ইতিহাস ও ঐতিহ্য

জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা

 সেলিম আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৯-২০১৮ ইং ০১:৪৯:৪৫ | সংবাদটি ২৮ বার পঠিত

খেলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলন শুরু হবার খানিকটা আগে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে করিমগঞ্জে সুরমা উপত্যকা রাষ্ট্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনের চতুর্থ অধিবেশনে সিলেট অঞ্চল থেকে একটি ‘জাতীয়তাবাদী’ সংবাদপত্র বের করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সম্মেলনের পরের বছর ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে জনশক্তি বের হতে শুরু করে। বিপিনচন্দ্র পাল পত্রিকার নাম ‘জনশক্তি’ রাখার সুপারিশ করেছিলেন এবং তিনি সেই রাষ্ট্রীয় সম্মেলনেও সভাপতিত্ব করেছিলেন।
জনশক্তির প্রকাশকাল নিয়ে খানিকটা ভিন্নমত আছে। কেউ বলছেন ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে বের হয়, কেউ বলছেন ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে। জনশক্তির শেষ সম্পাদক নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী লিখেছেন, পত্রিকাটি ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে বের হয়। তবে এ ক্ষেত্রে আমরা বিশিষ্ট সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ারের অভিমতকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবো। তিনি বলেছেন,Ñ‘এই পত্রিকা যে ১৯২০ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। ‘জনশক্তি’র ১ম খন্ড ২২শ সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯২০ সালের ২১ ডিসেম্বর (৬ পৌষ মঙ্গলবার ১৩২৭ বাঙ্গালা)। এর একটি কপি কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে অবস্থিত বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা পর্ষদের যতীন্দ্রমোহন সংগ্রহশালায় সযতেœ রক্ষিত আছে। এর ২২শ সংখ্যার তারিখ থেকে পেছনের দিনগুলোর হিসেব করলে দেখা যায়, যদি পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে থাকে, তাহলে এর ২১শ ও ২০শ সংখ্যা বের হয় ১৪ ও ৭ ডিসেম্বর। ঠিক তেমনি, ১৯শ, ১৮শ, ১৭শ, ১৬শ ও ১৫শ সংখ্যা বের হওয়ার কথা নভেম্বরের ৩০, ২৩, ১৬, ৯ ও ২ তারিখে। এই হিসেব অনুযায়ী পত্রিকাটির ১৪শ, ১৩শ, ১২শ ও ১১শ সংখ্যার প্রকাশকাল হওয়া উচিত ২৬, ১৯, ১২ ও ৫ অক্টোবর। সেপ্টেম্বরের ২৮, ২১, ১৪ ও ৭ তারিখে প্রকাশিত হওয়ার কথা ১০ম, ৯ম, ৮ম ও ৭ম সংখ্যা। তাহলে আগস্টের ২৪, ১৭, ১০ ও ৩ তারিখে বের হওয়া উচিত ছিল ৬ষ্ঠ, ৫ম, ৪র্থ ও ৩য় সংখ্যা এবং জুলাইয়ের ২০ ও ১৩ তারিখে যথাক্রমে ২য় ও ১ম সংখ্যা।’ হাসান শাহরিয়ারের বিশ্লেষণের মাধ্যমে একমত হওয়া যায় জনশক্তি পত্রিকাটি ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দেই বের হয়। ভূবনমোহন বিদ্যার্ণব ছিলেন তখন পত্রিকার সম্পাদক। তার সম্পাদনায় সাপ্তাহিক জনশক্তি পত্রিকাটি সিলেট শহরের চালিবন্দরের একটি জীর্ণ কুঁড়ে ঘর থেকে বের হতো। ভূবনমোহন বিদ্যার্ণবের বাড়ী ছিল হবিগঞ্জের বেজুড়া। তিনি জনশক্তি ছাড়াও সাপ্তাহিক শ্রীদেশবার্তা, সুরমা, মাসিক শ্রীভূমি, সময় এবং ত্রৈমাসিক শ্রীহট্ট ব্রাহ্মণ পরিষদ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তার পরে আরো কয়েকজন জনশক্তি পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
প্রথমদিকে, পত্রিকায় সম্পাদকের নাম ছাপা হত না। ‘জনশক্তি’র ১ম খন্ড ২২শ সংখ্যার প্রিন্টার্স লাইনে প্রকাশক হিসেবে প্রিয়দামোহন দত্ত এবং মুদ্রাকর হিসেবে জনশক্তি প্রিন্টার্স-এর নাম প্রকাশিত হয়। মহিউদ্দিন শীরু উল্লেখ করেছেন, ‘জনশক্তি’র প্রথম সংখ্যায় সুন্দরীমোহন দাসের আর্শীবাণী ছিল নি¤œরূপ:
‘জাগহে গণদেবতা বোধিতে জনশক্তি
প্রাণে প্রাণে উঠুক জাগি অকৃত্রিম ভক্তি।
ছিষট্টি কোটি নয়নে তেজ হের হে আপনার
ত্রিংশতি কোটি কন্ঠে কর হে হুংকার।
ছিষট্টি কোটি কর লাগাও চিরমঙ্গল কার্য্যে
ছিষট্টি কোটি চরণ ফেলি চল ‘স্বরাজ’ রাজ্যে।’
পরাধীন ভারতে অসহযোগ আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন ও স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে ও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে ‘জনশক্তি’ নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রচার কাজ চালায়। এজন্যে সেই সময়ের ব্রিটিশ সরকারের কাছে ‘জনশক্তি’ এক উদ্বেগকর বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। শানিত সম্পাদকীয় ও প্রবন্ধ প্রকাশ এবং স্বাধীনতা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলন সমর্থন করে রিপোর্ট ছাপানোর কারণে জনশক্তি ব্রিটিশ রাজরোষের শিকার হয়। বিভিন্ন সম্পাদকের যোগ্য সম্পাদনা ও পরিচালনায় জনশক্তির প্রকাশনা দীর্ঘদিন চালু ছিল। কলকাতা ও ঢাকা ছাড়া বাংলার মফস্বলে সে সময়ে জনশক্তির মতো সমৃদ্ধ ও বহুল প্রচারিত পত্রিকা আর ছিল না।
খেলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের চুড়ান্ত পর্যায়ে ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে কানাইঘাট মাদ্রাসার বার্ষিক জলসায় পুলিশের গুলি, একই সময়ে মাইজভাগের ছিন্ন কোরআনের ঘটনা, ভানুবিলের প্রজা আন্দোলন, সর্বোপরি স্বাধীনতা আন্দোলন প্রতিটি আন্দোলনে জনশক্তি জনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়েছিলো।
‘মাইজভাগের ছিন্ন কোরআন’ ঘটনাটি ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ৬ এপ্রিল ঘটেছিলো। গোলাপগঞ্জ থানার সেই সময়ের বড় দারোগা আবদুল হামিদ আখন্দ তার সহকর্মী দারোগা আজমল আলীসহ গুর্খা ফৌজ নিয়ে গোলাপগঞ্জের মাইজভাগ গ্রামের মগফুর আলী আমিনের বাড়িতে ঢুকে তার ঘর দরজা ভাংচুর করে। বাড়ির পর্দানশীন মহিলাদেরকে হয়রানী এবং অনেক মালামাল আত্মসাত করে নিয়ে যায়। দারোগা আবদুল হামিদ আখন্দের নির্দেশে গুর্খা সৈন্যরা বই পুস্তক ধর্মীয় কিতাব এমনকি পবিত্র কোরআন শরীফও ছিন্নভিন্ন করে ফেলে যায়। মগফুর আলী ছেড়া কোরআন শরীফ নিয়ে সিলেট শহরে আসেন। শহরের কুদরত উল্লাহ মসজিদে মুসল্লিদেরকে কোরআন শরীফের ছেড়া টুকরোগুলো দেখান। জনশক্তি পত্রিকায় ছেড়া কোরআন শরীফের ছবিও ছাপা হয়। এইসব সংবাদ ও একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করায় সম্পাদক সতীশ চন্দ্র দেব ও মুদ্রাকর অনাথ বন্ধু দাস ১৫৩ (ক) ধারায় অভিযুক্ত হন। এ ঘটনায় মামলা হয়। সিলেট জেলা কোর্টে চার বছর মামলা চলে। আপিলে জনশক্তি কর্তৃপক্ষও অব্যাহতি পান।
খেলাফত আন্দোলন চলাকালে আন্দোলনের পক্ষে সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ প্রভাবিত কানাইঘাট মাদ্রাসার বার্ষিক জলসা বেছে নেয়া হয়। গোপনে বিপুল জনসমাগমের আয়োজন করা হয়। জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন জলসায় আসতে শুরু করে। স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি জানতে পারে এবং আসামের প্রাদেশিক পুলিশ কমিশনার জে.ই. ওয়েবস্টার (ঔ.ঊ.ডবনংঃবৎ) কানাইঘাটে উপস্থিত হয়ে বার্ষিক জলসার একদিন আগে ১৪৪ ধারা জারি করে সভা, মিছিল, সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। আয়োজকদের পক্ষে মাত্র একদিনের নোটিশে জলসা বাতিল করা সম্ভব ছিলো না। ফলে জলসা শুরু হলে ওয়েব স্টার সাহেবের নির্দেশে পুলিশ জনতার উপর গুলি বর্ষণ করে। এতে ছয়জন নিহত এবং অসংখ্য মানুষ আহত হয়। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে নৃশংস হত্যাকান্ডের পর সম্ভবত এটাই ছিল ব্রিটিশ সরকারের আরেকটি ন্যাক্কারজনক কাজ। জনশক্তি এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের পাঠকদের কাছে সমাদৃত হয়ে উঠে। ঘটনাটি ঘটেছিলো ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে। সৈয়দ মুর্তাজা আলী তাঁর ‘আমাদের কালের কথা’ বইয়ে এই সমাবেশের তারিখ ১৫ ফেব্রুয়ারি উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘নন-কো-অপারেশন আন্দোলনের সময়ে ১৯২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পুলিশ কানাইঘাটে একটি বে-আইনী জনতা ছত্রভংগ করার জন্য গুলীবর্ষণ করে; ফলে অনেক লোক হতাহত হয়।’ ‘হযরত শাহ জালাল ও সিলেটের ইতিহাস’ গ্রন্থে তিনি ঘটনার তারিখ ২০ মার্চ উল্লেখ করেছেন।
১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে পৃথ্বিমপাশার জমিদার আলী আমজাদ খাঁর জমিদারি কমলগঞ্জ উপজেলার ভানুবিল অঞ্চলে কংগ্রেসের আহবানে ভানুবিলের মনিপুরী প্রজারা জমিদারের খাজনা ও সরকারি ট্যাক্স প্রদান সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেন। ‘জনশক্তি’ তখন প্রজাদের পক্ষ নেয় এবং প্রতিনিয়ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকে। ভানুবিলের এ কৃষক বিদ্রোহ সংগঠনে অন্যান্যদের সাথে নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামীও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এ আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে নিকুঞ্জ গোস্বামীর দেড় বছর কারাদন্ড হয়েছিলো।
জনশক্তি পত্রিকাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে সুনামগঞ্জের পাইলগাঁয়ের জমিদার, কংগ্রেস নেতা, আসাম বিধান সভা ও কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা পরিষদের সদস্য এবং বিদ্যানুরাগী ব্রজেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী যথেষ্ট অবদান রেখেছেন। ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর সম্পাদনায় জনশক্তির একটি ইংরেজী সংস্করণও কিছুদিন বের হয়েছিল।
জনশক্তি সম্পাদক নিস্তারণ গুপ্ত বলেছেন, টাকার অভাব আর সরকারের অত্যাচারে জনশক্তি বন্ধ হবার জোগাড় হলে ব্রজেন্দ্রনারায়ণ এগিয়ে আসেন এবং অনেক ক্ষতি মেনে পত্রিকাটি কিনে নেন। ব্রজেন্দ্রনারায়ণ উল্লেখ করেছেন, ‘যখন উহা (জনশক্তি) বিপর্যস্ত তখন ১৯২৬ হইতে ইহার আর্থিক দায়িত্ব, উন্নতি ও পরিচালনার ভার আমার হাতে আসে, ইহাতে আমার সাত হাজার টাকার ক্ষতি হয়। পরে ইহার খরচটা উঠিয়া আসিত এবং সম্পাদক প্রভৃতি চারি পাঁচজনের অন্নসংস্থান হইত। ১৯৪২-এর আন্দোলনের সময় সরকার জামিন চাহিলে নীতিগত কারণে উহা দিতে অনিচ্ছুক হইয়া আমার ভ্রাতার নিকট উহা মাত্র ৫০০ টাকা মূল্যে বিক্রয় করি। ১৯২৮-২৯-এ ইংরেজি একটি সংস্করণ ছিল যাহার লেখা ও সম্পাদনা আমার নিজের ছিল।’
জনশক্তির শেষ সম্পাদক নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী বলেছেন, ব্রজেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর অকৃপণ দানে জিন্দাবাজারে পত্রিকার নিজস্ব বাড়ী, ফ্ল্যাট, যন্ত্রসম্বলিত বিরাট প্রেস, অফিস ছিল।
‘জনশক্তি’র রেজিস্ট্রেশন নম্বর ছিল ৮৪৬, অগ্রিম বার্ষিক চাঁদা ছিল সডাক ৩ টাকা এবং প্রতি কপির দাম ছিলো এক আনা।
ভূবনমোহন বিদ্যার্ণবের পর পরই সতীশ চন্দ্র (লাউতা, বিয়ানীবাজার সতীশ চন্দ্রের জন্ম ১৮৬৪ খৃষ্টাব্দে, বাংলা ১২৭১ এবং মৃত্যু ১৯৪১ খৃষ্টাব্দের ১৩ই ডিসেম্বর) ‘জনশক্তি’ সম্পাদনার ভার নিয়ে ১৯২৮ পর্যন্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে একে একে জনশক্তি সম্পাদনা করেন নিস্তারণ গুপ্ত, অনাথবন্ধু দাস (জালালপুর সিলেট সদর), বিনোদ বিহারী চক্রবর্তী (মদনচরক, সিলেট সদর), জ্ঞানেন্দ্রনাথ ধর (মদনচরক, সিলেট সদর) ও বিধুরঞ্জন চক্রবর্তী (মদনচরক, সিলেট সদর)।’
‘কংগ্রেসের মুখপত্র হিসেবে ‘জনশক্তি’ ভারত বিভাগ আন্দোলনের বিরোধিতা করে এবং গণভোটে সিলেটকে ভারতের সাথে রাখার পক্ষে উকালতি করে। ভারত বিভক্তি, পাকিস্তানের জন্ম ও গণভোটের মাধ্যমে সিলেট পূর্ববঙ্গে যোগ দেবার পরও সিলেট থেকে ‘জনশক্তি’র প্রকাশনা অব্যাহত থাকে। এ সম্পর্কে নিস্তারণ গুপ্ত লিখেছেন, দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে সিলেটে প্রকাশ্য দিবালোকে সমাজবিরোধিরা ‘জনশক্তি’ অফিস ও প্রেস এবং পত্রিকার সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদকের বাড়ি আক্রমন করলে তারা বাধ্য হয়ে সিলেট ত্যাগ করেন। এরপর সিলেট থেকে পত্রিকাটির প্রকাশনা স্থগিত থাকে তিন বছর। তবে নিস্তারণ গুপ্ত শিলচর থেকে ‘জনশক্তি’ প্রকাশ করেন।
পাকিস্তান আমলে ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৩ বছর পত্রিকাটি বন্ধ ছিলো। নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী লিখেছেন, আমাদের সংগঠনাদির কাজে একখানা নিজস্ব পত্রিকা প্রকাশের বিশেষ প্রয়োজন অনুভূত হওয়ায় কুলাউড়া কর্মীর সঙ্গে একখানা সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নীরেন দেব মহাশয় ও আমাকে এ কাজের জন্য ভার অর্পণ করে সিলেট প্রেরণ করেন। পাইল গাঁওয়ের স্বনামধন্য জমিদার হরেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী মহাশয় (ব্রজেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর ছোট ভাই) জনশক্তি পত্রিকার পূণ:প্রকাশের অনুমতি দিলে আমরা ১৯৫৪ সালের অক্টোবর মাসে জনশক্তি পত্রিকার পুনঃপ্রকাশ আরম্ভ করি।’ তখন পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন প্রাক্তন এম এল এ নীরেন্দ্র নাথ দেব এবং সহকারী সম্পাদক ছিলেন নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী। চালিবন্দর অফিস হতে ১৯৫৪ সাল থেকে নীরেন্দ্রনাথ দেবের সম্পাদনায় পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় এবং ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তার সম্পাদনায় পত্রিকাটির প্রকাশ অব্যাহত ছিল।
পরবর্তীতে ইসকান্দার মির্জার শাসনের পর ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ূব খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানে সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং শাসনতন্ত্র পরিষদ, মন্ত্রীসভা ইত্যাদি সবই বাতিল করা হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক সংস্থার সাথে কংগ্রেসও বে-আইনী ঘোষিত হয়। তখন জনশক্তি পত্রিকার উপর সেন্সরশিপ আরোপিত হয়। নীরেন্দ্রনাথ দেব সেন্সরকৃত পত্রিকা সম্পাদনা করতে অস্বীকৃতি জানালে নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করে পত্রিকাখানি বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। পত্রিকাটি তখন আনন্দ প্রেস থেকে মুদ্রিত হয় এবং চালিবন্দরে বসন্ত কুমার দাসের বাড়ির বাইরের ঘরে ছিলো পত্রিকাটির অফিস।
শ্রীসুহাসিনী দাস স্মৃতিচারণ করেছেন, পরে দোতলা বাড়িতেই জনশক্তি কার্যালয়, গীতা প্রেস হয়েছিল। নিকুঞ্জদা এখানেই থাকতেন।’ গীতা প্রেসটি ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে স্থাপিত হয়।
নিকুঞ্জ গোস্বামী উল্লেখ করেন, ‘১৯৬৫ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধ বাঁধে। ৮ সেপ্টেম্বর রাত্রিতেই আমাদের চালিবন্দর ছাত্রাবাস ঘেরাও করে আমাকে বন্দী করা হয়।---আমার প্রেপ্তারের সঙ্গে সঙ্গেই জনশক্তি পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায় এবং এই পরিস্থিতিতে কারামুক্ত হয়েও পত্রিকার পুনঃপ্রকাশে অসমর্থ হই। ১৯৬৮ ইং পর্যন্তই ছাত্রাবাসে বাস করে অন্তরীণাবদ্ধভাবেই কাটাই।’
মুক্তিযুদ্ধশেষে দেশে ফিরে নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী আবার গীতা প্রেস ও জনশক্তি পত্রিকা চালু করেন। কিন্তু পত্রিকাটি খুব বেশীদিন টেকেনি।
শ্রী নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী তার আত্মজীবনী ‘আমার জীবনপঞ্জির পথের পাঁচালী’ উল্লেখ করেছেন, ‘১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারের এক কালো আদেশে অন্যান্য পত্র-পত্রিকার সঙ্গে জনশক্তি পত্রিকার প্রকাশনও বন্ধ হয়ে যায়। তাতে পত্রিকার মাধ্যমে সদনের মেয়েদের কর্মশিক্ষা ও আর্থিক যে সুবিধা ছিল তা নষ্ট হয়ে যায় এবং সদনটি (চালিবন্দর ছাত্রাবাসে অসহায় নারীদের জন্যে স্থাপিত ‘শ্রীকৃষ্ণ সেবাসদন’) আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। প্রেস পত্রিকার মাধ্যমে মাসিক প্রায় হাজার টাকা এই সদনের কাজে পাওয়া যেতো।’
তথ্যসূত্র: ১. শ্রী নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী, ‘আমার জীবনপঞ্জির পথের পাঁচালী’হে অনন্ত পুণ্য, উমেশচন্দ্র-নির্মলাবালা ছাত্রাবাস কর্তৃক ৭ অক্টোবর ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত ২. আব্দুল আজিজ, প্রয়াত নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী স্মরণে, প্রাগুক্ত ৩. শ্রীসুহাসিনী দাস, নিকুঞ্জদা স্মরণে, প্রাগুক্ত ৪. হাসান শাহরিয়ার, সাপ্তাহিক ‘জনশক্তি’ ও সিলেট, অতীত, অতীত নয় ৫. সৈয়দ মুর্তাজা আলী, আমাদের কালের কথা, বইঘর, চট্টগ্রাম, প্রকাশকাল কার্তিক ১৩৭৫।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • উনিশ শতকে সিলেটের সংবাদপত্র
  • হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশঝাড় চাষের নেই উদ্যোগ
  • হারিয়ে যাচ্ছে বেদে সম্প্রদায়ের চিকিৎসা ও ঐতিহ্য
  • একটি হাওরের অতীত ঐতিহ্য
  • বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক
  • বানিয়াচংয়ের ভূপর্যটক রামনাথ
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন
  • সিলেটের গৌরব : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রকৃতিকন্যা সিলেট
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ক্ষেত্র
  • ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ জামালপুর
  • সুনামগঞ্জের প্রথম নারী সলিসিটর
  • Developed by: Sparkle IT