মহিলা সমাজ  রয়টার্সের দুই সাংবাদিক

শাস্তি নয়, প্রশংসা প্রাপ্য

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০৯-২০১৮ ইং ০০:৫৫:৫৬ | সংবাদটি ১৩৭ বার পঠিত

জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা পরিচালনার দায়ে বর্মি জেনারেলদের শাস্তিদানের সুপারিশের প্রেক্ষাপটে রাখাইন রাজ্য নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের ‘দোষে’ বর্মি আদালত বার্তা সংস্থা রয়টার্সের দুই নির্ভীক সাংবাদিককে শাস্তি দিয়ে গোটা বিশ্ববিবেককে নিস্তব্ধ করে দিয়েছে। তাদের ‘দোষ’ তারা সেনা অভিযানের সময় এক গ্রামে দশ রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যার পরে পুঁতে ফেলার ঘটনা অনুসন্ধানে নিজেদের নিয়োজিত করেছিলেন। কিন্তু প্রকৃত খবর হলো, পুলিশ গত ডিসেম্বরে একটি রেস্তারায় ওই দুই সাংবাদিককে ডেকে নিয়ে হাতে কিছু কাগজ গুঁজে দিয়ে তাদের হাতেনাতে গ্রেফতার করে।
৩ সেপ্টেম্বর ইয়াঙ্গুনের একটি আদালত রাখাইনে রোহিঙ্গা গণহত্যা ও নির্যাতনের খবর প্রকাশ করে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের দায়ে রয়টার্সের দুই সাংবাদিক ওয়া লোন ও কিয়াও সোয়ে ও ওকে সাত বছর করে কারাদন্ড দেন। ২০১১ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসনের কবলে থাকা মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে এই রায়কে বড় ধরণের বাধা বলে মনে করা হচ্ছে। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ নানা দেশ ও আন্তর্জাতিক সংগঠন রায়ের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে। মিয়ানমারের সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমগুলোও জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং মানববন্ধনসহ বিভিন্ন সভা সেমিনার করছেন।
দুই সাংবাদিকের স্ত্রীরাও সংবাদ সম্মেলন করে তাদের নিরপরাধ স্বামীদের মুক্তি কামনা করেছেন। ওয়া লোন ও কিয়াও সোয়ের ছোট্ট দুই মেয়ে আছে। কিয়াওয়ের মেয়ের বয়স তিন বছর। আর সাংবাদিক ওয়ায়ের প্রথম সন্তানের জন্ম হয়েছে গত মাসে। কিয়াও সোয়ের স্ত্রী চিত সু উইন এবং ওয়া লোনের স্ত্রী পেন ই মন তাদের স্বামী নিরপরাধ বলে দাবী জানিয়ে কঠোর এই রায়ের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন এবং পাশাপাশি তাদের স্বামীরা মুক্তি পাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
মিয়ানমারের আদালতের ওই ‘রায়’ কার্যত বিশ্বসম্প্রদায়ের জাগ্রত ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের বিরুদ্ধে বৃদ্ধাঙ্গুলিও বটে। তবে এটা সুখের বিষয় যে, নিচু কণ্ঠে হলেও বর্মি সমাজের ভেতর থেকে এই অন্যায্য রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সকলেই বলেছে, এটা রাজনৈতিক রায়। এর লক্ষ্য হলো যাতে কোনো সাংবাদিকই রাখাইন রাজ্য নিয়ে স্বাধীনভাবে কোনো রিপোর্ট তৈরি করতে না পারেন। এই রায় আসলে গণহত্যার বিচার মিয়ানমারের মাটিতে হওয়ার পথও বন্ধ করল। এই রায়ে মিয়ানমারের রূঢ় বাস্তবতাই ফুটে উঠেছে। ঔপনিবেশিক আমলের তথাকথিত অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট প্রয়োগ করে যেভাবে একটি সাজানো মামলায় রয়টার্সের দুই সাংবাদিককে অপরাধী সাব্যস্থ করা হলো, তা ওই একই ধরণের আইনের প্রয়োগকারী দেশগুলোর সাংবাদিকদের যে বিচলিত করতে পারে, তাতে কোন সন্দেহ নাই।
সাংবাদিকরা সমাজের ভেতরের দুঃখ, ক্লেশ, ঘটনা-দুর্ঘটনা, অনিয়ম-দুর্নীতি মানুষের বিবেকের কাছে তুলে ধরবেন সুন্দর সাবলীলভাবে, এটাই তাদের দায়িত্ব। কিন্তু সেই সংবাদ পরিবেশনের অপরাধে যদি কোনো সাংবাদিককে প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়, তাহলে সেই ‘রায়’কে বিশ্ববিবেক মেনে নিতে পারে না। তাই আমি এবং আমার মতো যারা মানবতার কথা বলি, মানুষের দুঃখের কথা বলি তথা বিপন্ন মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করি সেই সুশীল সমাজেরই একজন হয়ে আমিও বর্মি আদালতের ওই রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে দুই সাংবাদিকের মুক্তি হবে বলে আশা রাখি।
দুই সাংবাদিক কারামুক্ত হয়ে আবার ঘরে ফিরবেন। আর তাদের অনুসন্ধানী চোখ সর্বদা খুঁজবে নির্যাতিত মানুষের ভয়ার্ত মুখের ছবি। আশার বাণী নিয়ে তারা মানুষের পাশে দাঁড়াবেন এবং তাদের সাহসী কন্ঠে ধ্বনিত হবে Ñ এক বুক জ্বালা নিয়ে/ বন্ধু তুমি/ কেন একা/ বয়ে বেড়াও?/ আমায় যদি তুমি বন্ধু মানো/ কিছু জ্বালা আমায় দাও!/ এক বুজ জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি...।
সুতরাং, মানুষের বন্ধু হয়ে মানুষের অধিকারের কথা, নির্যাতিত মানুষের কথা যে সাংবাদিকরা তুলে ধরবেন সেই সাংবাদিকদের শাস্তি আমরা চাইতে পারি না। তাই মিয়ানমারের দুই সাংবাদিকের শাস্তি নয়, প্রশংসা প্রাপ্য বলে আমি মনে করি। তাদের জন্য রইলো ফুলেল শুভেচ্ছা। নিশ্চয়ই তারা অবিলম্বে মুক্তি পাবেন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT