ধর্ম ও জীবন

শিক্ষার্থীদের শাসন : ইসলামী দৃষ্টিকোণ

মাজহারুল ইসলাম জয়নাল প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৯-২০১৮ ইং ০১:০২:১০ | সংবাদটি ১২৪ বার পঠিত

আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনে জাতির কর্ণধার। একজন শিক্ষার্থীর কাছে তার শিক্ষক বা অভিবাবক হচ্ছেন আদর্শ বা মডেল। শিক্ষার্থীরা সাধারণত অনুকরণপ্রিয় হয়ে থাকে। শিক্ষক তার শিক্ষার্থীকে আদর্শবান মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। বিশেষ করে একজন শিক্ষার্থীকে শাসন করার ক্ষমতা শিক্ষকের অবশ্যই রয়েছে। তবে এই শাসন এর অর্থ এই নয় যে, তাকে বেত্রাঘাত, প্রহার, মানসিক আঘাত ইত্যাদি অসৌজন্যমূলক আচরণ করা।
মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক হচ্ছেন আমাদের প্রিয় নবী (সা.)। রাসূল (সা.) বলেন, আমি তোমাদের জন্য শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। সেজন্য মহানবী (সা.) এর শিক্ষাদানের প্রদ্ধতি কেমন ছিল? সে সম্পর্কেই আলোচ্য প্রবন্ধ।
শিক্ষককে বিবেচক হতে হবে। আবেগের মাথায় হুট করে কিছু একটা করে ফেললেই হবে না। শিক্ষককে যথেষ্ট পরিমাণ সহিষ্ণু হতে হবে। ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। সহিষ্ণুতা ও ধীরস্থিরতা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় গুণ, হাদিসে এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক সাহাবীকে বলেছেন, তোমার মধ্যে এ দুটি গুণ রয়েছে যা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় সহিষ্ণুতাও ধীরস্থিরতা। [মুসলিম: হাদিস নং-১৭]
সহিষ্ণুতা ও ধীরস্থিরতা দাবি হল, আপনি যখন আপনার শিক্ষার্থীকে কোনো অন্যায় করতে দেখবেন, তখন রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে সাথে সাথে মারধর করতে যাবেন না এ ক্ষেত্রে আপনাকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। শুরুতে আপনি তাকে জিজ্ঞাসা করবেন কেন এমনটি করল? তারপর তাকে এ ব্যাপারে যা সঠিক তা বলে দেবেন। সে যে অন্যায় করেছে তা ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝাবেন। সাথে সাথে তাকে একটু আদরও করে দেবেন। হতে পারে সে সংশোধিত হয়ে যাবে।
রাফে ইবনে আমর আল গিফারি বর্ণিত, এক হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন বাল্যকালে আমি আনসারদের খেজুর গাছে ঢিল ছুড়তাম অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে বলা হল এ বালকটি আমাদের খেজুর গাছে ঢিল ছুড়েছে। এরপর আমাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে যাওয়া হল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন হে বালক খেজুর গাছে তোমার ঢিল ছোঁড়ার কারণ কী? আমি বললাম খেজুর খাওয়ার জন্য ঢিল মারি। তিনি বললেন: খেজুর গাছে ঢিল মেরো না। গাছের নিচে যা এমনিতেই পড়ে তা খাও। অতঃপর তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং বললেন, হে আল্লাহ! আপনি এর উদর পরিতৃপ্ত করুন। [ইমাম তিরমিযি হাদিসটি বিশুদ্ধ বলেছেন]।
সহিঞ্চুতা ও ধীরস্থিরতার আরেকটি দাবি হলো বাচ্চাদেরকে প্রহার না করা। আমরা অনেকেই মনে করি মারধর না করলে ছেলে সন্তান মানুষ করা যাবে না এ কথা ভুল। বরং হেকমত ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে বাচ্চাদের ভুলত্রুটি শুদ্ধ করা জরুরি। ইসলামে শাস্তি প্রদানের উদ্দেশ্য ইসলাহ ও সংশোধন, প্রতিশোধ ও মনের ঝাল মেটানো নয়। এ কারণে শিশুকে শাস্তি দেয়ার পূর্বে তার মেজাজ প্রকৃতি বুঝতে হবে। ভুল সম্পর্কে শিশুকে বারবার বলে বুঝাতে হবে। ইবনে খালদুন (রা.) বলেন যে ব্যক্তি শিক্ষার্থী ও খাদেমদেরকে মারধর ও মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে শিক্ষা দিতে যাবে, এমতাবস্থায় এ বলপ্রয়োগই অধিপতি হয়ে বসবে, বলপ্রয়োগকৃত ব্যক্তির হৃদয়ে সংকীর্ণতা আগমন করবে। উদ্যম-উৎসাহ বিদায় নেবে। অলসতা জায়গা করে নেবে। এ কাজ তাকে মিথ্যা ও খারাবির দিকে ধাবিত করবে: সে এরূপ করবে এই ভয়ে যে অন্যতায় থাকে দমনপীড়নের শিকার হতে হবে। সে জন্য সে ধোঁকা ও ছলচাতুরি শিখবে। পরবর্তীতে এরূপ করা তার অভ্যাসে পরিণত হবে। মানবতা, যা তাকে শেখানোর উদ্ধেশ্য ছিল তা বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়বে।
অভিজ্ঞতার সাক্ষী এই যে মারধর কোনো ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনে না। অধিকাংশ সময় মারধর বরং বিপরীত ফলাফল বয়ে আনে। মারধর শিশুর ইচ্ছা শক্তিকে দুর্বল করে দেয়, চেতনার শাণিতভাব বিলুপ্ত করে দেয়, উদ্যম উৎসাহে ব্যত্যয় ঘটায়। সন্তান যদি তার পাশে এমন ব্যক্তিকে পায় যে সবসময় তাকে হেকমত ও সুন্দর ভাষায় তার দায়দায়িত্ব সম্পর্কে বোঝাবে, এতে শিক্ষার্থী কাজ করার প্রতি উৎসাহী হবে। হ্যাঁ, মারধর করার একান্ত প্রয়োজন হলে তা হতে হবে হালকাভাবে, অর্থাৎ তা হতে হবে এমনভাবে যে মারের আঘাত গায়ের চামড়া ভেদ করে কখনো যেন মাংস পর্যন্ত গিয়ে না পৌঁছায়। শিশুর বয়স দশ বছরের কম হলে হালকাভাবে একসাখে তিন প্রহারের অধিক করা যাবে না।
উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রা.) বিভিন্ন এলাকায় এই চিঠি লিখে পাঠাতেন যে, শিক্ষক যেন একসাথে তিন প্রহারের অধিক না দেয়, কেননা এতটুকুই শিশুকে ভয় দেখানোর জন্য যথেষ্ট। শিশু দশ বছর বয়সে উপনীত হলে তাকে নামাজ পড়তে বাধ্য করার প্রয়োজনে মারধরের অনুমতি রয়েছে। হাদিস এসেছে, হদ (শরিয়ত নির্ধারিত শাস্তি) ব্যতীত অন্য কোনো ক্ষেত্রে দশ প্রহারের অধিক প্রয়োগ করা হবে না। [বুখারি : ৬৩৪২]
প্রহারকারীর ক্ষেত্রে উমর (রাযি.) এর নির্দেশ হল হাত এমনভাবে না উঠানো যাতে বগলের নীচ প্রকাশ পেয়ে যায়। [ইবনে আব্দুল বাবর, আত্তামহিদ : খগু : ৫, পৃষ্ঠা ৩৩৪] অর্থাৎ প্রহার যেন শক্ত ও কঠিনভাবে না হয়। প্রহারকালীন সময়ে কোন শিশু যদি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থণা করে তবে সাথে সাথে প্রহার বন্ধ করে দেয়া জরুরি। হাদিস এসেছে যে ব্যক্তি তোমাদের কাছে আল্লাহর নামে আশ্রয় চায়, তাহলে তাকে মুক্তি দাও। (সহিহুল জামে : ৬০২১]
রাসুল সা. ছিলেন উস্তাদ (শিক্ষক) আর সাহাবাগণ ছাত্র। সাহাবাগণের নীতি ছিল তাদের মনে যে কোন প্রশ্নের সৃষ্টি হলে সাথে সাথে তা রাসূল (সা.) এর কাছে উপস্থাপন করতেন জানার জন্য। সেই মহান শিক্ষকের অবস্থান হলো এই যে, আল্লাহর রাসূল (সা.) জীবনে কাউকে আঘাত করেন নি, শুধু আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ছাড়া। প্রিয় রাসূল (সা.) তার জীবনে কখনও কোন শিক্ষার্থীকে আঘাত করার ইতিহাস নেই। বরং হাদিসে এসেছে তোমরা সাত বছর হলে সন্তানদের নামাযের শিক্ষা দাও, আর দশ বছর হলে শাসন করো। মহানবী (সা.) এর এ কথার মর্ম কী? বর্তমানে শাসনের নামে শিক্ষার্থীকে জালিবেতের বাড়ি, রুলার, বাঁশের কঞ্চি, লাঠি আরো কত রকমের উপকরণ দিয়ে শিক্ষার্থীকে শাসনের নামে দৈহিক এবং মানসিক ভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে, যা আদৌ ঠিক নয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো শিশুকে কোন দিন মারধর করেন নি। বেশির বেশি তিনি হালকাভাবে কান ডলা দিতেন। এমনকী জেহাদের ময়দান ব্যতীত তিনি তার নিজ হাতে কাউকে প্রহার করেন নি। হাদিসে এসেছে, আয়শা (রা.) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাত দিয়ে কখনো প্রহার করেন নি। না কোন নারীকে, না খাদেমকে, হ্যাঁ, যদি তিনি আল্লাহর রাস্তায় জেহাদে যেতেন, (তবে ভিন্ন কথা) [মুসলিম : ৪২৬৯]
অতএব, শিক্ষার্থীকে আদব শেখানো প্রহারের আশ্রয় ব্যতীতই সম্পন্ন হওয়া উচিত। হিকমত, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ইত্যাদি বিবেচনায় রেখে শিক্ষার্থীকে আদব শেখানো উত্তম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়াসাল্লাম এর শিক্ষা পদ্ধতির অনুসরণ করা উচিত। শিক্ষার্থীকে বেত্রাঘাত বরং আদর-সোহাগ, ভালবাসা দিয়ে আদর্শ মানুষ হিসাবে গড়ে তুলুন।

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  • প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান (রাহ.) ও সাদাকায়ে জারিয়া
  • রাসূলের সাথে জান্নাত
  • মাতা-পিতার অবাধ্যতার শাস্তি
  •  তাফসিরুল কুরআন
  • বিশ্বনবীর কাব্যপ্রীতি
  • শতবর্ষের স্থাপত্য সিকন্দরপুর জামে মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  •  আত্মার খাদ্য
  • মানব জীবনে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা
  • সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ : ইসলাম কী বলে
  • মৃত্যুর আগে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করি
  •   তাফসীর
  • ইসলামে বিনোদনের গুরুত্ব
  • কুরআনে হাফিজের মর্যাদা
  • মদীনা রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকা-ের কেন্দ্র ছিল মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  • এতিম শিশু
  • বার্মিংহামে আল কুরআনের হাতে লেখা প্রাচীন কপি
  • রাসুলের সমগ্র জীবন আমাদের জন্য অনুকরণীয়
  • মৌল কর্তব্য আল-কুরআনের বিধান
  • Developed by: Sparkle IT