উপ সম্পাদকীয় স্মরণ

অধ্যাপক ডাক্তার এম.এ রকিব

ফজলুল হোসেন মীনা প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৯-২০১৮ ইং ০১:৩৯:২৪ | সংবাদটি ৫৪ বার পঠিত

অধ্যাপক ডাঃ এম.এ রকিব ছিলেন একজন সজ্জন প্রকৃতির মানুষ। তাই দেখা যায় যখনই যে কোন ব্যাপারে বিশেষ করে যখনই যে কোন সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত হতেন সেটাকে উচ্চমার্গে নিয়ে যেতে সব সময় প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতেন এবং বহুলাংশে সফলও হতেন। তিনি ছিলেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সিলেট শাখার একজন প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং এ অঞ্চলের স্বনামধন্য চিকিৎসক। তৎকালীন সময়ে চিকিৎসা জগতে কয়েকজন মুষ্টিমেয় ও উচ্চতর ডিগ্রীধারী ছিলেন তাদের মধ্যে অধ্যাপক ডাঃ এম.এ রকিব ছিলেন অন্যতম। তিনি জিন্দাবাজারস্থ তাঁর প্রাইভেট চেম্বারে বিকেলে প্রেকট্রিস করতেন-সীমিত আকারে রোগী দেখতেন, বিশেষ করে গরীব/অসহায় রোগীদের প্রতি তাঁর সহানুভূতি ছিল প্রবল।
অধ্যাপক ডাঃ এম.এ রকিব দীর্ঘদিন এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা করে পরে এই কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দক্ষতার সহিত কার্যক্রম পরিচালনা করে কলেজকে একটি সুন্দর পরিবেশের মধ্যে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন সিলেট শাখা একটি অরাজনৈতিক সমাজসেবীদের রেজিষ্টার্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন যার জন্য ১৯৮১ সালে চক্ষু বিশেষজ্ঞ মরহুম ডাঃ শফিকুর রহমান, মরহুম ডাঃ দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল, অবসর প্রাপ্ত জেলা জজ মরহুম আব্দুল হান্নান চৌধুরীর নেতৃত্বে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট্য একটি আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৮২ সালে অধ্যাপক ডাঃ এম.এ. রকিবকে সভাপতি করে একটি কার্য নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়।
যার অগ্রযাত্রা তাঁর নেতৃত্বে অব্যাহত ছিল দীর্ঘ দিন ধরে এর কার্যক্রম উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে পূর্ব শাহী ঈদগায় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল নামে একটি হাসপাতাল তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা লাভ করে। শহর থেকে সামান্য দূর একটি নিরিবিলি ও চারিদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর মুক্ত প্রাঙ্গনে খোলামেলা ও শান্ত পরিবেশে, যানজট, জনজট বিহিন প্রশস্ত রাস্তার পাশে বিশাল দৃষ্টিনন্দন ভবনে স্থাপিত হয়েছে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন। প্রসঙ্গগত একইভাবে সিলেট ডায়াবেটিকস হাসপাতাল জিন্দাবাজারস্থ পুরানলেনে প্রতিষ্ঠা লাভ করে যদিও এর কার্যক্রম ধোপাদিঘীপারস্থ কুমুদিনী হাসপাতালে প্রাথমিক অবস্থায় কার্যক্রম আরম্ভ হয়। অবশ্য এটারও অধ্যাপক ডাঃ এম.এ রকিব ফাউন্ডার সভাপতি ছিলেন। তাঁর ও অন্যান্যদের নিরলস প্রচেষ্টায় এবং সাহায্য/সহযোগিতায় আজ ডায়াবেটিক হাসপাতাল সিলেট একটি আধুনিক হাসপাতাল রূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে যার জন্য আজ বৃহত্তর সিলেট তথা সমগ্র দেশের ডায়াবেটিক আক্রান্ত মানুষ এবং হৃদরোগ আক্রান্ত রোগীরা বেশ কম মূল্যে সেবা পেয়ে যাচ্ছেন। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সিলেট এর কার্যক্রমের পরিধি দিন দিন বেড়েই চলেছে বিশেষ করে অভিজ্ঞ ও দক্ষ চিকিৎসক দ্বারা প্যাথলজি, ইকো, এনজিওগ্রাম, এনজিওপ্লাষ্টি, পেসমেকার অর্থাৎ প্রায় যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক মেশিনারী স্থাপনের মধ্য দিয়ে একটি আধুনিক হাসপাতাল গড়ে উঠছে যা অত্যন্ত আশা-ব্যঞ্জক। জন্মলগ্ন থেকে সিলেট ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে ঢাকার ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ব্রিগেডিয়ার (অবঃ) ডাঃ প্রফেসর আব্দুল মালিকের নেতৃত্বে দেশের প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তরা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এসে গরীব/অসহায় রোগী দেখে থাকেন ফ্রি হার্ট ক্যাম্পের মাধ্যমে যা প্রায় প্রতি বছর আয়োজন করা হয়। এছাড়া অত্যাধুনিক এনজিওগ্রাম মেশিন স্থাপনের পর দেশের প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ খালেদ মোহসীন এই হাসপাতালে অতি যতেœর সহিত রোগী দেখে থাকেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম পূর্ব শাহী ঈদগাহে স্থানান্তরিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অধ্যাপক এম.এ রকিবের নেতৃত্বে যারা সাধারণ সম্পাদকের গুরু দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পালন করেন তারা হলেন মরহুম ডাঃ দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল, ডাঃ আলতাফুর রহমান, মরহুম শামসুল আলম চৌধুরী, মরহুম অধ্যাপক ডাঃ অখতার হোসেন ও অধ্যাপক ডাঃ আমিনুর রহমান লস্কর-তাঁর কার্যক্রম এখনও অব্যাহত। দীর্ঘদিনের একটি লালিত স্বপ্ন ছিল ফাউন্ডেশনের জন্য একখন্ড জমি ক্রয় করার। ২০০৫ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অবঃ) প্রফেসর ডাঃ আব্দুল মালেকের প্রাণবন্ত প্রচেষ্টায় ও সমিতির অন্যান্যদের সহযোগিতায় পূর্ব শাহী ঈদগায় সরকার থেকে এক একর জমি বরাদ্দ পাওয়া যায়। এখানে ৯ই মে ২০০৭ সালে হাসপাতাল ভবন নির্মাণের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন বাংলাদেশের তৎকালীন মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ড. ইয়াজ উদ্দিন আহমদ এবং ১৪.০৯.২০১৩ সালে হাসপাতালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা।
প্রসঙ্গত আমি (লেখক) ডায়াবেটিক এসোসিয়েশনের সাথে জীবন সদস্য হিসেবে ১৯৮৭/৮৮ সাল এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের ১৯৮৯ সাল থেকে জীবন সদস্য হিসেবে জড়িত আছি। সমিতিকে একটি পর্যায়ে নিয়ে আসতে কোটি কোটি টাকার প্রয়োজন হয় যা সরকারের সাহায্য ছাড়া যুক্তরাজ্যে বসবাসরত প্রবাসী ৩১ সদস্যের এডভাইজারী কমিটি, সংগঠনের আজীবন সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। যারা প্রথম থেকে এই সমিতির সাথে জড়িত ছিলেন তাঁদের মধ্য থেকে আজ আমাদের মধ্যে অনেকেই নেই। তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং অনেকেই যারা বার্ধক্যজনিত কারণে দূরে সরে আছেন তাঁদের সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।
অধ্যাপক ডাঃ এম.এ রকিব ১৯৩৫ সালে ১লা নভেম্বর সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের গড়গড়া গ্রামের এক শিক্ষিত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আলমাস আলী তালুকদার এবং মাতার নাম মঞ্জিলা বানু। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন বিধায় সুনামগঞ্জের প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সরকারি জুবলি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সহিত ১৯৫১ সালে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৫৩ সালে সিলেট এম.সি কলেজ থেকে মেধার সহিত আই.এস.সি পাশ করেন। ১৯৫৯ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এম.বি.বি.এস সুনামের সহিত উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি কলেজে চাকুরীতে যোগদান করেন। অধ্যাপক ডাঃ এম.এ রকিব ১৯৮৪ সাল থেকে সিলেট মেডিকেল কলোনীর ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সভাপতি, বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের সভাপতি, নর্থইষ্ট মেডিকেল কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ছিলেন। তিনি স্ত্রী ডাঃ হাসনা বানু, এক মেয়ে নায়লা রকিব এবং এক ছেলে তানভীর রকিবসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও আত্মীয় স্বজন রেখে গেছেন।
অধ্যাপক ডাঃ এম.এ রকিব আজ আমাদের মধ্যে নেই। বিশাল পরিধির মানবসেবার কর্মকান্ড ফেলে পরলোকে পাড়ি দিয়েছেন ৯ জানুয়ারী ২০১৮ সালে। বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু হয় এবং ১০ জানুয়ারী পবিত্র দরগা শরীফে জানাজা শেষে দাফন করা হয়। মরহুমের মাগফেরাত কামনা করে তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।
লেখক : প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ ও বর্তমান কার্যকরী কমিটির সদস্য, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, সিলেট জেলা শাখা।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শিক্ষা হোক শিশুদের জন্য আনন্দময়
  • ফরমালিনমুক্ত খাবার সুস্থ জীবনের বুনিয়াদ
  • জামাল খাসোগী হত্যাকান্ড ও সৌদি আরব
  • শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য কী হওয়া উচিত
  • ব্যবহারিক সাক্ষরতা ও বয়স্ক শিক্ষা
  • সুষ্ঠু নির্বাচন ও যোগ্য নেতৃত্ব
  • জেএসসি পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে
  • অন্ধকারে ভূত
  • আর্থিক সেবা ও আর্থিক শিক্ষা
  • প্রসঙ্গ : আইপিও লটারী
  • রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন
  • মূর্তিতেই দুর্গা : বিশ্বাসের বিষয় তর্কের নয়
  • শিক্ষার্থীর মনোজগৎ বিকাশে কার কী ভূমিকা
  • দুর্গের কর্তা দেবী দুর্গা
  • রাশিয়ার কাছে কি যুক্তরাষ্ট্র হেরে যাচ্ছে
  • দারিদ্র বিমোচনে সাফল্যের পথে বাংলাদেশ
  • বাংলাদেশ-সম্প্রীতি সমাবেশ ও কিছু কথা
  • পর্যটন নীতিমালার বাস্তবায়ন কত দূর
  • ওসমানীর দন্তরোগ বিভাগ
  • দুর্গার আগমন শুভ হোক
  • Developed by: Sparkle IT