ধর্ম ও জীবন

রাসূল সা. যেভাবে সময়ের গুরুত্ব দিতেন

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৯-২০১৮ ইং ০১:০৩:৫২ | সংবাদটি ১৯ বার পঠিত

মহান আল্লাহর অফুরন্ত নিয়ামতরাজির মধ্যে সময় হচ্ছে অন্যতম। নিশ্চয়ই সময় দিন রাত্রির সমন্বিত রূপ। সময় শব্দটি তিন অক্ষরের ছোট শব্দ হলেও এর ব্যাপ্তিকাল অনেক বড়। সৌর বছরে ৩৬৫ দিন আর চন্দ্র বছরে ৩৫৪ দিন। ঘন্টার হিসেবে ২৪ ঘন্টা এবং মিনিটের হিসাবের দিক দিয়ে ১৪৪০ মিনিট। এ সময় হতে এক ঘন্টা বা এক মিনিট চলে যাওয়া মানে প্রকৃত পক্ষে জীবনের একটা মূল্যবান অংশ কমে যাওয়া। এ কারণে সময়ের যথাযথ ব্যবহার একান্ত অপরিহার্য। সময়ের সমষ্টিই জীবন। মানুষ তার দুনিয়ার জীবন কীভাবে অতিবাহিত করেছে আখিরাতে সে হিসাব প্রদান করতে হবে। এ কারণে সময়ের সদ্ব্যবহারের জন্য এর যথার্থ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। এ প্রয়োজনীয়তাকে সামনে রেখেই জন্ম হয়েছে সময় ব্যবস্থাপনা পরিভাষার।
বর্তমানে উন্নয়ন চিন্তার ক্ষেত্রে মানবসম্পদ উন্নয়ন ধারণাটি ব্যাপকভাবে আলোচিত। কেননা, সব ধরণের চিন্তার মূল কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে মানবসম্পদ। তাকে কেন্দ্র করেই সব ধরণের উন্নয়ন চিন্তা পরিচালিত হয়। এ উন্নয়ন চিন্তার স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতার জন্য সময় ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত।
ইসলাম মানুষের সার্বিক কল্যাণ, চিন্তা ও পরকালীন সুখ সমৃদ্ধির বিষয় সামনে রেখে মানুষকে সময়ের গুরুত্ব অনুধাবন, এর সদ্ব্যবহার ও ফলপ্রসূ ব্যবস্থাপনার নির্দেশ প্রদান করে। আরবীতে সময়ের প্রতিশব্দ ওয়াক্তুন। এর বহুবচন আওক্বাতুন। ইংরেজীতে সময়ের প্রতিশব্দ ঞরসব, ঢ়বৎরড়ফ, যড়ঁৎ। সময় বা কাল একটি পুরাতন পরিভাষা। তা দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন নির্দিষ্ট মেয়াদে নানা ঘটনার অতিক্রমকে বোঝানো হয়। এ কারণে এ সময় থেকে যা অতিক্রান্ত হয় তা আর কখনো ফিরে আসে না। সময় হচ্ছে এই সংক্ষিপ্ত দুনিয়াতে মানুষের প্রধান সম্পদ। এটা তার আয়ূষ্কালের সংক্ষিপ্ত রূপ এবং তার কাঁধে একটা বড় দায়িত্ব। যদি সে সময়ের দ্বারা উপকৃত হয়, তাহলে সে তার উত্তম প্রতিফল পেল। আর যদি সে তার কাঁধে সময় নামক অর্পিত বস্তুর আমানত ও দায়িত্ব পালনে খেয়ানত করে, তাহলে সে দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সময় হলো একটা মানদন্ড, যেখানে ঘটনাসমূহ অতীত থেকে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের পানে বা অতীত বর্তমান ভবিষ্যতে সন্নিবেশ করা যায় এবং ঘটনাসমূহের ব্যাপ্তিকাল ও তাদের মধ্যকার বিরামকালের ও পরিমাপক। মানব জাতির জীবন পরিচালনার আদর্শ গাইডলাইন মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে সময় অপচয় ও অনর্থক কাজে ব্যয় করার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এমনকি আল্লাহ তা‘আলা সময় বোঝানোর জন্য কুরআনে অনেক প্রতিশব্দ ব্যবহার করে এর প্রতি গুরুতারোপ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তিনি সূর্যকে করেছেন তেজোদ্দীপ্ত, আর চন্দকে করেছেন আলোকময়। আর তার (হ্রাস-বৃদ্ধির) মানযিলসমূহ সঠিকভাবে নির্ধারণ করেছেন, যাতে তোমরা (এ নিয়ম দ্বারা) বছরের গণনা এবং দিন তারিখের হিসাবটা জানতে পার; (আসলে) আল্লাহ তা‘আলা যে এ সব কিছু সৃষ্টি করে রেখেছেন (তার) কোনটাই তিনি অনর্থক সৃষ্টি করেননি; যারা (সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে) জানতে চায় তাদের জন্যে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নির্দেশ গুলোকে সুষ্পষ্ট করে বর্ণনা করেন।
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন , কালের শপথ। মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে ডুবে আছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের অনেক স্থানে তা বুহ সৃষ্টিকে নিয়ে কসম করেছেন, এতে এগুলোর মর্যাদা অনেক বেড়ে গেছে। তেমনি সময় নিয়ে কসম করায় এটি প্রত্যেক মানুষের জন্য কত গুন গুরুত্বপূর্ণ তা সহজেই অনুমেয়। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: আমি রাত আর দিনকে দুটো নিদর্শন বানিয়েছি। আমি রাতের নিদর্শনকে জ্যোতিহীন করেছি, আর দিনের নিদর্শনটিকে করেছি আলোয় উজ্জ্বল, যাতে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে পার। আর যাতে বছরের সংখ্যা ও হিসাব জানতে পার; আমি সকল বিষয় বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে দিয়েছি। সময়ের সাথে রয়েছে হিসাববিজ্ঞান (অপপড়ঁহঃরহম) ও জ্যোতিবিদ্যার (অংঃৎড়হড়সু) অনন্য সম্পর্ক। কুরআনে সময়ের কথা উল্লেখ করতে যেয়ে আল্লাহ তা‘আলা একাধিক স্থানে এই দুই জ্ঞানের কথা উল্লেখ করেছেন।
রাসূল স. আরো বলেন, পাঁচটি বস্তু আসার পূর্বে পাঁচটি বস্তকে সুযোগ মনে করো। বার্ধক্যের পূর্বে যৌবনকে, অসুস্থ হওয়ার পূর্বে সুস্থতাকে, দারিদ্রতার পূর্বে সচ্ছলতাকে, ব্যস্ততার পূর্বে অবসরকে এবং মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে। রাসূল স. আরো বলেন: দুটি নিয়ামতের (ব্যবহারের) অধিকাংশ মানুষই ধোকার, রোযা ও হজ্জ সময়ের সাথে সম্পর্কিত। এছাড়া আরো বিভিন্ন ইবাদত নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সীমাবদ্ধ। এগুলো বেশির ভাগ নির্দিষ্ট সময়ের আগে বা ওযর ছাড়া দেরিতে আদায় করার কোন নিয়ম ইসলামে নেই। সুতরাং এগুলো বিশেষভাবে সময়ের সাথে জড়িত। যেমন, রাসূল স. ইবাদতগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করার জন্য তাঁর উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আল্লাহর নিকট কোন আমল অধিক প্রিয়? তিনি বললেন, যথাসময়ে সালাত আদায়। একইভাবে রোযা শুরুর ব্যাপারে রাসূল স. বলেছেন। তোমরা চাঁদ দেখে রোযা করো এবং চাঁদ দেখে রোযা ছাড়ো। যদি মেঘের কারণে তা দেখা না যায়, তাহলে ত্রিশ দিন পূর্ণ করবে। আবূ বাকরাহ তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কোন মানুষ উত্তম? জবাবে তিনি বললেন: যার বয়স বৃদ্ধির সাথে তার আমলও উত্তম হলো। আবার তাঁকে প্রশ্ন করা হলো যে, কোন মানুষ নিকৃষ্ট? তিনি বললেন: যার বয়স বেশি হলো: কিন্তু আমল খারাপ হলো। সুতরাং হাদীসেও সময়ের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: আর তারা তোমাকে আযাব ত্বরান্বিত করতে বলে। অথচ আল্লাহ কখনো তাঁর ওয়াদা খেলাফ করেন না। আর তোমার রবের নিকট নিশ্চয়ই একদিন তোমার গণনায় হাজার বছরের সমান। আল্লাহ আরো বলেন: ফেরেশতাগণ ও রূহ এমন একদিনে আল্লাহর পানে উর্ধ্বগামী হবে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।
সকল মানুষের মাঝে রাসূল স. সবচেয়ে বেশি সময়কে গুরুত্ব দিতেন। তিনি তাঁর বেশির ভাগ সময় আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার কাজে ব্যয় করতেন। তিনি সময়ের প্রতিটি মুহূর্তেই যথাযথভাবে কাজে লাগাতেন। রাসূল স. এর সময় ব্যয় করা প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে, হুসাইন রা. বলেন, আমি আমার পিতাকে রাসূল স. এর বাড়িতে প্রবেশের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তখন তিনি বলেন, যখন তিনি বাড়িতে প্রবেশ করতেন, তখন প্রবেশ করাকে তিন ভাগে ভাগ করতেন। এক ভাগ আল্লাহর জন্য, এক ভাগ পরিবারের জন্য আর এক ভাগ নিজের জন্য রাখতেন। অতঃপর তাঁর ভাগের কিছু অংশ নিজ ও মানুষের মাঝে প্রয়োজনে ব্যয় করার জন্য রেখে দিতেন। তেমনিভাবে রাসূল স. জীবনে প্রায় বেশির ভাগ সময় আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর আনুগত্যে ব্যয় করতেন। উম্মুল মু‘মিনীন আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল স. এত দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করতেন যে, তখন তাঁর পা দুটো ফুলে যেত। তখন আয়িশা রা. বললেন হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এত কষ্ট করেন কেন? আল্লাহতো আপনার পূর্বের ও পরের সব ক্রুটি মোচন করে দিয়েছেন। তখন রাসূল স. বললেন: আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?
তেমনিভাবে রাসূল স. তাঁর উম্মতকে জীবনের প্রতিটি সময় ভাল কাজে ব্যয় করার জন্য উৎসাহ প্রদান করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রা. বলেন, রাসূল স. আমার কাছে এসে বললেন, আমি কি তোমাকে বলবো না যে, তুমি রাতভর ইবাদত করবে আর দিনে রোযা রাখবে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন: না এ কাজ করবে না। রাতে ইবাদত করবে আবার ঘুমাবে, রোযা রাখবে আবার রোযা থেকে বিরত থাকবে। কেননা, তোমার উপর তোমার শরীর, দুচোখ, অতিথি ও অপ্যায়কদের ও স্ত্রীর হক রয়েছে। আশা করা যায়, তোমার বয়স লম্বা হবে, তাহলে যদি সক্ষম হও তাহলে প্রত্যেক মাসে তিনটি করে রোযা রাখবে। কেননা, প্রত্যেক ভাল কাজ দশটি ভাল কাজের সমান। এভাবে সারা বছর রোযা রাখার সমান হবে। এভাবে রাসূল স. সময়কে গুরুত্ব দিতেন আর তাঁর উম্মতকেও গুরুত্ব দিতে উৎসাহ প্রদান করতেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT