উপ সম্পাদকীয়

বিশ্ব বরেণ্যদের রম্য উপাখ্যান

সুলতান মাহমুদ প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৯-২০১৮ ইং ০১:১০:৩০ | সংবাদটি ৭৯ বার পঠিত

গজনীর সুলতান মাহমুদ (৯৭১-১০৩০) ভারতবর্ষ তথা এশিয়া মহাদেশের ইতিহাসে বরেণ্য ব্যক্তি। তিনি সতেরো বার ভারতবর্ষ আক্রমণ করেছিলেন এবং তাঁর সর্বশেষ আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল বিখ্যাত সোমনাথ মন্দির। গজনী রাজ্যে প্রথমত অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমান আফগানিস্তান ও বর্তমান ইরানের উত্তর-পূর্বাংশ। কিন্তু তিনি ক্রমাগত যুদ্ধজয়ের দ্বারা ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিমাংশ ও ইরানের প্রায় পুরোটাই গজনীর অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেন। প্রসঙ্গত, তাঁর পিতা ছিলেন একজন ক্রীতদাস।
১. সুলতান মাহমুদ তাঁর রাজধানী গজনীকে কৃষ্টি ও সভ্যতার পীঠস্থান হিসেবে গড়ে তোলেন। বহু বিখ্যাত লেখক ও কবি তাঁর দরবার অলংকৃত করেছিলেন। এঁদের মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ‘শাহনামা’র রচয়িতা কবি ফেরদৌসী। কথিত আছে, শাহনামার তিন হাজার শ্লোকের জন্য কবিকে তিন হাজার স্বর্ণমুদ্রা দেবার জন্য সুলতান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন । কিন্তু কবি তাঁর রচনা সমাপ্ত করলে পর মন্দ লোকদের প্ররোচনায় তিনি কবিকে তিন হাজার স্বর্ণমুদ্রার পরিবর্তে সমসংখ্যক রৌপ্যমুদ্রা দিতে চাইলে কবি তা প্রত্যাখ্যান করে তাঁর জন্মস্থান তুষ শহরে চলে যান। যাবার পূর্বে অবশ্য তিনি একটি কবিতা রচনা করে এবং সেই কবিতায় সুলতানের বংশ-পরিচয় তুলে ধরে সেটা রেখে যান। সুলতান কবিতাটি পাঠ করে অনুতপ্ত হয়ে তিন হাজার স্বর্ণমুদ্রাই কবির উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। কিন্তু হায়! স্বর্ণমুদ্রাগুলো কবির বাসভবনে যখন পৌঁছাল, সেই ক্ষণে তাঁর মরদেহ সমাধিস্থলের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
২. সুলতান মাহমুদের দরবারে যে ভাঁড় দিলেন, তাঁর নাম ছিল তালহাক। সুলতান ঈদ উপলক্ষে দরবারের সবাইকে মূল্যবান পোশাক উপহার দিলেন, কিন্তু তালহাককে দিলেন একটি ‘জিন’ তথা গাধার পিঠের গদি। তো ঈদের দিনে সবাই মূল্যবান পোশাক পরে এসেছেন, তালহাক কাঁধে জিন চড়িয়ে এলেন। সবাই এটা দেখে হাসাহাসি শুরু করলে পর তালহাক বলতে লাগলেন, ‘আপনারা না বুঝে অহেতুক হাসাহাসি করবেন না। দেখুন না, মহামান্য সুলতান আমাকে কত সম্মান করেন। তিনি রাজকীয় ওয়াড্রোব থেকে আপনাদেরকে পোশাক উপহার দিয়েছেন, আর আমাকে বিশেষ সম্মান করে তাঁর নিজের শরীর থেকে পোশাক খুলে দিয়ে দিয়েছেন।’
সুলতান খুশি হয়ে তালহাকের জন্যে নতুন পোশাকের অর্ডার দিলেন।
৩. সুলতান মাহমুদ যখন যুবরাজ ছিলেন তখন একদিন তিনি তাঁর নিত্য সাথী আহমদ হোসেন মায়মন্দিকে নিয়ে একটি বাগানে বেড়াচ্ছিলেন। মাহমুদ দেখলেন যে তাঁদের সামনে আরেকজন লোকও এভাবে বেড়াচ্ছে। ‘আহমদ’ মাহমুদ তাঁর বন্ধুকে ডেকে বললেন, ‘ওই লোকটা কে হতে পারে?’
‘সে একজন কাঠমিস্ত্রি হবে’ আহমদ প্রত্যুত্তরে বললেন।
‘তা তুমি কি আমাকে তার নাম বলতে পারবে?’
‘আমার মনে হয় তার নামও আহমদ।’
‘তাহলে তুমি তাকে চেন?’
‘না, আমি পূর্বে তাকে কখনো দেখিনি।’
‘তাহলে কীভাবে তুমি তার নাম ও তার পেশা জানলে?’
মায়মন্দি তখন বললেন, ‘যখন আপনি আমার নাম ধরে ডাকলেন তখন লোকটি দেখলাম এমনভাবে ফিরে তাকাল যেন সে জবাব দিতে যাচ্ছে। তাই আমার মনে হল, তার নামও নিশ্চয় আহমদ হবে। আবার আমি লক্ষ করলাম যে চলার পথে সে ফলের গাছ কিংবা ফুলের দিকে নজর না দিয়ে কেবল বড়ো বড়ো গাছ, যেগুলো দিয়ে কাঠের আসবাবপত্র বানানো যায়, সেগুলোর দিকে নজর দিচ্ছে। এ থেকে আমি ধারণা করলাম যে, সে নিশ্চয়ই একজন কাঠমিস্ত্রি হবে।
‘বাস্তবিক আশ্চর্যের ব্যাপার! তা তুমি যদি আমাকে বলতে পার আজকে সে কী খেয়েছে, তাহলে তোমার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার ওপর আমার মুগ্ধতা আরো বেড়ে যাবে।’
‘সে আজ হয় মধু অথবা অন্য কোনো মিষ্টান্ন খেয়েছে।’
মাহমুদ তখন সেই লোককে কাছে ডেকে বললেন, ‘তুমি কি আমার সাথের এই যুবককে চেনো?’
‘না’, লোকটি প্রত্যুত্তরে বলল।
‘আমি তোমাকে দু’তিনটি প্রশ্ন করতে চাই,’ মাহমুদ বললেন, ‘প্রথম প্রশ্ন হল, তোমার নাম কী? দ্বিতীয়ত, তোমার পেশা কী? আর তৃতীয়ত, তুমি আজকে কী খেয়েছ?’
লোকটি উত্তর দিল, ‘আমার নাম আহমদ; আমি একজন কাঠমিস্ত্রি; এবং আমি আজকে মধু খেয়েছি।’
মাহমুদ বিস্মিত হয়ে লোকটিকে বিদায় দেবার পর তাঁর সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কীভাবে ধারণা করলে যে লোকটি মধু খেয়েছে?
প্রত্যুত্তরে মায়মন্দি বললেন ‘সে ক্রমাগত তার মুখ মুছছিল ও ঠোঁট চাটছিল; আর তার ঠোঁটের চারপাশে মাছি উড়ছিল, যেগুলোকে সে ঘন ঘন তাড়াচ্ছিল। আমি এত্থেকে ধারণা করলাম যে, সে আজ মিষ্টি জাতীয় কোনো জিনিস খেয়েছে।’
৪. ইরাকের এক প্রদেশের শাসনকর্তা ফখর-উদ-দৌলার মৃত্যু ঘটলে পর তাঁর ছেলে মাজদ-উদ-দৌলা পিতার স্থলবর্তি হন। কিন্তু তিনি তখনো নাবালক ছিলেন বিধায় তাঁর মা শাসনকাজ দেখাশোনা করতে লাগলেন। রানীমা ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ মহিলা। গজনীর সুলতান মাহমুদ উক্ত প্রদেশ থেকে কর আদায় করতে চাইলেন এবং এতদুদ্দেশ্যে রানীমাকে এই মর্মে এক পত্র পাঠালেন যে, তিনি যদি বার্ষিক কর দিতে রাজি না হন তাহলে সুলতান মাহমুদ তাঁর প্রদেশ বিজয়ার্থে সেনাবাহিনী পাঠাতে বাধ্য হবেন। রানীমা পত্র-বাহককে যথাযোগ্য সম্মান সহকারে অভ্যর্থনা জানালেন এবং অতঃপর নি¤œলিখিত উত্তর প্রদান করলেন :
‘আমার স্বামীর জীবিতাবস্থায় আমি ভীত ছিলাম যে বিরাট পরাক্রমশালী সুলতান মাহমুদ আমাদের শত্রু হলে বিপদ ঘটতে পারে; কিন্তু এখন আমি ভীত নই। কেননা আমি জানি যে, মহান ও খ্যাতনামা সুলতান একজন মহিলাকে আক্রমণের জন্য সেনাবাহিনী পাঠাবেন না। আর যদি তিনি ভুলক্রমে পাঠানোও তাহলে এটা নিশ্চিত যে আমি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করে যাব এবং অতঃপর সুলতান যদি জয়ীও হন, তথাপি লোকজন বলাবলি করবে যে তিনি একজন বৃদ্ধা স্ত্রীলোককে পরাজিত করেছেন। আমি স্থির নিশ্চিত যে, সুলতান যথেষ্ট বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ বিধায় তাঁর এই ভীতি-প্রদর্শনকে বাস্তবায়িত করবেন না এবং আমি শান্তিতে বাস করতে পারব।’
সুলতান মাহমুদ এটা পাঠ করে রানীমার বিচক্ষণতায় স্তম্ভিত হয়ে গেলেন এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন যে, রানীমা যতদিন বেঁচে আছেন তিনি ওই রাজ্য আক্রমণ করবেন না।
৫. সুলতান মাহমুদ ১০২৪ সালে যখন দক্ষিণ-ভারতের সোমনাথ মন্দির আক্রমণ করেন, তখন তিনি উক্ত মন্দির ও মন্দিরের অভ্যন্তরস্থ দেব-দেবীর মূর্তিসমূহ ভাঙতে উদ্যত হলে মন্দিরের পেট্রন ও পুরোহিতগণ এই মর্মে প্রস্তাব পাঠালেন যে, তিনি এটা করা থেকে বিরত থাকলে তাঁকে প্রচুর স্বর্ণ ও মণিমুক্তা দেয়া হবে। তদুত্তরে তিনি নাকি বলে পাঠিয়েছিলেন ‘ইতিহাসে আমি মূর্তি বিক্রেতা নয় বরং মূর্তি ধ্বংসকারী হিসেবেই পরিচিত হতে চাই।’
পাদটীকা : মফস্বলের এক স্কুলে স্কুল-ইন্সপেক্টর পরিদর্শনে গিয়ে দশম শ্রেণীতে জনৈক শিক্ষক ইতিহাস পড়াচ্ছেন দেখে একজন ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সোমনাথের মন্দির কে ভেঙেছে?’ ছেলেটি কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘ওটা আমি ভাঙিনি, স্যার; অন্য কেউ হয়ত ভেঙেছে।’ ইন্সপেক্টর বিস্মিত হয়ে শিক্ষকের দিকে তাকাতে শিক্ষক সাফাই দিলেন, ‘স্যার, আমি এই ছেলেকে জানি। ও খুব ভালো ছেলে, ও নিশ্চয়ই একাজ করেনি।’ ইন্সপেক্টর ততোধিক বিস্মিত হয়ে স্কুলের হেডমাস্টার সাহেবের কাছে ঘটনাটি বিবৃত করতেই হেডমাস্টার বলে উঠলেন, ‘আমি আমার স্কুলের ছাত্র ও শিক্ষক সবাইকে জানি। এঁরা এমন কাজ করতে পারেন না। এটা নিশ্চয়ই অন্য কোন স্কুলের পোলাপান করেছে।’

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • অরিত্রী : অস্তমিত এক সূর্যের নাম
  • স্বপ্নহীন স্বপ্নের তরী
  • মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান
  • নয়া রাষ্ট্রদূত কী বার্তা নিয়ে এসেছেন?
  • ফেসবুক আসক্তি
  • কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় পৌরসভা প্রসঙ্গে
  • শিক্ষার্থীদের শাস্তি এবং অরিত্রী প্রসঙ্গ
  • রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ শিল্প টিকিয়ে রাখা ও উন্নয়ন জরুরি
  • হাফিজ মোবাশ্বির আলী
  • কীর্তিগাথা ক্রিকেটে অদম্য টাইগাররা
  • তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন মেনে চলচ্চিত্র নির্মাণ হোক
  • দেশী মাছের আকাল ও সংরক্ষণ
  • ১৯৭০ এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধ
  • রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পরিণতি
  • যাত্রাপালা
  • Developed by: Sparkle IT