উপ সম্পাদকীয়

রাইড শেয়ারিং নিয়ে কিছু কথা

আমিনুল ইসলাম মিলন প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৯-২০১৮ ইং ০০:৫৩:৫৩ | সংবাদটি ৯ বার পঠিত

নগর পরিবহনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলায় সরকার বছর দুই আগেই অনানুষ্ঠানিকভাবে রাইড শেয়ারিং সার্ভিস অনুমোদন করেছিলেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা ২০১৭’ অনুমোদনের মাধ্যমে রাজধানী তথা সমগ্র বাংলাদেশে রাইড শেয়ারিং সার্ভিসকে আনুষ্ঠানিক আইনগত ভিত্তি প্রদান করা হলো। এ নীতিমালা ৮ মার্চ, ২০১৮ থেকে কার্যকর হয়েছে।
রাইড শেয়ারিং একটি প্রাচীন পরিবহন ব্যবস্থাপনা। এককালে বাংলাদেশে খেয়া পারাপারকে রাইড শেয়ারিং-এর আদিম সংস্করণ বলা যেতে পারে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো সাইকেল-মোটরসাইকেলে ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করা হয়, যা রাইড শেয়ারিং-এর আরেক চিত্র। কিন্তু অ্যাপসের মাধ্যমে যাত্রীর চাহিদা অনুযায়ী পরিবহন ব্যবস্থা রাইড শেয়ারিং একটি আধুনিক পরিবহন কার্যক্রম যা ইতোমধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রানসিস্কো শহরভিত্তিক রাইড শেয়ারিং কোম্পানি ‘উবার’ ঢাকায় যাত্রা শুরু করে ২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর। অতি দ্রুত এটি জনপ্রিয়তা পায়। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে যেখানে মাত্র ১০ হাজার যাত্রী পরিবহন করা হয়, সেটি মাত্র ১০ মাসের মাথায় ২০১৭ সালের নভেম্বরে পৌঁছে ৫ লাখে। উবারের বিস্ময়কর সাফল্য দেখে দেশীয় অনেক প্রতিষ্ঠান এ ব্যবসা শুরু করে। অন্যদিকে ২০১৫ সালে মোটরসাইকেলের মাধ্যমে ই-ডেলিভারি কার্যক্রম শুরু করে ‘পাঠাও’ নামক একটি কোম্পানি। এর দেখাদেখি ঝযধৎব-ধ-গড়ঃড়ৎপুপষব বা ঝঅগ যাত্রা শুরু করে ৭ মে, ২০১৬। ছাত্র ও কর্মজীবী মানুষের মধ্যে ‘পাঠাও’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। মোটরসাইকেলের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে। ২০১০ সালে যেখানে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছিল ২.১০ লাখ, সেখানে এপ্রিল ২০১৮-তে তা ৫ লাখে পৌঁছে। শুধু ২০১৭ সালেই বিআরটিএ হতে ৭৫ হাজার ২৫১টি মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়।
এ পরিপ্রেক্ষিতে রাইড শেয়ারিংকে আইনগত ভিত্তি প্রদান করে সরকার একটি সময়োচিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এজন্য সরকার ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে নীতিমালাটি পড়ে কয়েকটি ধারাকে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়নি। যেমন, নীতিমালা ৫ (ক) ধারায় মোটরসাইকেল, মোটরকার, জিপ, মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সকে আওতাভুক্ত করা হলেও সিএনজিকে এর বাইরে রাখা হয়েছে। কিন্তু রাইড শেয়ারিং নীতিমালা ২০১৭-এর প্রণেতাগণ কেন সিএনজিকে এর আওতাভুক্ত করেননি, তা বিস্ময়ের ব্যাপার। এখনো সারা দেশে মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত জনগণের অন্যতম প্রধান বাহন সিএনজি অটোরিকশা। একটি সিএনজি অটোরিকশায় মোটামুটি একটি পরিবার ভ্রমণ করতে পারে বলে এর চাহিদাও বেশি। অন্যদিকে মোটরসাইকেলে মাত্র একজন ভ্রমণ করতে পারে। ফলে মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ভ্রমণের জন্য সিএনজি অটোরিকশাই প্রধান বাহন। কিন্তু এটিকে রাইড শেয়ারিং-এর আওতাভুক্ত করা হয়নি বলে যাত্রীসাধারণ রাইড শেয়ারিং-এর সুফল পাচ্ছেন না। অনতিবিলম্বে সিএনজি অটোরিকশাকে রাইড শেয়ারিং-এর অন্তর্ভুক্ত করা হোক। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, এ দেশের যাত্রীসাধারণ কখনোই সিএনজি অটোরিকশা হতে কাক্সিক্ষত যাত্রীসেবা পায়নি। সিএনজি-নৈরাজ্য সকল সীমা অতিক্রম করেছে। মিটারে না যাওয়া, মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া আদায়, ড্রাইভারদের মর্জিমতো যাওয়া-না যাওয়ার সিদ্ধান্ত, অসৌজন্যমূলক আচরণ যাত্রীসাধারণকে সুদীর্ঘকাল হতে ভোগাচ্ছে। যদি সিএনজি অটোরিকশাকে রাইড শেয়ারিং-এর আওতাভুক্ত করা হয় তাহলে এক্ষেত্রে নৈরাজ্য কমবে, শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
নীতিমালার ক (৯) ধারা অনুযায়ী একজন মোটরযান মালিককে মাত্র একটি মোটরযান পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটিও যুক্তিসঙ্গত নয়, বরং ক্রমবর্ধমান গণপরিবহন সংকট মোকাবিলায় উদ্যোক্তাদের অধিক সংখ্যক যানবাহনকে রাইড শেয়ারিং-এর অনুমতি প্রদান করা হলে এ খাতটি আরও শক্তিশালী হবে। নীতিমালার ক (১০) ধারা অনুযায়ী ব্যক্তিগত মোটরযান রেজিস্ট্রেশনের পরে এক বছর পার না হলে তা রাইড শেয়ারিং-এর অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। বাংলাদেশের বিশেষ করে রাজধানীর পরিবহন সংকটকে মাথায় রেখে এ ধারা পরিবর্তন করে সর্বোচ্চ ৬ মাস করা যেতে পারে।
ইতোমধ্যে রাইড শেয়ারিং সার্ভিস ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দিন দিন এর যাত্রীসংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে উবার, পাঠাও, সহজ, চাল-ডাল, পিকমি, রেইডার, ইজিয়ার, এসএম, মুভ প্রভৃতি কোম্পানি রাইড শেয়ারিং ব্যবসা পরিচালনা করছে। সম্প্রতি ওভাই ও ওবোন নামক একটি কোম্পানিও এ ব্যবসা শুরু করেছে। এ কোম্পানিগুলোর প্রায় সবারই মোটরগাড়ি ও মোটরসাইকেল রয়েছে। ওবোন সার্ভিসটি শুধু মেয়েদের জন্য চালু করা হয়েছে। নগর পরিবহনে রাইড শেয়ারিং এক ধরনের স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে। যদিও রাইড শেয়ারিং-এ উচ্চ ভাড়া এবং কিছু কিছু চালকের অসদাচরণের কারণে সমালোচনা হচ্ছে। তবে মোটরসাইকেল রাইড ‘পাঠাও’-এর ব্যাপারে সমালোচনা তীব্র। প্রথমত, আনাড়ি চালক, দ্বিতীয়ত, ট্রাফিক আইন না মানা, তৃতীয়ত, উচ্চ ভাড়া প্রভৃতি নিয়ে পাঠাও-এর ব্যাপারে অভিযোগ রয়েছে। মোটরসাইকেলের দুর্ঘটনার হারও বেশি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অপপরফবহঃ জবংবধৎপয ওহংঃরঃঁঃব-এর মতে, সকল ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের মধ্যে মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনার হার বেশি। তাই মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা লেন করা যায় কিনা, সরকার ভেবে দেখতে পারেন। রাইড শেয়ারিং-এর সকল যানবাহনকে ক্লোজ মনিটরিং-এর আওতায় আনা হোক। পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ করে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে রাইড শেয়ারিং-এর যানবাহনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা হোক। এ দেশের সড়কে কখনোই শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা যায়নি। কার, সিএনজি অটোরিকশাকে কখনোই মিটারে যেতে বাধ্য করা যায়নি। আর নগর পরিবহনে সিটি বাস সার্ভিসতো সকল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এ সপ্তাহে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার সাহেব ঢাকাবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন সেপ্টেম্বরের মধ্যে নগর পরিবহনে বিশেষ করে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধিত হবে। আমরা কমিশনার সাহেবের আশ্বাস অনুযায়ী একটি নিরাপদ, কার্যকর ও সাশ্রয়ী নগর পরিবহন ব্যবস্থা দেখতে চাই।
লেখক : সাবেক প্রধান তথ্য কর্মকর্তা।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে আগস্টের শোকাবহ ঘটনাবলী
  • সংযোগ সেতু চাই
  • টিবি গেইট ও বালুচরে ব্যাংকিং সুবিধা চাই
  • হাসান মার্কেট জেল রোডে স্থানান্তর হোক
  • ২৭নং ওয়ার্ডের কিষণপুর-ঘোষপাড়ার রাস্তা মেরামত প্রসঙ্গে
  • প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
  • দেশীয় রাবার শিল্প বাঁচান
  • পরিবর্তিত হও : ছকের বাইরে ভাবো
  • শিক্ষা ও চিকিৎসায় প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ
  • কতটা ভালোবাসি দেশ?
  • রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান আন্তর্জাতিক চাপেই সম্ভব
  • শুধু একবার বলুন : আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি
  • শরৎকাল
  • বাংলাদেশের সঠিক জনসংখ্যা কত?
  • বিশ্ব-বরেণ্যদের উপাখ্যান আতাউর রহমান
  • মিয়ানমারের একগুঁয়েমি ও মিথ্যাচার
  • টেলিকমিউনিকেশন দৌড়ে বাংলাদেশ ইতিহাস গড়লো
  • সড়কপথে শৃঙ্খলা কত দূর?
  • বৃক্ষসখা দ্বিজেন শর্মা
  • নারীদের জন্য নিরাপদ হোক গণপরিবহন
  • Developed by: Sparkle IT