উপ সম্পাদকীয়

সৈয়দ মুজতবা আলী

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৯-২০১৮ ইং ০০:১৪:২৫ | সংবাদটি ১৭ বার পঠিত

সাহিত্যের অন্যতম ঔপন্যাসিক, গল্পকার, অনুবাদক ও রম্য রচয়িতা সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্ম ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের ১৩ সেপ্টেম্বর অবিভক্ত ভারতের আসামের অন্তর্ভুক্ত সিলেটের করিমগঞ্জে। তার পিতা খান বাহাদুর সৈয়দ সিকান্দার আলী ও মাতা আয়তুল মান্নান খাতুন। তার পৈতৃক ভিটা হবিগঞ্জে। ভ্রমণ কাহিনীর জন্য, বিশেষভাবে জনপ্রিয় বহুভাষাবিদ মুজতবা আলীর রচনা একই সঙ্গে বৈদগ্ধ ও রম্যরসে পুরিপুষ্ট।
সৈয়দ মুজতবা আলীর শিক্ষার হাতে খড়ি সুনামগঞ্জ শহরের পাঠশালায় ১৯০৮ সালে। পিতার বদলির চাকুরির সুবাদে তার প্রাথমিক শিক্ষা জীবন কাটে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। ১৯১৫ সালে ভর্তি হন মৌলভীবাজার হাইস্কুলে, পরের বছর সিলেট হাইস্কুলে ভর্তি হন ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে। ১৯২১ সালে তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছে শান্তি নিকেতনে যান পড়াশুনা করতে। তিনি ছিলেন বিশ্বভারতীর প্রথম দিকের ছাত্র, এখানে তিনি সংস্কৃতি, ইংরেজি, ফারসি, আরবি, হিন্দি, গুজরাটি, ফরাসি, জার্মান ও ইটালীয় ভাষা শিক্ষা লাভ করেন। ১৯২৬ সারে তিনি এখান থেকে ¯œাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি উচ্চ শিক্ষার্থে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শেষে তিনি ১৯২৭ থেকে ২৯ সাল পর্যন্ত কাবুলের একটি কলেজে অধ্যাপনা করেন। সেখানে তিনি ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার শিক্ষক ছিলেন। ১৯২৯ সালে দর্শন শাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য জার্মান সরকারের বৃত্তি নিয়ে বন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে গবেষণার জন্য ১৯৩২ সালে তিনি ডিফিল ডিগ্রি লাভ করেন। বন ছাড়াও তিনি ইউরোপের বার্লিন, প্যারিস এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন। ১৯৩৪ সালে এক বছরের জন্য তিনি কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশোনা করেন।
উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে ১৯৩৫ সালে তিনি বরোদার মহারাজার আমন্ত্রণে বরোদা কলেজে ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এখানে তিনি আট বছর কাটান। এরপর দিল্লিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন। কিন্তু সরকারি কাজে মন না বসায় তিনি কলকাতায় আসেন এবং বন্ধুবর আবু সায়ীদ আয়ুবের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। গৌরী-আয়ুব দম্পতির সঙ্গে দক্ষিণ ভারত ভ্রমণকালে তিনি দেশ পত্রিকায় তার বিখ্যাত ভ্রমণ কাহিনী দেশে-বিদেশে লিখতে শুরু করেন। লেখাটি ১৯৪৮ সালের মার্চ সংখ্যা থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করে।
দেশভাগ পরবর্তীকালে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের বগুড়ার আজিজুল হক কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন কিন্তু নানা প্রতিকুলতায় সেখানে থাকতে পারেননি। কলকাতায় ফিরে গিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাডিজ বিভাগের খন্ডকালীন প্রভাষকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৫০ থেকে ৫২ সাল পর্যন্ত দিল্লির ইন্ডিয়ান কাউন্সিলর ফর কালচারাল রিলেশনস-এর সচিবের পদ অলংকৃত করেন। এ সময় তিনি সাফায়াত উল হিন্দ নামে একটি আরবি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। ১৯৫৩ সালে বোনদের পীড়াপীড়িতে শিক্ষাবিদ রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন।
পঞ্চাশের দশকে তিনি কিছুদিন আকাশবাণীর স্টেশন ডিরেক্টরের দায়িত্ব নিয়ে পাটলী, কঠক, কলকাতা এবং দিল্লীতে কাটান। ১৯৬১ সালে তিনি শান্তি নিকেতনে ফিরে বিশ্বভারতীর ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের রিডার পদে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালে জ্যেষ্ঠ সন্তান ফিরোজকে শান্তি নিকেতনে নিয়ে আসেন এবং পাঠ ভবনে ভর্তি করে দেন। কিন্তু ১৯৫৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে ফিরোজকে পাকিস্তানে পাঠাতে বাধ্য হন। তার স্ত্রী তখন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তা। ১৯৬৫ সালে তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
শান্তি নিকেতনে পড়ার সময় মুজতবা আলী বিশ্বভারতীয় নামে হাতে লেখা পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। পরবর্তীকালে সত্যপীর, ওমর খৈয়াম, টেকচাঁদ, প্রিয়দর্শী প্রভূতি ছন্দনামে দেশ, আনন্দবাজার, বসুমতি, সত্যযুগ, মোহাম্মদী প্রভৃতি পত্রিকায় কলাম লিখতেন। বহুদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন অনবদ্য সব ভ্রমণ কাহিনী। এছাড়াও লিখেছেন ছোটগল্প, উপন্যাস, রম্য রচনা। বিভিন্ন ভাষা থেকে শ্লোক ও রূপকের যথার্থ ব্যবহার, হাস্যরস সৃষ্টিতে পারদর্শিতা এবং এর মধ্য দিয়ে গভীর জীবন কষ্ট ফুটিয়ে তোলার অনায়াস দক্ষতায় তিনি বাংলা সাহিত্যে এক বিশেষ মর্যাদার আসন অধিকার করে নেন। তার রচিত বইয়ের সংখ্যা ৩০। তার ভ্রমণ কাহিনী, উপন্যাস ও রম্য রচনার মধ্যে দেশে-বিদেশে, জলে ডাঙ্গায়, অবিশ্বাসী, শনবম, চাচা কাহিনী, টুনিমেম, শহরইয়ার, পঞ্চতন্ত্র, ময়ুরকণ্ঠী উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর তিনি ১৯৭২ সালে স্ত্রীর সঙ্গে বসবাসের জন্য ঢাকায় চলে আসেন। থাকতেন ধানমন্ডির ১ নম্বর সড়কে। তাদের দুই পুত্র সন্তান-সৈয়দ মোশারফ আলী (ফিরোজ) ও সৈয়দ জগলুল আলী। ঢাকায় আসার কিছুদিনের মধ্যে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ জনিত কারণে তার শরীরের একাংশ অবশ হয়ে যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসায় উন্নতি না হওয়ায় তাকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখানেই ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজিমপুর কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।
বহুভাষাবিদ, পন্ডিত, হাস্যরসিক, তুমুল আড্ডাবাজ এই লেখক খ্যাতির তুলনায় স্বীকৃতি পেয়েছেন সামান্যই। ২০০৫ সালে মরণোত্তর একুশে পদক ছাড়া ১৯৫১ সালে তিনি আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। এর আগে ১৯৪৯ সালে পেয়েছিলেন একমাত্র নরসিং দাস পুরস্কার।
আজ এই ক্ষণজন্মা সাহিত্যিকের শুভ জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করি বিন¤্র শ্রদ্ধায়।
লেখক : কবি।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে আগস্টের শোকাবহ ঘটনাবলী
  • সংযোগ সেতু চাই
  • টিবি গেইট ও বালুচরে ব্যাংকিং সুবিধা চাই
  • হাসান মার্কেট জেল রোডে স্থানান্তর হোক
  • ২৭নং ওয়ার্ডের কিষণপুর-ঘোষপাড়ার রাস্তা মেরামত প্রসঙ্গে
  • প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
  • দেশীয় রাবার শিল্প বাঁচান
  • পরিবর্তিত হও : ছকের বাইরে ভাবো
  • শিক্ষা ও চিকিৎসায় প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ
  • কতটা ভালোবাসি দেশ?
  • রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান আন্তর্জাতিক চাপেই সম্ভব
  • শুধু একবার বলুন : আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি
  • শরৎকাল
  • বাংলাদেশের সঠিক জনসংখ্যা কত?
  • বিশ্ব-বরেণ্যদের উপাখ্যান আতাউর রহমান
  • মিয়ানমারের একগুঁয়েমি ও মিথ্যাচার
  • টেলিকমিউনিকেশন দৌড়ে বাংলাদেশ ইতিহাস গড়লো
  • সড়কপথে শৃঙ্খলা কত দূর?
  • বৃক্ষসখা দ্বিজেন শর্মা
  • নারীদের জন্য নিরাপদ হোক গণপরিবহন
  • Developed by: Sparkle IT