চেতনার জগতে এ আযান দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার সেতুবন্ধন-চিন্তনের উর্ধ্বমুখী সিঁড়ি। অশরীরী জগতের মীড়ে মীড়ে বইয়ে দেয় সুরের তুফান। স্ফুলিঙ্গের ডানা মেলে, স্কাইস্ক্রেপার ম্যানশন মাড়িয়ে উজ্জ্বল দিগন্ত হয়ে ওঠে গতিশীল সজীব উল্কারা, ছুঁড়ে দেয় মহাজাগতিক ঐক্যের ইশারা।
অন্ধকারে দড়িকে সাপ দেখে ভয়ে কেঁপে ওঠে আমাদের চেতনার জগৎ। কিন্তু এটি অলীক দর্শন। অসত্য। ইন্দ্রিয় এভাবেই আমাদেরকে বিভ্রান্ত করে। তাই, ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা মাত্রই সত্য নয়। এটি সত্য অনুভবের আকার নয়। জার্মান দার্শনিক কান্ট যেমন বলেন, ইন্দ্রিয়জ সংবেদন আমাদেরকে অভিজ্ঞতার উপাদান সরবরাহ করে মাত্র। এ জন্যই কান্টের অনুসরণ করে আমরাও বলতে পারি, নিছক ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা সংশয়মুক্ত নয়। এ কারণেই ঐন্দ্রিয়িক সত্য প্রশ্নাতীত বা প্রকৃত সত্যের আকার হতে পারে না। আর এভাবেই আমাদের চেতনার জগৎ এখানে মুখ থুবড়ে পড়ে। সূচনা ঘটে হতাশার, অস্তিত্ব-সংকট চেতনার। ফরাসি দার্শনিক রেঁনে দেকার্ত যেমন বলেছিলেন, ‘আমি কী অস্তিত্বশীল?’, ঠিক তেমনিভাবে কবি আফজাল চৌধুরীর কবিতায়ও আমরা প্রত্যক্ষ করি এ- ধরনেরই আত্মজিজ্ঞাসার অনুরণন। তিনি বলেন,
‘আর আমি/ এই এক ‘চৌধুরী’ নামক/ যে অখ্যাত ও অস্ফূট লোক/------ আচমকা রূপান্তরে হই যেন অধম প্রবাল/ লুপ্তপ্রায় লেগুনের দেহপিষ্ট খামিরের তাল/ এই আমি ঠিক/ আত্মপরিচয়হীন, নৈর্ব্যক্তিক/ সমুদ্রের তলানিতে জীবাশ্ম-শ্রমিক’ (অতীন্দ্রিয়ন)। কিন্তু দেকার্ত যেমন এই আত্মজিজ্ঞাসায় অন্তর্লীন হয়ে যান নি, অস্তিত্ব চেতনার সংকট থেকে উত্তীর্ণ হতে চেয়েছেন এবং পরিশেষে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন এই বলে যে, ঈড়মরঃড় বৎমড় ংঁস অর্থাৎ চিন্তাকারী তো অস্তিত্বশীল, তেমনি আফজাল চৌধুরীর অস্তিত্ব-চেতনার প্রক্রিয়াটিকেও আমরা এক পরমার্থিক লক্ষাভিসারী হতে দেখি। একই কবিতায় তাঁর আত্মগত উপলব্ধির জিজ্ঞাসু রূপটি কাব্যভাষা পেয়েছে নিম্নরূপ
‘কে বা আমি বর্ণ আর গন্ধের জগতে/ আপেক্ষিক এই পৃথিবীতে/ যেখানে জানে নি কেউ কোথা হতে কোথা আসা হলো/ ঔরষের বীজাঙ্কুর মাতৃদোরে কেন রাখা হলো/ কেন বা সে অন্ধকারে, নির্জ্ঞানের অতল বিন্দুতে/ দ- ও পলের ক্রমায়ুতে/ ফলে এ দেহতত্ত্বরূপ?/------ বিশাল এ কায়েনাতে আমি কার সদিচ্ছার স্বরূপ?’ কিন্তু এ এন্টিথিসিসে তিনি অস্তিত্বহীন হয়ে যান নি, তাঁর কাব্যচিন্তায় সুস্পষ্ট হতে থাকে হেগেলীয় সিনথেসিসের আভাস। তিনি বলেন, ‘আদিগন্ত অনস্তিত্বে অন্ধকার এই লোকে/ জেগে আছি তাই/ সারারাত সারাক্ষণ চাই, চাই, চাই/ সূর্যোদয়।’ ( অতীন্দ্রিয়ন)।
অত:পর কবির আত্মগত উপলব্ধি এগোতে চায় অন্তরঙ্গ ভাবগত বিন্যাসে। আত্মনির্মাণের বহুল-বর্ণিল প্রচেষ্টাগুলোকে শুধরে নেবার আকুল আকুতি কবিকন্ঠে ঝংকৃত হতে থাকে। তাঁর ভাষায়- বুঝি না কোথায় এসে ফেলেছি এ অকাল নোঙর।/ আমার প্রাণের বৃন্তে কে ফোঁটায় নক্ষত্রের ফুল?------ স্বভাবে গেরস্থ হয়ে তবু এক বদ্দু-যাযাবর/ এই আমি/ কোনরূপ ঘরানার পাইনি সুখবর।’ (যাযাবর)। কিন্তু পরমসত্তায় আত্মস্থ হয়ে জীবন ও জগতের সারাৎসারে সাঁতার কাটা সহজ কাজ নয়। মানবিক সীমাবদ্ধতা কখনোবা নৈরাশ্যবাদী জিজ্ঞাসার অনুরণন তোলে। কবি যেমন বলেন, ‘কি-হবে কি-হবে ওহে ভবিতব্য, বলে দাও কোন যোগাযোগে/ আমার শুরু ও শেষ, কোথায় কোথায় মুক্তি, কোন বিনিয়োগে?’ (প্রান্তিক দূর্গে যুদ্ধ)। অতঃপর এক ভারসাম্যময় অস্তিত্বের অনুভব-প্রত্যাশী কবিকন্ঠে সুচেতনার বিপ্লব-দ্যুতি’ এখনও প্রান্তিক দূর্গে যুদ্ধ চলছে, কুরবান হয়েছে জান/ এইটুকু বলতে পারি-জীবন ব্যয়িত নয় কেবল সম্ভোগে/ কেবল কৈবল্য যপে অঙ্ক-কষাকষি নয় যোগে ও বিয়োগে।(ঐ)।
অধ্যাত্মের অনুভব কবিকে মৃত্তিকার এ-ই জগত থেকে বিমুখ করে দিয়ে ইহজাগতিক-অস্তিত্বহীন করে দিতে পারে নি। মহাকাশচারী কবিসত্তা প্রত্যাবর্তন করেন মৃত্তিকার জগতে। এভাবে, ‘হেমন্তের খানাখন্দে উলঙ্গ চাষার মত বে-পানাহ / মুখ থুবড়ে পড়ে আছি হায়/ খামার বাড়ি ও খলা, উঠানে, বাথানে ফের ধান তুলবো কিনা/ বলে দাও, বলে দাও/ হে মহাকাল।’ (মহাকাল)। কিন্তু ইন্দ্রিয়ের উস্কানিতে তিনি আর বিভ্রান্ত হতে চান না। পরমসত্তার আধ্যাত্মিক উপলব্ধিতে স্থিত, সমাহিত ও শান্ত-সুনিবিড় তাঁর স্বরূপটি সচেতনভাবেই মিনতি জানায় বিশুদ্ধ স্বরে’ আমাকে বিশুদ্ধ করো শুদ্ধতম চৈতন্য-সভায়/ নিয়ে যাও হে মালিক, গ্লানিহীন শৈশবের স্বাদে। (শুদ্ধস্বর)। শৈশবের স্বাদ ও সৌন্দর্যে স্নাত ও বিশুদ্ধ কবিসত্তার কন্ঠে এবার বিপ্লবী ভাষারূপ’ হঠাৎ বজ্রের দিকে বাড়িয়ে দিতেই এই হাত/ অক্ষত পাঞ্জায় দেখি ধরে আছি আল্লাহর চাবুক (দাও পরকাল)। শানিত চেতনার স্বতঃস্ফূর্ত স্ফূরণ বিশ্লিষ্ট হয়, পুনর্গঠিত হয় বিশ্বাস ইকবালের ‘খুদী’-র মত অস্তিত্ব-চেতনার বিকাশে। কবি বলেন, ‘অতঃপর/ আর নয় হত্যাকা-/ নিজের পরের কিংবা আর নয়/ পাচারকর্ম পাপ ও পূণ্যের/ নির্বাণে ও নৈরাত্মায় হাস্তি হারিয়ে আর/ রুদ্ধ করা নয় আত্মশক্তির বিকাশ’(ঐ)।
এভাবেই কবি আফজাল চৌধুরীর কাব্যভাষা ও ভঙিমা ইন্দ্রিয় ও অতীন্দ্রিয় চেতনা ও চিন্তার ক্রমবিশুদ্ধির মধ্য দিয়ে শিল্প ও বিশ্বাসের নান্দনিক তৃপ্তি লাভ করেছে। এজন্যই কবির কাব্যভাষায় এমন নন্দিত আহ্বান-
‘অতএব চাই প্রতি প্রহরের যত সব/ রহস্যাবৃতি নয়নে ফলিত হোক হে/ এস এস দিকে ক্লিষ্ট ও আশাহত সব/ ভক্তি ও প্রেমে তুমুল নৃত্য হোক হে।’

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT