সাহিত্য

ছেদ

আনোয়ার হোসেন মিছবাহ্ প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৯-২০১৮ ইং ০১:১৩:৫৩ | সংবাদটি ৪৩৯ বার পঠিত

ন’টার সাথে সাথে হুড়োহুড়ি ভিড় বাড়ছে। কলেজ ক্যানভাসে উপস্থিত সবাই। আজ কলেজে ভর্তির দিন। ফরম সিরিয়াল, মেধা বা যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়। আগে ফীস পরে ভর্তির সুযোগের ভিত্তিতে নেওয়া হবে ছাত্র। তাই ভিড়কে ঠেলে যে যার মতো লাইনে। যেনো রেলের বগির মতো জড়িয়ে আছে লাইন। আগে টাকাতো আগে ভর্তি। আগে ভর্তিতো ক্লাসের ক্রমিক নাম্বার আগে। তাই ধাক্কাধাক্কির মাত্রাটাও বাড়তির দিকে। লাইন হারিয়ে বোকা সাজতে রাজি নয় ছাত্রছাত্রীরা। এরই মধ্যে শ্যাম কপালি ছাত্রীর আবির্ভাব। হিজাব থাকায় পুরোটা দেখার সুযোগও হাতছাড়া। কপাল বর্ণকেই গায়ের রং হিসেবে ধরে নিতে হচ্ছে। চোখ দেখে বোঝা যায় ২ শে ছুঁই ছুঁই মেয়েটির বয়স। টানা টানা চোখে কাজলের জলছাপ যেনো ঘাট বাধা পুকুরের পাড় ভাঙ্গা ঢেউ। নাবিল আঁড় চোখে আঁচ করে শ্যামলাবর্ণের এই মেয়েটি হৃদয়ে তুফান আনা কেউ। কিন্তু নাবিলকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটি হিজাব খুলে ফেলে, এবং হাতে হিজাব রেখেই নাবিলকে উদ্দেশ্য করে বলে,
-হাই নাবিল, কেমন আছেন?
-কিন্তু, আপনাকে ঠিক...
-আমি সীমা। আমাকে চিনবেন না। তবে আমি আপনাকে চিনি। আপনার পাশে কি একটু জায়গা হবে? পেছনে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি। ভরসা পাচ্ছি না, আদৌ ফী টা জমা করতে পারবো কি না। তাই আপনার কাছ থেকে একটু সুযোগ চাইছি আর কি। এবার নাবিল এলোপাথাড়ি চোখটাকে তার নিজের কাছে নিয়ে আসে। সীমার চোখে চোখ মেখে তাকায়। কিছু একটা বলতে যাবে, ওমনি সীমাই তার পরিচয়ের আয় টানে-
-আমি সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এসেছি।
-ও, আমি আবার এমসি কলেজ থেকে।
-থাক! আর পরিচয় দিতে হবে না। আপনি নাবিল হাসান। আমি আপনাকে ভালো করেই চিনি।
কবিতার পাতায় পাতায় আপনার নাম। তাছাড়া যুক্তিবিদ্যার ক্লাস থেকেই আপনার সাথে মনোপরিচয়। আমরা ক’জন কিন্তু বড়–য়া স্যারের ক্লাস মিস করিনি। যেদিন স্যারের ক্লাস, ঐদিন আমাদের কলেজ পালানো।
-ও, তাই?
-জি, জনাব। ক্লাসেই দেখেছি আপনি মনোযোগী শ্রোতা। আর শুধু শ্রোতাই নন, ঘষ ঘষ করে লিখে নিতেন স্যারের সমূহ ল্যাসন। আপনার কাছ থেকে নোট আনবো বলে কতোদিন ইচ্ছেকে পাজাকোলো করেছি। কিন্তু সাহসের কাছেই শুধু ধরাশায়ী হয়েছি। আনতে পারিনি, আর পারিনি বলেই আপনার চেয়ে হয়তো অনেক কম মার্ক নিয়ে ডিগ্রিটা টপকেছি। আপনি যখন বন্ধু তাজিনকে জানাচ্ছিলেন, ভর্তি হচ্ছেন ল’ কলেজে। তখনই ইচ্ছেকে আপনার ইচ্ছের সাথে মিলতে দিয়েছি। ব্রতী হয়েছি আমিও হবো। কিন্তু এতোক্ষণ ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে ভরসা পাচ্ছিলাম না, ভর্তি হতে পারবো কি না। ক্রমিক নাম্বারের সাথেইবা আপনাকে পাবো কিনা। আর তখনই আপনাকে দেখতে পেলাম সামনের অংশে দাঁড়িয়ে। একটু জায়গা হবে?
এবার নাবিল পেছনে তাকায়। তাকায় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভাবি সহপাঠীর দিকে। সীমাকে ঠাঁই দিলে অন্যায় হবে কি না ভাবছে। এমন সময় পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধু জয় বলে ওঠে-
-সমস্যা কি, দাঁড়িয়ে যান। নাবিল জায়গা না দিলে আমি দিতে পারি। চলে আসুন আমার সামনেই।
জয়ের এমনতরো আবাহনে নাবিল লজ্জা পেলেও ভরসা পায়। বলে;
-হা, হা, চলে আসুন। চাইলে আমার সামনেই চলে আসতে পারেন। সীমা বলে;
-না, না, আপনার সামনে নয়, পেছনেই থাকি। বলে নাবিলের পেছনে দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে বলে;
-থ্যাংক ইউ।
মধ্য দুপুর অবধি শেষ হচ্ছে না লম্বা লাইন। কাঠ শুকানো রোদে পুড়ে যাচ্ছিলো শরীর।
কিছুক্ষণ পর পর নাবিল করতালু ঘষে ঘষে পিষে মারছিলো ঘামফোঁটা। আর সবার মতো হাঁসফাঁস করছিলো এবং দুঃখ দুঃখ ভাব নিয়ে কাঁধ ঘুরিয়ে দেখছিলো সীমার ধৈর্য্য প্রতিক্ষা। মায়া হচ্ছিলো নাবিলের। মনে মনে ফী আদায়কারী কর্তাটির গুষ্ঠি উদ্ধার করছিল। শালা! হাত ভারি একটা! আমি হলে...
এবার সীমার গলা এলো।
-কিছু বললেন?
-না বলছিলাম, ইচ্ছে করলে লোকটা একটু তাড়াতাড়িই নিতে পারতো।
-ও, তাই বলেন। ভাবলাম, আমাকে কিছু বলছেন। তা নিক না, একটু সময় করে নিক। আরেকটু অবসরে। এখনতো লাইনে খারাপই লাগছে না।
-কি যে বলেন, আমরা রোদে পুড়ে কাঠ হচ্ছি, আর বলছেন ভালই।
-না। বলছিলাম, একজন কবির ধারে কাছেতো দাঁড়াতে পারছি। লাইনের ইতি হলে কি অমন করে পারতাম? এই নিয়ে একটা কবিতা লিখেন না কবি। অথবা শুনান না একটা...।
-ঠাট্টা করছেন?
-না তো। ঠাট্টা করবো কেনো? জানেন, আমি কবিতা ভালোবাসি। হাটে, ঘাটে, মাঠে যেখানেই কবিতা পাই পড়ি। আপনার কবিতা হলেতো কথাই নেই। কবিতা ভালোবাসি। আরো ভালোবাসি... না। থাক!
-শুনে খুশি হলাম, কবিতা ভালোবাসেন। আরো কী বাসেন যেনো বলছিলেন?
বলে ঘাড়টি ঘুরিয়ে নেয় নাবিল। আর অমনি অচেনা এক মাদকতা ছড়িয়ে যায় তার শরীর জুড়ে। এতোক্ষণ ধরে উড়–-উড়– যা ছিলো তা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি কমনীয় শরীরে এ কি দেখলো নাবিল। এতো রূপ ছড়াতে পারে সীমা- এতোক্ষণ জানা ছিলো না। টিকালো নাক। জোড় করা জুড়া ভ্রু। পাতাবাহারি ঠোঁট যেনো সূর্যের আলোর বাহার ছড়িয়ে যায়। টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো আফাল চুলে সত্যিই সীমাহীন সীমা নাবিলকে কবিতার কাছে নিয়ে যায়। আফাল চুলের মনোহারী দোলার মতো তার হৃদয়ও দোলে ওঠে। আপন দোলায় দোলে ওঠে মনোরাজ্য। কেমন জানি ঢেউ খেলে যায় মনোসমুদ্রে। সে টের পেতে শুরু করে মনোসমুদ্রের ঝড়ের পূর্বাভাস। আর মৃদুকন্ঠে আওড়াতে লাগলো;
তোমার বুকের ঝড়টি থামুক
আমার বুকের বন্দরে
পাগলা ঝড়ের বাজুক বাঁশি
অনেক চাওয়ার অন্দরে।
কবিতাটি খুব সুন্দর। এখন লিখলেন বুঝি?
বলেই কথা শেষ করতে পারে না সীমা। তার কথাটি কেড়ে নিয়েই মুখ বাঁকালো তাহের। বলে;
-কবিদের এক দোষ। নারী পেলে মাথা ঠিক থাকে না। কথা নেই, বার্তা নেই, কবিতা আমদানী হয়ে যায়। যত্তোসব। এবার সীমা বললো;
-উনি এমনিতেই লিখেন। আপনি শুধু শুধু দোষারূপ করছেন। ভালোইতো লিখেছেন। আমার ভালো লেগেছে। সত্যি অপরূপ। এ কথা শুনার পর তাহের সামনে এগুতে থাকে। তাহের ক্লাসমিট হলেও মুখ পাতলা স্বভাবের জন্য বহুল পরিচিত এমসি কলেজে।
সীমা আর নাবিলের মাদক মাতাল গল্প বিলাসে কেটে যাচ্ছিলো সময়। এগুচ্ছিলো লাইন। ভুলিয়ে ভালিয়ে রোদও তার প্রখরতাকে চালিয়ে নিচ্ছিলো। এমন সময় একটি ছায়া হঠাৎ করেই গিলে খায় নাবিলের শরীর। সীমা ছাতা মেলেছে। আগলে রেখেছে দুজনের মাথা। ঘামে নেয়ে যখন জবুথবু আর শরীরের বাঁকগুলো যখন জল থৈ থৈ সীমার শরীর আব্দুল তখনই ছাতাটি এনেছে।
সীমা পরিচয় করিয়ে দেয়;
-ও হচ্ছে আব্দুল। আমাদের বাসাতেই থাকে। ওর জন্ম সুনামগঞ্জের ভাটিপাড়া হলেও বড় হয়েছে এখানে।
আর সেই আব্দুলের আনা ছাতাটিরই ছায়া ছায়া ভাগে দু’জনের শরীর। নাবিল মাথাটি ঘুরিয়ে বলে;
-ধন্যবাদ, সীমা।
-ওয়েলকাম। এ আর এমন কী। আমার কষ্ঠ হচ্ছিলো শার্টটি ভিজিয়ে ফেলেছেন দেখে।
-ও, তাই? আমারও কিন্তু কষ্ট হচ্ছিলো। আমারই বাজু ঘেঁষে আপনি নাইতে যাচ্ছেন দেখে। সত্যিই আপনার জন্য কিচ্ছু করতে পারছিলাম না ভেবে খারাপ লাগছিলো। আচ্ছা, একটা কাজ করুন না আমার ঠিক আগে চলে আসুন। একটা কিছু করতে পেরেছি ভেবে মনটা শান্তি পাবে।
এবার সীমা বললো;
-বাহ! আপনি খুব সুন্দর করে কথা বলে ফেললেন। জানেন? আপনার পেছনের ক্রমিকটিই যেনো আমার হয়... এটিই ছিলো প্রতীক্ষা। একটু পরেই এর অবসান হবে বলে মনে হচ্ছে।
আপনি ক্রমিক নাম্বারে রাজা হলে আমায় অন্তত: প্রজা হতে দিন।
বেলা দেড়টার দিকে ভর্তির পালা শেষ হয় নাবিলের। ভর্তির কাগজটি হাতে নিয়ে কেমন জানি একটু অপেক্ষার ইচ্ছা জাগে। খুব ইচ্ছে করে সীমার জন্য দেওয়া হোক না আরেকটু সময়। অপেক্ষাও শেষ হয়। নাবিলের ঠিক পরপরই সীমার ক্রমিক নাম্বার। কিন্তু এ কি! কাগজটি হাতে নিয়ে বিজয় ভঙ্গিতে হন হন করে বেরিয়ে গেলো সীমা। শুধু ‘থ্যাংকয়ু’ নব্দটি খানিক আছড়ে পড়লো নাবিলের গায়। গেইটের ওপারে ছিলো সীমাদের এলিয়েন কার। গাড়িতে ওঠে পড়লো সীমা। আস্তে আস্তে করে ছুটে চললো এলিয়েন। নিদানের চোখ জমা রেখে রেখে নাবিল শুধু মুখস্ত করতে লাগলো পেছনের নাম্বার প্লেইট-ঢাকা-গ ০৮৮৬।
আজ ক্লাস শুরু হবে। একটু পরেই বেজে ওঠবে চাপরাশির ঘন্টা এর জন্য কান পাতা সকলের। ঘন্টা বাজলেই নতুন জীবন শুরু হবে সবার। শুরু হবে নাবিলেরও। বারান্দায় হুড়োহুড়ি। কেউ কেউ পরিচয় নিতে ব্যস্ত। কেউবা আবার ক্লাসে ঢুকায়, এমন সময় সবাই মুখোমুখি দাঁড়ালেও সীমা আর নাবিল দু’জন দু’মুখো। কেউ কারো সাথে কথা বলে না। নাবিলের ইচ্ছেগুলো মার্বেলের মতো আছাড়ি পিছাড়ি খায় যেনো একবার কথা বলে সীমা। কেনো হঠাৎ উধাও হয়েছিল সেদিন? আবার নিজেকে নিজে গুটিয়ে নিয়ে প্রশ্ন করে; এমন করে কথা বলার দাবীও কী নেওয়া হয়েছিলো দাবীতে?
এমন ভাবনা বেলায় টন টন করে বেজে ওঠে কলেজের ঘন্টা; আর অমনি হুড়মুড় করে ক্লাসে ঢুকে নব ছাত্রদল। ক্লাসে তিন ধাপের পাতানো চেয়ারের প্রথম চেয়ারে বসে সীমা। আর নাবিল দ্বিতীয় সারির প্রথম চেয়ারে। নাবিল যখন অন্যমুখো হয়, তখন সীমা হয় নাবিল মুখি। আর সীমা অন্যমুখো হলে নাবিল গভীর পর্যবেক্ষণে মেতে ওঠে। চোখে চোখ পড়লেই শুধু দুটো চোখ বিপরীত মুখি হয়। নতুবা চোখের তীরে তরী ভেড়ানোর ইচ্ছেই দু’জনের মনে আঁকু পাঁকু খায়।
ক্লাসে স্যার আসেন। সবাই প্রাইমারি শিক্ষাকে কাজে লাগায়। স্যার বসতে বলেন। নিজের পরিচয় দিয়ে ক্লাসে সবার পরিচিতি নিতে চান। এক এক করে সবাই পরিচিতি দিতে থাকে। দ্বিতীয় সারির প্রথম এলেই এবার নাবিল দাঁড়ায়।
-আমি নাবিল হাসান। এমসি কলেজ থেকে এসেছি। আমরা দু’ভাই এক বোন। বাসা শহরের ফুলপুর। নাবিলের ধারাবাহিকতা শেষ হয় সীমার শেষ সারিতে। স্যার পাঠ্যবইয়ের নাম লিখে দিযে বললেন,
-কাল থেকে ক্লাস শুরু হবে। আমি মুসলিম ও পারিবারিক আইনটি পড়াবো। আপনারা প্রস্তুতি নিয়ে আসবেন। বলেই এদিনের মতো বেরিয়ে গেলেন।
পরের দিন স্যার মুসলিম ও পারিবারিক আইনের ১৯৬১ থেকে শুনিয়ে সবাই বুঝেছেন কিনা জিজ্ঞেস করলেন। প্রথম ক্লাসে সবাই বুঝেছে এ রকম একটি ভাব দেখালে স্যার অন্য ক্লাসের তাগাদায় চলে গেলেন। অন্য দিনের জন্য ক্লাসও শেষ হয়। নাবিল খুব আঁড়চোখে সীমাকে দেখে। লক্ষ্য করে সীমাও চোখের পলকে পলক ফেলে আড়মোড়া ভাঙ্গে মনেরই আয়নায়।
এদিকে নাবিল সীমার চঞ্চলতাকে প্রশ্রয় দিয়ে আহ্লাদি মিনির মতো বুকে তোলে নেয়। মনে মনে মনের ক্যানভাসে তুলির আঁছড়ে যেনো কথা বলে।
এ আমি কি করছি? কেনো তোলপাড় করে যাচ্ছে ভেতরের রক্তকণিকা। সীমাকে দেখলেই হু হু করে ওঠছে কেনো বুক? কেনো এতো চলোচঞ্চল হয়ে ওঠছে হৃদয়ের ঘরদোর। তাহলে এরই নাম প্রেম? প্রেমতো হলো আবার চোখে চোখে কথা। মনের কোণে শূন্যতার ব্যথা। তাহলে কী শূন্য তবে এই বুক? হ্যাঁ। তাইতো। সীমাকে দেখলেই কেমন জানি পেতে ইচ্ছে করে। একেবারে নিজের করে পেতে। ও চলে গেলে খা খা করে ওঠে বুক। শূন্য শূন্য হয়ে ওঠে জীবন। ঘুমের জন্য কাঙাল চোখ সীমার জন্য ছুটে বেড়ায়। এইতো গত কয়েকদিন থেকে এরকম করে ওঠছে নাবিলের আঁেখাটি হৃদয়। যদি তার নাম প্রেম হয়- তবে প্রেমে পড়েছে নাবিল। আর সীমা?
নাবিল জানে না। যে সীমা নাবিলের সাথে পূর্ব পরিচিতের তোয়াক্কা না করে সুবিধা নিলো। তাহলে কী নাবিল তাকে সুবিধা বলবে? যার দিকে নাবিল এক পা বাড়িয়ে দিলো। সেই কি না কাজ শেষে মুখ ফিরিয়ে নিলো।
ভাবনাকে পুঁজি করে ক’দিন থেকে ক্লাসে অমনোযোগি হয়ে ওঠছে নাবিল। ট্রট আইন থেকে শুরু করে কোন ক্লাসেই মনোযোগ দিতে পারছে না সে। ক্লাসে স্যার নাবিলের অমনোযোগিতা প্রত্যক্ষ করেই হঠাৎ প্রশ্ন করে বসেন-
নাবিল বলেনতো, মুসলিম ও পারিবারিক আইন কবে পাশ হয়?
এমনতরো প্রশ্নে ভড়কে যায় নাবিল। সে বিদ্যুৎ চমকের মতো চমকিত হয়। ক্লাসে মেঝে থেকে ছাদ, ছাদ থেকে দরোজা, জানালা সবকিছু থেকেই যেনো উত্তরের আশায় কান পেতে রয়। স্যার আবার রিপিট করেন-
-বলেন, নাবিল।
এবার ক্লাস শুদ্ধ হেসে ওঠে। যেনো মনে হয় গরুর লেজে কেউ বেঁধে দিয়েছে পলিথিন। ভাবখানা এমন যেনো সবারই জানা আছে উত্তর। এবার নাবিলের অসহায় চোখ কেনো জানি সীমার দিকে পাক খায়। সীমা এহেন পাক খাওয়া চোখ দেখে বড়ো বড়ো অক্ষরে খাতায় লিখে দিয়ে আপাত উদ্ধার করে নাবিলকে।
কিন্তু নতুন করে পরিচয় হওয়া ক্লাসমেটরা শার্টের পেছনে টেনে ধরে নাবিলের। কি ব্যাপার কবি সাহেব? শুরু? না আগে থেকে ছিলো?
একটু কানাঘোষা। একটু কথার পিঠে কথা ক্যাম্পাস ছড়ায়। বাড়তে থাকলো খুনসুটি আর কানাঘোষার দল। তবে যার জন্য এমনতরো হয়ে ওঠলো মায়াবি ক্যানভাস সে শুধু জানলো না। সে শুধু আড়ালে আর ধারে কাছে টুনটুনির মতো গেয়ে গেয়ে টুই-টই-টিপ-টিপ!
এমন করে চলে যাচ্ছিলো নাবিলের দিন। একদিন সহপাঠি লাকি নাবিলকে বলে;
তোমার নোট খাতাটা কি নিতে পারি? গতো দিন ক্লাসে আসিনি তাই নোটটা চাচ্ছি। তুমিতো আসো প্রতিদিন। আজ নোটটি দিলে কালকেই ফেরত দিয়ে দেবো।
নাবিল কোন কিছু না ভেবে সীমার বান্দবীর আবদারটুকুই রক্ষা করে শুধু। নোট ডায়রীটা লাকির হাতে তুলে দেয়।
পরের দিন লাকি নোটটি ফেরত দেয় ঠিক, তবে প্রতিটি নোটের নিচে তার নিজের মতামত লিখে। অথবা নাবিলের লিখা কবিতার নিচে আরেকটি কবিতার প্রচেষ্টা চালিয়ে।
নাবিলতো অবাক। এও কি হয়? এ আবার কেমনতরো অসভ্যতা? নাবিল লাকিকে স্পর্ধার জন্য ভৎসনা করলে কান্না জুড়ে দেয় লাকি। বলে;
-নোট নিয়ে কেনো জানি ভুলেই গিয়েছিলাম, এ নোট আমার নয়। কিসের জানি ভর করেছিলো একটা দাবি। তোমাকে আপন ভাবার মতো নোটকেও আপন ভেবে লিখে ফেলেছি। ফেইসবুকে তোমার কবিতাগুলো লাইক দিতে দিতে কখন জানি তোমাকেও লাইক করতে শুরু করেছি নিজেও জানি না। এ জন্য ক্ষমা চাইছি। ক্ষমা করে দিও।
কথাগুলো খুব গভীর মনোযোগে দাঁড়িয়ে শুনছিলো সীমা। এবার নাবিলের কাছে এসে সেও নোট ডায়রীটা চায়। নাবিল ডায়রীটা দিতে ইতস্ততঃ করলে এক ধরনের রাগি চেহারায় টান মেরে নিয়ে যায়। আর আস্তে আস্তে ডায়রীটা খুলে এক এক করে লাকির নোট পড়তে থাকে। এ সময় ভিজে ওঠে তার চোখ। বুঝে পায় না কি করবে সে। রাগে অপমানে হঠাৎ করে ডায়রীর পাতা ছিঁড়তে থাকে। লাকির লিখা অংশগুলো ছিড়ে ছিড়ে উড়িয়ে দেয় ক্যাম্পাসের ঘাস গালিচায়। এরপর ঘট ঘট শব্দের মতোন শব্দ তুলে চলে যায়।
নাবিল পেছন থেকে ডাকতে চেয়েও ডাকতে পারে না। সে ঘটনার আকস্মিকতায় খেই হারিয়ে ফেলে সময়ের। তারপর আস্তে আস্তে করে তুলে নেয় ছিঁড়ে ফেলা কাগজগুলো এবং পড়তে থাকে;
‘চোখ তুলে তাকালেই তোমাকে দেখি,
তোমায় ভালোবাসি নাবিল
তোমায় ভালোবাসি।’
কি থেকে কি হয়ে গেলো। বুঝাটাই শুধু বাকি রয়ে গেলো। নাবিল বুঝে ওঠতে পারছে না যা সে চায়নি তাই কেনো পায়। আর যা চায় সেই কেনো চলে যায়।
আজও কলেজ ক্যাম্পাস শূন্য। সীমা ছাড়া নাবিলের কাছে শূন্যই লাগে ক্যাম্পাস। আজ নিয়ে দ্ইু সপ্তাহ হতে চললো কলেজ বিমুখ হয়েছে সীমা। কলেজ বিমুখতার কারণও জানে না কেউ।
লাকির কাছ থেকেও সদুত্তর পাওয়া যায়নি দু’একটা মোবাইল নাম্বার ছাড়া। হঠাৎ করেই নাবিলের মনে হলো, ফোন করলে কেমন হয়? সে ফোন দেয়। ওপাশ থেকে শব্দ আসে-
‘এই মুহূর্তে আপনার কাক্সিক্ষত নাম্বারে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না....’
একবার, দু’বার তিনবার চেষ্টা করে নাবিল। মোবাইলটি বন্ধই পায়। এ অবস্থায় কেমন জানি অস্থির লাগে নাবিলের। সে এবার সীমার ড্রাইভার আব্দুলকে ফোন দেয়। ফোন ধরে আব্দুল।
-হ্যালো। কে বলছেন?
-আমি নাবিল। সীমার ক্লাসমেট।
-হা আপনাকে চিনতে পেরেছি।
-সীমার কি খবর? ওর ফোন বন্ধ কেনো? সীমা কোথায়? কথাগুলো এক শ্বাসে জিজ্ঞেস করে নাবিল থামে। কিন্তু একি অপাশ থেকে কান্না করছে আব্দুল।
-ভাই। আপামনি মুন লাইট ক্লিনিকে। আপা মণি অসুস্থ ভাই। আজ নয় দিন ধরে কথা বলছে না আপা মণি।
ডাক্তার বলেছেন, ‘সময় ফুরিয়ে এসেছে আপা মণির। আপা মণি আর বাঁচবে না ভাইজান।
-কেনো কি হয়েছে আপা মণির?
-অস্থির ভাবে জিজ্ঞেস করে নাবিল।
-আপামণির ক্যান্সার হয়েছে ভাইজান।
বলে আবারও হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে আব্দুল।
অন্যদিকে শরীর হীম হয়ে আসে নাবিলের। বাড়তে থাকে হৃদপিন্ডের শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT