উপ সম্পাদকীয়

শিক্ষাবিদ আব্দুল মুকিদ

এ এইচ এম ফিরোজ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৯-২০১৮ ইং ০০:৫১:০৭ | সংবাদটি ৩১৮ বার পঠিত

আব্দুল মুকিদের অকাল মৃত্যুতে বিশ্বনাথসহ দেশ-বিদেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শিক্ষাবিদ আব্দুল মুকিদকে হারিয়ে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু- বান্ধব শোকাহত। গত ১৯ আগস্ট রোববার বিশ্বনাথ উপজেলার দেওকলস দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আব্দুল মুকিদ মধুবন সুপার মার্কেটে হিস্ট্রোকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তিনি জোহরের নামাজ পড়ার জন্য মধুবন সুপার মার্কেটের সিড়ি বেয়ে ৪র্থ তলায় উঠে এক পা মসজিদের ভেতর ঢুকে পুনরায় নিচে ফিরে এসে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সাথে সাথে তাঁকে চিকিৎসকের নিকট নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ঐদিন রাত ৯টায় দেওকলস দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজ মাঠে তাঁর জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।
অধ্যক্ষ আব্দুল মুকিদ ১৯৭০ সালের ২৭ মার্চ সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দেওকলস ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী কান্দিগাঁও গ্রামের এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মো: আব্দুল বারি, মাতার নাম শিরিয়া বেগম। ৫ ভাই বোনের মধ্যে আব্দুল মুকিদ ছিলেন সবার বড়।
আব্দুল মুকিদ কান্দিগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রেণী, এবং দেওকলস দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে সিলেট সরকারি কলেজে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হন। তাঁর পর তিনি উদ্ভিদ বিজ্ঞানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স শেষ করে ১৯৯৬ সালে দেওকলস দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি সারা বাংলাদেশের মধ্যে সেরা প্রতিষ্ঠানের গৌরব অর্জন করে। এবং তিনি শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন।
ছোট বেলা থেকেই আব্দুল মুকিদ শান্ত প্রকৃতির লোক ছিলেন। তিনি একেবারে সহজ সরল জীবন-যাপন করেছেন। তিনি কথা বলতেন কম শুনতেন বেশি। তাঁর অসীম ধৈয্য শক্তি ছিল। নীতি-নৈতিকতা মানবতা পরোপকার ছিল তাঁর চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট। তিনি ছিলেন নির্লোভ ও প্রচারবিমুখ। আর্থিক অনেক সুবিধা পেয়েও তিনি এ প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করে যাননি। বিশ্বনাথ মাধ্যমিক পাবলিক পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধ ও সরকারের সকল নিয়ম-কানুন পালনে ছিলেন অনড়। তিনি একজন সংকৃতিমনা মানুষ ছিলেন। প্রতি বছর শীতকালে বিদ্যালয় মাঠে ৩ দিন ব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন।
আব্দুল মুকিদ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হৃদয় দিয়ে লালন পালন করতেন এবং তিনি মুক্তিযুদ্ধের হারিয়ে যাওয়া তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করতেন। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। মহাকবি ইসহাক রেজা চৌধুরী, বঙ্গবন্ধুর অন্যতম সহচর যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মরহুম গাউছ খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম ইফতেখার হোসেন শামীম, সিরাজুল ইসলাম বীর প্রতীক অনেক গুণী লোকের জন্ম এ ইউনিয়নে। তিনি তাদের জীবনাচার ও নীতি নৈতিকতাকে অনুসরণ করে অজোপাড়াগায়ে জন্ম নেয়া মানুষটি অকালে হারিয়ে যাবেন তা কেউ ভাবতে পারেনি।
অধ্যক্ষ আব্দুল মুকিদ বয়সে আমার ছোট হলেও জ্ঞানেগুণে শিক্ষা-দীক্ষায়, আচার ব্যবহারে ছিলেন অনেক দূর এগিয়ে। প্রায় ৩০ বছরের চলা ফেরার জীবনে আব্দুল মুকিদকে নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। মৃত্যুর প্রায় সপ্তাহখানেক পূর্বে সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলম খায়েরের বিবাহ সংক্রান্ত বিষয়ে আমার বাসায় এক বৈঠকে আব্দুল মুকিদ ৫ তলা সিড়ি বেয়ে এসে প্রচুর ঘামছিলেন এবং বলছিলেন এত কষ্ট দিয়ে আমাকে উপরে তুলে আপনার লাভ কী? উত্তরে আমি বলেছিলাম, তুমি শিক্ষিত হয়েছ পরের জন্য, নিজের জন্য নয়। তোমার শরীরের ওজন বেশি হয়েছে, উচ্চ রক্তচাপের সম্ভাবনা। চিকিৎসা না করালে সন্তানগুলোকে এতিম করে চলে যাবে। কাল থেকে নিজের শরীরের প্রতি খেয়াল রাখবে। আমার মুখ ফসকে গিয়ে এসব কথা বলেছিলাম। এ দিনই তাঁর সাথে আমার জীবনের শেষ কথা হয়েছিল।
১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে সিলেট-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ আজিজুর রহমান। সেই নির্বাচনে প্রচারের একমাত্র হাতিয়ার ছিল, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং এক সময় সিলেটে পাকিস্তানের তথা কথিত লৌহমানব আইয়ুব খানকে শাহ আজিজুর রহমান জুতা নিক্ষেপ করেছিলেন। এমন প্রচারণায় শাহ আজিজ নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের খুব কম সংখ্যক লোক প্রচারণায় যুক্ত হয়েছিলেন। দেওকলস ইউনিয়নে প্রচারকালীন সময়ে আমি অধ্যক্ষ আব্দুল মুকিদ, আজম খান (যুক্তরাজ্য প্রবাসি), খলিলুর রহমান ও সমসিদ খান (যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসি) সহ অনেকেই ছিলেন। আমি আযম খানের বাড়িতে ৩ দিন রাত্রী যাপনও করেছিলাম। শেষ দিনটি ছিল শুক্রবার। ফজরের নামাজের পর থেকে শাহ আজিজকে নিয়ে ঘরে ঘরে ভোট চেয়ে জুমার নামাজের সময় কান্দিগ্রাম মসজিদে এসে সমবেত হই। এ সময় শাহ আজিজুর রহমানের দুই পা দিয়ে প্রচুর রক্ত ঝরছিল। আমার পেন্ট ছিড়ে যায় এবং আব্দুল মুকিদের জুতা কোথায় পড়ে ছিল তার কোন খবর ছিলনা। আব্দুল মুকিদ তখন শাহ আজিজের দু’পায়ের রক্ত নিজ হাতে মুছে দিয়ে তাঁকে নামাজ পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এমন ঘটনা মসজিদের অনেকেই দেখছিলেন। নিরহঙ্কার এ মানুষটি মৃত্যুর পর বার বার এই স্মৃতি স্মরণ হচ্ছে। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান দেখিয়ে আব্দুল মুকিদ নিজেই সম্মানী হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের কোন বৈঠকে বসলে সবাই তাঁর মুখের দিকে চেয়ে থাকতেন। তিনি মূল্যবান কথা বলতেন। দেওকলস স্কুল এন্ড কলেজকে তিলে তিলে নিজের মত করে গড়ে ছিলেন প্রতিষ্ঠানটিকে। তাঁর এ শুন্যতায় প্রতিষ্ঠানটি যাতে কোন ক্ষতি না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে এলাকাবাসীকে। তাঁর এতিম সন্তানগুলোর খোঁজ খবর রাখলে কৃতজ্ঞ থাকব। পরিশেষে শিক্ষাবিদ আব্দুল মুকিদের বিদেহী আত্মার শান্তি ও মাগফিরাত কামনা করছি।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • লেবানন : চলমান গণবিক্ষোভের লক্ষ্য ও পরিণতি
  • ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ বিতর্ক
  • ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের ইতিকথা
  • শিক্ষক পেটানোর ‘বিদ্যাচর্চা’
  • অভিযান যেন থেমে না যায়
  • পেঁয়াজ পরিস্থিতি হতাশার
  • ইরান-আমেরিকা সংকট ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়
  • জোসনার শহরের কবি
  • সড়ক পরিবহন আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি
  • প্রসঙ্গ : ট্রেন দুর্ঘটনা
  • মাদকের ভয়াবহতা
  • জাদুকাটা সেতু ও পর্যটন প্রসঙ্গ
  • বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি প্রসঙ্গ
  • রাজনীতির গুণগত মান নিয়ে প্রত্যাশা
  • উন্নয়নের রোল মডেল
  • সড়ক দুর্ঘটনা : পরিত্রাণের উপায়
  • নিম্বার্ক দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা
  • ‘...আমি তোমাদেরই লোক’
  • বায়ু দূষণ
  • মানবতার কল্যাণে মহানবী
  • Developed by: Sparkle IT