উপ সম্পাদকীয়

জলবায়ু পরিবর্তন ও সংকটাপন্ন বন্যপ্রাণী

আলম শাইন প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৯-২০১৮ ইং ০১:৪২:৫৩ | সংবাদটি ১৪৫ বার পঠিত

যে কোনো প্রজাতির প্রাণী যদি জলবায়ু পরিবর্তন অথবা আবাসন সংকটের কারণে প্রকৃতি থেকে বছর দশেকের মধ্যে শতকরা ৫০ ভাগ বা তারও অধিক বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে সাধারণত সেই প্রজাতি মহাবিপন্নের তালিকায় স্থান পায়। আমাদের দেশে বেশ কয়েকটি প্রজাতি প্রাণী আজ মহাবিপন্নের তালিকায় রয়েছে। তন্মধ্যে ‘লজ্জাবতী বানর’ অন্যতম। প্রাণীবিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এটি দ্রুত হারিয়ে যাবে এ দেশ থেকে। ফলে লজ্জাবতী বানর ‘রেড সিগন্যালের’ আওতায় রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে জলবায়ুর পরিবর্তন এবং আবাসন সংকট।
মূলত লজ্জাবতী বানরের বাসযোগ্য স্থান পার্বত্য চট্টগ্রাম ও লাউয়াছড়ার গভীর জঙ্গলের উঁচু গাছের মগডালে। জন-মানবের পদচিহ্ন নেই অমন এলাকাই ওদের পছন্দ। অপরদিকে এদের প্রজননহারও সন্তোষজনক নয়। বছরে মাত্র একটি বাচ্চা প্রসব করে মাদী বানরটি। সন্তোষজনক নয় গড় আয়ুও। মাত্র ১০-১২বছর বাঁচতে সক্ষম; তা-ও যদি অনুকূল পরিবেশ পায়। পরিবেশগত কারণ ছাড়াও আমাদের দেশে অকারণেই বলিরপাঁঠা হচ্ছে বন্যপ্রাণীরা। যেমন- বাঘেরবাচ্চা মনে করে মেছোবাঘকে লোকজন পিটিয়ে মারছে গ্রামগঞ্জের ঝোঁপজঙ্গলে। চামড়ার লোভে একশ্রেণীর শিকারি জ্যান্ত গুইসাপের চামড়া তুলে নিত একসময়। পরক্ষণে গুইসাপটি মারা গেলেও বড়ই করুণভাবে প্রাণ হারাতে হতো সরীসৃপটাকে। অজগর সাপের ক্ষেত্রেও তদ্রূপ ছিল দুই আড়াই দশক আগে। সুখবরটি হচ্ছে ওসব এখন আর নজরে পড়ছে না। তবে যা ক্ষতি হওয়ার তাই হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই।
এভাবে অনেক বন্যপ্রাণী নির্যাতিত হয়ে হারিয়ে গেছে প্রকৃতি থেকে। তন্মধ্যে সম্বর হরিণ, হগ হরিণ ও প্যার্যাইল্ল্যাবানর উল্লেখযোগ্য। হনুমানের অবস্থাও সংকটাপন্ন। সরকারি তদারকিতে লাউয়াছড়া, যশোরের কেশবপুরে কোনো রকম বেঁচেবর্তে আছে। অপরদিকে খাদ্য সংকটের কারণে হাতিরাও ভালো নেই।
তিন যুগ আগেও দেশের উত্তরাঞ্চলে নীলগাই নজরে পড়ত। শিকারিদের দৌরাত্ম্যের কারণে এতদঞ্চলে হালে নীলগাই নজরেই পড়ে না। শুধু নীলগাই নয়, এক সময় পদ্মার উচ্চ অববাহিকায় ঘড়িয়াল দেখা যেত। পরিবেশগত সংকটে এখন আর ঘড়িয়াল নজরে পড়ে না। ভবিষ্যতে নজরে পড়ে কিনা তাই নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান রয়েছে প্রাণীবিদরা।
এবার আমরা পাখিদের কথায় আসছি, যারা পরোক্ষভাবে পরিবেশের ভারসাম্য টিকিয়ে রেখেছে। ওরা শুধু পরিবেশের ভারসাম্যই রক্ষা করছে না, ওরা আমাদের প্রকৃতির কঠিন পরিবেশে খাপ খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করছে প্রতিনিয়ত। অভিযোগ রয়েছে, পাখিরা আমাদের ফল-শস্যাদি খেয়ে ফেলছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ওই ফল-ফলারি খেয়ে দূরে কোথাও গিয়ে মলত্যাগের মাধ্যমে বনায়ন সৃষ্টি করে অক্সিজেন ফ্যাক্টরি গড়ছে। আরো অবাক করা তথ্য হচ্ছে, হাওরাঞ্চলের মানুষের ধারণা, অতিথি পাখিরা শুধু তাদের ফসল খেয়েই বিনষ্ট করছে। অথচ সেই অতিথি পাখিরা হাওরেই প্রতিদিন একটন বিষ্ঠাত্যাগ করছে। যার ফলে ফসল এবং মাছেরা উপযুক্ত খাবার পাচ্ছে। অথচ সেই উপকারি বন্ধু অতিথি পাখিসহ অন্যান্য পাখি নিধন করছে কিছু অসাধু মানুষ। ওরা পাখ-পাখালির খাবারে বিষ মাখিয়ে, বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ পেতে অতিথি পাখি শিকার করছে। এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার ফলে অতীতে দেশ থেকে অনেক প্রজাতির পাখি হারিয়ে গেছে। যেমন হারিয়েছে ফ্লোরিকান ময়ূর, পিংক মাথা হাঁস। আর হারিয়ে যেতে বসেছে বাদিহাঁস, বালিহাঁস, দিগহাঁস, কালো তিতির, বাংলা শকুন প্রভৃতি প্রজাতি।
এভাবে বন্যপ্রাণীরা হারিয়ে যেতে থাকলে এক সময় আমাদের পরিবেশের ভারসাম্যও হারিয়ে যাবে। আর আগামী প্রজন্ম তলিয়ে যাবে অন্ধকারে। বিষয়টা মাথায় নিয়ে আমাদের উচিত জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাওয়া এবং প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে বন্যপ্রাণীদের ওপর যেন অত্যাচার-নিপীড়ন না ঘটে তার প্রতি সজাগ দৃষ্টি দেওয়া। এই কাজটি ইচ্ছে করলেই করতে পারি আমরা। প্রয়োজন শুধু সচেতনতার; আর প্রয়োজন প্রচার প্রচারণারও।
ব্যাপকভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারলে এবং যথাযথ আইনের প্রয়োগ ঘটাতে পারলে বন্যপ্রাণীদের রক্ষা করা সম্ভব। সবাইকে জানিয়ে দিতে হবে দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন এখন আর দুর্বল নয়। ১৯৭৪ সালে প্রণীত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন বিলুপ্ত এখন। যে আইনের ২৬ধারা মোতাবেক শাস্তির বিধান ছিল সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২০০০ টাকা জরিমানা। আর খুব বেশি হলে ছয়মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত কারাদ- ছিল। তার তুলনায় হালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন বেশ যুত্সই। এই আইনের বিলটি ৮ জুলাই ২০১২ সালে পাস হয়েছে। উক্ত আইনে বাঘ অথবা হাতি হত্যা করলে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা ও ৭ বছরের কারাদ-ের বিধান রয়েছে। এছাড়া অন্যসব বন্যপ্রাণী শিকার করলে অথবা আইন লঙ্ঘনকারীকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং ১ বছর কারাদ-ের কথা বলা আছে। আইনটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে অনেক বিপন্ন বন্যপ্রাণী রক্ষা পাবে বলে প্রাণীবিদদের ধারণা। তাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বিষয়টি পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিতে হবে। এভাবে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ঘটাতে পারলে অনেক প্রজাতির বন্যপ্রাণীর বিলুপ্তিরোধ করা সম্ভব হবে। যা আমাদের অনেকটাই সাধ্যের মধ্যে রয়েছে। শুধু সদিচ্ছার প্রয়োজন এখন।
লেখক : বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • অরিত্রী : অস্তমিত এক সূর্যের নাম
  • স্বপ্নহীন স্বপ্নের তরী
  • মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান
  • নয়া রাষ্ট্রদূত কী বার্তা নিয়ে এসেছেন?
  • ফেসবুক আসক্তি
  • কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় পৌরসভা প্রসঙ্গে
  • শিক্ষার্থীদের শাস্তি এবং অরিত্রী প্রসঙ্গ
  • রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ শিল্প টিকিয়ে রাখা ও উন্নয়ন জরুরি
  • হাফিজ মোবাশ্বির আলী
  • কীর্তিগাথা ক্রিকেটে অদম্য টাইগাররা
  • তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন মেনে চলচ্চিত্র নির্মাণ হোক
  • দেশী মাছের আকাল ও সংরক্ষণ
  • ১৯৭০ এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধ
  • রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পরিণতি
  • যাত্রাপালা
  • Developed by: Sparkle IT