পাঁচ মিশালী

আইলরে লন্ডনের জ্বর

শুভ্রেন্দু শেখর ভট্টাচার্য প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৯-২০১৮ ইং ০০:৩৬:২৮ | সংবাদটি ১৮৯ বার পঠিত

দেশ ব্যাপী চলছে শুদ্ধি অভিযান। তখন আমাদের সিলেট শহরে শুরু হল আরেক ঘটনা। ঘটনার উৎসস্থল যুক্তরাজ্য। সেখানে উন্নয়ন কাজে একসাথে প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন। কমনওয়েলথভুক্ত দেশ সমুহ হতে এই শ্রমিকের চাহিদা পূরণ হবে। জোটের সদস্য হওয়ায় পাকিস্তানের ভাগেও একটা কোটা আছে। এখন নিখিল পাকিস্তানের প্রাপ্য এ কোটার ঢেউ কেমনে কেমনে আমাদের নিস্তরঙ্গ শহরে ঢুকে জোয়ার সৃষ্টি করেছে। আকাশে বাতাসে লন্ডন যাওয়ার রব। মানুষের মুখে মুখে গান হয়ে প্রকাশ পেল এর প্রতিক্রিয়া, উৎসাহ, উদ্দিপনা ও তৎপরতা; ঠিক এ ভাবে,‘আইলরে লন্ডনের জ্বর,/ ঘর বাড়ি সব বিক্রি কর/ তাড়াতাড়ি পাসপোর্ট কর, দিনত বইয়া যায়রে’।
সিলেট স্টেডিয়াম লোকে লোকারণ্য। চার আনা দামে লন্ডন যাওয়ার ফর্ম বিক্রি হচ্ছে। বেশির ভাগই কৃষি শ্রমিক বা নিম্নবিত্ত কৃষিজীবী। বাস্তুভিটা যা আছে সব বিক্রি করে হলেও লন্ডন যেতে হবে। এখন আর অন্য কোন কাজ নয়; সব কাজ এখন কেমনে ফর্ম সংগ্রহ করা, পুরন করা, টাকা পয়সার ব্যবস্থা, অফিসে সব ঠিক ঠাক করে জমা দেয়া ইত্যাদির মধ্যেই চলছে। ভাবটা হল সুযোগ জীবনে একবারই আসে।
সুযোগের সদব্যবহার করল সিলেটের লোক যথাসময়ে। ঢেউয়ের টানে এই প্রথম একটি সহজ ও নিয়ম তান্ত্রিক উপায়ে এত বিপুল সংখ্যক লোক সিলেট হতে লন্ডন পাড়ি জমাল। অবশ্য সিলেট অঞ্চল হতে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বহু আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর বিভিন্ন লেখনিতে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। সেই বৃটিশ আমল থেকেই জাহাজের খালাসি, সারেং, কাপ্তান হয়ে সিলেটের মানুষের বিদেশ পাড়ি দেয়ার অনেক ঘটনা আছে। এখনও সিলেটের গ্রামাঞ্চলে সারেং বাড়ি, খালাসি বাড়ি, কাপ্তান বাড়ি কালের সাক্ষি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। ১৯৬২ সালে এক ধাপে বিপুল সংখ্যক সিলেটীর দেশান্তরের পর বিদেশ যাওয়ার এই প্রবণতায় কিন্তু ভাটা পড়েনি। প্রথম প্রজন্ম একটু স্থিতিশীল হওয়ার পরই পরবর্তী প্রজন্মকে প্রবাসে নিয়ে যাওয়ার তৎপরতা শুরু হয়। দেশে কর্ম সংস্থানের অভাব, এবং বিদেশে একটি স্বাচ্ছ্যন্দপূর্ণ নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রথম দিকে দেশান্তর হওয়ার আকর্ষণীয় প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে। এই প্রবাহ অব্যাহতভাবে চলছে প্রজন্ম হতে প্রজন্মান্তর। প্রসঙ্গত আমি সিলেট মদন মোহন কলেজে ইংরেজির অধ্যাপনায় কর্মরত অবস্থায় অনেক ছাত্র আমার কাছে বিদেশে যাওয়ার রং বেরংএর ফর্ম নিয়ে আসত বুঝিয়ে দেয়ার জন্য। লক্ষ্য করতাম, লেখা পড়ার চেয়ে ঐ দিকেই তাদের ব্যস্ততা বেশী। আমি তাদেরকে কমপক্ষে গ্র্যাজুয়েশনটা শেষ করে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়ার পরামর্শ দিতাম। কিন্তু একদিকে প্রবাসী বাপ চাচার চাপ, অন্যদিকে বিদেশের মোহনীয় হাতছানি, এই দুটানার মধ্যে পড়ে প্রবাস জীবনই তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হত। ছাত্রদের মাঝে দেশান্তরের কারণে সরকারী উচ্চপদস্থ চাকরিতে সিলেটীদের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। সেই বৃটিশ আমল হতে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত এবং বাংলাদেশেও যেখানে ওঈঝ, ঈঝচ, ইঈঝ ইত্যাদি উচ্চপদস্থ পদে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সিলেটী ছিল সেখানে বর্তমানকালে এই হার ক্রমশই নিম্নগামী হচ্ছে।
কালক্রমে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা একটা নেশার মত চেপে বসে তরুণ সমাজের মাঝে। আইন কানুন কঠোর হলে ক্রমান্বয়ে ইউরোপের সীমা অতিক্রম করে ইউএস, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ইত্যাদি বিত্তবান দেশে যেখানেই সুযোগ পাচ্ছে সে দিকেই সিলেটী তথা বঙ্গসন্তানরা পাড়ি দিচ্ছে। উল্লেখ্য বিদেশের মোহনীয় আকর্ষণ এখন সিলেটের গ-ি পেরিয়ে দেশ ব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও যাওয়ার পথে অনেক বঙ্গ সন্তানের সলিল সমাধি হচ্ছে , অবৈধ পথে ধরা পড়ে বিদেশের কারাগারে নির্যাতনের মধ্যে দিন গুজরান করছে। কিন্তু এত প্রতিকুলতার মধ্যেও এই স্রোতধারা থেমে নাই, চলছে নিত্য নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন। যেন তেন প্রকারে একবার বিদেশের মাটিতে পা রাখলেই হল; এরপরত জীবনের ইপ্সিত সব প্রাপ্তি হাতের মুঠোয়। এই যে সর্বস্ব খুইয়ে, জীবনকে বাজি রেখে বিদেশ যাওয়ার মারমুখি প্রতিযোগিতা, ইহার পিছনে বেকারত্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তাহিনতা ইত্যাদিই শুধু নিয়ামক ভুমিকা পালন করেনা। আমার মনে হয় আমাদের তরুণ সমাজের মধ্যে রাতারাতি ধনী হওয়ার ইচ্ছা, হতাশা থেকে মুক্তির বাসনা, এক ধরনের পলায়নবাদি মনোবৃত্তি ইত্যাদি কারণও দেশত্যাগে প্রেরণা যোগায়। সরকারী চাকরির সুবাদে কয়েকটি দেশে আমার সেমিনার, ট্রেইনিং, মিটিং ইত্যাদি উদ্দেশ্যে ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল। কাজের ফাঁকে বাহিরে হোটেল, প্লাজা ইত্যাদিতে বাংলাদেশি কর্মরত লোক দেখলেই আমি আগ্রহের সাথে তাদের প্রবাস জীবন নিয়ে আলাপ করেছি। আলাপকালে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমার মনে হয়েছে অমানুষিক পরিশ্রম করে এরা ওখানে যে আয় করছে দেশে এই নিষ্ঠা ও সততার সাথে এর অর্ধেক শ্রম দিলে এ অর্থ উপার্জন করে পরিবারের সাথে নিরুদ্বেগ জীবন কাটাতে পারত এবং দেশের উন্নয়নে ভুমিকা রেখে গৌরববোধ করতে পারত। কিন্তু এই যে, ‘ওপারে যে এত সুখ, আমার বিশ্বাস’ অথবা ‘এতা নয়, হেথা নয়, অন্য কথা’।
অবশেষে অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে বিদেশ যাত্রা সম্পন্ন হল। জীবনের সব চাওয়া পাওয়া হাতের মুঠোয়; এমন কি কোন কোন ক্ষেত্রে কল্পনারও অতীত। দেশে প্রবাসে গাড়ী, বাড়ি, বিত্ত, বৈভব সবই ত হল। অতঃপর! সব পাওয়ার এই স্বপ্নের দেশেও কি যেন নেই। একটা শুন্যতা বোধ, অন্তরের হাহাকার! তারা এখন প্রবাসী। প্রজন্মসহ তারা এখন শিকড় গেড়েছেন জীবনের ইপ্সিত সব প্রাপ্তির মধ্যে। অস্তিত্বের দৃঢ় ভিত্তি স্থাপনের দৃপ্ত প্রত্যয়ে তাদের আপন মেধার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটছে একটা অনুকুল পরিবেশে ও বংঃধনষরংযবফ ংুংঃবস এ। আমার দেশের এ মানুষগণ বিপুল অবদান রাখছেন বসবাসরত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ইত্যাদির উন্নয়ন ক্ষেত্রে। এমনকি প্রবাসের রাজনীতির মুল ধারায়ও তাদের অনেকে নিজের আসন পাকাপুক্ত করেছেন। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভা-ারও ফুলে ফেঁপে স্ফীত হচ্ছে বিদেশে তাদের ঘামে ঝরা পরিশ্রমের ফসল হিসেবে।
কিন্তু বিদেশের জল, হাওয়া, মেশিনের সাথে খাপ খাওয়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও তারা কিন্তু নাড়ির টান ছিন্ন করতে পারেননি। এত কর্মযজ্ঞের মধ্যে মনোনিবেশ করেও মাঝে মাঝে তারা আনমনা হয়ে যান। দেশের জন্য মন আনচান করে।
সময় সুযোগে ছুটে আসেন তারা দেশে, ছায়া সুনিবিড় নিজ আলয়ে। পরিচিত পরিবেশে মিশে যেতে তাদের কত ব্যাকুলতা। পুকুর ঘাটে স্নান করেন, বড়শি দিয়ে মাছ ধরেন, গ্রামের হাটে যান, পুরনো ইয়ার, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেন হাটে, ঘাটে, মাঠে। সবই চিরপরিচিত, পরিবেশের সাথে মিশে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা। অতীতকে ফিরে পাওয়ার নিরন্তর আকুতি। এরপরও পিয়াসী মন আরও যেন কিছু খুঁজে বেড়ায়। খুঁজে বেড়ায় তাঁর ফেলে যাওয়া শৈশব, তাঁর সাথি, অবিকল আগের মত, ছায়া সুনিবিড় সেই গ্রাম। দেশান্তরের সাথে সাথে সব কিছু যেন হারিয়ে গেছে।একটা শুন্যতাবোধ, নিজেকে যেন সেই অতি পরিচিত পরিবেশে বিলীন করে দেয়া যায়না। দেশ কালের পরিক্রমায় কোথায় যেন একটা মধঢ় হয়ে গেছে। এভাবেই সময় কাটে। ফেরার সময় হয়ে যায়। মনে কিছুটা না বলা কষ্ট নিয়েই ফিরতে হয় সুখের দেশে অতৃপ্ত শান্তিকে পিছনে ফেলে স্বপ্নের শান্তির দেশ ছেড়ে।
আবার সেই ছকে বাঁধা যন্ত্র জীবন। একঘেয়েমি থেকে মুক্তি খোঁজেন তারা। প্রবাসে কাজের ফাঁকে সুযোগ পেলেই সকলে মিলিত হন এক সাথে। সাত সমুদ্র তের নদীর পারে তারা আরেকটা বাংলাদেশের ৎবঢ়ষরপধ রচনা করেন। সোচ্চার হন দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি সংস্কৃতি, ঘটমান ঘটনা ইত্যাদি বিষয়ে। আয়োজন করেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের। শিল্প সাহিত্য চর্চা করেন দেশীয় আবহে, মেজাজে। আমার পরিচিত নিভৃতচারী কিছু স্বজনদের অজানা সুপ্ত প্রতিভার জোরালো প্রকাশ ঘটতে দেখি প্রবাসে তাদের রচিত শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি ইত্যাদি চর্চার পরিম-লে, সরব ও সক্রিয় বিচরণে। বিভিন্ন সামাজিক মিডিয়ায় প্রকাশ পায় দেশ সম্পর্কে তাদের আলোচনা, সমালোচনা, মতামত ইত্যাদি। এই সব কর্মকা-ই দেশের সাথে তাদের একাত্ম থাকার প্রয়াস। ম্যানহাঁটনের বাঙালি অধ্যুষিত কোন রেস্তরাঁয় গিয়ে বসে আলাপ আলোচনা শুনলে মনে হয় আমি যেন বাংলাদেশেই আছি ,বিশ্বময় বাংলাদেশ। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা না বলে পারছিনা। নিউইয়র্কের এক রাস্তায় গাড়ী দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ এক দোকানে বাংলায় ও ইংরেজিতে বন্দর বাজার লেখা বড় সাইন বোর্ড দেখে আমি থমকে উঠলাম। খুশীতে মন নেচে উঠল, নিউইয়র্কেও বন্দরবাজার! তাড়াতাড়ি গাড়ীটা পার্কিং করে আমি প্রায় এক মা ইল উর্ধশ্বাসে ছুটে বন্দরবাজারে গিয়ে ঢুকলাম। এক শ্বাসে পরিচয় প্রসঙ্গর পর্ব শেষ হল। দোকানের দু’জনের বাড়িই সিলেটের মেজরটিলা। আমার ‘বিশনাতি’ পরিচয় পেয়ে দুইজনই খুশীতে ডগমগ। তারা এখন আমাকে নিয়েই মসগুল। কাস্টমার, বেচাবিক্রি সব বন্ধ। আমাকে জিজ্ঞাসা, ‘ভাই কিতা খাইবা? আফনার জেতা ইচ্ছা লইয়া খাইন, লগে করি পরিবারের লাগি লইয়াও যাওয়া লাগব। ‘মনে হল এই মুহূর্তে পারলে সারা দোকানটাই আমার ঘাড়ে তুলে দিলে তাদের শান্তি। যাই হোক, দু’একটা জিনিস খাওয়ার পর একটা বড় প্যাকেট আমার হাতে জোর করে দিয়ে বলল, ‘ইটা দেশে লইয়া যাওয়া লাগব।’ এর মধ্যে দেশের কথা চলল অবিরাম। গোগ্রাসে গিলছে ওরা। আগ্রহের শেষ নাই। অবশেষে উষ্ণ আলিঙ্গনে বুকের মধ্যে তাদের একটা চেপে থাকা বিষাদের ভার নিয়ে বিদায় নিলাম। ‘শেষ হইয়াও হইলনা শেষ।’
শেষ কথা, প্রবাসে থাকা আমার দেশের এই ভাগ্য তাড়িত মানুষদের জীবনের শেষ ইচ্ছা থাকে, এই জৌলুশপূর্ণ জীবন থেকে মুক্ত হয়ে দেশের মাটিতে যেন তাদের প্রাণহীন, বাসনাহীন নিথর দেহটাকে শায়িত করা হয়/ অথবা দাহ করা হয়। তাঁর শেষ জানাজা যেন স্বজনদের উপস্থিতে হয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT