ধর্ম ও জীবন

শুদ্ধ করে সালাম দেবো

মুন্সি আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৯-২০১৮ ইং ০১:০২:৪৩ | সংবাদটি ৫০ বার পঠিত

সালাম নিশ্চিত সওয়াবের কাজ। উত্তম দোয়া। সর্বোত্তম অভিবাদন। আল্লাহ তায়ালা একটি বারের সালামকে কবুল করলে তার জন্য কি দুনিয়া আখেরাতে এই সালাম নামক দোয়াটি যথেষ্ট হতে পারে না?
মুসলিম সমাজে আমাদের বসবাস। আমাদের ডানে বায়ে, সামনে পিছনে বেশির ভাগই মুসলমানদের বাস। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ইসলামী না হলেও, মুসলিম তো অবশ্যই। ইসলামী অনেক কৃষ্টি কালচার আমাদের সমাজে বিদ্যমান। আমাদের কোন কোন ক্ষেত্রে ভিন্ন ধর্মের সংস্কৃতিও দেখা যায়। একজন মুসলিম যে আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চায়, দুনিয়ার শান্তি ও পরকালীন মুক্তি পেতে চায়, সে সবসময় নিজেকে সংশোধনে নিয়োজিত রাখে। সে কখনো অলস হয় না। কখনো অলসতা আসলে একটু পরেই সে সজাগ হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালার নিকট অলসতার জন্য মাফ ও সাহায্য চায়।
শয়তান আমাদের প্রকাশ্য দুশমন। সে মনে করে আমাদের কারণে সে অভিশপ্ত হয়েছে। তার যড়যন্ত্রের কারণে আমরা জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়েছি। এই দুইয়ের মধ্যে শত্রুতা চিরদিনের। আমাদের এমন কোন ভাল কাজ নেই সে বাধার সৃষ্টি করে না। প্রথমত কোন ভাল কাজ যেন আমাদের দ্বারা না হয় তার জন্য সে আপ্রাণ চেষ্টা করে। এখানে যদি সে ব্যর্থ হয়, তখন ঐ কাজটির মধ্যে যেন আমি বাড়াবাড়ি বা ছাড়াছাড়িমূলক কিছু করে বসি, তার চেষ্টা চালায়। লক্ষ্য করলে দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রে সে সফল হয়ে যায়।
আমরা যদি খুব সহজ, বেশি ও নিশ্চিত সওয়াবের ইবাদত সালামকে নিয়ে চিন্তা করি, তবে এ ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহর রাসুল (সা.) আমাদেরকে একরকম সালাম, একরকম জওয়াব শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু আজকাল সালাম ও তার জওয়াব কত প্রকার, তা হিসাব করা দায়। প্রশ্ন হল, কেন এমনটি হচ্ছে?
আমরা যদি তাকাই আলেম সমাজের দিকে, সেখানেও হতাশা আমাদের হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে ফেলে। কেন? সমাজের সাধারণ মানুষ ইসলাম জানবে, দ্বীন মানবে তাদের শিক্ষায়, তাদের উৎসাহে। আল্লাহর রাসুল (সা.) সবাব আগে সালাম দিতেন, আসহাবে রাসুলগণের (সা.) মধ্যে কেউ বেশি সালাম দেওয়ার জন্য বাজারে যেতেন যাতে বেশি বেশি সালাম দিতে পারেন। উদ্দেশ্য একটাই নিশ্চিত বেশি সওয়াব অর্জন। রাসুল (সা.) এর শিক্ষা, সব কথার আগে সালাম দেওয়া, সাক্ষাতে এবং বিদায়ে সালাম দেওয়া। আল্লাহ তায়ালার প্রিয়গণ সবার আগে সালাম দেন।
আলেম সমাজের কেউ হয়তো মনে করেন, তিনি মাদ্রাসায় পড়েছেন, আলেম হয়েছেন, সালাম তার পাওনা। তিনি কেন সালাম দিবেন? কিন্তু আল্লাহর রাসুল (সা.) থেকে কি কেউ বড়, এই কথা কোন মুসলিম কি কখনো কল্পনা করতে পারে? নাউজুবিল্লাহ। যদি এরূপ না হয়ে থাকে, তবে আলেমগণের অন্যকে সালাম দিতে আপত্তি কোথায়? আলেমগণ যদি বেশি বেশি সালাম দিতেন, তবে সমাজে সালামের প্রচলন ব্যাপকতর হত। সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি থাকত। কারো মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার, আমিত্ব, বড়ত্বের চাহিদা দানা বাধত না। আগে সালাম দাতা হিংসা, অহংকার থেকে মুক্ত।
আমরা দেখি মাদ্রাসার ক্লাসে যখন শিক্ষক মহোদয় আসেন, সকল ছাত্রছাত্রী তখন দাঁড়িয়ে সালাম দেয়। কিন্তু সুন্নত কি এরূপ? যিনি আগন্তুক, তিনি হবেন সালাম দানকারী। তাহলে শিক্ষার সূচনা থেকেই আমরা সুন্নতের শিক্ষা ও পরিপালন থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। আবার শিক্ষক মহোদয় সালামের জবাবটাই কতটুকু সুন্দর করে দেন, তাও ভেবে দেখার দরকার।
আসল কথায় আসা যাক। সালাম আমাদের সমাজে কত্তো রকম? সালামের এতো রকমফের হওয়ার কারণ কি? খুব সহজেই বলতে পারি, শয়তান চায় না আমরা এতো সহজে ১০-৩০ টি নেকী পেয়ে যাই। একজন মুসলিম ইচ্ছা করলেই প্রতিদিন সালামের মাধ্যমে কয়েক’শ নেকী হাসিল করতে পারে। আমাদের সওয়াব থেকে বঞ্চিত করার জন্য শয়তান অনেক ফন্দি আটে। আমাদের একটু অসাবধানতায় তার ফন্দির ফান্দে পড়ে আমাদের আজ করুণ দশা। আমরা পরিশ্রম করেও ফল থেকে বঞ্চিত হই। আল্লাহর রাসুল (সা.) আমাদেরকে অভিবাদন হিসাবে “আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু” শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু আমরা কত রকম সালাম শুনি যেমনÑ সামাইকুম, সেমাইকুম আস্লামাইকুম, আস্লেমাইকুম, আস্সামাইকুম, স্লামালিকুম আরো কত কি!’ এই শব্দগুলো আমরা অনেক নামাজী, খোদাভীরু (মনে করি) লোকজনের মুখ থেকেও শুনে থাকি। এই যদি হয় আমাদের অবস্থা, তাহলে আমরা কতটুকু সওয়াব পাব? এই সালামে আমাদের পরম প্রিয় আল্লাহ খুশি হবেন, না আমাদের চরম দুশমন শয়তান খুশি হবে, চিন্তা করে সংশোধন করার দরকার।
সালামের ব্যাপারে আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়, আমরা যখন কাউকে সালাম দেই, তার শান্তি কামনা করি। আসলে কি তখন আমাদের হৃদয়ে তার শান্তি কামনা করে? তখন কি মুখে সালাম উচ্চারণের সাথে হৃদয়ের সম্পর্ক থাকে? সালামকে যদি আমরা উত্তম দোয়া মনে করতাম তাহলেও হয়তো সুন্দরভাবে সালাম দেওয়ার জন্য সচেষ্ট হতাম। অনেক শিক্ষিত মুসলিম দেখা যায়, আস্সালামু আলাইকুম উচ্চারণই করতে পারেন না। যা মুসলিম সমাজের জন্য চরম হতাশাজনক।
সালামের ক্ষেত্রে আরোও একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়, আমরা যখন টেলিফোন বা মোবাইলে কারো সাথে কথা বলতে চাই। তখন আগে হ্যালো বলি তারপর সালাম দেই। তাও তো সুন্নাহ বিরোধী। আল্লাহর রাসুল (সা.) সব কথার আগে সালাম দিতে বলেছেন। ফোন রিসিভ করার ক্ষেত্রে হ্যালো না বললে এমনকি সমস্যা হবে? কোন সমস্যাই নেই। তাই আমরা আজ থেকে সিদ্ধান্ত নেই, যে আগে হ্যালো নয়, সবার আগে বলব, আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, যখন তোমাকে কেউ সালাম দিবে তুমি তার থেকে উত্তম করে, কমপক্ষে তার মতো করে জবাব দিবে। এই জন্য আলেমগণের সর্বসম্মত মত হল, সালামের জওয়াব দেওয়া ওয়াজিব। আমাদের সমাজে সালামের চেয়ে সালামের জওয়াব দানের অবস্থা আরোও সুচনীয়।
সালামের জওয়াবে ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু বলবে এটাই নিয়ম, ইহাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তব অবস্থার দিকে তাকালে অন্তরে দহন ছাড়া আর কিছুই বাড়ে না। সমাজের দিকে তাকালে দেখা যায় বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে কেউ বলছে আলিকুম সালাম, কেউ আলিকুম বলছে, কেউ ঠোঁট নেড়ে, কেউ ঘাড় বাঁকিয়ে, কেউ মাথা ঝাকিয়ে, কেউ হাতের ইশারায় আবার কেউ চোখ টিপে সালামের জওয়াব দিচ্ছে। কিন্তু আল্লাহর রাসুল (সা.) কি কখনও এভাবে সালামের জওয়াব দিয়েছেন বা দিতে বলেছেন? যখন দেখি আলেমগণের মধ্যেও বেশির ভাগের এই অবস্থা তখন আফসোস করা ছাড়া আর কিইবা করার থাকে? অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যে, বেশীর ভাগ আলেম মনে করেন, তারা সালাম পাওনা। ধরে নিলাম তারা সালাম পাওনা। কিন্তু জওয়াবের ক্ষেত্রে কি এরূপ মনে হয় না যে, আমরা অনেক সম্মানী, মস্তবড় বুযুর্গ, আমার মত লোক তোমার মত নাদানের সালামের জওয়াবে যে ঘাড় নেড়েছি, মাথা ঝাকিয়েছি তাতো বেশ করেছি। তোমার সালামের জওয়াবে আমার মাথা ঝাকানোটা পেয়েছ মানে তুমি ধন্য হয়েছ। এই আমিত্ব, বড়ত্ব, অহংকার আলেম সমাজের আমলকে একেবারে নষ্ট করে দিচ্ছে। অনেক সময় মনের অজান্তেও এরূপ ঘটে যেতে পারে যে, ছোট কাল থেকে দেখতে দেখতে এই অভ্যাস গড়ে উঠেছে। এখন উপনীত বয়সে এসেও মনেই করছে না যে, সালামের জওয়াব এভাবে দেওয়া যায় না, এভাবে দেওয়া ঠিক নয়। শয়তান তার কৌশল যথাযথ কাজে লাগিয়ে আমাদেরকে সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহের মালিক বানিয়ে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে আমরা অলস, বেখবর থাকলেও, সে খুব সজাগ।
সালাম ও জওয়াবের এই নাজুক পরিস্থিতিতে আলেম সমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে এবং তাদের নিজেকে আগে সুধরে নিতে হবে। সমাজের সাধারণ মানুষ দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়ে আলেম সমাজকেই অনুসরণ করে থাকে। সমাজের আলেম সমাজ এক আর নেক হয়ে গেলে পুরো সমাজটাই পাল্টে যাবে। আল্লাহ তায়ালার অবারিত রহমত এই সমাজে বর্ষিত হতে থাকবে। কেননা সালাম শান্তি, নিরাপত্তা ও অফুরন্ত রহমতের গ্যারান্টি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT