ধর্ম ও জীবন

আশুরার তাৎপর্য।

আহমদ যাকারিয়া। প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৯-২০১৮ ইং ০১:১৮:৫০ | সংবাদটি ২৮৬ বার পঠিত

মহররম মাস সম্মানিত হওয়ার কয়েকটি কারণের মধ্যে বিশেষ একটি কারণ হলো- আশুরা (মহররমের ১০ তারিখ)। পৃথিবীর ঊষালগ্ন থেকেই আশুরার দিনে সংঘটিত হয়েছে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা ও হৃদয়বিদারক কাহিনী। আশুরার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ঘটনা হলো যে, এই দিনে হজরত মুসা (আ.) ফিরআউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। এই দিনে লোহিত সাগরে ডুবে মৃত্যুবরণ করে অভিশপ্ত ফেরআউন। এই দিনে সত্য-মিথ্যার পথিকদের একটা প্রায়োগিক শিক্ষা দিয়েছিলেন আল্লাহ তাআলা ভ্রান্ত খোদার দাবিদার ফিরআউন ও তার বিশাল বাহিনীকে ধ্বংস করার দ্বারা। ‘হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, মহানবী (সা.) যখন হিজরত করে মদিনা পৌঁছেন, তখন তিনি দেখলেন যে, মদিনার ইহুদি সম্প্রদায়গুলো আশুরার দিনে রোজা রাখতেছে। তিনি তাদেরকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা প্রতিউত্তরে বললো যে, এই দিনটি আমাদের নিকট অনেক বড়, এই দিনটি আমাদের কাছে অনেক গুরুত্ব বহন করে। এই দিনে আল্লাহ তা’আলা মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইল জাতিকে ফিরআউনের কবল থেকে রক্ষা করেছিলেন আর ফিরআউন ও তার বাহিনী কিবতি সম্প্রদায়কে ডুবিয়ে মেরেছিলেন লোহিত সাগরে। আর এর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ হজরত মুসা (আ.) রোজা রাখতেন, সুতরাং এর ধারাবাহিকতায় আমরাও আশুরার রোজা পালন করে থাকি। উল্লিখিত হাদিস থেকে বুঝতে পারা যায় যে, আশুরার ঐতিহ্য আবহমানকাল থেকেই চলে আসছে।
অথচ আমাদের সমাজে আশুরাকে শুধুমাত্র কারবালার সংগে যুক্ত করে সংকীর্ণ করে রাখা হচ্ছে। অনেকেই আশুরাকে কারবালার ঘটনা বুঝেন। কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আশুরার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে থাকেন। আশুরার ফজিলত শুধু কারবালার জন্য নয়। আশুরার ফজিলত কারবালার ঘটনার ৫০ বছরেরও বেশী আগের হাদীস থেকে বর্ণিত। তবে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসাবে কারবালার ঘটনা পর্যালোচনা করা আমাদের জন্য অতীব প্রয়োজন। সেখানে হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) তার পরিবারের ১৯ জন সদস্য সহ প্রায় ৫০ জন সঙ্গী নিয়ে উবাইদুল্লাহ বাহিনীর আক্রমনের শিকার হয়ে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শহীদ হন। শহীদ হন তার পরিবারের দুগ্ধ পোষ্য শিশু, কিশোর ও মহিলা সহ অনকেই। ইমাম হুসাইন (রা.) কারবালায় মূলত যুদ্ধ করতে যান নি। তিনি কুফার লোকদের আহ্বানে সাড়া দিতে মুসলিম বিশ্বের খিলাফতের দায়িত্ব (ইয়াজিদ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি) নিতে গিয়েছিলেন। যদিও মক্কা মদীনার অনেক বিচক্ষণ সাহাবী ইমাম হুসাইনকে কুফায় যেতে নিষেধ করে বলেছিলেন যে, কুফার লোকজন বিশ্বাস ঘাতক তারা আপনার বিপদে সরে দাঁড়াবে।
কিন্তু তিনি ইসলামি আইনের মূল উৎস বিষয়ক সূত্র ‘আযীমাত প্রতিষ্ঠা’ তথা একটা উত্তম কাজ করার জন্য কুফায় গিয়েছিলেন। তার শহিদ হওয়ার জন্য কোন সাহাবীকে দায়ী করা যাবে না। এটাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সর্বসম্মত মত। আহলে বাইতকে মহব্বত করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের কষ্টে আমরা ব্যথিত। তাদের যারা কষ্ট দিয়েছে আমরা তাদেক ঘৃণা করি। তবে আশুরার দিনে শোক, মাতম, তা’জিয়া করে মিছিল শোডাউন বের করা ইত্যাদি ইসলাম বিরোধী কর্ম। অথচ আমাদের সমাজের অনেকেই না বুঝে অথবা ভ্রান্ত প্ররোচনায় প্ররোচিত হয়ে আশুরার ঐতিহ্য বলতে রাসুল (সা.) এর প্রিয়তম নাতি হজরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত বরণ ও নবী পরিবারের কয়েকজন সম্মানিত সদস্যের রক্তে রঞ্জিত কারবালার ইতিহাসকে বুঝে থাকেন। আর তাই ঐদিন তারা মাতম করে নিজের হাতে নিজের শরীরকে রক্তাক্ত করেন। তাদের অবস্থা ও কার্যাদি অবলোকন করলে মনে হয়, কারবালার ইতিহাসকে ঘিরেই যেন আশুরার সব ইতিহাস-ঐতিহ্য, এতেই রয়েছে আশুরার সব রহস্য নিহিত। বাস্তবে কিন্তু এমন না।বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। বরং আশুরার ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে সেই প্রাচীনকাল থেকেই। হজরত হুসাইন (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের ঘটনার অনেক কাল পূর্ব থেকেই ‘আশুরা’ অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ও রহস্যঘেরা দিন হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। কেননা কারবালার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে ৬১ হিজরির ১০-ই মহররম। আর আশুরার রোজার প্রচলন চলে আসছে ইসলাম আবির্ভাবেরও বহুকাল আগ থেকে। তবে এটা অবশ্য স্বীকার্য যে, আবহমানকাল থেকে আশুরার দিনে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা যেমন অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি হিজরি ৬১ সনে আশুরার দিন কারবালার ময়দানের দুঃখজনক ঘটনাও মুসলিম জাতির জন্য অতিশয় হৃদয়বিদারক ও বেদনাদায়ক হিসেবে পরিগণিত। তবে এটাও বাস্তব যে, এ ঘটনাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে না পারার কারনে আজ সমাজের অনেকেই ভ্রষ্টতা ও কুসংস্কারের অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে নিজের অজান্তেই।
‘হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিনে আপন পরিবার-পরিজনের মধ্যে পর্যাপ্ত উন্নত খানাপিনার ব্যবস্থা করবে, আল্লাহ তা’আলা পুরো বছর তার রিজিকে বরকত দান করবেন। (তাবরানি : ৯৩০৩) যদি কেউ উপরোক্ত হাদীসের উপর আমল করার উদ্দেশ্যে আশুরার দিনে উন্নত খানাপিনার ব্যবস্থা করে, তাহলে শরীয়তে এর নিষেধ নেই। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে, কোনোক্রমেই যেন তা বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘনের স্তরে না পৌঁছে। আশুরার দিনে নফল নামাজ বেশি বেশি করে পড়া, কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করা, জিকির-আযকার করা, রোজাদারকে ইফতারি করানো, নিজে রোজা রাখা, গরীবদেরকে দান-সদকা করা এবং সামর্থ্যানুযায়ী পরিবার-পরিজনদের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় অধিক পরিমাণ খরচ করা এ সবকিছুই সওয়াবের কাজ হিসেবে পরিগণিত হবে। সাথে সাথে নিজের গোনাহ ও পাপ কাজের জন্য বিনয়ের সাথে বেশি বেশি করে আল্লহর কাছে তাওবা-ইস্তিগফার করা। কারণ এ মাসে তাওবা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT