মহিলা সমাজ

লোভাছড়া : বাংলার রূপ

আয়েশা মুন্নি প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৯-২০১৮ ইং ০০:৪০:৪৯ | সংবাদটি ২০০ বার পঠিত

প্রকৃতির কাছে প্রকৃতির বুকেই যে জাগে আমার অন্তরাত্মা। আমার বরের প্রবাসী বন্ধুদের জন্য আমার বাসায় ডিনারের আয়োজন করেছি। দু’জন ইংল্যান্ড, একজন আমেরিকা আর একজন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। গল্পের ছলেই বললাম, বাইশ বছর যাবৎ সিলেটে কিন্তু বেশ কিছু দর্শনীয় জায়গায় এখনো যাওয়া হয়নি। যখনই বাচ্চাদের ছুটি হয় বা যাব সিদ্ধান্ত নেই, তখন ওর সময় নেই। যথারীতি ফাইনাল হল, আগামীকালই আমরা লোভাছড়া দেখতে যাব। ওর আজ নাইটে ডিউটি আছে। একটা রাউন্ড দিয়ে চেক করে ঘণ্টা দুয়েক এর মধ্যে চলে আসবে।
শফিক ভাই খুব স্বজন আমাদের। বিয়ের পর যখন প্রথম গোয়াইনঘাট যাই তখন থেকেই উনার সাথে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক। প্রায় বিশ বছর হতে চলেছে। এবারও দশ বছর পর দেশে এসে আমার বাসাতেই কয়েকদিন আড্ডা, গানের আসর খুব জমেছে। উনি বলল ওকে, আমি থেকে যাই। ভোরে বের হয়ে লোভাছড়া ঘুরে আসার পথে আমার শালিকার বাড়িতে দুপুরের খাওয়া হবে। আমার বর বলল, কিভাবে যেতে হবে বা ওখানকার ব্যাপারে খবর নেই।
২০০১ সালে যখন প্রথম জকিগঞ্জ যাই, তখন থেকেই মঈন ভাইর সাথে আমাদের আত্মার সম্পর্ক। না বন্ধু নয়। উনি আমাকে বোন ডাকেন আর ওসি সাহেব বোন জামাই। এই সাদাসিধে বয়স্ক মানুষটি এলাকায় বেশ প্রভাবশালী, কিন্তু একদম সহজ সরল গ্রাম বাংলার ব্যক্তিত্ব। আমি বললাম, মঈন ভাইকে একটা ফোন দাও। বল আমি যাব, ব্যাস আর কিছু লাগবে না। বাকী চিন্তা উনার। বরং আমি কম বলেছি, শুধু দায়িত্ব না আরো কিছু যদি থাকে তাও উনি পালন করেছেন। এরপর বাকীটা গল্পের মত...।
রাত বারোটা। বাচ্চারা ঘুমোতে গেছে, শফিক ভাইও। আর কর্তা গেছেন ডিউটিতে। আমি আছি আধোঘুম আধো জাগরণে। হঠাৎ খেয়াল করলাম সময় রাত তিনটা। এ সময়ের ভিতর তো চলে আসার কথা। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি জিরো ব্যালেন্স। অতএব উঠলাম। ল্যান্ড ফোন থেকেই ফোন দিলাম। ও বলল, তুমি ঘুমাও ফিরতে সকাল হয়ে যাবে। প্রশ্ন করলাম, কেন? একটা অপারেশন করেছি। মাদক ইয়াবা ধরেছি আসামিসহ। তুমি এখন কোথায়? অফিসে।
মনটা খারাপ হয়ে গেল এক মুহূর্তের জন্য। কালও যাওয়া হবে না। বাচ্চারা মন খারাপ করবে। বেশিরভাগ সময়ই কোনো প্রোগ্রাম করলে এমন কিছু না কিছু হাজির হয়। পরে ভাবলাম ভোর নাগাদ এলেও হবে। ওরতো না ঘুমানোরই অভ্যাস। ঘণ্টা দুয়েক ঘুমালেই হবে। আমি বিছানায় গেলাম। না ঘুম আসছে না।
কর্তা সারারাত বাসায় বসে নেটে থাকে, টকশো দেখে। আর আমি থাকি ঘুমের রাজ্যে। কিন্তু ডিউটি থাকলেই আমি সাউন্ডস্লিপ দিতে পারি না। সকাল হয়ে গেছে সাতটা বাজে। এখনো এলো না। আবার ফোন দিলাম। বলল ঝামেলা শেষ করে বাসার নীচ পর্যন্ত এসেছিল। আবার যেতে হয়েছে। কেন? আবার ডাক পড়েছে। এক রাতে দু’টো অপারেশন সাকসেস। এবার স্মাগলিং ভারতীয় বিড়ি। কখন ফিরবে বলতে পারছে না। সিজার লিস্ট মামলা, সব শেষ হলে তারপর ফিরবে। বলল, তোমরা রেডি হও, আসছি। বাচ্চারাতো রেডি। শফিক ভাইও। নাস্তা পর্বও শেষ।
এবার শফিক ভাই ফোন দিলেন। বলল, আপনি ওদের নিয়ে চলে যান আমি কাজ শেষ করে আসছি। আমি বাচ্চাদের বললাম, মনতো খারাপ হবেই। কিন্তু পাপাকে ছাড়া যেহেতু যাব না, তাই আমরা শারদীয় দুর্গাপূজার বন্ধে যাব। তাছাড়া ওরাও ছোট থেকে অভ্যস্ত এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে। শুধু ওরা কেন, পুলিশের বৌ বাচ্চাদের জীবনে এমন ঘটনা যে কত কত বার ঘটেছে তা শুধু এই পরিবারগুলোই জানে।
শফিক ভাইও চলে গেলেন। এদিকে মঈন ভাই সকাল আটটা থেকে ফেরিঘাটে নৌকা ভাড়াসহ যাবতীয় আয়োজন করে রেডি। কিছু সময় পরপর আমাকে ফোন দিচ্ছে। বারোটা বাজে ও ফোন দিল দশ মিনিট লাগবে আর আসতে তোমরা রেডি হও। আমরাতো সকাল থেকেই রেডি। আমি বললাম আজ আর বাদ দাও। এসে কিছু সময় বরং ঘুমাও। পরে একসময় যাব। উনি বললেন, ছেলে-মেয়ে মন খারাপ করবে। সমস্যা নাই আজই যাব। কিসের দশ মিনিট। একটা বাজে। এদিকে শফিক ভাই ফোন দিচ্ছে উনার শালিকা লাঞ্চ এর আয়োজন করেছে। এখন যাওয়ার পথে, খেয়ে যাব।
আমি মঈন ভাইর সাথে কথা বলে জানলাম, দু’ঘণ্টা কানাইঘাট আর দু’ঘণ্টা নৌপথ। অতএব কোনোভাবেই এখন আমি সময় নষ্ট করতে রাজি হলাম না। বললাম ফেরার পথে ডিনার করব। (পুলিশের পাল্লায় পড়েছেন শফিক ভাই। ইহা আমেরিকা নয় সোনার বাংলা।)
কর্তা ফিরলেন বিধ্বস্ত। কিন্তু মুখখানায় একটা অসহায় হাসি। একবার ভাবলাম বলি বাদ দাও। কিন্তু ইয়া বড় সাইজের আস্ত একখানা ধমকের ভয়ে চুপ করে রইলাম। বললাম তুমি গোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে একটু খেয়ে নাও তারপর বের হই।
শফিক ভাইকে ফোন দিয়ে বললাম আপনি বের হন আসছি। মঈন ভাইকে বললাম আবার নৌকা ভাড়া করেন বের হচ্ছি। ড্রাইভারকে নিতে চাইলাম, বললাম তুমি গাড়িতে একটু ঝিমিয়ে নিবে। বলল না, সেই ড্রাইভ করবে। উল্লেখ্য শফিক ভাই সাংঘাতিক নিয়ম মানেন। এক সিটে একজনের বেশি হলে বেচারা টেনশন করতে করতে যাবেন। তিন মিনিটের পথেও উনি সিটবেল্ট বাঁধেন। অবশেষে আল্লাহর নাম নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হলো লোভাছড়ার উদ্দেশ্যে।
বেশ কিছু সময় পর আমরা পৌঁছালাম জৈন্তিয়াপুর। কর্তা বলল, ঘুম পাচ্ছে চা খাব। জায়গাটার নাম বাঘের সড়ক। ছোট একটা টং দোকানে গাড়ি থামিয়ে উনি চা খেলো । বলল, ড্রাইভিং করার সময় দু’তিন বার চোখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এবার আমি জোর করেই ড্রাইভিং সিটে বসলাম।
পৌঁছালাম কানাইঘাট থানার ফেরিঘাটে। পরবর্তী যাত্রা নৌপথ। ভর দুপুরের তপ্তরোদ মাথায়। এতো সময় এসিতে টের পাইনি। ছাতা নিয়ে উঠলাম ইঞ্জিনচালিত বেশ বড় একটা নৌকায়। প্রকৃতির বাতাসের শীতলতায় শুধু দেহ নয়, মন প্রাণও জুড়োতে লাগল। আমার বাংলা। আহা, কি অপরূপ। কোটি কোটি শব্দভান্ডারও শেষ হবে, তবু এই রূপের বর্ণনার ছিঁটেফোটাও হবে না।
অনেক ইঞ্জিল নৌকা নদীর বুক চিরে উল্কাবেগে দৌড়াচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতির অপার মহিমায় যৌবন ভরা নদীর ছলছল জলে কতটুকুইবা ক্ষতি করবে প্রকৃতির। সম্ভবই না এই প্রকৃতির ধারেকাছে যাওয়া। ছুটে চলছে আমার বজ্রানৌকা। ছুটছে আমার মন। প্রকৃতির বিশালতার কাছে সবই ক্ষুদ্র। আমি হারাই, হারিয়ে যাই। এই জনম স্বার্থক আমার, এ বাংলা আমার। মায়াময় রূপময় বাংলা। পানির সাথে পানির মিতালী দেখতে দেখতে বেশ সময় পার করে যেখানটায় পৌঁছালাম সেখানটায় নদীর মিলনস্থল তিনদিকে ধাবিত।
প্রথম গেলাম ঝুলন্ত সেতু যেদিকে। একধারে সারি সারি একই ধরনের বিশাল লম্বা লম্বা গাছ। সাজানো গোছানো কাটছাট গাছগাছালি বরাবরই আমার আটিফিসিয়াল লাগে। আরেকধারে গাছগাছালি তাদের ইচ্ছেমতো লতাপাতা ডালপালা ছড়িয়েছে। আহা মরে যেতে স্বাদ জাগে এত রূপের মায়ায়। মহিষগুলো দল বেঁধে ভেসে ভেসে তাদের ঠিকানায় ঠিকই পৌঁছাবে।
সন্ধ্যের আগেই সবকটা দৃশ্য যে আমায় দেখতেই হবে। এবার নৌকা উল্টো ঘুরে লোভাছড়া চা বাগানের ঘাটে ভিড়ল। শতবর্ষী বিশাল এক বটবৃক্ষ দাঁড়িয়ে বহমান স্রোতের সাক্ষী হয়ে। পাথরের সমাবেশে বৃদ্ধ শেকড়গুলি পেতেছে এক বিরাট সিংহাসন। আমি সে বৃক্ষের শেকড় বেয়ে গুড়িতে বসে রাণীর মতো ছবির পোজ দিলাম। বাগানের সরু পথ ধরে হাতি হেঁটে যাচ্ছে আয়েশিভাবে। এরপর চা বাগানের ফটক। অনুমতি ছাড়া ঢুকা যাবে না। জনাবিশেক ছেলে অনেকসময় চেষ্টা করে ব্যর্থ মনে জটলা করছে।
আমি জানতে চাইলাম ম্যানেজার আছে বা টিলা বাবু। আমার উনি বলল, বাদ দাও কি হবে ভিতরে গিয়ে, কত চা-বাগান দেখছ। ভীড় থেকে একটা কিশোর বলল আমার কাছে চেয়ারম্যানের নাম্বার আছে, কিন্তু অনুমতিতো দিবে না। নাম্বার নিয়ে ওকে বললাম কথা বল। ও পরিচয় দিল। যাক, আমাদের জন্য এতগুলো কিশোরের ইচ্ছা পূরণ হল। কিছু ছবি তুলেই ফিরলাম।
ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত মানে লোভাছড়ার শেষ সীমানাটা যে না দেখলে অপূর্ণতা থেকেই যাবে। বর্ডার মানে শেষটা ছুঁয়েই ফিরছি। সূর্য তার আপন মহিমায় পূর্বাকাশ রাঙিয়ে আলোকচ্ছটা ছড়িয়ে আমাদের ফিরতি পথে প্রত্যেকের মুখে পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে। পূবালী বাতাসে কি অপরূপ ছিল সে কন্যাসুন্দর সময়।
ঘাটে ফিরলাম। আবেশিত মন ক্ষণে ক্ষণে পুলকিত হচ্ছিল। এবার আবার গন্তব্যে ফিরার পালা।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT