উপ সম্পাদকীয়

শিক্ষক বান্ধব শিক্ষা প্রশাসনের কাছে প্রত্যাশা

অহিদুর রব প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৯-২০১৮ ইং ০০:০৯:২৪ | সংবাদটি ১৭ বার পঠিত

দুই হাজার সতের সালের মার্চ মাসে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় দুই দিনব্যাপী সিলেট উৎসব। উক্ত উৎসবের একটি অধিবেশনে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী জনাব নূরুল ইসলাম নাহিদ সম্বর্ধিত হন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সিলেট তথা বাংলাদেশের একজন আলোকিত ব্যক্তিত্ব ব্রিগেডিয়ার হাফিজ আহমদ মজুমদার বলেন, আমাদের শিক্ষামন্ত্রী ‘টেইলর মেইড’ শিক্ষামন্ত্রী। জনাব মজুমদারের এই মন্তব্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থাৎ জাতীয় প্রয়োজনেই তাঁকে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তৈরি করা হয়েছে অথবা তিনি নিজেকে তৈরি করেছেন। সত্যি তাই। শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় মন্ত্রী হওয়ার বহু বছর আগে থেকেই শিক্ষা নিয়ে নিরন্তর চিন্তাভাবনা করেছেন এবং জাতির সামনে ধারাবাহিক লেখনীর মাধ্যমে তা তুলে ধরেছেন। শিক্ষা, শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার পরিবেশ সম্বন্ধে রয়েছে তাঁর সমৃদ্ধ ‘হোমওয়ার্ক’। তাই তাঁর নেতৃত্বে যে শিক্ষা প্রশাসন তা শিক্ষা ও শিক্ষক বান্ধব। মাননীয় সচিব মহোদয় ‘শিক্ষা সচিব’ হওয়ার আগেও মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে কাজ করেছেন। সে কারণে তাঁদের মধ্যে ‘বুঝাপড়া’ চমৎকার। মন্ত্রণালয়ে রয়েছেন শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা একজন গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত সচিব মহোদয়।
স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়সহ হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন লক্ষ লক্ষ শিক্ষক। তারা আবার সরকারি, বেসরকারি, পাবলিক ও প্রাইভেটে বিভক্ত। শিক্ষকদের সমস্যা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার জন্যে আছে নিজ নিজ প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন।
দেশের সরকারি কলেজ সমূহে কর্মরত শিক্ষকদের সমস্যাসমূহ সরকারের কাছে তুলে ধরেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি। মন্ত্রী মহোদয়ের নেতৃত্বে শিক্ষা প্রশাসন সেগুলো সম্পর্কে অবগত আছেন। আমি অত্যন্ত বিনীতভাবে আশু সমাধানের আশায় অগ্রাধিকার যোগ্য কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরছি।
১. পদোন্নতির সমস্যা : পর্যাপ্ত সংখ্যক পদ সৃষ্টি করে এ সমস্যার সমাধান করা যায়। বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষাকে অবারিত করা হয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা কলেজ পর্যায়ে প্রদান করা হয়। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন অনার্স বিষয়ে যতো শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়, তার দ্বিগুনেরও বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় বড় অনার্স, মাস্টার্স পর্যায়ের কলেজগুলোতে। মাস্টার্স ১ম ও শেষপর্বে কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকগুণ বেশি। এছাড়া বি.এ, বি.এস.এস, বি.এস.সি, বিবিএস (পাস) কোর্সে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী অধ্যয়ন করে। এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর তুলনায় অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের কলেজগুলোতে শিক্ষকদের পদ সংখ্যা অপর্যাপ্ত। ১৯৮৭ সালের সমীক্ষা কমিটি সুপারিশ করেছিলো প্রতিটি বিষয়ে (অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের কলেজে) ২ জন করে প্রফেসর সহ ১৬টি পদ সৃষ্টি করতে। বর্তমানে প্রফেসরের প্রায় ১২০০ পদ সহ কয়েক হাজার পদ সৃষ্টির বিষয় বিবেচনাধীন আছে। দ্রুত এসব পদ সৃষ্টি করলে পদোন্নতির সমস্যা আর থাকবে না। উল্লেখ্য, রংপুর কারমাইল কলেজে বহু বছর থেকে ইংরেজির ২টি প্রফেসর পদ আছে। টাঙ্গাইলের সাদত কলেজেও হিসাব বিজ্ঞানের ২টি প্রফেসর পদ বিদ্যমান।
শিক্ষা ক্যাডারের চতুর্দশ ব্যাচের কর্মকর্তাগণ ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে প্রফেসরের স্কেল পাচ্ছেন। তাদেরকে পদোন্নতি দিলে আর্থিক ব্যয়ও বাড়বে না। বর্তমানে ষোড়শ ব্যাচ পর্যন্ত কর্মকর্তাগণ প্রফেসর-এর স্কেল পাচ্ছেন। দ্রুত পদ সৃষ্টি করে বা পদের অতিরিক্ত পদোন্নতি দিয়ে (গত দু’বছর থেকে সীমিত আকারে যা দেয়াও হচ্ছে) সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। সময়ের প্রয়োজনে প্রশাসন ক্যাডারে যেমনটি করা হয়। প্রশাসন ক্যাডারে অতিরিক্ত সচিবের মোট পদ ১২১টি। কিন্তু ২৯/৮/১৮ তারিখে নতুন করে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে ১৬০ জনকে বর্তমানে ১২১টি পদের বিপরীতে মোট অতিরিক্ত সচিব আছেন ৬৩৪ জন (সূত্র ঃ দৈনিক প্রথম আলো ৩১/৮/২০১৮)। শিক্ষা ক্যাডারের সমস্যা সমাধানের জন্য পদের তুলনায় এতোগুন বেশি পদোন্নতি দরকার হবে না। আশা করি বিষয়টি সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করে সরকারের বর্তমান মেয়াদেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
২. পূর্ণ গড় বেতনে অর্জিত ছুটি না থাকায় বঞ্চনা : শিক্ষা বিভাগে এখন আর ‘ভেকেশন বিভাগ’ নয় বাস্তবে। গ্রীস্মের আলাদা কোন ছুটি নেই। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় এই ছুটি থাকে। শীতকালীন ছুটিতেও পরীক্ষা থাকে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সাপ্তাহিক ছুটি দুইদিন করা হয়। কিন্তু বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিভাগে ১ দিন শুধু শুক্রবার ছুটি। স্বাস্থ্য বিভাগ সহ সকল বিভাগ প্রতি ১১ দিনে ১ দিন পূর্ণ গড় বেতনে অর্জিত ছুটি পান। কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রতি ১২ দিনে অর্ধ গড় বেতনে ছুটি পান। অথচ গত ২০ বছর ধরে বছরে ৫২ দিন বেশি কাজ করছেন শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ। এছাড়া বছরের প্রায় অর্ধেক শুক্রবার বিভিন্ন নিয়োগ ও পেশাগত পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করেন সরকারি কলেজের শিক্ষকগণ। এসব বিবেচনায় ৬/৬/২০১৩ তারিখ আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় শিক্ষা ক্যাডারের পূর্ণ গড় বেতনে অর্জিত ছুটির বিষয়টি অনুমোদিত হয়। আশা করি ভূতাপেক্ষভাবে পূর্ণগড় বেতনে অর্জিত ছুটির বিষয়টি কার্যকর করা হবে। শিক্ষা ক্যাডারে ২৪ দিনে ১ দিন অর্জিত ছুটি থাকায় কর্মকর্তারা পিআরএন এর সময় আর্থিক ক্ষেত্রে মারাত্মকভাবে বঞ্চিত হন। অন্যান্য ক্যাডার কর্মকর্তারা যেখানে চাকরির শেষ দিকে হিসাব করে করে অর্জিত ছুটি ভোগ করে পর্যাপ্ত ছুটি হাতে রাখেন, সেখানে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাগণ কোন অর্জিত ছুটি ভোগ না করেও পিআরএন এর সময় ১৮ মাসের মূল বেতনের স্থলে মাত্র ৮ বা ৯ মাসের মূল্য বেতন পান, (সা’লাম গ্রান্ট নামে পরিচিত) অর্থাৎ একজন প্রফেসর যদি ৭০ হাজার টাকা মূল বেতনে পিআরএন-এ যান এবং অন্যান্যদের তুলনায় ১০ মাসের মূল বেতন কম পান, তাহলে তার নীট ক্ষতি ৭ লক্ষ টাকা। আরেকটি বিষয় উল্লেখ করার মতো। অন্যান্য ক্ষেত্রের কর্মকর্তাগণ প্রতি তিন বছরে একবার ১৫ দিনের প্রাপ্তি বিনোদন ছুটি ভোগ করেন। কিন্তু শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাগণ এটা ভোগ করেন না, সমন্বয় করা হয় তাদের ছুটি। উপর্যুক্ত সব বিবেচনায় আবারও আশা করছি এ ব্যাপারে আশু ব্যবস্থা নেয়া হবে।
৩. গ্রেড উন্নয়ন : বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বাদ দিলাম। মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, কৃষি কলেজের অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকগণ শিক্ষা ক্যাডারের একই স্তরের কর্মকর্তাদের তুলনায় একধাপ উচ্চতর গ্রেডে বেতন পান। এই বৈষম্য দূর করে গ্রেড উন্নয়নের সবিনয় আবেদন জানাচ্ছি।
অত্যন্ত সংবেদনশীল মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা সচিব মহোদয়ের নেতৃত্বে শিক্ষা প্রশাসন অবগত আছেন, ২০০৬ সাল থেকে পার্শ্ব প্রবেশ বা ‘লেটারাল এন্ট্রি’ আছে এমন ক্যাডারের নিয়মে শিক্ষা ক্যাডারে পদোন্নতি না দেয়া, যারা সিনিয়র স্কেল পাস না করে ১৫ বছরে পদোন্নতি পেয়েছেন তাদের সর্বোচ্চ সহযোগী অধ্যাপক পদে না রেখে এমার্জন দিয়ে অধ্যাপক করা, যারা বিভাগীয় ও সিনিয়র স্কেল কোন পরীক্ষা না দিয়ে ৫০ বছরে প্রথম পদোন্নতি পেয়েছেন তাদেরকেও এমার্জনে অধ্যাপক করার কারণে শত শত যোগ্য কর্মকর্তা যথাসময়ে পদোন্নতি পাননি। আশা করি পর্যাপ্ত সংখ্যক পদ সৃষ্টি করে বা পদ সৃষ্টিতে বিলম্ব হলে পদের অতিরিক্ত পদোন্নতি দিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে কর্মরত কর্মকর্তাদের হতাশা দূর করা হবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, এম.সি কলেজ, সিলেট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • দেশীয় চ্যানেল দর্শক হারাচ্ছে কেন?
  • বিশ্ব বরেণ্যদের রম্য উপাখ্যান
  • আশুরা ও কারবালার চেতনা
  • জলবায়ু পরিবর্তন ও সংকটাপন্ন বন্যপ্রাণী
  • অধ্যাপক ডাক্তার এম.এ রকিব
  • শিশু নির্যাতন ও পাশবিকতা
  • প্রবীণদের প্রতি নবীনদের কর্তব্য
  • রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে আগস্টের শোকাবহ ঘটনাবলী
  • সংযোগ সেতু চাই
  • টিবি গেইট ও বালুচরে ব্যাংকিং সুবিধা চাই
  • হাসান মার্কেট জেল রোডে স্থানান্তর হোক
  • ২৭নং ওয়ার্ডের কিষণপুর-ঘোষপাড়ার রাস্তা মেরামত প্রসঙ্গে
  • প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
  • দেশীয় রাবার শিল্প বাঁচান
  • পরিবর্তিত হও : ছকের বাইরে ভাবো
  • শিক্ষা ও চিকিৎসায় প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ
  • কতটা ভালোবাসি দেশ?
  • রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান আন্তর্জাতিক চাপেই সম্ভব
  • শুধু একবার বলুন : আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি
  • Developed by: Sparkle IT