মহিলা সমাজ

নারীর মর্যাদা

জাহিদা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৯-২০১৮ ইং ০০:৩৯:৫৪ | সংবাদটি ১৫৮ বার পঠিত

স্বাস্থ্যে, পুষ্টি, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক সমীক্ষা থেকে ১৯৮০ এর দশকে বাংলাদেশে নারীদের সামাজিক মর্যাদা পুরুষের চাইতে কম। বেশির ভাগ নারীদের জীবন তাদের পরম্পরার ওপর কেন্দ্রীভূত থাকে এবং তাদের জন্য বাজার ব্যবস্থা, উৎপাদনশীল সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা এবং স্থানীয় সরকারে খুব সীমিত প্রবেশাধিকার থাকে। সুযোগের এই অভাবগুলি উর্বর, উর্বরতার ধরণগুলোর ক্ষেত্রে অবদান রেখেছিল যা পরিবারের সুখ খর্ব করে দেয় অপুষ্টি এবং সাধারণত শিশুদের দরিদ্র স্বাস্থ্যে সহায়তা করে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে এবং অন্যান্য জাতীয় উন্নয়নে হতাশ করে তুলে। প্রকৃতপক্ষে প্রান্তিক পর্যায়ে তীব্র দারিদ্র নারীদের ওপর কঠোর হয়ে ওঠে। যতক্ষণ পর্যন্ত স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণে নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত থাকবে ততোক্ষণ পর্যন্ত মহিলা জনগোষ্ঠির উৎপাদনশীলতা সম্ভাবনাগুলি সীমিত থেকেই যাবে।
১৯৮০ এর দশকের শেষ নাগাদ প্রায় ৮২ শতাংশ নারী গ্রামাঞ্চলে বসবাস করতো। বেশির ভাগ গ্রাম্য মহিলা সম্ভবত ৭০ শতাংশ ছোট কৃষক ভাড়াটে এবং ভূমিহীন পরিবার ছিলো অনেক খ-কালীন বা সামাজিক শ্রমিক হিসাবে কাজ করে সাধারণত ফসল ফলানোর কাজে লাগে এবং এক ধরণের ক্ষুদ্র নগদ মজুরিতে পারিশ্রমিক পায়। ২০ শতাংশের আরেকটি অংশ বেশির ভাগ দরিদ্র ভূমিহীন পরিবারে নৈমিত্তিক শ্রম কুঁচকানো, ভিক্ষা এবং আয়ের অন্যান্য অনিয়ন্ত্রিত উৎসের উপর নির্ভরশীল।
সাধারণত তাদের আয় বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য ছিলো। অবশিষ্ট ১০ শতাংশ নারী প্রধানত পেশাগত ব্যবসা বাণিজ্য বা বড় মাপের ভূস্বামী শ্রেণিতে থাকেন এবং তারা সাধারণত বাড়ির বাইরে কাজ করে না। বাংলাদেশে নারীদের সামাজিক মর্যাদা বহু বছর ধরে সংগ্রাম করে প্রাপ্তিকে বুঝানো হয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশি নারীরা বৃহদাকারে সাফল্য ম-িত হলেও বিগত চার দশকে নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি, উন্নততর কর্ম প্রত্যাশা, উন্নত শিক্ষা এবং তাদের রক্ষার্থে নতুন আইন প্রয়োগ দেখা গেছে।
নারীদের অর্থনৈতিক অবদান উল্লেখযোগ্য ছিলো কিন্তু বেশিরভাগই অস্বীকৃত। গ্রামীণ এলাকার নারীরা বেশির ভাগ ফসল পূর্ব কাজ করতো যা রান্নাবান্না এবং গবাদি পশু, হাঁস মুরগি এবং ছোট বাগানগুলি পালন করার মধ্যে অন্তর্গত ছিলো। শহরের মধ্যে নারীরা গার্হস্থ্য ও ঐতিহ্যগত কাজের উপর নির্ভরশীল ছিলো কিন্তু ১৯৮০ এর দশকে তারা ক্রমবর্ধমান উৎপাদন কাজগুলিতে কাজ করে বিশেষ করে প্রস্তুতকারক গার্মেন্টস শিল্পে।
যারা অধিক শিক্ষা নিয়েছে তারা সরকার, স্বাস্থ্য সেবা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে কাজ করে কিন্তু তাদের সংখ্যা খুব সীমিত ছিলো। অত্যহিতভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চহার এবং চুলাভিত্তিক নারী বাড়ির বাইরে কর্মসংস্থান চায়। তদানুসারে মহিলা শ্রমশক্তির অংশ গ্রহণ হার ১৯৭৪ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে যায়। যখন এটি প্রায় ৮ শতাংশে এসে পৌঁছেছিলো। ১৯৮০ এর দশকে মহিলা মজুরির হারের ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে। বাংলাদেশে নারীদের মর্যাদা বহুবছর ধরে সংগ্রাম করে বিশাল প্রাপ্তিকে বুঝানো হয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশি নারীরা বৃহদাকারে সাফল্য মন্ডিত হয়েছে।
বিগত চার দশকে নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি, উন্নয়ন কর্ম প্রত্যাশা, উন্নত শিক্ষা এবং তাদের রক্ষার্থে নতুন আইন প্রয়োগ দেখা গেছে। নারী হচ্ছে পৃথিবীর আলো, নারী হচ্ছে প্রকৃতি ও প্রকৃতির একটি অপরিহার্য অঙ্গ। তাকে ছাড়া গোটা বিশ্ব অচল। সভ্যতার অগ্রগতির মূলে নারীর অবদান অনস্বীকার্য।
যুগ যুগ ধরে পুরুষের পাশাপাশি নারীও সমানভাবে অবদান রেখে আসছে। সর্ব যুগেই নারী তার বুদ্ধি, মেধা, শ্রম, যোগ্যতা, মমতা দিয়ে ভবিষ্যৎ এর সাফল্য নিশ্চিত করে আসছে, সেই সাথে সৃষ্টি করে যাচ্ছে নতুন ইতিহাস।
কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে আমাদের সমাজ প্রযুক্তি ও শিক্ষায় উন্নতি করতে পেরেছে অথচ আজো নারীদের সম্মান, মর্যাদা ও অবস্থান সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র জ্ঞান অর্জন করতে পারেনি।
আদিকাল থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত নারীরা ধাপে ধাপে নিজেকে এগিয়ে নিয়েছে কিন্তু সমাজে তারা আজো অবহেলিত, অপমানিত, কারণ তারা হচ্ছে নারী। প্রাপ্তির পরিবর্তে মিলছে শুধু শূন্যতা।
হাজার প্রতিবন্ধকতা নারীর চলমান গতিকে শিথিল করে দিচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে অবস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, তারপরেও পরিবর্তন হয়নি নারীর অবস্থান।
একবিংশ শতাব্দীর এই উন্নত পরিবেশে এসেও নারী আজ বড়ই অসহায়। বিশ্বের প্রতিটি দেশে প্রায় প্রতিদিনই নি¤œস্তর থেকে উর্ধ্বতন বিভিন্ন কৌশলে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
শুধু ঘরে বসেই নয়, বাইরের কর্মক্ষেত্রেও নারীদের কোন নিরাপত্তা নেই। সবচেয়ে বেশি আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে কিছু কিছু পরিবার এখনো নারী শিশু জন্ম নিলে তাদের হত্যা করা হয় কিংবা কোন পরিত্যক্ত স্থানে ফেলে দেয়া হয়।
আমাদের দেশে নারীদের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। স্বামী থেকে শুরু করে পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের হাতে নারীরা অত্যাচারিত হয়ে থাকে, এর ফলে বহু নারী আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেয়।
সমাজের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব না করে পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন না হলে শিশু বয়স থেকে শুরু করে কিশোর, যৌবন, বিবাহ পরবর্তী জীবন নারীকে সহ্য করতে হয় মানসিক, শারীরিক নির্যাতন।
পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে নারীর নেই কোন স্বাধীনতা। নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া নারীর কঠোর পর্দা প্রথার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার নিকট নারী স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিলো স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করে পুরুষের সক্ষমতা অর্জন।
আজ যেসব নারী তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন সে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে সে তার অধিকার আদায় করে নিচ্ছে। একটা সমাজ কতখানি উন্নত তা নির্ভর করে এই সমাজের নারীর অবস্থান কতটুকু উন্নত তার ওপর।
কমলা বাসিনীর সুরে পৃথিবী স্বাধীন, রাষ্ট্র স্বাধীন কিন্তু নারীরা এখনো সামাজিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপে স্বাধীন নয়।
স্বাধীন সামাজিক মর্যাদার জন্য পথ পাড়ি দিতে হবে অনেকটা। সে পথে মনোবল নিয়ে নারীকে এগোতে হবে শত বাধা বিপত্তি পেরিয়ে সম্মুখ পানে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT