উপ সম্পাদকীয়

ভোটে ইভিএম : কেন এতো বিতর্ক

এডভোকেট আনসার খান প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৯-২০১৮ ইং ০১:৪৫:০৬ | সংবাদটি ১৪৯ বার পঠিত

একটি বিকশিত এবং জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণমূলক পরিপূর্ণ গণতন্ত্রের জন্য অবশ্যই অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক, যেখানে ভোটার সাধারণ ভয়মুক্ত পরিবেশে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন এবং প্রদত্ত ভোটের সুষ্ঠু গণনার নিশ্চয়তাও থাকতে হবে নির্বাচনী ব্যবস্থায়। উল্লেখ্য যে, অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা হলো গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিস্বরূপ এবং একই সাথে ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার মানুষের একটি মৌলিক অধিকারও বটে।
মানুষের মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ অধিকারটি সুরক্ষার জন্য ভোট প্রদান ব্যবস্থাটি আধুনিকায়ন ও অধিকতর উন্নতি সাধনের জন্য যুগে যুগে, দেশে দেশে বিভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়ে থাকে। কোনো এক পদ্ধতির অসারতায় অন্য পদ্ধতি বেছে নেয়া হয়। এটিই নিয়ম। বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির উন্নয়ন ভোটিং ব্যবস্থায়ও প্রভাব সৃষ্টি করেছে। ভোটাধিকারের প্রয়োগের স্বচ্ছতার জন্য, “ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা (ইভিএম)” ব্যবহারের একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে কোনো ব্যবস্থাই বিতর্ক মুক্ত নয় বিধায় ইভিএম নিয়েও দেশে দেশে তর্ক-বিতর্ক ও সমালোচনা হচ্ছে। কোনো কোনো দেশ ইতোমধ্যেই ইভিএম পদ্ধতি ব্যবহার করে এর যথার্থতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছে। এর কার্যকরতা স্বচ্ছ ভোট বান্ধব নয় বলে ইভিএম পদ্ধতি থেকে সরে গেছে। আবার কোনো কোনো দেশ পুরানো পদ্ধতি ছেড়ে প্রযুক্তি নির্ভর ইভিএম পদ্ধতি প্রয়োগ ও ব্যবহারের জন্য উদ্যোগী হয়েছে।
ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণের পক্ষে-বিপক্ষে কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ। বার বছর ধরে ইভিএম পদ্ধতির যথার্থতা জানতে গবেষকদের সাথে কাজ করেছেন টেক্সাসের ট্রাভিস কাউন্টি ইন অস্টিনের কাউন্টি ক্লার্ক ডানা বিউভিয়র। তিনি মনে করেন, ইভিএম পদ্ধতি সবচেয়ে নিরাপদ, স্বচ্ছ, অডিটেবুল ও বিশ্বাসযোগ্য ভোটিং পদ্ধতি। অন্যদিকে, এ পদ্ধতির ভোটিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেছেন রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ডান ওয়ালাস। তিনি মন্তব্য করেছেন-“এটি মূলত: একটি কম্পিউটার এবং অবশ্যই কম্পিউটার হ্যাক করা সম্ভব।” অন্যান্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরাও একই কথা বলছেন। তাঁদের মতে, কম্পিউটার হ্যাক করা সম্ভব। মূলত: ইভিএম বিতর্ক নিয়ে সারা বিশ্বেই বির্তকে বিশেষজ্ঞ, জনপ্রতিনিধি এবং ভোটার সাধারণ দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। তবে এটি সত্য যে, ইভিএম পদ্ধতির বিপক্ষের পাল্লাটি সবচেয়ে ভারী। অল্প সংখ্যক দেশ বর্তমানে ইভিএম ব্যবহার করছে। ব্যবহারকারী দেশগুলো হলো, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, ব্রাজিল, কানাডা, এস্তোনিয়া, ফ্রান্স, ভারত, ইটালি, নামিবিয়া, দ্য নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, পেরু, রুমানিয়া, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা, দ্য ফিলিপাইনস। এখানে উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্রের অনেকগুলো রাজ্যে ইভিএম ব্যবহার করা হয় না। অন্যদিকে, গত একদশকে ইভিএম পদ্ধতি বাতিল করেছে ইটালি জার্মানী, দ্য নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড, জার্মানীসহ কয়েকটি দেশ। অর্থাৎ ইভিএম ব্যবহারে যথার্থ সফলতা না পাওয়ার প্রেক্ষিতেই যে ইভিএম পদ্ধতি ব্যবহার থেকে পিছিয়ে এসেছে ঐ দেশগুলো সেটি বলার অপেক্ষা রাখেনা। প্রযুক্তি সমৃদ্ধ জার্মানীতে আদালতের নির্দেশেই নির্বাচনী কাজে ইভিএম ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে ২০০৯ সালে। কারণ হিসেবে স্বচ্ছতার অভাবকেই নির্ণায়ক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট প্রদান ও ভোট গণনায় স্বচ্ছতার অভাব বিদ্যমান বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন।
বিভিন্ন দেশে ইভিএম এর ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, একজন ভোটার তাঁর পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি নিশ্চিত হতে পারবেন না প্রদত্ত ভোটটি পছন্দের প্রার্থী পেয়েছেন কীনা। কারণ, বাটন পুশ করে ভোট দেওয়া যায় বটে, তবে ভোট কাকে দিলেন সেটি দেখার কোনো সুযোগ নেই ইভিএম পদ্ধতিতে। ইভিএম পদ্ধতিতে এ অস্বচ্ছতার কারণেই জার্মানীর একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইয়োকিম ভিসনা এবং তাঁর পুত্র উলরিখ ভিসনা ইভিএম পদ্ধতি বাতিলের জন্য দেশটির সাংবিধানিক আদালতে মামলা দায়ের করেছিলেন। শুনানী শেষে আদালত এ যুক্তি দেখিয়ে ইভিএম পদ্ধতি ব্যবহারকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দেন যে, ইভিএম অস্বচ্ছ এবং ইভিএম দিয়ে কীভাবে ভোট গ্রহণ ও গণনা করা হয়, সেটি সাধারণ ভোটারদের বোঝার কোনো সুযোগ ও ক্ষমতা নেই। ২০০৯ সালে আদালত কর্তৃক বাতিল আদেশের পরবর্তীকাল থেকে জার্মানীতে ইভিএম ব্যবহৃত হচ্ছে না।
ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ ও গণনার বিষয়টিতে যেমন স্বচ্ছতা থাকে না, তেমনি রয়েছে আরো বেশ কিছু মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ অসুবিধা, যে কারণে ইভিএম পদ্ধতি নিয়ে তুমুল বিতর্ক আছে দেশে দেশে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশই তাই ইভিএম ব্যবহার করছেনা। যেমন; সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, বিশ্বের মোট ১২০টি গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে মাত্র ২৫টি দেশ সম্পূর্ণ বা আংশিক ভাবে ইভিএম ব্যবহার করছে। আবার কিছু কিছু দেশে এ পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।
ইভিএম পদ্ধতির ব্যবহারে যে সকল ত্রুটিগুলো বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো; (১) নিরাপত্তা জনিত সমস্যা (২) ভোট গ্রহণ ও গণনায় টেম্পারিং ও হ্যাকিং এর সমূহ সম্ভাবনা থাকা (৩) ভোট নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে পড়েছে কি না সেটি দেখার কোনো সুযোগ না থাকা (৪) সংরক্ষণ করে রাখার অনিশ্চয়তা (৫) সফটওয়্যারের অকার্যকরতা ও ভুলের জন্য সঠিক ভোট গ্রহণ ও গণনা না হওয়ার আশংকা।
বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন যে, ইভিএম সফটওয়্যার এবং হার্ডওয়্যার মোটেই নিরাপদ নয়। তাঁদের মতে, ভোট গ্রহণ এবং গণনার মধ্যবর্তী সময়ে অসৎ নির্বাচন ইনসাইডারস বা অন্য কোনো ক্রিমিনাল গ্রুপ ইভিএম এর ভোট রেকর্ডের ডিভাসই পরিবর্তন বা অদলবদল করে ভোটের প্রকৃত ফলাফল বদলে দিতে পারে। এছাড়াও কম্পিউটার সফ্টওয়্যার সাধারণত: সফ্টওয়্যার প্রোগ্রামিং এবং নির্দিষ্ট কোড এর মাধ্যমে কার্যক্রম সম্পন্ন করে। এ কারণে কোনো কম্পিউটার প্রোগ্রামার যদি কোনোভাবে সফটওয়্যারের কোড নম্বর জেনে যায় এবং তাঁর মধ্যে যদি কোনো অসৎ উদ্দেশ্য কাজ করে তবে সে কোড নম্বর ব্যবহার করে নির্বাচনী ফলাফল সম্পূর্ণ পাল্টে দিতে পারবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
ইভিএম ব্যবহারের ফলে কোনো অসৎব্যক্তি বা হ্যাকারদের দ্বারা প্রতারিত হওয়ারও একটি আশংকা থেকে যায়। যদি ওরা মেশিনে কোনোভাবে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যায় এবং যদি এরা জানতে পারে সফটওয়্যার কীভাবে কাজ করে, সে ক্ষেত্রে তারা মেশিনে সংরক্ষিত মেমোরি কার্ডটি সরিয়ে অন্য একটি মেমোরি কার্ড স্থাপন করে দেয়, তাহলে সফটওয়্যার ভাইরাস আক্রান্ত হবে এবং এভাবে ভোট টেম্পারিং করা সম্ভব।
ক্ষমতাসীন সরকারের যোগাযোগীতেও ইভিএমে টেম্পারিং করার সুযোগ থাকে। এক্ষেত্রে মেশিন প্রস্তুতকালীন সময়েই সেটি করা সম্ভব। কারণ, ক্ষমতাসীনরা জানে কোন কোম্পানী বা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান থেকে মেশিনগুলো ক্রয় করা হচ্ছে। তাই সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে সরকারের অনুকূলে সহায়ক হবে এমন ধরণের মেসিন নির্মাণ করা সম্ভব। অর্থাৎ, প্রস্তুতকালীন সময়েই ভোট টেম্পার করা যায় এমন ধরণের মেশিন নির্মাণ করা সম্ভব ক্ষমতাসীণদের যোগসাজশে। পূর্ব থেকেই কোড নম্বরগুলো জানা হয়ে যাবার কারণে ভোট- টেম্পারিং ও ভোট গণনা সরকারী পক্ষ নিজেদের অনুকূলে পরিচালিত করতে পারে বলে মনে করা হয়।
ভোটিং মেশিনগুলো সাধারণত: কোনো বিদেশী ম্যানুফেকচারিং কোম্পানী থেকে ক্রয় করা হয়ে থাকে। আর এটাতো স্বাভাবিক যে, নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গোপন কোড নম্বর এবং মেশিনের সফটওয়্যার কীভাবে কাজ করে সেটি তারা জানে বিধায় কোড নম্বর ও প্রোগ্রামিং সংক্রান্ত গোপনীয় এসব উপাদানগুলো হ্যাকারদের নিকট অথবা অন্যকোনো পক্ষ-যারা নির্বাচনের সাথে জড়িত, তাদের নিকট অসৎ উদ্দেশ্যে বিক্রি বা সরবরাহ করতে পারে। ফলে বিদেশের ভূখন্ড থেকে ও ভোট গণনা হ্যাকিং বা টেম্পারিং করতে পারে। ভোট গণনাকারীরা যদি টেম্পারিং বা হ্যাকিং এর সাথে কোনোভাবে জড়িয়ে পড়ে তবে ফলাফলের চিত্র পাল্টে দিতে পারে। সম্ভবত: এ কারণেই তৎকালীন সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্টালিন বলেছিলেন- “দোজ হো কাস্ট দ্য ভোটস ডিসাইড নাথিং। দোজ হো কাউন্ট দ্য ভোটস ডিসাইড এভরিথিং।”
ভোটিং মেশিনে যেমন অসুবিধা আছে, তেমনি সুবিধাদিও আছে অনেক। অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন সুবিধার পরিমাণ বেশি। কিন্তু বাস্তবতা বলছে অন্য কথা। যদি সুবিধা বেশিই হতো তাহলে ১২০টি গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে মাত্র ২৫টি দেশে মেশিন ব্যবহার হচ্ছে কেন,- প্রশ্ন এসে যায়। তাছাড়া, মেশিন ব্যবহার করেও নিরাপত্তার অভাবজনিত কারণে, হ্যাকিং ও টেম্পারিং প্রতিরোধ করতে না পারা বা ম্যানিপুলেশন বা বড় ধরনের প্রতারণা জনিত কারণে স্বচ্ছ, অবাধ এবং মুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব না হওয়ার দরুণ অনেক দেশ ভোটে মেশিন ব্যবহার বাতিল করে দিয়ে পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে গেছে। এ দেশগুলো মনে করে-মেশিনে ফ্রি, ফেয়ার ও স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয়।
বিতর্ক এড়ানোর জন্য এবং স্বচ্ছ-গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে ইভিএম পদ্ধতি ব্যবহার করার পূর্বে যথেষ্ট সময় নিয়ে এ পদ্ধতির সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন আছে বলে বিশেষজ্ঞজনেরা মনে করেন।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • রহমতের নবী মুহাম্মদ (সা:)
  • মহানবী : মানবজাতির সতর্ককারী, সুসংবাদদাতা
  • মনীষীদের দৃষ্টিতে মহানবী
  • আসামের ৪০ লাখ অধিবাসী যাবে কোথায়?
  • জনসংখ্যা ও জনসম্পদ
  • বাস্তবতার নিরিখে হাল আমলের বিশ্ব
  • জলবায়ু পরিবর্তন ও বিজ্ঞানীদের সতর্কতা
  • বিদেশে কর্মসংস্থান : সমস্যা ও সম্ভাবনা
  • সাম্প্রতিক কথকতা
  • শিশুর সুরক্ষা ও গণমাধ্যম
  • উন্নয়নের অভিযাত্রায় অদম্য বাংলাদেশ
  • ডাক বিভাগ ফিরে পাচ্ছে প্রাণ
  • আমরা সবাই ভালো হলে দেশ ভালো হবে
  • ‘জাতীয় বীর’ কৃষকদের নিয়ে কিছু কথা
  • ভর্তিযুদ্ধে লাঘব হোক ভোগান্তি
  • মানব সম্পদ উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষা
  • ভোটের মাঠে তারকার মেলা
  • আয় বৈষম্য ও সামাজিক অসমতা
  • সামাজিক আন্দোলন : নিরাপদ সড়ক চাই
  • আলী হোসেন খান
  • Developed by: Sparkle IT