সাহিত্য

তথ্যসমৃদ্ধ নিটোল ইতিহাস গ্রন্থ

মুনশি আলিম প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৯-২০১৮ ইং ০১:১৫:৫০ | সংবাদটি ২২১ বার পঠিত

গবেষণায় থাকে অজানা তথ্য-উপাত্ত, জ্ঞাত-অজ্ঞাত সত্য ও সুন্দরের মিশেল। গবেষকের পরিশ্রমের ফলে তা চূড়ান্ত রূপ পায়। গবেষক জফির সেতুর ‘সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের ইতিহাস’ তথ্যসমৃদ্ধ একটি গবেষণাগ্রন্থ। সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য জানতে অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি’র শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত জানা যেমন জরুরি তেমনই জরুরি জফির সেতুর সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের ইতিহাস বইটি। এ বই একটি আন্দোলনের ইতিহাস, একটি বৃহৎ অঞ্চলের গণমানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার ইতিহাস। কিছু লেখার আবেদন ক্ষণস্থায়ী আর কিছু লেখার আবেদন থাকে দীর্ঘস্থায়ী। পাঠক পড়ামাত্রই তা অনুধাবন করতে পারে। সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের ইতিহাস বইটি এমনই একটি বই যার আবেদন দীর্ঘস্থায়ী তো বটেই, সিলেটের গবেষণা গ্রন্থগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণও বটে।
এ গ্রন্থে উঠে এসেছে শ্রীহট্ট তথা সিলেটের তথা ভারতীয় উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতিসহ বিবিধ বিষয়। এ গ্রন্থটিতে ছবির মতো করে ফুটে উঠেছে শ্রীহট্টের শিক্ষাবিষয়ক তথা ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষাবিষয়ক রাজনৈতিক ইতিবৃত্ত। পুরোটা পাঠে জানা যাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিম-লের নানাদিক। তথ্য-উপাত্তে সন্নিবেশিত আর বর্ণনার ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে প্রাঞ্জলতা, নিটোল আকর্ষণ। যারা গদ্যে সরসতা খুঁজে পান না, তারা জফির সেতু’র সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের ইতিহাস বইটি একটু নাড়াচাড়া করে দেখতে পারেন। আশা করছি আপনারা নিরাশ হবেন না। সিলেটের ‘নাগরী’ থেকে প্রকাশিত ১৯.২৫ ফর্মার এই বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের পথপরিক্রমা। বইটিতে মোট সাতটি অংশ রয়েছে। যথা : প্রেক্ষাপট, ব্রিটিশ-ভারত পর্ব, পাকিস্তান পর্ব, বাংলাদেশ পর্ব, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, প্রাসঙ্গিক, উপসংহার অংশসহ বিবিধ।
বিশশতকের সূচনালগ্ন থেকে পূর্ববঙ্গেও মুসলমানরা শুরু করে পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি। গাণিতিক হিসেবে তা প্রায় ৭০ বছরেরও অধিক হবে। রাষ্ট্রনায়কদের বারবার আশ্বাস দেওয়ার পরও বঞ্চিত এবং জেলজুলুমের শিকারও হয়েছে আন্দোলনের কিয়দাংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন যখন বিশশতকে দানা বেঁধে উঠেছিল ঠিক সে সময়ে আসাম প্রদেশের মানুষও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখা শুরু করে। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজকে কেন্দ্র করে শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের নতুন বাঁক।
তদানীন্তন আসামের চিফ কমিশনার ও গভর্নরও অনেকটা ঘোষণা দিয়েছিলেন একটি উচ্চমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের। এর বাস্তবায়নের জন্য দূরদর্শী রাজনীতিবিদ ও আসামের শিক্ষামন্ত্রী খান বাহাদুর সৈয়দ আবদুল মজিদ ওরফে কাপ্তান মিয়াসহ তাঁর সঙ্গীরা শহরের গোবিন্দচরণ পার্ক থেকে কলেজটিকে শহরের বাইরে টিলায় স্থানান্তর করে বিশাল আকারের ভূমিও অধিগ্রহণ করেন।
১৯২৫ সালে দাবি ওঠে সিলেটে উচ্চতর শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৩৮ সালে সিলেটে ‘শ্রীহট্ট বিশ্ববিদ্যালয় কনভেনশন’ অনুষ্ঠিত হয় এবং ‘শ্রীহট্ট বিশ্ববিদ্যালয় ব্লুপ্রিন্ট’ প্রণীতও হয়। এসময় অহমিয়ারাও পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি জানায় গৌহাটিতে। ১৯৪১ সালে শিক্ষামন্ত্রী মুনাওর আলী আসাম ব্যবস্থাপনা পরিষদে ‘শ্রীহট্ট বিশ্ববিদ্যালয়’র প্রস্তাব করেন এবং অহমিয়াদের বিরোধীতার মুখে তা নাকচও করেন। অহমিয়াদের জাতিবিদ্বেষ ছিল কিংবদন্তিতুল্য। ‘লাইনপ্রথা’ ও ‘বাঙালখেদা’ আন্দোলন এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৫ সালে ‘পরিকল্পনা কমিটি’, ‘শ্রীহট্ট বিশ্ববিদ্যালয় স্কীম’ প্রণয়ন এবং অনুমোদনও করা হয়। ১৯৪৬ সালে আসাম ব্যবস্থাপনা পরিষদে তা উত্থাপিত এবং গৃহীতও হয়।
রাজনৈতিক কারণে দেশবিভাগের পর দুটি দেশের সৃষ্টি হলে সিলেট গণভোটের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে ১৯৪৮ সালে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়টি গৌহাটিতেই স্থাপিত হয়। খাজা নাজিমউদ্দিনের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি উত্থাপন করা হলে তিনি আশ্বাস দেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপন করা হয় রাজশাহীতে। ১৯৫১ সালের শুমারি অনুযায়ী সিলেটের শিক্ষার হার ছিল ২৪.৮%, যেখানে সারাদেশের শিক্ষার হার ছিল ১৮.২৪%। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৫০ সালে রাষ্টায়ত্ত সিলেট মহিলা কলেজকে ১৯৫০ সালে বাতিল ঘোষণা করা হয়। এবং একই সঙ্গে মুরারিচাঁদ কলেজের অনার্স শ্রেণির পাঠদান ক্রমান্বয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে আবারও বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন দানা বাধে। ১৯৬৪ সালে সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা থাকলেও ফজলুল কাদের চৌধুরীর ধূর্তচালে একদিনের মাথায় তা পরিবর্তিত হয়ে চট্টগ্রামে স্থাপিত হয়। ষাটের দশকের বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোনের ইতিহাস ছিল খুবই জোরালো। এ আন্দোলনের ঢেউ মফস্বলে এসেও লাগে। এ আন্দোলনে প্রবাসী সিলেটিরাও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে ‘বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ পালন করা হয়। সিলেটের নারীরাও এ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। সিরাজুন্নেসা চৌধুরী তাঁর ১৯ দফা দাবিতে সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবিও সংযুক্ত করেন। গণদাবিতে সহমত পোষণ করেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান ও হামিদুল হক চৌধুরী। ১৯৭২ সালে আন্দোলন আবারও জোরদার হয়। আশির দশকে জিয়াউর রহমান নির্বাচনি প্রচারণায় সিলেটে এলে তা নতুন ভাবে উচ্চারিত হয়। ১৯৮৩ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় আরোহণের পর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন গাঁটছড়া বাধে।
এরই ফলে ১৯৮৫ সালের ৫ সেপটেম্বর আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সিলেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘জাতীয় অর্থনীতিতে সিলেটবাসীর অবদানের কথা ১০ কোটি মানুষের জানা আছে। [...] কিন্তু দুঃখের বিষয় সেই অর্থ সিলেটের উন্নয়নে কাজে লাগছে না। তাই বিগত দিনে আপনারা যা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন আমি আপনাদের তা পূরণ করে দেব। [...]
১৯৮৬ সালের ৩০ এপ্রিল আখালিয়া-কুমারগাঁওয়ে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় আধ্যাদেশ জারি হয়, প্রবল বিরোধীতার মুখে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইনটি ১৯৮৭ সালে পাস হয়। সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যে পরিমাণ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে বাংলাদেশে আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য এতটা পোড়াতে হয়নি।
জফির সেতু প্রতিশ্রুতিশীল কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক। এককথায় তিনি একজন পরিশ্রমী লেখক। সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের ইতিহাস বইটি লিখতে গিয়ে তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহের জন্য তিনি হেঁটেছেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, শহর থেকে শহরান্তে, দেশের সীমানা পেরিয়ে ভিনদেশে। উপর্যুক্ত দলিল দস্তাবেজের মাধ্যমেই তিনি তাঁর গবেষণাকর্মের সুসমন্বয় করেন। সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থের জন্য কিংবা সমৃদ্ধ একটি গবেষণার জন্য একজন গবেষককে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। এই বইটি যে বহুপরিশ্রমেরই ফসল তা পঠনপাঠনেই বোঝা যায়।
জফির সেতু সাহিত্যের নানাক্ষেত্রে বিচরণ করলেও কবি হিসেবেই তিনি সমধিক পরিচিত। সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের ইতিহাস গ্রন্থ প্রণয়নে তিনি ইতিহাসের ক্রমব্যাপ্তি অনুসরণ করেছেন। অসম্ভব প্রায় দুর্লভ তথ্য-উপাত্তে তিনি পূর্ণ করে তুলেছেন তাঁর গ্রন্থটি। উচ্চতর শিক্ষাবিষয়ক আন্দোলনের ইতিহাস জানতে গিয়ে তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন ইতিহাসখ্যাত ভারতীয় উপমহাদেশের নানা অঞ্চল। নানা রাজনৈতিক ব্যক্তির স্পষ্ট ও অস্পষ্ট ভূমিকা। জটিলতার জাল দুর্ভেদ্য করে দ্রৌপদীর শাড়ির মতো পাঠকের সামনে একে একে উন্মোচন করেছেন ব্রিটিশভারত থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরবর্তী শিক্ষাবিষয়ক সমাচার। বইটি পঠনপাঠনে পাঠক নতুন নতুন তথ্যের সঙ্গে পরিচিত হবে। এক অংশ থেকে আরেক অংশে পদার্পণে পাঠক ক্রমাগতই বিস্মিত হবেÑভাব, ভাষা, তথ্য-উপাত্তের বিষয় বৈচিত্র্যে। শিক্ষাবিষয়ক ইতিহাসের নিটোল স¦াদ নিতে, নিরপেক্ষ স্বাদ নিতে পাঠক বইটি সংগ্রহে রাখতে পারে। আমার বিশ্বাস, সমৃদ্ধ গবেষণার কারণে গ্রন্থটির পাশাপাশি লেখকও মহাকালে স্মরণীয়-বরণীয় হয়ে থাকবেন বহুকাল।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT