ইতিহাস ও ঐতিহ্য

দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি

আল-আমিন প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৯-২০১৮ ইং ০০:৪৬:৪৬ | সংবাদটি ২১০ বার পঠিত

সংসদীয় আসন ২২৮, সুনামগঞ্জ-৫ এর অন্যতম দোয়ারাবাজার উপজেলা। দোয়ারাবাজার উপজেলাটির উত্তরে ভারতের চেরাপুঞ্জি, মেঘালয় রাজ্য। দক্ষিণে ছাতক উপজেলা, পূর্বে ছাতক ও সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা, পশ্চিমে সুনামগঞ্জ জেলা।
সুনামগঞ্জ থেকে দোয়ারাবাজারের দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। সিলেট থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার। দোয়ারাবাজার সুরমা নদীর উত্তরপাড়ে হওয়ায় সড়ক পথে বাংলাদেশের অন্য কোনো জেলার সাথে সরাসরি কোনো যোগাযোগ নেই।
এই উপজেলায় নয়টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে: ১. বাংলাবাজার ইউনিয়ন, ২. নরসিংপুর ইউনিয়ন, ৩. দোয়ারাবাজার ইউনিয়ন, ৪. মান্নারগাঁও ইউনিয়ন, ৫. পা-ারগাঁও ইউনিয়ন, ৬. দোহালিয়া ইউনিয়ন, ৭. লক্ষীপুর ইউনিয়ন, ৮. বোগলাবাজার ইউনিয়ন এবং ৯. সুরমা ইউনিয়ন।
দোয়ারাবাজার নামটি এসেছে মূলত উপজেলার বাজারকে দুইবার স্থানান্তর করা থেকে। সুরমা নদীর নদীভাঙনের ফলে বাজারটিকে দুইবার স্থানান্তর করতে হয়েছে। আঞ্চলিক সিলেটি "দুই আরা" বা দুইবার থেকে দুয়ারা বা দোয়ারা শব্দটি এসেছে।
দোয়ারাবাজার উপজেলার মধ্যে দিয়ে নদী সুরমা, যাদুকাটা, বগরা অতিবাহিত হয়েছে। এছাড়াও খাসিয়ামারা, চিলাই নদী, মৌলা নদী ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে দোয়ারবাজার সুরমা নদীতে সংযোগ হয়েছে। এই উপজেলাটি স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে থানা গঠিত হয় এবং এই থানাকে ১৯৮৫ সালে ছাতক উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে নতুন করে দোয়ারাবাজার উপজেলা হিসেবে গঠিত হয়। এরপর ৭ টি ইউনিয়ন এই উপজেলায় অন্তর্ভুক্ত হয়। পরে লক্ষীপুর ইউনিয়নকে তিনটি ইউনিয়ন করে বর্তমানে মোট নয়টি ইউনিয়ন নিয়ে দোয়ারাবাজার উপজেলা গঠিত হয়েছে।
এই উপজেলার আয়তন মোট ৩২৪.১৯ বর্গ কিলোমিটার। ২০১১ সালের আদমশুমারি রিপোর্ট অনুসারে জনসংখ্যা মোট ২,৩৭,১৮০ জন। উপজেলায় নয়টি ইউনিয়নে ১৭৬ টি মৌজা ও ২৯৫ টি গ্রাম রয়েছে। শিক্ষার হার ৩০.৮%,এর মধ্যে পুরুষ ৩৫% ও নারী ২৬.৪%।
দোয়ারাবাজার উপজেলায় মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১৮টি। ২টি আলিম ও ১টি ডিগ্রি মাদরাসা সহ দাখিল স্তরের মাদরাসার সংখ্যা ১০টি। কলেজ সংখ্যা ৬টি এবং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৯২টি। মসজিদ-২৯৫ টি। মন্দির ১৫টি, গীর্জা ৪টি। নিবন্ধনকৃত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বা ক্লাব ১০টি এবং খেলার মাঠ ২টি রয়েছে। এর মধ্যে উপজেলার উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-বুগলা রোছমত আলী- রামসুন্দর উচ্চবিদ্যালয় এন্ড কলেজ ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বড়খাল বহুমুখী স্কুল ও কলেজ ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সমুজ আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। দোয়ারাবাজার কলেজ ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। টেংরা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। আমবাড়ী উচ্চবিদ্যালয় ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ঘিলাছড়া মাধ্যমিক উচ্চবিদ্যালয় ও কলাউড়া দারুসছুন্নাহ ফাজিল মাদরাসা ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়াও দোয়ারাবাজার মডেল উচ্চবিদ্যালয়, পেঁশকার গাঁও ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসা, ইসলামপুর সিদ্দিকিয়া দাখিল মাদরাসা, বড়–ই উড়ি আলিম মাদরাসা অন্যতম।
এই উপজেলায় হাটবাজারের সংখ্যা ২২টি। এর মধ্যে বোগলা বাজার, বালিউরা বাজার, দৌলতপুর বাজার (পশ্চিম বাংলাবাজার), বাংলাবাজার, দোহালিয়া বাজার, আমবাড়ি বাজার গরুর হাটের জন্য বিখ্যাত। দোয়ারাবাজার, লক্ষীপুর বাজার, আমবাড়ী বাজার, টেংরাটিলা বাজার, বালিউড়া বাজার, বোগলা বাজার, মাছিমপুর এবং জালালপুরের বাজার বৈশাখী মেলার জন্য খুব পরিচিত।
উপজেলার আবাদী জমির পরিমাণ-২৭৬৪৫ হেক্টর। অর্থকরী ফসল-ধান ও রবিশস্য। দর্শনীয় স্থান বাঁশতলা স্মৃতি সৌধ, মৌলা নদীর সুইস গেইট, টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ড, পান্ডারখাঁল বাঁধ, দোহালিয়া জমিদার বাড়ী।
এই উপজেলার জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উৎস কৃষি ৭১.১৪%। অকৃষি শ্রমিক ৫.৮৫%, শিল্প ০.৩২%, ব্যবসা ৮.৪২%, পরিবহণ ও যোগাযোগ ১%, চাকরি ২.৫৯%, নির্মাণ ০.৮৩%, ধর্মীয় সেবা ০.৩৬%, রেন্ট অ্যান্ড রেমিটেন্স ১.৬১% এবং অন্যান্য ৭.৮৮%।
এখানকার দর্শনীয় স্থান বাঁশতলা শহীদ স্মৃতিসৌধ, যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের ৫ নম্বার সেক্টরের সাবসেক্টর। এখানে রয়েছে এগারটি কবরস্থান যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শাহাদাত বরণকারী বীর সন্তানেরা । বাঁশতলার প্রাকৃতিক পরিবেশ মনোমুগ্ধকর। উত্তরে ভারতের সীমান্তবর্তী সবুজ পাহাড় আর পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা সর্পিল নদী যে কারো ভালো লাগবে। এখানে জুমগাঁও বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম হিসেবে পরিচিত। জুমগাও বাঁশতলা শহীদ স্মৃতিসৌধের সামান্য পশ্চিমে অবস্থিত একটি জনপদ যা সম্পূর্ণভাবে পাহাড়ের উপর গড়ে ঊঠেছে । গারো নৃগোষ্ঠীর মাধ্যম্যে সেখানে জনবসতি শুরু হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই স্থানটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত পছন্দের স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই উপজেলাটি মেঘালয়ের দ্বারপ্রান্তে বলে শীত মৌসুমে প্রচুর শীত পড়ে।
বোগলা ইউনিয়নের বোগলাবাজার বিজিবি ক্যাম্প মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে ইপিয়ার ক্যাম্প নামে পরিচিত ছিল। সরকারী এই বিজিবি ক্যাম্পটি এক সময় উপজেলার বিডিয়ারের হের্ডকোয়াটারের কার্যক্রম হিসেবে পরিচালিত হয়েছিল।
দোয়ারাবাজার সদরের একেবারেই গাঁ ঘেষে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের এক অনন্য নিদর্শন কাজল হাওর এবং দেখার হাওর। এই হাওরের কাজল বর্ণের ছলছল জলের দুর্বার আকর্ষণ যে কাউকে মোহময় করে তুলবে। বর্ষায় এর জলরাশি প্রবল শক্তিতে আছড়ে পড়ে উপজেলা সদরের উত্তর পশ্চিম অংশে আর শীতকালে হয়ে উঠে ফসলের চাদরে আবৃত ভূসর্গ। পান্ডারখালের বাঁধ এখানে কৃত্রিমভাবে তৈরি এ বাঁধটি যেকারো নজর কাড়বে। দোয়ারাবাজার সদর ও পান্ডারগাও ইউনিয়নের মধ্যে সংযোগকারী এই বাঁধটি পান্ডারখালকে দুইভাগে বিভিক্ত করে নিজের বুকে গড়ে তুলেছে সবুজের ছায়াঘেরা নান্দনিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ।
শিক্ষাক্ষেত্রে এককালে পিছিয়ে পড়া এই অঞ্চলটি বর্তমান সময়ে অনেকটাই এগিয়ে যাচ্ছে। দোয়ারাবাজারের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অধ্যয়ন করা ছাত্রছাত্রীদের অনেকেই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, ব্যাংক অফিসারসহ নিজ নিজ অবস্থানে যোগ্যতার সাথে দেশে-বিদেশে দায়িত্ব পালন করছেন।
কৃষি, ও মৎস্য, নির্ভর অর্থনীতির এ এলাকাটি বর্তমানে কিছুটা উন্নত হলেও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর ব্যাপক সম্ভবনাময় উপজেলাটি অবকাঠামোগত উন্নয়নহীনতা ও জনপ্রতিনিধিদের সুপরিকল্পিত উদ্যোগের অভাবে এখনো বাংলাদেশের পশ্চাৎ পদ উপজেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বন্ধ গ্যাসক্ষেত্র টেংরাটিলা এখানেই অবস্থিত। সর্বশেষ নাইকোর সাথে মামলায় এই গ্যাস কোম্পানিটি বন্ধ রয়েছে।
এই উপজেলায় বাংলাদেশের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, দার্শনিক.সাহিত্যিক ও সমালোচকও জন্মগ্রহন করেছেন।
দোয়ারাবাজারে জন্মগ্রহণ করেছেন এক সময়কার বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ আজরফ। তিনি একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।
বাংলাদেশে যে দুইজন বীরপ্রতীক উপাধি প্রাপ্ত নারী মুক্তিযুদ্ধা ছিলেন তাদেরই একজন কাকন বিবি। এই নারী ১৯৭১ সালে সংঘটিত বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীরযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা ও গুপ্তচর ছিলেন। সুনামগঞ্জ জেলার সবচেয়ে বেশি মুক্তিযোদ্ধে অংশগ্রহণকারী দোয়ারাবাজার উপজেলায় আরো তিন জন বীরপ্রতীক উপাধি প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা হলেন ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতিক, আব্দুল হালিম বীরপ্রতিক, আব্দুল মজিদ বীরপ্রতীক।
এই উপজেলায় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন নকিব উদ্দিন, ডা. আব্দুল রহিম, ডাঃ আব্দুল কুদ্দুস। বর্তমানে দায়িত্বে আছেন ইদ্রিস আলী বীরপ্রতীক।
সুনামগঞ্জ-৫ আসনটি থেকে ১৯৯১ সালে জাতীয় পার্টি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এডভোকেট আব্দুল মজিদ মাস্টার। ২০০১ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন এবং ১৯৯৬, ২০০৮ এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে মুহিবুর রহমান মানিক সংসদ সদস্য হয়ে এই জনপদের সাংসদ হিসেবে রয়েছেন।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সাত মার্চের কবিতা ও সিলেট বেতার কেন্দ্র
  • পার্বত্য তথ্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সিলেটের প্রাচীন ‘গড়’ কিভাবে ‘গৌড়’ হলো
  • ৮৭ বছরের গৌরব নিয়ে দাঁড়িয়ে সরকারি কিন্ডারগার্টেন প্রাথমিক বিদ্যালয় জিন্দাবাজার
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা
  • খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন
  • ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
  • শ্রীরামসি গণহত্যা
  • প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্প
  • বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা
  • গ্রামের নাম আনোয়ারপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • Developed by: Sparkle IT