পাঁচ মিশালী

সারথি আড্ডা : এমসি কলেজের দিনগুলো

এডভোকেট আনসার খান প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৯-২০১৮ ইং ০০:৩২:৫৮ | সংবাদটি ১৫৮ বার পঠিত

বন্ধু নজমুলের আয়োজনে জমে ওঠেছিলো প্রাণের মেলা, সারথিদের জমজমাট আড্ডা। এমসি কলেজের সাতাত্তর ব্যাচের অনার্স ও ডিগ্রি ক্লাসের শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা। যখন এমসি’র (তখন অবশ্য এটির নাম ছিলো সিলেট সরকারি কলেজ) শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের পথচলা শুরু হয়েছিলো তখন প্রত্যেকের বয়স আঠারো বা উনিশ, যৌবনের শুরু, চোখের রঙিন চশমা দিয়ে দুনিয়া দেখার বয়স, ছিলো হয়তো অনেকের মনেই বিশ্বজয়ের আকাক্সক্ষা। যৌবনের সেই আমরা এখন ষাটে পৌঁছে গেছি। মাঝে আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে প্রায় চার দশক। কিন্তু চার দশক আগের সেই জীবনটাই ছিলো স্বর্ণালী অধ্যায়। সেই স্বর্ণালী সময়কাল আর কখনো ফিরে আসবে না আমাদের জীবনে। তাই সবার মনেই এ প্রশ্নটা বেদনাভরা কণ্ঠে উচ্চারিত হয় ‘কোথায় হারিয়ে গেলো সোনালী সেই দিনগুলো’।
হারিয়ে যাওয়া সোনালী সেই দিনগুলোকে খোঁজে পাবার এক ধরণের প্রত্যাশার আকাক্সক্ষা থেকেই বন্ধুদের মিলনমেলার আয়োজন। এমসি কলেজের শিক্ষা জীবন শেষে আমরা বন্ধুরা যে যার মতো করে চলে গিয়েছিলাম জীবনের অন্য এক অধ্যায়ে, প্রবেশ করেছিলাম জীবন যুদ্ধে। এমন করে এক সাথে, একই ক্যাম্পাসে বিচরণ করার সুযোগ আর আসেনি আমাদের জীবনে। এমনকি, অনেকের সাথে দেখা পর্যন্ত হয়নি ফেলে আসা গত প্রায় সাড়ে তিন দশকের মধ্যে। বন্ধু নজমুলের আয়োজিত প্রাণের এই মেলায় সেই স্বর্ণালী দিনের বাইশ জন বন্ধু একত্রিত হয়েছিলাম, জমিয়ে আড্ডার ছলে আমরা ফিরে গিয়েছিলাম সেই শিক্ষাজীবনের সোনালী দিনগুলোতে, সেদিনের পুরো এমসি কলেজের ক্যাম্পাসটি ভেসে ওঠে ছিলো আমাদের মনের মনিকোঠায়।
এমসি কলেজ আমরা ছেড়েছিলাম গত শতকের আশির দশকের একদম শুরুতে। অর্থাাৎ সময়ের হিসেবে এখন থেকে প্রায় সাইত্রিশ-আটত্রিশ বছর আগে। বয়স উনিশ-বিশের কোঠায়, ছিলাম শিক্ষার্থী আর এখন ষাটের কোঠায় আমরা বুড়ো বয়সে পৌঁছে গেছি। ষাটের কোঠার বন্ধুদের ডাক পড়লো নজমুলের পক্ষ থেকে। সাত সেপ্টেম্বর ২০১৮, শুক্রবার আমরা জড়ো হয়েছিলাম নজমুলের এনজিও আইডিয়ার উপশহরস্থ কার্যালয়ে। সকাল ১১টা থেকেই বন্ধুদের আগমন শুরু হয়েছিলো। উল্লেখ্য যে, সারথীদের এই আড্ডায় অনেক দুর-দুরান্ত থেকেও বন্ধুরা এসেছিলেন। যেমন নোয়াখালী থেকে বন্ধু মিজান, হবিগঞ্জ থেকে মোল্লা জালাল উদ্দিন। আর সিলেট শহর থেকে আমরা অনেকেই অংশ নিয়েছিলাম। ছাত্র জীবন পরে এমন আড্ডা দেওয়া আর কখনো হয়নি। আজকের এই প্রাণের মেলা ছিলো অসাধারণ এক আয়োজন।
এটি কোনো নিয়ম সিদ্ধ বা গন্ডিবদ্ধ অনুষ্ঠান ছিলো না, এটি ছিলো বন্ধুদের ¯্রফে একটি আড্ডা, এমসি কলেজ জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করার একটি প্রয়াস বলা যায়। তাই, উপস্থিত সবাই পুরানো দিনের সেই স্মৃতি খোঁজে পাবার চেষ্টা করেছি, কলেজের সেই পুরানো দিনগুলোকে নতুন করে স্মরণ করেছি পুরনো বন্ধুদের পরস্পর বুকে জড়িয়ে ধরে অতীতকে বরণ করেছি। পুরানো দিনের কথা, অনেক স্মৃতির কথা ও বিষয়গুলো ভেসে উঠেছিলো চোঁখের সামনে ও আমাদের মনের মণিকোঠায়। এখনো কলেজ কেন্টিনের চিত্রটি চোঁখের সামনে অবিকলভাবে ভেসে ওঠে। দিনের বেশির ভাগ সময়ই কেন্টিনে আড্ডা দিয়ে, রাজনৈতিক বৈঠক করে বা চাÑধূমপানের মধ্য দিনে অতিবাহিত করেছি। আমাদের সেই পুরানো আড্ডাস্থল সেই কেন্টিনটি এখন বয়সের ভারে অচল, এটি এখন তাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কলেজের বিরাট দীঘির উত্তর পাড়ে স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অচল সেই কেন্টিন ঘরটি।
আমরা যারা ছাত্র রাজনীতি করতাম তাদের নিকট স্মৃতির আরো একটি জায়গা ছিলো শিরিশতলা। আর্টস বিল্ডিংয়ের দক্ষিণ পূর্ব কোণে ছিলো একটি বিরাট শিরিশ গাছ। সে এখন নেই। তবে একটি গাছ এখনো আছে। ঐ শিরিশ তলায় জমে ওঠতো রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ। যেখানটায় দাঁড়িয়ে ¯্রােতা শিক্ষার্থীরা আমাদের বক্তব্য শুনতো ঐ স্থানটায় একটি মিনি পরিসরের ফুল বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। স্থানটি লাইব্রেরি ভবনের লাগোয়া দক্ষিণে। আর একটি আকর্ষণীয় স্থান ছিলো গ্যালারী ভবন। পুরানো দু’টি ঘর এখন জরাজীর্ণ। দু’টি ঘরের কানেকটিং সেড ও ভেঙ্গে পড়েছে। স্মৃতি ধরে রাখার জন্য একটি পুরানো ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার জন্য এগুলোর সংস্কারে কলেজ কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে ভালো হয়।
ফিরে আসি আবার মূল কথায়। নির্দিষ্ট দিনের নির্দিষ্ট সময়টাতে একে একে হাজির হলেন সতীর্থরা। এলো রূপালী ব্যাংকের সাবেক জিএম বন্ধু আব্দুল মতিন, এলো সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি, লেখক-সাংবাদিক বন্ধু মোক্তাবিস উন নুর, নুরের হাতে গোটা কয়েক নিমকির প্যাকেট। আমাকে বললো দোস্ত ডায়বেটিক রোগীদের জন্য মিষ্টি বিহীন খাবার আনলাম। এটি তার স্বাস্থ্য সচেতনতার একটি উদাহরণ। এখন স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা সবাই চিন্তিত, অথচ শিক্ষা জীবনে ছিলো না স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো ভাবনা।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আসলেন আমার পরম বন্ধু এডভোকেট মফুর আলী, এডভোকেট ময়নুল ইসলাম। কোর্টের একই ক্যাম্পাসে আমিও আছি। কিন্তু তাদের সাথে দেখা হয়, কথা হয় কদাচিৎ, তবে আড্ডা দেওয়া হয়নি তেমনভাবে। বন্ধু মফুর আলী, সৈয়দ ফরহাত, আনোয়ার বখত হিরক, আবদুস সোবহান ও আমি, আমরা এই পাঁচ বন্ধু ছিলাম হরিহর আত্মা। কলেজের কেন্টিন, মুসলিম সাহিত্য সংসদের সামনের খোলা স্থানে, কখনো হাওয়াপাড়ার শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে বা আমার আবাসন, ফরহাতের বাসা বা অভিজাত হোটেলের লবিতে ছিলো আমাদের পাঁচ বন্ধুর ম্যারাথন আড্ডা। আর বন্ধু এডভোকেট ময়নুল, মনসুজ্জামান বাবুল, সোবহান, আমি আমরা ছাত্র ইউনিয়নের বন্ধুরা দিনের পর দিন কতো পোস্টার লিখেছি, আবার রাতে ঐগুলো শহরের দেয়ালে নিজেরা সাঁটিয়ে দিতাম সামরিক স্বৈরাচারের ভয়ঙ্কর শাসনের রক্ত চক্ষুকে অবজ্ঞা ও উপেক্ষা করেই আমরা এগুলো করেছি। আমি ছাত্র ইউনিয়নের সিলেট জেলার সভাপতিও হয়েছিলাম। বাবুল সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলো। আর বন্ধু নজমুল, সোবহান ও আমি মিলে বের করেছিলাম ছোট্ট পত্রিকা ও ম্যাগাজিন। এগুলো মূলতঃ মহান একুশে ও বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করেই প্রকাশ করেছিলাম। তাছাড়া, বঙ্গভবন না রাজপথ নামে একটি দেয়াল পত্রিকাও বের করেছিলাম। নজমুল, সোবহান এবং আমি প্রায়ই রিক্সায় ভ্রমণ করতাম শহরে। মধ্যখানে উঁচুতে আমি, বাকী দু’জন দুই সাইডে। কতো আনন্দ আর ফুর্তির দিন ছিলো সে সময়টা। আজ সেসবই কেবল স্মৃতি।
সেসব দিনের বন্ধুদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলো এমসি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর বিমল দত্ত, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সুসেন চন্দ্র দাস, বিসিকের জিএম মহসিন কবির খান, সোহেল আহমদ, ডিএফও দেলোয়ার হোসেন, এডভোকেট জামিলুল হক (জেলা বারের সাবেক সভাপতি), এডভোকেট মিনহাজ উদ্দিন খান, এডভোকেট আনোয়ার হোসেন, (সে ছাত্রলীগের জেলা সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলো), জিয়াউর রহিম মোর্শেদ (ভিপি), ইকবাল হোসেন (ভিপি)। মোর্শেদকে দেখে খুবই ভাবিত হলাম। আহত হলাম মনের দিক থেকে। সে খুবই অসুস্থ। কলেজ জীবনে আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলো সে। খুবই ভালো ছাত্র ছিলো, পড়তো ইংরেজি অনার্সে। কি সুদর্শন, তখনকার সময়ের সবচেয়ে চৌকস, স্মার্ট ছেলেটি, কথাবার্তা, আচরণে, চলনে-বলনে সে সবার নজর কাড়তো, ঐ আকর্ষণীয় ছাত্র বন্ধুটি আজ পারকিনসন রোগে আক্রান্ত। সারা শরীর তার কাঁপছে। দেখে বিমর্ষ হলাম, যৌবনের সুদর্শন ছেলেটি বুড়ো বয়সে এসে সে এক দুঃসহ সময় পার করছে। সে ছিলো ছাত্রলীগের মনোনীত কলেজ সংসদের ভিপি। আমি ছিলাম ছাত্র ইউনিয়নের জেলা সভাপতি। অথচ আমাদের বন্ধুত্বে রাজনীতির ভিন্নতার জন্য কোনো বাধা হয়ে আসেনি কখনো। একইভাবে এডভোকেট মফুর আলী বা এডভোকেট আনোয়ার হোসেনের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ওরা ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকা সত্ত্বেও আমার সাথে তাদের বন্ধুত্ব ছিলো সবচেয়ে গভীর হৃদ্যতাপূর্ণ। আনোয়ারের সাথে দিনের অধিকাংশ সময়ই কেন্টিনের এক টেবিলে আড্ডা দিয়েছি, চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ঝড় তুলেছি রাজনৈতিক আলোচনায়। মার্কস, এঙ্গেলস, লেলিন, ফিডেল ক্যাস্ট্রু, এমনকি বিপ্লবী চেগুয়েভারা প্রমুখের দর্শন ও রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে কতো আলোচনা করেছি। পড়াশুনায় ছিলাম চৌকস। প্রতিদিন ৪/৫টা পত্রিকা, ম্যাগাজিন ইত্যাদি বগলদাবা করে যেতাম আমরা কলেজে। পত্রিকা পড়ে পড়ে শুরু হতো পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল রাজনৈতিক বিতর্ক। সেই স্মৃতিগুলো কি কখনো বিস্মৃত হওয়া যায়। আজকের আড্ডা সেটিই পুনর্বার মনোজগতে আলোড়ন তুললো, ফিরে গেলাম ফেলে আসা দিনগুলোতে, বার বার ঝাপসা হয়ে যাওয়া স্মৃতিতে ভেসে ওঠলো কলেজ ক্যাম্পাস। সে দিনের সাথী বন্ধুরা আজ কে কোথায় আছে আমরা জানিনা, অনেক বন্ধুদের মধ্যে আজ তো মাত্র বাইশ জন আমরা উপস্থিত। অনেকের নাম এসেছে, বাকীরা হলো আতাউর রহমান, সুদীপ কুমার তালুকদার, তপন কুমার তালুকদার, আফজাল আহমদ অর্থাৎ একটি বন্ধু গ্রুপই আজকের আড্ডায় উপস্থিত। অধিকাংশই আজকের আড্ডায় নেই।
কলেজ ক্যাম্পাসের দিনগুলোতে আমাদের বন্ধুদের সংখ্যা ছিলো অনেক বেশি; সে তুলনায় আজকের উপস্থিতি নগন্য হলেও পরিবেশটা ছিলো উৎসবমুখর এবং মনোমুগ্ধকর। আনন্দের এই আড্ডায় আমরা খোঁজে ফিরেছি অতীতের বন্ধুদের এবং অনেকেরই সুখাবয়ব ধরা পড়েছে স্মৃতিতে। এদের মধ্যে অনেকে আছে প্রবাসে, যেমন সৈয়দ ফরহাত, আনোয়ার বখত হিরক, আব্দুল কুদ্দুছ বাবুল। আবার আবদুস সোবহান উপসচিব পদ থেকে অবসরে গিয়ে আছে ঢাকায়। না আসতে পারার জন্য ফোনে দুঃখ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, আমার একান্ত বন্ধু জামান ওরফে ওয়াহিদুজ্জামান বা ক্লাসমিট গুলসান আরা কোথায় আছে জানিনা। নেই কোনো যোগাযোগ গত আটত্রিশ বছর ধরে। অন্যদিকে আমাদের রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ক্লাসমিট খালেদা ও মোর্শেদা আমাদেরকে ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছে বলে শুনেছি। তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
আড্ডার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ছিলো খানাপিনা। দুপুরের খাবারের আয়োজন করেছিলো নজমুল। এটি কোনো সাধারণ খানাপিনা নয়, একদম রাজকীয় খাবারদাবার। বিয়ে সাদিতেও এতো পদের খাবার হয় না। ইতিহাসে পড়েছি, রাজ্যহারা মোগল স¤্রাট যখন পারস্যে (আজকের ইরান) গিয়েছিলেন তখন ত্যাঁর সম্মানে পারস্য স¤্রাট যে খাবারের আয়োজন করেছিলেন তাতে নানা পদের ৫০০ প্রকারের খাবার আইটেম ছিলো। আমাদের আড্ডার হোস্ট ৫০০ প্রকার পদের আয়োজন না করলেও খাবারের পদের সংখ্যা একদম কম ছিলো না। আমার কাছে মনে হয়েছে সারথি আড্ডাকে যেমন আকর্ষণীয় করার চেষ্টা করা হয়েছে আয়োজকের পক্ষ থেকে, তেমনি খাবারের মেনুও এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে খাবারের স্বাদটি পরবর্তী সারথি আড্ডা পর্যন্ত জাগরুক থাকে। অনেক স্মৃতির গল্প বলে আড্ডাস্থলকে জমজমাট করে তুললেন বন্ধুরা এবং সবাই প্রত্যাশা করলেন আগামীতে যেন আরো বড় পরিধিতে এমনই আড্ডার আয়োজন করা হয়। ফেলে আসা দিনগুলোর অনেক স্মৃতি ধারণ করে অবশেষে আমরা ফিরে গেলাম যারযার ঘরে। সবার আগামী সুন্দর হোক, সকলের সুস্বাস্থ্য কামনায় ভবিষ্যতের শুভ প্রত্যাশায় এখানেই সমাপ্তি টানতে হলো।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT