উপ সম্পাদকীয়

শিশু নির্যাতন ও পাশবিকতা

অহিদুর রব প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৯-২০১৮ ইং ০১:৩৫:৪৫ | সংবাদটি ৩৫ বার পঠিত

জাতিসংঘের সংজ্ঞায় ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সবাই শিশু। আমাদের দেশের বাস্তবতায় ষোল-সতের বছর পর্যন্ত বয়সের ছেলে-মেয়েদের শিশু। কিশোর হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বর্তমান নিয়মে ৬ বছর বয়সে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হতে হয়। সে হিসেবে দশম শ্রেণিতে থাকতেই শিক্ষার্থীর বয়স ষোল-সতের হয়ে যায়।
আয়তনের তুলনায় বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ। মাথাপিছু গড় আয় বাড়লেও দরিদ্রতা কমলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মোট সংখ্যা কমেনি, বরং বেড়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘন বসতির কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষের এই দেশে লক্ষ লক্ষ শিশু-কিশোরকে জীবন ধারণের জন্য শ্রম দিতে হয়। এই শিশুগণ তাদের কর্মদাতা অথবা অন্ন সংস্থানের জন্যে যে যে ক্ষেত্রে তারা শ্রম দেয় সেসব ক্ষেত্রে অবস্থানকারী বয়স্কদের দ্বারা শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়। কখনো কখনো এই নির্যাতনের নির্মমতা ও অভিনবত্ব কল্পনাকেও হার মানায়। শিশু রাকিবকে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করার ভয়াবহ দৃশ্য এখনো চোখে ভাসে। এরপর বিভিন্ন ‘ওয়ার্কশপ’ প্রভৃতিতে পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে একাধিক হত্যাকান্ড ঘটে। নির্যাতনকারীরা অত্যন্ত বেপরোয়া। তারা আদিম বর্বরতাকে হার মানিয়ে জুলুম নির্যাতন করে বন্য উল্লাসে মেতে উঠে। ঘরে ঘরে গৃহকর্মী নির্যাতনে নারীরাও পিছিয়ে নেই। ‘পুকুর চোর’ ‘সাগর চোরে’রা সমাজে বুক ফুলিয়ে চলে, আর অভাবের কারণে সামান্য চুরির অপরাধে আমরা শিশুদেরকে বিচার নিজের হাতে নিয়ে তাৎক্ষণিক মৃতুদন্ড কার্যকর করতে উদ্যত হই। একটি গোল আলু চুরির অপরাধে শিশুকে গাছে ঝুলিয়ে পেটানোর ছবি সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। অর্থাৎ আমরা লঘু পাপে গুরুদন্ড দিতে মরিয়া কিন্তু গুরুপাপে লঘুদন্ড দিতেও তেমন আগ্রহী নই।
সাধারণ শারীরিক নির্যাতনের বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে ‘জৈবিক প্রবৃত্তি’ চরিতার্থ করার জন্যে শিশু-কিশোরদের উপর যে ‘পাশবিক’ নির্যাতন করা হয়, সে বিষয়ে কিঞ্চিৎ আলো ফেলতে চাই।
যাদের স্বতন্ত্র বাড়িতে বা ঘরে বসবাস করার সামর্থ নেই, তাদের সংখ্যা কোন পরিসংখ্যানের সাহায্য না নিয়েও বলা যায়, অন্তত: দুই কোটি হবে। এরা থাকে রেললাইন বা রাস্তার ধারে অপরিচ্ছন্ন অপ্রশস্ত লাগোয়া ঘরে, যে ঘরে দাঁড়ানোরও সুযোগ নেই। রাজধানী থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহানগরের, জেলা শহরের, উপজেলা সদরের বস্তিতে এদের বেশির ভাগের বসবাস। এখানে লক্ষ লক্ষ শিশু-কিশোরের জীবন খুবই অনিরাপদ। সহজেই তারা শিকারে পরিণত হয় জৈবিক লালসার। বড় ধরণের দুর্ঘটনা না হলে এসব নিয়ে কেউ মাতামাতিও করে না।
আবাসিক বা খাবার হোটেল, দোকানে, ওয়ার্কসপে, শিল্প প্রতিষ্ঠানে এবং অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে যেসব শিশু-কিশোর কাজ করে তাদের অনেকেই ক্ষেত্র বিশেষে তাদের কর্মদাতা, সেখানে কর্মরত বয়স্কদের দ্বারা পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়। স্কুল-মাদ্রাসা মক্তবে পড়–য়া শিশু-কিশোরদের অনেকেই শিক্ষকদের দ্বারা নির্যাতিত হয়। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে অল্পবয়সী শিক্ষার্থীকে লজিং দিয়ে দুশ্চরিত্র বাড়িওয়ালা অপকর্ম করতে কুন্ঠিত হয় না। মসজিদে বা অন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে, অনুষ্ঠানে যাবার নাম করেও ‘ট্রেপে’ ফেলা হয় শিশুদের। লক্ষ্য করলে দেখবেন, কেউ কেউ ধর্মের ছদ্মবেশ ধারণ করে রাস্তায় হাটে, শিশু-কিশোরদের টার্গেট করে, ‘নাতি’ ভাই ইত্যাদি বলে কাঁধে হাত দেয়। হাত ধরাধরি করে হাটে, এভাবে সুযোগ খোঁজে। এদের অনেকের নাতিপুতিও আছে, পুত্রবধু বা জামাতারাও সব জানে, তা জেনেও তাদের লজ্জা হয় না। কথায় বলে, স্বভাব যায় না ম’লে (মরলে), আর ইল্লত যায় ধুলে (ধৌত করলে)।
মানবচরিত্র খুব দুর্বল। তাকে পাহারায় রাখতে হয়। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন বা বাড়ির সহায়ক কর্মচারীকেও অন্ধবিশ্বাস করতে নেই। কারো সাথে নির্জনে শিশুদের সময় কাটানোর সুযোগ দেয়া যাবে না। ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) বলেছেন, একটি নির্জন ঘরে কোন সুশ্রী পশু থাকলে তার সাথে প্রবৃত্তি চরিতার্থ করা থেকে বিরত থাকতে পারবেন, এমন গ্যারান্টি তিনি নিজেও দিতে পারেন না। এ থেকে বুঝা যায় চরিত্রের হেফাজতের জন্য শক্তিশালী সুরক্ষা দরকার।
বার্টান্ড রাসেল বলেছেন, ‘নৈতিকতা সুযোগের অভাব ছাড়া’ আর কিছু নয়। বড়শি ফেলে মাছ শিকারি যেমন ‘ছিপের’ দিকে অপলক দৃষ্টি রাখে, তেমনি শিশু-কিশোরদের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে, যাতে কেউ তাদের বিপথগামী না করতে পারে। বিয়ে বা অন্য কোন উৎসবে বাড়িতে লোকসমাগম হলে ঘুমানোর ব্যবস্থায় অদল-বদল হয়, তখন বেশি করে সাবধানতা অবলম্বন প্রয়োজন। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, স্বচ্ছল পরিবারের কোন কোন সন্তানকে ‘বেহিসেবি’ খরচে অভ্যস্ত করে বিপথে নিয়ে যাওয়া হয়।
মূলত: মানবচরিত্রের মধ্যেই এই প্রবণতা আছে। হযরত লুত (আঃ) এর সময়ের ঘটনা আমাদের জানা। আমাদের সমাজেও অতীতে এই প্রবণতা ছিলো। বাউল আব্দুল করিমের বিখ্যাত গান ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’-এর সবকিছুই কি সুন্দর ছিলো? সেখানে ‘বাউল গান’ ভাটিয়ালি গান আর ‘মুর্শিদি গানের’ সাথে ঘাটুয়া গানও গাইতেন বলেছেন বাউল করিম।
মানুষ পশুর মতো অপকর্ম কবলে আমরা বলি ‘পাশবিক’। আসলে মানুষের মতো এতো নীচে পশুর নামার ক্ষমতাই নেই। কোন শিশু পশুকে কি কখনো বয়স্ক পশু দ্বারা পাশবিকতার শিকার হতে দেখা যায়?
নৈতিকতার সুরক্ষা, অভিভাবকদের অপলক সচেতনতা, সামাজিক শক্ত প্রতিরোধ এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে আলোচ্য নির্যাতনের হাত থেকে শিশু-কিশোরদের রক্ষা করতে হবে। সাম্প্রতিক কালে টাইওয়ালা একজন আংকেলের একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়, যিনি সুযোগ পেলেই মেয়েদের বাজে কথা বলেন। শিশু-কিশোরদের সাথেও যারা বাজে আচরণ করে তাদেরকে চিহ্নিত করে তাদের ভিডিও চিত্র ধারণ করে বিজ্ঞাপন প্রচার করলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে।
পুনশ্চ :
গত ১৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত আমার ‘শিক্ষক বান্ধব শিক্ষা প্রশাসনের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক লেখায় কিছু মুদ্রণ প্রমাদ ঘটেছে। শুদ্ধ শব্দ/বাক্যগুলো হবে নি¤œরূপঃ পি আর এল, যা লাম গ্রান্ট নামে পরিচিত, ‘শ্রান্তিবিনোদন ছুটি’ প্রমার্জন।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, এম.সি কলেজ।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শিক্ষা হোক শিশুদের জন্য আনন্দময়
  • ফরমালিনমুক্ত খাবার সুস্থ জীবনের বুনিয়াদ
  • জামাল খাসোগী হত্যাকান্ড ও সৌদি আরব
  • শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য কী হওয়া উচিত
  • ব্যবহারিক সাক্ষরতা ও বয়স্ক শিক্ষা
  • সুষ্ঠু নির্বাচন ও যোগ্য নেতৃত্ব
  • জেএসসি পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে
  • অন্ধকারে ভূত
  • আর্থিক সেবা ও আর্থিক শিক্ষা
  • প্রসঙ্গ : আইপিও লটারী
  • রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন
  • মূর্তিতেই দুর্গা : বিশ্বাসের বিষয় তর্কের নয়
  • শিক্ষার্থীর মনোজগৎ বিকাশে কার কী ভূমিকা
  • দুর্গের কর্তা দেবী দুর্গা
  • রাশিয়ার কাছে কি যুক্তরাষ্ট্র হেরে যাচ্ছে
  • দারিদ্র বিমোচনে সাফল্যের পথে বাংলাদেশ
  • বাংলাদেশ-সম্প্রীতি সমাবেশ ও কিছু কথা
  • পর্যটন নীতিমালার বাস্তবায়ন কত দূর
  • ওসমানীর দন্তরোগ বিভাগ
  • দুর্গার আগমন শুভ হোক
  • Developed by: Sparkle IT