শিশু মেলা

কবর

জসীম আল ফাহিম প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৯-২০১৮ ইং ০০:২০:৪৪ | সংবাদটি ১০ বার পঠিত

সুরক্ষিত দেয়াল ঘেরা বহু যুগের পুরোনো একটি কবরস্থান। কয়েকশো বছর আগে একজন আউলিয়াকে এখানে সমাহিত করা হয়। তারপর একজন দু’জন করে কত হাজার মানুষকে যে এখানে দাফন করা হয়েছে, হিসাব নেই। সবাই কামনা করে, ওলির কবরের পাশে তার নিজের অন্তিমশয্যাটা হোক। কারণ ওলি সাহেব আল্লাহপাকের প্রিয় বান্দা। বেহেশত থেকে আল্লাহপাকের রহমতের হাওয়া তাঁর কবরে বর্ষিত হয়। তাই ওলি সাহেবের কবরের পাশে কারও কবর দেয়া হলে বেহেশতি রহমতের হাওয়া তার কবরেও এসে লাগবে। বেহেশতি রহমতের হাওয়া মানে শান্তির সুবাতাস। অন্তিমশয্যায় সকলেই চিরশান্তিতে থাকতে চায়।
জিতুর বাবা দীর্ঘদিন মরণব্যাধি ক্যান্সারে ভোগেন। দিনপাঁচেক আগে তিনি হঠাৎ মারা যান। বাবার মৃত্যুতে জিতুদের পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে। জিতু, তার বড়ো ভাই সেতু এবং তাদের মাকে নিয়ে ছোটোখাটো সংসার। বাবার মৃত্যুর পর জিতুদের দু’ভাইয়ের মধ্যে দিশেহারা ভাব লক্ষ করা যায়। কী যে তারা করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। এমন সময় তাদের বাড়িতে পাড়াপ্রতিবেশি কিছু লোকসমাগম হয়। মুরব্বি গোছের একজন লোক সেতুকে জিজ্ঞেস করে, তোমার বাবা কি কোনো অসিয়ত রেখে গেছেন?
সেতু বলে, অসিয়ত মানে কী চাচা?
মুরুব্বি বলেন, অসিয়ত মানে হলো অন্তিম ইচ্ছা। কোথায় তাকে দাফন করা হবে তোমাদের কিছু বলে গেছেন নাকি?
মুরব্বির কথা শুনে সেতু বলে, এ ব্যাপারে তো বাবা আমাকে কোনো কিছু বলে যাননি।
পরে মুরব্বিটি বলেন, তাহলে তো বিরাট সমস্যা। এক কাজ করো তুমি। তোমার মাকে গিয়ে একবার জিজ্ঞেস করে এসো। উনাকে কিছু বলে গিয়ে থাকতে পারেন।
পরে সেতু ঘরের ভেতর মায়ের কাছে যায়। গিয়ে মাকে বলে, মা। বাবাকে কোথায় দাফন করা হবে এ ব্যাপারে তোমাকে কি কিছু বলে গেছেন?
সেতুর মা বলে, হ্যাঁ বাবা বলে গেছে।
সেতু বলে, কী বলে গেছেন?
মা বলেন, বলে গেছেন আমরা যেন তাকে ওলি সাহেবের মাজারের পাশে দাফন করি।
মায়ের কথা শুনে সেতু বলে, ঠিক আছে মা। পরে সে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মুরব্বিটির কাছে তার মায়ের কথাটা জানায়। শুনে মুরব্বি বলেন, ঠিক আছে। তাই করা হবে।
পরে সকলে মিলে সেতুর বাবাকে ধরাধরি করে ঘর থেকে উঠোনে নিয়ে আসেন। উঠোনের কোনে কালো চাদর বেষ্টনি দিয়ে একটি মঞ্চ গড়া হয়। সেই মঞ্চে সেতুর বাবাকে শোয়ানো হয়। একজন বয়স্ক মতন লোক বরই পাতা চুবানো গরম জল দিয়ে খুব যতœসহকারে সেতুর বাবাকে শেষ গোসল করান। গোসল শেষ হলে পরিস্কার একটি নতুন তোয়ালে দিয়ে মৃতের ভেজা শরীরটা ভালো করে মুছে দেন। মোছার পর শরীরটাকে তিন টুকরো সাদা কাপড় দিয়ে জড়ান। পা, বুক ও মাথার কাছের কাপড়ে শক্ত গিঁট দেন। আতর, গোলাপজল ছিটিয়ে দেন। তারপর একটি স্টিলের খাটকিতে নিয়ে শোয়ান। খাটকির সামনের হাতলে দু’জন এবং পেছনের হাতলে আরও দু’জন করে মোট চারজন লোক ধরাধরি করে কাঁধে চড়ান। তারপর তারা ধীর পায়ে হেঁটে জিতু-সেতুর বাবাকে ওলি সাহেবের মাজারের কাছে নিয়ে যান। মাজারের সাথেই একটি বড়ো মসজিদ। মসজিদ প্রাঙ্গণে হাজারো লোকের উপস্থিতিতে জিতুর বাবার নামাজে জানাজা পড়ানো হয়। নামাজে জানাজা শেষ হলে বাবার জন্য খোঁড়া নির্ধারিত কবরে নিয়ে শুইয়ে দেয়া হয়। তারপর সারি করে বাঁশের ফালি দিয়ে কবরটা ঢেকে দেয়া হয়। বাঁশের ফালির ওপর বৃষ্টি গড়িয়ে পড়ার জন্য মাটি ফেলে কবরের বুকের দিকটা উঁচু এবং চারপাশটা ঢালু করে দেয়া হয়। সে সময় কবরের চার কোনায় চারজন লোক চারটি খুঁটি পুঁতে দেন। খুঁটিতে হাত রেখে প্রত্যেকেই পবিত্র কোরান শরিফের একটি করে নির্দিষ্ট সুরা ভক্তি সহকারে মনে মনে পাঠ করেন। তারপর সকলেই কবরের পাশ থেকে ৪০ কদম দূরে সরে আসেন। সঙ্গে আসা মুরব্বিটি সকলকে নিয়ে জিতু-সেতুর বাবার জন্য কিছুসময় দোয়া করেন। দোয়া শেষ হলে তারা জিতু-সেতুকে সান্ত¦না দিয়ে যে যার মতো বাড়ি ফিরে আসেন।
পরদিন খুব ভোরে জিতু এবং সেতু তাদের বাবার কবরের পাশে যায়। কবরের পাশে গিয়ে তারা কিছুসময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। বাবার রুহের মাগফিরাতের জন্য তারা কিছু দোয়া-আসকার করে। দোয়া শেষ হলে তারা সেদিনের মতো বাড়ি ফিরে আসে।
তৃতীয় দিন জিতু একাকী বাবার কবরের পাশে যায়। সে কবরের পায়ের দিকে ছোটো একটি গর্ত দেখতে পায়। কবরে আচানক গর্ত দেখে সে থমকে যায়। অবাক হয়ে জিতু ভাবতে থাকে, কীভাবে গর্তটি হয়েছে? এটা কি শিয়ালে করেছে? নাকি অন্য কিছুতে?
পরক্ষণে সে ভাবে, শিয়াল তো গর্ত করার কথা নয়। কারণ কবরস্থানটি জনবহুল এলাকায় অবস্থিত। শিয়াল থাকে গভীর জঙ্গলে। এমন জনবহুল স্থানে শিয়াল আসার কথা নয়। জিতু যখন অবাক হয়ে এসব ভাবছে। সে সময় সেতুও বাবার কবরের পাশে আসে। এসে দু’ভাই মিলে কবরের গর্তটি দেখতে থাকে। সে সময় তারা দেখতে পায়, দু’টো বড়োসড়ো নেউল দ্রুতবেগে তাদের পাশ কেটে দৌড়ে পালাচ্ছে। নেউল দেখে সেতু বলে, এটা আসলে নেউলেরই কাজ। রাতের আঁধারে এসে ওরা হয়তো কবরের গায়ে গর্ত করে। পরে দু’ভাই মাটি দিয়ে ভালো করে গর্তটি বন্ধ করে দেয়।
চতুর্থদিন জিতু ও সেতু বাবার কবরের পাশে গিয়েও একই ব্যাপার দেখতে পায়। আজকের গর্তটি আগের চেয়ে অনেক বড়ো। গর্তের মুখে কালো রঙের ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র অনেক পোকা ওড়াওড়ি করছে। জিতু আশপাশ থেকে কিছু ইটের টুকরো এবং মাটি এনে গর্তটি বন্ধ করতে লেগে যায়। গর্তটি বন্ধ করতে করতে জিতু বলে, নেউলেরা বোধ হয় বাবার শরীর থেকে গোশত খেতে আসে। কিন্তু আমি কিছুতেই তা হতে দেবো না। কক্ষনো না। পরে আগের মতোই গর্তটি বন্ধ করে দু’ভাই বাড়ি ফিরে আসে।
পঞ্চমদিন দু’ভাই আবার বাবার কবরের পাশে যায়। গিয়ে দেখে সেদিনও গর্ত তৈরি করা হয়ে গেছে। পরে মন খারাপ করে দু’ভাই মাটি দিয়ে গর্তটির মুখ বন্ধ করতে থাকে। গর্ত বন্ধ করতে করতে জিতু অসহায়ভাবে বলে, ভাইয়া দেখছÑনেউলেরা আমাদের বাবাকে খেয়ে ফেলছে! কী করি এখন বলো তো? নেউলকে ফেরাই কেমন করে? তারপর জিতু একটু দম নিয়ে বলে, চলো না সবকটা নেউলকে আমরা ধরে মেরে ফেলি।
জিতুর আবেগময় কথা শুনে সেতু বলে, দেখছিস তো এখানে কয়েকশো নেউলের বসবাস। আমরা আর কয়টাকে মারতে পারব রে বোকা?
বড়ো ভাইয়ের কথা শুনে জিতু বলে, ভারি চিন্তার বিষয় তো! বলে সে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে।
ছোটো ভাইটির কান্না দেখে সান্ত¦না দিয়ে সেতু বলে, কাঁদিস না তো ভাই। মনকে শক্ত করে বাঁধ। আর মন দিয়ে আমার কথা শোন। আমাদের বাবার শরীরে এখন আর প্রাণ নেই। বাবার মৃত দেহটাকেই তো নেউলগুলো খাচ্ছে। ক্ষুধার্ত যখন ওরা, খাক না।
সেতুর কথা শুনে জিতু কান্না থামিয়ে বলে, ভাইয়া! তুমি এটা কেমন কথা বললে? বাবার শরীরে প্রাণ নেই বলে কি সামান্য নেউল তার গোশত খাবে নাকি? এটা আমি মানতে পারব না ভাইয়া। বলে সে আবারও কাঁদতে থাকে।
ছোটো ভাইটির কান্না থামাতে সেতু তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। বলে, আমি ঠিক কথাই তো বলেছি রে ভাই। মরে গেলে আসলে মানুষের কোনো কিছু করার থাকে না।
বড়ো ভাইটির কথা শুনে জিতু বলে, কিন্তু তারপরও তো আমাদের বাবা একজন মানুষ। সৃষ্টির সেরা জীব। আর নেউল হলো ছোটোখাটো জন্তু মাত্র। সামান্য জন্তু হয়ে তারা মানুষের শরীরে কামড় বসাবে। কী সাংঘাতিক কথা! ভাবতে পারো ভাইয়া।
সেতু এবার ছোটো ভাইটিকে সান্ত¦না দেয়। একটু দম নিয়ে বলে, তুই আমাদের বাবার মৃত শরীর থেকে ক্ষুধাক্লিষ্ট নেউলগুলোর কয়েক টুকরো গোশত খাওয়া দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিস ভাই! অথচ কবরের ভেতর খোঁজ নিলে দেখা যাবে বাবার দেহটাতে এখন কোটি কোটি কীটপতঙ্গ এসে ভাগ বসিয়েছে। ইচ্ছেমতো তারা বাবার মৃত দেহটাকে কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে। এমন ঘটনা শুধু আমাদের বাবার বেলা নয়, পৃথিবীর সকল মৃত প্রাণীর বেলাতেই ঘটে। সকল প্রাণীর বেলাতেই এটা সত্যি। আজ যারা মজা করে অন্যকে খাচ্ছে, একদিন তারাও অন্যের খাবারে পরিণত হবে। এটাই পৃথিবীর নিয়ম। নিয়মের বাইরে সৃষ্টিজগতে কোনো কিছু নেই।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT