ইতিহাস ও ঐতিহ্য হাদা মিয়া-মাদা মিয়ার ঐতিহাসিক বিদ্রোহ

মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ

রফিকুর রহমান লজু প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৯-২০১৮ ইং ০০:৪৯:২৬ | সংবাদটি ১১৪ বার পঠিত

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ কর্তৃক বাংলার স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হবার মাত্র সিকি শতাব্দী পর ১৭৮২ তে সিলেট ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে ছিলো। সিলেটবাসী স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় কোম্পানির প্রতিনিধি রবার্ট লিন্ডসের সুনিপুন সেনা দলের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়েছিলো। ইতিহাসে এই যুদ্ধ ‘হাদা মিয়া-মাদা মিয়ার বিদ্রোহ’ নামে খ্যাত। সিলেট শহরের ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ’র সন্নিকটে এক টিলার উপর এই সামনা সামনি লড়াই সংগঠিত হয়। ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে মুহররমের আশুরার (১০ মুহররম) দিনটিকে বিদ্রোহীরা বেছে নিয়েছিলেন। কোম্পানির ইংরেজ রেসিডেন্ট রবার্ট লিন্ডসের ট্রেনিং প্রাপ্ত অস্ত্রধারী সেনা দলের সামনে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে দেশ প্রেমিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী টিকতে পারে নি। কিন্তু বিদ্রোহের মূলহোতা পীরজাদার সাহসী নেতৃত্বে তারা যে মহৎ আত্মত্যাগ ও দেশ প্রেমের উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছেন তা পৃথিবীর মুক্তিকামী স্বাধীনতাকামী লড়াকুদের জন্য প্রেরণার উৎস হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। ইংরেজ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামীদের এই বিদ্রোহকে কেহ কেহ ব্রিটিশ বিরোধী প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন মনে করেন।
চতুর ও সম্পদলোলুপ ব্রিটিশ রেসিডেন্ট রবার্ট লিন্ডসে দেশপ্রেমিক বীর সিলেটীদের এই বিদ্রোহকে হিন্দু-মুসলমানের দ্বন্দ্ব বা মুহররমের দাঙ্গাঁ বলে অপবাদ ও দুর্নাম দিতে প্রয়াস পেয়েছেন। লিন্ডসে নিজের অপকর্ম, অপরাধ ও নৃশংসতাকে আড়াল করতে গিয়ে তার আত্মজীবনীতে (অহবপফড়ঃবং ড়ভ ধহ ওহফরধহ খরভব) এই বিদ্রোহকে মুহররমের দাঙ্গাঁ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি একই সঙ্গেঁ দেশপ্রেমিক স্বাধীনতাকামীদের বিদ্রোহকে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সংগঠিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাঁ বলেও মন্তব্য করেছেন। আসলে কালেক্টর বা রেসিডেন্ট হিসেবে লিন্ডসের উৎপীড়নের প্রতিকার ও স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা থেকেই বিদ্রোহের লিডার পীরজাদা ও তার দুই সহোদর হাদা মিয়া ও মাদা মিয়া সিলেটে ইংরেজদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে হাদা মিয়া- মাদা মিয়ার বিদ্রোহের ঘটনাটি মুহররমের দাঙ্গাঁ কিংবা হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাঁ ছিলো না। এটা ছিলো ব্রিটিশ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সিলেটবাসীর ক্ষোভের বর্হিপ্রকাশ।
ইতিহাসের গবেষকরা ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দের সশস্ত্র অভ্যুত্থানের বিষয়ে অনুসন্ধান ও গবেষণা চালিয়ে আসল সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করেছেন। তারা রবার্ট লিন্ডসের বক্তব্য ও ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ইতিহাস অনুসন্ধানী সৈয়দ মুর্তাজা আলী তার ‘হযরত শাহ জালাল ও সিলেটের ইতিহাস’ গ্রন্থে রবার্ট লিন্ডসের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে মন্তব্য করেছেন : ‘লিন্ডসে লিখেছেন যে এই ঘটনার পরে তিনি আর কোনো বিদ্রোহ হবে বলে মনে করেন নি। এতে মনে হয় মুসলমানদের পক্ষে আরও বেশি লোক হত হয়েছিলো।’ (প্রাগুক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা-৯৯)
রবার্ট লিন্ডসে স্বাধীনতাকামী দেশ প্রেমিক বিদ্রোহের ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে এবং ইহার মনগড়া ও অসত্য বিবরণ দিয়ে গভর্ণর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসকে চিঠি লিখে রিপোর্ট করেন।
অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ পূর্বাংশ খ-ে উক্ত চিঠিখানা উদ্বৃত করেছেন। তত্ত্বনিধি লিখেছেন : ‘এই রিপোর্টে কয়েকটা নতুন কথা পাওয়া যায় আক্রমণকারীগণ প্রথমেই দেওয়ানের বাড়ি আক্রমণ করিয়া শহরের সর্বত্র অগ্নিদান করিয়াছিলো।’ মুসলমানরা অর্থাৎ সশস্ত্র অভ্যুত্থানকারীরা যদি সত্যি সত্যি হিন্দুদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাঁ সংগঠিত করত, তাহলে তারা হিন্দুদের নির্যাতন করতে বা হিন্দু নিধনেই মশগুল থাকতো। তারা লোকালয় (যেখানে হিন্দুদের ও বসবাস) ছেড়ে লিন্ডসে বাহিনীর সঙ্গেঁ লড়াই করার জন্য টিলার উপরে সংগঠিত হতো না। অথচ বিদ্রোহীরা সশস্ত্র হয়ে টিলার উপর অবস্থান নিয়েছিলো ব্রিটিশ প্রতিনিধি রবার্ট লিন্ডসে বাহিনীকে মোকাবিলা করার জন্য। খুনি-ঘাতক বা ডাহা মিথ্যুক নিজেই নিজের অপরাধের আলামত বা নিদর্শন রেখে যায়। লিন্ডসে একই কায়দায় নিজের মিথ্যাচারের কাছে ধরা পড়েছেন। টিলার উপরে সামনা-সামনি সংঘর্ষের বিবরণ দিতে গিয়ে লিন্ডসে নিজেই উল্লেখ করেছেন পীরজাদার মুখোমুখি হওয়ার পর তার মুখের উপর পীরজাদা উচ্চ কণ্ঠে বলেন ” ‘আজ মারিবার দিন, নয় মরিবার দিন, আজ ইংরেজ রাজত্বের শেষ দিন।’ (শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত-পূর্বাংশ, দ্বিতীয় ভাগ-পঞ্চম খন্ড, পৃষ্ঠা-১২)
লিন্ডসের নিজের ভাষায় পীরজাদার উদ্ধৃত বাক্যটি এরকম : ‘ঞযরং রং ঃযব ফধু ঃড় শরষষ ড়ৎ ফরব-ঃযব ৎবরমহ ড়ভ ঃযব ঊহমষরংয রং ধঃ ধহ বহফ! প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১২। একথা তো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাঁবাজদের কথা নয়, এটা তো ইংরেজ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধের লড়াকু সৈনিকের কথা। রবার্ট লিন্ডসের ‘সিলেটে আমার বারো বছর’ গ্রন্থের অনুবাদক আবদুল হামিদ মানিকও লিন্ডসের মুহররমের দাঙ্গাঁ, হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গাঁ প্রভৃতি বক্তব্য উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি তাঁর গবেষণালব্ধ গ্রন্থ ‘সিলেটে ভাষা আন্দোলনের পটভূমি’র ৯৮, ৯৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন :
‘লিন্ডসে এই প্রথম বিদ্রোহকে সাম্প্রদায়িকতার কলংক দিয়ে কালিমালিপ্ত করতে চেয়েছেন। বলেছেন মুহররমের দাঙ্গা। কিন্তু গবেষকরা লিন্ডসের এ ব্যাখা গ্রহণ করেন নি। বরং সমসাময়িক পরিবেশ সম্পর্কে যে সব তথ্য পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক তখন অত্যন্ত চমৎকার ছিলো। তাই লিন্ডসের দাবি অর্থাৎ মন্দির ভেঙ্গে ফেলার প্রস্তুতির তথ্য সঠিক নয়। ঐ সময় মুসলমানরা হিন্দুর নয় বরং নবাগত খ্রিস্টান ইংরেজদের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিলো। তা ধর্মীয় কারণে নয়। বরং স্বাধীনতা হরণকারী শক্তি হিসেবেই মুসলমান তখন ইংরেজকে দুশমন জ্ঞান করেছে। ঐ মাসটি ছিলো মুহররম। কারবালার ঘটনা আজো মুসলমানের জেহাদের প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। ‘ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হর কারবালাকে বাদ’ এই জেহাদী জোশ নিয়েই প্রকৃতপক্ষে লিন্ডসের আমলে সিলেটের মুসলমানরা পীরজাদার নেতৃত্বে যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এ সময় এমন কোনো জুলুমও লিন্ডসে বা ইংরেজ সরকার করেনি যার তাৎক্ষণিক জবাব দেয়ার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিলো। শাসক লিন্ডসে যদি কোনো নাগরিককে ফাঁসি দিতেন, শাস্তি দিতেন, কিংবা মসজিদ, খানকা ভেঙ্গে দিতেন, তাহলে বোঝা যেত এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার কিছু লোক রুখে দাড়িয়েছিলো। কিন্তু তেমন কিছুই ঐ সময় ঘটেনি। এরপরও রীতিমতো যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে এক স্থানে সমবেত হওয়ার ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণেই স্বাধীনতার সংরক্ষণের লক্ষ্যে সিলেটের মুসলমানরা ইংরেজ রাজত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন।’
হাদা মিয়া-মাদা মিয়ার বিদ্রোহ সম্পর্কে রবার্ট লিন্ডসের মিথ্যা, বানোয়াট বর্ণনাকে ইতিহাসের অধ্যাপক মুস্তাকীম আহমদ চৌধুরী খুব সুন্দরভাবে খ-ন করেছেন। তিনি মো. আব্দুল আজিজ ও অন্যান্য সম্পাদিত বৃহত্তর সিলেটের ইতিহাস প্রথম খ-ে সিলেটের রাজনৈতিক ‘ইতিহাস প্রবন্ধে এ বিষয়ে দীর্ঘ মন্তব্য করেছেন। গ্রন্থের ৬১, ৬২ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন :
‘কালেক্টর রবার্ট লিন্ডসের বিবরণ থেকে তদানীন্তন সিলেটের আরও কিছু তথ্য পাওয়া যায় (২৫. পৃষ্ঠা-৭২)। ‘মুহররম’ উপলক্ষে সংগঠিত সংঘর্ষ সম্পর্কে তার বিবরণ মনোযোগ দিয়ে পড়লে বোঝা যায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে তিনি কিছু মিথ্যা তথ্য সংযোজন করেছেন। অন্য কোনো উৎস থেকে এ ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু তার দেওয়া বিবরণটি বিশ্লেষণ করলেই প্রকৃত ঘটনা কিভাবে ঘটেছিলো তা বোঝা যায়। তিনি লিখেছেন মুহররমের কয়েকদিন পূর্বে নেতৃস্থানীয় কয়েকজন হিন্দু এসে তাকে গোপনে সংবাদ দেয় যে, মুসলমানরা মুহররমের সময় হিন্দুদের মন্দির ভেঙে বিদ্রোহ করবে। আমাদের বক্তব্য হিন্দুদের মন্দির ভাঙার প্রসঙ্গটি বানোয়াট এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত। কারণ হিন্দুরা তখন শাসন ক্ষমতায় ছিলো না বা হিন্দুদের দ্বারা মুসলমানদের কোনো স্বার্থহানি ঘটেনি। নতুন করে শাসন ক্ষমতায় এসেছিলো কোম্পানির ইংরেজ খ্রিস্টানগণ। এক্ষেত্রে তাদের দ্বারাই মুসলমানরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো। স্বাভাবিকভাবে মুসলমানরা তাদের ওপরেই ক্ষুব্ধ ছিলো। তাই তিনি যদি মুসলমানদের দ্বারা খ্রিস্টান পাদ্রিদের বা সিলেটের লোকদের নিকট খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য গির্জা আক্রমণের কথা বলতেন তাহলে তা যুক্তিসঙ্গত বলে গ্রহণ করা যেত। তাছাড়া সমসাময়িক কালের কিছু পূর্বের তথ্য থেকে দেখা যায় যে হিন্দুরা মুহররমের সময় মিছিলে যোগদান করত, বাংলার হিন্দু জমিদারদের অনেকেই মুহররমের অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। গোলাম হোসেনের ‘সিয়ারে মুতাখ্খিরীন’ থেকে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক বিষয়ে জানা যায় যে প্রবল ঝাকুনিতে দুধ ও চিনি যেভাবে মিশে যায় হিন্দু-মুসলিম সেভাবে এক হয়ে মিশে গিয়েছিলো। একে অন্যের আন্তরিক মঙ্গল কামনা ও কল্যাণ সাধন করছে। একই পরিবারের সন্তান হিসেবে একে অন্যের কথা ভাবছে (৩৪. পৃষ্ঠা-২৯, ১২৪)।
তাই লিন্ডসের এ কথা সত্য বলে গ্রহণ করা যায় না। তিনি লিখেছেন, মুহররমের দিন শহরের বিভিন্ন মহল্লা থেকে মুসলমানদের দ্বারা আহত হয়ে কিছু হিন্দু তার বাংলাতে আশ্রয় গ্রহণ করে। এখানে আমাদের বক্তব্য হলো যদি কোনো লোক আক্রান্ত বা আহত হয়েই থাকে তবে তারা হিন্দু হওয়ার জন্য নয়, বরং তারা কোম্পানির কর্মচারী ছিলো এবং সেজন্যই আক্রান্ত হয়েছিলো। এরপর তিনি লিখেছেন, আহতরা তাকে জানায় মুসলমানরা দেওয়ান মানিক চাঁদের মন্দির প্রথম আক্রমণ করে; ফলে দেওয়ান পূজা বন্ধ করেন, কিন্তু মুসলমানরা মুর্তি ভাঙার জন্য দাবি করলে তিনি মুর্তি ভাঙতে অসম্মত হন। লিন্ডসে পূর্বেই সৈন্য প্রস্তুত রেখেছিলেন এবং দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। তার ভাষ্য অনুযায়ী ঘটনাস্থল দেওয়ান মানিক চাঁদের মন্দিরই হওয়ার কথা, কিন্তু তিনি বিদ্রোহীদের কোনো মন্দিরের ধারে কাছে নয়, তাদের দেখতে পান এমন এক স্থানে যার পিছনে রয়েছে একটি উঁচু টিলা এবং তাঁকে আসতে দেখে তারা দাঙ্গাকারী বিশৃঙ্খল জনতা হিসাবে নয় বরং পিছু হটে টিলার ওপর সামরিক নিয়মে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ও শ্রেণিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ বিদ্রোহীরা এখানে প্রতিপক্ষ হিসাবে হিন্দুদের নয় ইংরেজদেরকেই মোকাবেলা করার জন্য সশস্ত্র, শক্ত ও সুবিধাজনক অবস্থান গ্রহণ করে। লিন্ডসে তাদের অস্ত্র সমর্পণের আদেশ দেওয়ার উত্তরে ধর্মীয় নেতা বা বিদ্রোহীদের নেতা উত্তর দেনÑ ‘আজ ইংরেজ রাজত্বের শেষ দিন। এখানেও বিদ্রোহীদের দ্বারা সুস্পষ্টভাবে ইংরেজ শাসনের অবসানের উদ্দেশ্য ঘোষিত হয়েছে।’
এ থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় সিলেটের মুসলিম শিয়া মতাবলম্বীগণ মুহররমের আত্মত্যাগের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে মরণপণ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিলো। মুগল শাসনামলে শিয়া মতাবলম্বী ফৌজদার ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঈদগাহ ময়দানে মুহররমের ঐতিহ্যবাহী সমাবেশ অনুষ্ঠান চালু হয়ে কিছু দিন পূর্ব পর্যন্তও অব্যাহত ছিলো। তাই মুসলমানরা যে ঈদগাহ ময়দানে সমবেত হয়েছিলো তা সহজেই বোঝা যায়। প্রায় তিন শতাধিক লোক এ সংঘর্ষে অংশগ্রহণ করে। লিন্ডসে যদিও ধর্মীয় নেতাসহ তাই দুই ভাই এবং অল্পসংখ্যক লোক নিহত হওয়ার কথা বলেছেন কিন্তু নিহতের সংখ্যা যে অনেক বেশি ছিলো তা আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত বাহিনীর সঙ্গে মান্ধাতার আমলে অস্ত্রধারী, বিদ্রোহীদের সংঘর্ষের কথা চিন্তা করলেই অনুধাবন করা যায়। ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনে সিলেটের প্রথম শহীদ ছিলেন এ সংঘর্ষে নিহতরাÑযারা সর্বপ্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। লিন্ডসে বাহিনী ও স্বাধীনতাকামীদের সম্মুখ যুদ্ধের ঠিক পরের অবস্থার বর্ণনাও রয়েছে লিন্ডসের আত্মজীবনীতে। স্বাধীনতাকামীদের হাতে কথিত আহতদের চিকিৎসা সম্পর্কে লিন্ডসে যে বর্ণনা দিয়েছেন তা থেকেও একথা বুঝার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, এই যুদ্ধ অন্য কোনো কারণে সংগঠিত হয়নি। দেশ প্রেমিকরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়েছেন স্বাধীনতার জন্য। বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ও গবেষক মুনতাসির মামুনের এক লেখায় তা স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে! তিনি সাপ্তাহিক বিচিত্রা’য় (ঈদ সংখ্যা-১৯৯১) লিন্ডসে সাহেবের সিলেট গমন’ প্রবন্ধে মন্তব্য করেছেন :
‘লিন্ডসে এরপর জখমীদের নিয়ে এলেন তার ডেরায়। তাদের শুশ্রুষা দরকার। কিন্তু চিকিৎসার কোনো বন্দোবস্ত নেই। তবে তার দড়ি প্রস্তুতকারক জোব হিন্টন সেলাই জানতো ভালো। তাকেই লাগিয়ে দেয়া হলো জখমীদের ক্ষতস্থানগুলি সেলাই করার জন্য। শহরের অবস্থা কি তখনও তা পুরোপুরি অবগত হননি লিন্ডসে। তাই জিম্মি হিসেবে শহরের প্রধান মুসলমানদের ধরে নিয়ে আসা হলো তার বাসায়। যখন তাদের জিম্মি করার কাজ প্রায় শেষ তখন বেশ কিছু ইউরোপীয় দৌড়ে এলো লিন্ডসের বাসায় আশ্রয়ের জন্য। জানালো তারা, বাইরে লোক জমায়েত হচ্ছে এবং তারা লিন্ডসের বাড়ি পুড়িয়ে দেবে। পরে জানা গেল ব্যাপারটি ঠিক নয়। আসলে মশাল জ্বালিয়ে মিছিল করে নিহতদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দাফন করার জন্য। লিন্ডসে সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে তাদের জানালেন, যেহেতু তারা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে সেহেতু সম্মান প্রদর্শন করে তাদের দাফন করা যাবে না। পরদিন মৌলানার আত্মীয়রা জানালেন বিনীতভাবে যে, তারা দাফনের অনুমতি চান। নিভৃতে দাফনের অনুমতি দেয়া হলো।
এ যুদ্ধ ইংরেজদের শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র অভ্যুত্থান বলা যায়। এ সময় ইংরেজদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ অন্যত্রও ছিলো। কিন্তু সিলেটেই এ বিরল সাহসী নজীর স্থাপিত হয়েছে।’
এতদাঞ্চলের ধন-সম্পদের প্রতি লিন্ডসের লোলুপ দৃষ্টি ছিলো আগে থেকেই। সিলেটে কালেক্টর বা রেসিডেন্টের পদটি ছিলো লোভনীয়। এই পদটি পাবার জন্য অনেকেই লালায়িত ছিলো। লিন্ডসে এই পদটি বাগিয়ে নেবার জন্য ঢাকায় শুধু লবিংই করেন নি, এজন্যে তিনি উৎকোচেরও আশ্রয় নিয়েছেন বলে কথা আছে। শুধু তাই নয়, সিলেটে রেসিডেন্ট হিসেবে চাকুরির মেয়াদকাল দীর্ঘ করার জন্য লিন্ডসে ঢাকায় তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সময়ে সময়ে প্রচুর ভ্যাট বা নজরানা দিয়ে খুশি রাখতেন।
যে কোন পন্থায় ধন-সম্পদ আহরণ কিংবা কোম্পানির চাকুরির বাইরে ব্যবসা-বাণিজ্য করে বাড়তি আয়ের প্রতি লিন্ডসের আকর্ষণ বেশি ছিলো। তার নির্দেশ ছিলো যেনো তেনো উপায়ে জনগণের নিকট থেকে ট্যাক্স আদায়ের। এক্ষেত্রে তার আচরণ ছিলো জঘন্য ও নির্মম। পীরজাদার নেতৃত্বে বিদ্রোহের বছরখানেক আগে ১৭৮১ সালে সিলেটে এক প্রলয়ঙ্করী বন্যা হয়েছিলো। লিন্ডসের আত্মজীবনী থেকেই জানা যায় যে, বন্যায় মাঠের সমস্ত ফসল তলিয়ে যায় এবং তীব্র খাদ্যাভাবে জেলায় এক তৃতীয়াংশ লোক অনাহারে মৃত্যুবরণ করেছিলো। ইংরেজ কোম্পানি বা তার প্রতিনিধি রেসিডেন্ট রবার্ট লিন্ডসে বন্যা ও দুর্ভিক্ষপীড়িত অসহায় লোকদের জন্য কোন সহানুভূতি প্রদর্শন করে নি। এরকম কিছু করার মানসিকতা লিন্ডসের ছিলো না, কোন চেষ্টাও ছিলো না। তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিলো একটাই এবং এজন্যে তার সকল শ্রম ও মেধা নিয়োজিত করেছিলো। বস্তুত এদেশে ব্রিটিশ আধিপত্য বিস্তার ও সম্পদ লুণ্ঠনই ছিলো লিন্ডসের লক্ষ্য। রবার্ট লিন্ডসের উৎপীড়ন অত্যাচার ও নির্মম আচরণ থেকে রেহাই পাবার স্পৃহাই সিলেটবাসীকে স্বাধীনতার যুদ্ধে অনুপ্রাণীত করেছিলো। পরাধীন শাসন উৎখাতের জন্যই সৈয়দ পীরজাদা, সৈয়দ হাদা মিয়া ও সৈয়দ মাদা মিয়ার নেতৃত্বে সিলেটবাসী ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে আশুরার দিনে সামনা সামনি সশস্ত্র লড়াই-এ অবতীর্ণ হয়েছিলো।
লিন্ডসে তার আত্মজীবনী গ্রন্থে যাই লিখেন না কেন হাদা মিয়া-মাদা মিয়ার বিদ্রোহ ছিলো ইংরেজ দুঃশাস

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • জাতীয় স্মৃতিসৌধ
  • বাংলাদেশের লোকশিল্প
  • উৎলারপাড়ের পোড়া পাহাড় আর বুদ বুদ কূপ
  • চেলা নদী ও খাসিয়ামারা মোহনা
  • সিলেটে মুসলমান সম্পাদিত প্রথম সাহিত্য সাময়িকী
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • Developed by: Sparkle IT