শিশু মেলা

কল্পনা

সঞ্জয় কর প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৯-২০১৮ ইং ০১:৪১:৩৮ | সংবাদটি ৯৬ বার পঠিত

আয়নার সামনে দাঁড়ায় অক্ষর। কপালে ভাঁজ পড়ে তার। মাথার চুলগুলো দুধ সাদা রঙ ধারণ করেছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন তার মাথায় সাদা টুপি পরিয়ে রেখেছে। শুধু চুল নয়, দাড়িগুলোও যেন শরতের কাশফুল। চোখের নিচে কালি পড়েছে। দৃষ্টি শক্তিও আগের মতো নেই। ছোট-খাটো জিনিসপত্র দেখতে পায়না অক্ষর। এতো তাড়াতাড়ি বুড়ো হয়ে গেলাম! মনে মনে ভাবে সে। চশমা হাতে নিয়ে অক্ষরের সামনে দাঁড়ায় এডমিন। এখন এডমিনই দেখাশুনা করে অক্ষরকে। অক্ষরের খাওয়া-দাওয়া, গোসল করা, ঔষধ খাওয়ানো সহ সবকিছুই করে এডমিন। আর্থিক যোগান আসে অক্ষরের ব্যাংক একাউন্ট থেকে। ব্যাংকে প্রচুর টাকা-পয়সা আছে অক্ষরের। শুধু ব্যাংক চেকে স্বাক্ষর করে অক্ষর। টাকা উঠানো, কেনা-কাটা সহ যাবতীয় সব কাজ করে এডমিন। প্রতিনিয়ত অক্ষরের সেবাই করে যাচ্ছে সে। যেন শুধু সেবার জন্যই তার জন্ম। মাঝে মধ্যে অক্ষর কৃতজ্ঞতা জানায় এডমিনকে। এডমিন বলে ‘বৃথা বাক্য ব্যয় করার প্রয়োজন নেই’। চশমা চোখে পরে মাথার চুলগুলো হাত দিয়েই ঠিক করে ঘোরে দাঁড়ায় অক্ষর। এডমিন পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিয়ে দেয় অক্ষরকে। এবার নাস্তা নিয়ে আসে এডমিন। সে ভালো রান্নাবান্না করতে পারে। রান্না করা খাবারগুলো, চীন দেশীয় খাবারের মতো কিন্তু খাবারগুলো সু-স্বাদু। খেতে খেতে অক্ষর বলে ‘তুমি খাবেনা এডমিন’ এডমিন ঝাঁঝালো গলায় উত্তর দেয়- ‘আপনি জানেন না আমার খাওয়ার প্রয়োজন নেই।’ অক্ষর নিরব হয়ে যায়। এ জগতে অক্ষরের আপন বলতে কেউ নেই এডমিন ছাড়া। কিন্তু কে এই এডমিনকে নিয়োগ করেছে তাকে দেখাশুনা করার জন্য? মনে প্রশ্ন জাগে তার। অনেক ভাবনার পরও উত্তর খুঁজে পায় না অক্ষর। দিন দিন তার মেধা ও স্মৃতিশক্তি লোপ পাচ্ছে, উপলব্ধি করে অক্ষর। এডমিন অক্ষরের মুখে এক খিলি পান গুঁজে দিয়ে দু’জন হাত ধরাধরি করে রাস্তায় বের হয়। রাস্তায় কোন পরিবহন নেই। যানজট নেই। গাড়ির হর্ণ, ট্রাফিকের হুইসেল নেই। হঠাৎ আকাশটা ডেকে ওঠে। এডমিন বলে ‘স্যার পকেট থেকে ছাতাটা বের করুন। হালকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরছে। অক্ষর পাঞ্জাবির বুক পকেট থেকে ছাতা বের করে এডমিনের হাতে দেয়। কলম সদৃশ ছাতাটির ছোট একটি বাটনে টিপ দেয় এডমিন। সাথে সাথে বিরাট বড় ছাতা হয়ে যায়। অক্ষর বিস্মিত হয়ে বলে ‘এটা কি করে সম্ভব হলো!’।
- স্যার আপনিতো বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন?
- হ্যাঁ
- তাহলে তো এ বিষয়ে আপনার ধারনা থাকার কথা।
এডমিন আরোও বলে ‘স্যার আপনার মস্তিষ্ক ঠিক মতো কাজ করছেনা। আপনি ধীরে ধীরে মেধাশূণ্য হয়ে পড়ছেন। আপনি ইতিমধ্যে ব্যাংক চেকের স্বাক্ষরও ভুলে গেছেন। আপনাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। এডমিন মাথার উপর হাত তুলে সিগনাল বাতি জ্বালায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ থেকে নেমে আসে একটি অভিনব এয়ার বাস। এর কোন পাখা নেই, কোন চাকা নেই। এডমিন অক্ষরকে নিয়ে এয়ারবাসে উঠে বসে। সুদৃশ্য এয়ারবাসটি ধীরে ধীরে উপরে উঠতে থাকে। অক্ষর বিস্মিত হয়ে চেয়ে থাকে। কিছু বলার ইচ্ছা থাকলেও বলেনা। দুই ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরে। বাসের জানালা দিয়ে নিচের দিকে তাকায় এডমিন। রাস্তা দিয়ে প্রচুর মানুষ চলাচল করছে। তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছে এডমিনের স্ব-জাতিরাও। মানুষের পৃথিবীতে তাদের আধিপত্য ক্রমশ বাড়ছে। বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনা কমে গেছে। স্থলপথে পরিবহনের ছিটে ফোটা থাকলেও আকাশ পথ, নৌ পথ এবং সমুদ্র পথে পরিবহনের জটলা সৃষ্টি হয়েছে। সেখানেও শৃংখলা বজায় রাখার কাজে এডমিনের স্ব-জাতিরা মানুষের সহযোগী হিসেবে বিচক্ষণতার সাথে কাজ করছে, মনে মনে ভাবে এডমিন।
এয়ার বাস নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে নামিয়ে দিল অক্ষর ও এডমিনকে। অক্ষর বলে ‘আমার মাথাটা ঘুরছে দাঁড়াতে পারছিনা’ এডমিন ঝাপটে ধরে অক্ষরকে। অক্ষর অজ্ঞান হয়ে পড়ে। এডমিন হাউ মাউ করে কাঁদতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে অক্ষরের। এডমিনের কান্না দেখে ভীষণ রেগে যায় সে। সর্বশক্তি দিয়ে অক্ষর বলে ‘এডমিন তোমার চোখে এক ফোটাও জল নেই। তুমি কখনো এরকম মেকি কান্না করবেনা’। এডমিন বলে ‘আপনি জানেন না, রোবটদের চোঁখে জল আসে না, তাদের আবেগ, অনুভূতি নেই।
এডমিন একটি রোবট। সুদূর চীন থেকে তাকে আনা হয়েছে। অক্ষরকে দেখাশুনা করার জন্য এডমিনকে নিয়োগ করেছেন অক্ষরের এক শুভাকাঙ্খী। চীনা বিজ্ঞানী ফাদার নেইপল অক্ষরের শুভাকাঙ্খীর নির্দেশনা ও নির্দেশনার বাহিরে অতিরিক্ত আরও কিছু গুণ সংযোজন করে তৈরী করেছেন এডমিনকে। এডমিন মানুষের অতীত বর্তমান বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করতে পারে। কখনও কখনও জ্ঞানমূলক কথাও বলে সে। মুখ কালো করে খুঁিড়য়ে খুঁিড়য়ে হাঁটছে অক্ষর। দুই হাতে অক্ষরকে ধরে এডমিন বলে ‘স্যার আপনি কি কখনও মেধা নিয়ে অহংকার করেছিলেন?’
অনেকক্ষণ ভাবনার পর অক্ষর বলে,
- হ্যাঁ, করেছিলাম।
- কখন?
- ছাত্র জীবনে।
- আপনি কি পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলেন?
- ‘হ্যাঁ।
অক্ষর আরোও বলে ‘আমি গণিত খুব ভালো বুঝতাম এবং সেজন্য গর্ববোধ করতাম। ক্লাসের অপারগ ছাত্ররা আমার কাছে সাহায্য চাইতো। আমি সাহায্য করতাম না। আমার আর কিছুই মনে হচ্ছেনা এডমিন। এডমিন বলে ‘আপনি ভুল করেছেন স্যার। জ্ঞান দান করলে জ্ঞান কমে না। এজন্যই আপনি ধীরে ধীরে মেধাশূণ্য হয়ে যাচ্ছেন। অহংকার পতনের মূল স্যার।’
হাঁটতে হাঁটতে ডাক্তারের চেম্বারের সামনে এসে দাঁড়ায় দু’জন। চেম্বারের সামনে ছোট একটি টুলে বসে আছে পল। এডমিন বলে ‘পল এবং আমি দুজনেই একসাথে চীন থেকে এসেছি। আমাদের দুজনেরই পিতা চীনা বিজ্ঞানী নেইপল।’ পল অক্ষরের হাতে একটি টুকেন ধরিয়ে দেয়। এডমিন অক্ষরকে নিয়ে চেম্বারের ভেতরে ঢুকে। অক্ষর ডাক্তারকে কিছু বলতে চায়। এডমিন চুপ থাকতে ইশারা দেয় অক্ষরকে। ডাক্তার পলকে ডাকেন। পল এসে অক্ষরকে “হোল বডি চেক” মেশিনে ঢুকিয়ে দেয়। ডাক্তারের টেবিলে রয়েছে মেশিনের সাথে সংযুক্ত বিশাল একটি কম্পিউটার মনিটর। মনিটরের দিকে তাকিয়ে অক্ষরের সবগুলো সমস্যা চিহ্নিত করেন ডাক্তার। প্রেসক্রিপশন লিখে পলের হাতে তুলে দেন তিনি। পল অক্ষরকে নিয়ে যায় পাশের কক্ষে। সেখানে রয়েছে অসংখ্য চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং খুব আরামদায়ক একটি বিছানা। অক্ষরকে বিছানায় শুইয়ে দেয় পল। বিশাল বড় একটি ইনজেকশন সিরিঞ্জ হাতে নেয় সে। অক্ষর ইনজেকশন খুব ভয় পায়। তার হাত, পা কাঁপতে থাকে। এডমিন অক্ষরের মাথার কাছে বসে শান্ত¦নার বাণী শোনায়। ইনজেকশন পুশ করার জন্য পল অক্ষরের দিকে আগায়। পল কাছে আসতেই বিছানায় উঠে বসে অক্ষর। অক্ষর চোখ মেলে তাকাতে পারছেনা। তার মুখের উপর কেউ যেন পাওয়ার ফুল একটি টর্চ লাইট ধরে আছে। অক্ষর অনেক কষ্টে চোখ মেলে তাকায়। দেখে সে ডাক্তারের চেম্বারে নয়। নিজ বাড়ীতে নিজের বিছানায় শুয়ে আছে। জানালা খোলা তাই জানালা দিয়ে সূর্যের আলো বিছানায় এসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে অক্ষর। একসময় বুঝতে পারে স্বপ্ন দেখছিল সে। দাদীমাকে স্বপ্নের সব কথা খুলে বলে অক্ষর। দাদীমা মুচকি হেসে বলেন ‘টিভি দেখতে দেখতে তুমি এই বয়সেই গল্প বানানো শিখে ফেলেছো!’ অক্ষর দাদীমার হাত শক্ত করে ধরে এবং অভিমানের সুরে বলে, ‘সত্যি বলছি গল্প না, গত রাতের কল্পনা।’

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT