উপ সম্পাদকীয়

ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল

মামুনুর রশীদ প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৯-২০১৮ ইং ০১:২০:৫০ | সংবাদটি ৬৮৪ বার পঠিত

মৃত্যু এক চিরন্তন সত্য। এই চিরন্তন সত্যকে মেনে নিয়েই সবাইকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়। তবে লোকান্তরিত হয়েও কিছু কৃতী মানুষ নিজ কর্মগুণে বেঁচে থাকেন তার উত্তরসূরিদের মাঝে। ভাবি সমাজ তাদের আদর্শ বয়ে বেড়ায়। ঠিক এমনি একজন মানুষ ছিলেন শ্রদ্ধেয় ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল ভাই। তার তুলনা তিনি নিজেই। তার অস্থি মজ্জায় ছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি। ডা. দেওয়ান নুরুল হোসেন চঞ্চল ১৯৩৯ সালে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার কচুয়াবহর নোয়াটিলা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম দেওয়ান ইসহাক আলী, মাতা-দেওয়ান কুলসুম বেগম, তিন ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ডা. দেওয়ান নুরুল হোসেন চঞ্চল বর্ণিল ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী। তিনি আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ নির্লোভ-নির্মোহ-স্পষ্টবাদী ছিলেন। তার শুভাকাঙ্খী ও সহকর্মীগণই তার ঘর সংসার, পরিবার সদস্যদের মত সর্বোপরি দেশ ও জনগণই ছিলো তার দিবারাত্রির মহাকাব্য। তিনি প্রতিনিয়ত বিশ্বাস করতেন স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি পারে জনগণের কল্যাণ বয়ে আনতে। কখনও একজন রাজনৈতিক কর্মী কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা কিংবা পরশ্রী কাতরতায় আক্রান্ত হতে পারেনা। বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতি মানুষকে উদার করে পরমত সহিষ্ণু করে, বানায় দেশপ্রেমিক।
৫০এর দশকে তিনি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ১৯৬৬ এর ৬দফা ও ৬৯এর গণ আন্দোলনে স্বাধীনতার চেতনা সে সময় সিলেটের ছাত্র ও যুবকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন তার দায়বদ্ধতা আছে দেশ-মাটি- মানুষের কাছে । দেশ ও দেশের মানুষের জন্য দায়বদ্ধতা এড়ানোর কোন সুযোগ নেই কারোরই।
সংগ্রামী মানুষের ভেতরের মুক্তির দীপশিখাটি জাগিয়ে তুলতে তাই নিজের আলো অন্যের ভেতরে ছড়িয়ে দিতে মাঠে ময়দানে কাজ করেছেন সংগ্রাম মুখর দিনগুলোতে। তার মেধা মননে ছিলো বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক স্বপ্নের সোনার বাংলা।
১৯৭০ সালের গণপরিষদ নির্বাচনে তিনি কর্ণেল ওসমানীর পক্ষে দিনরাত কাজ করেছেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলোতে সিলেটে আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনায় সিলেটের কৃতি সন্তান মুক্তি বাহিনী প্রধান জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) এম.এ.জি ওসমানী, প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ, প্রাক্তন মন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজী, আওয়ামীলীগ নেতা অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান, এম.এ রহিম, সৈয়দ আবু নসর অ্যাডভোকেট, আনম শফিকুল হক, ইফতেখার হোসেন শামীম, সিরাজ উদ্দীন আহমদ এর সাথে কাজ করেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানীদের হাতে বন্দি হওয়ার আগে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র পুলিশের ওয়্যারলেসে জেলায় জেলায় প্রেরণ করা হয়েছিল। সিলেট জেলায় তা পৌছে যায় তৎকালীন জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান ফরিদ গাজীর কাছে। ওয়্যারলেস বার্তার সংবাদ পেয়ে ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল আওয়ামীলীগ সহ সিলেটের তৎকালীন সকল রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মী ও জনসাধারণের কাছে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেন। সিলেটের ছাত্র ও যুবকদের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে সাহস যোগান। হাজার হাজার যুবকদের সংগঠিত করে মুক্তি বাহিনীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে প্রেরণ করেন। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি ৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে হাজার বছরের কাঙ্খিত স্বাধীনতা লাভ করে। ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল সিলেট জেলা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, যুবলীগ কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের যুব আন্দোলনের নেতা হিসেবে ঘুরে বেড়িয়েছেন পুরো দেশ। স্বাধীনতা উত্তর সিলেট জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি।
জননেতা ডা. নূরুল হোসেন চঞ্চল স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে সিলেট জেলায় তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকারের দেশ গড়ার কাজে নির্লোভ কাজ করে যান। তিনি সিলেটে রিলিফ অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। এসময় সিলেট জেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছাত্র জীবনে এম.সি কলেজ ছাত্র সংসদের ছাত্র মিলনায়তন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ফুটবল খেলতে ও কবিতা লিখতে ভালোবাসতেন। ১৯৭৫ সালে ২৫ জানুয়ারি বাকশাল গঠনের প্রতিবাদে জেনারেল ওসমানী সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করলে সিলেট-৬ (ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ) আসনে ২০ এপ্রিলের উপ-নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স-পরিবারে ও যুবলীগের তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনিকে হত্যার পর সারাদেশে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের ওপর নেমে আসে জেল, জুলুম ও নির্যাতন। সে সময়ের সামরিক সরকারের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে সিলেটের মাটিতে আওয়ামীলীগকে পুণর্গঠিত করতে নিরলস ভাবে কাজ করে যান তিনি। তৎকালীন যুবলীগের কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা. দেওয়ান নুরুল হোসেন চঞ্চল পরবর্তীতে আওয়ামী যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। স্বৈরাচারী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ১০ দলীয় ঐক্য নেতৃত্বে দুর্বার আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলেন।
১৯৭৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে বিএনপির জয় জয়কার হলেও ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জে আওয়ামীলীগের প্রার্থী ইনামুল হক চৌধুরী (বীর প্রতীক) ৩হাজার ৫শ ৭৩ ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থী ফতেহ ইউনুছ খানকে হারিয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন। আওয়ামীলীগ প্রার্থীকে বিজয়ী করতে ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল জানবাজি রেখে কাজ করেন সে সময়।
১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী জেনারেল এমএজি ওসমানীর পক্ষে ও ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ড. কামাল হোসেনের পক্ষে কাজ করে যান ডা. নূরুল হোসেন চঞ্চল। ১৯৮২সালের ২৪ মার্চ সামরিক শাসক এইচএম এরশাদের অবৈধ ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামে সামনের কাতারে থেকে ১৫ দলীয় ঐক্য জোটের পক্ষে সিলেটে নেতৃত্ব দেন ডা. নূরুল হোসেন চঞ্চল।
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল ১৯৮৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মাত্র ৪৫ বছর বয়সে সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান।
বর্তমান প্রজন্ম জননেতা মরহুম ডা. নূরুল হোসেন চঞ্চলকে চিনেনা। ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চলের মতো সংগঠক যোদ্ধা, রাজনীতিবিদকে জানা অবশ্যই প্রয়োজন। তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের সৈনিক হিসেবে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। আওয়ামীলীগ সংগঠন ছিলো তার ধ্যান, জ্ঞান, সাধনা। আমৃত্যু তিনি সংগঠনের সঙ্গে ছিলেন, এক মুহূর্তের জন্য বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে জলাঞ্জলি দেননি বরং তিলে তিলে একে ধারণ করেছেন। সিলেটের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে তার দীর্ঘ উপস্থিতি তখনকার রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকান্ডকে উর্বর ও বিকশিত করেছেন। দেশ মানুষ ও মানবতার কল্যাণে নিবেদিত প্রয়াত ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চলের মতো নেতার মৃত্যু নেই।
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, রাজনীতিবিদ, চিকিৎসক, প্রভৃতি পরিচয়ে প্রয়াত ডা.দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল অমর হয়ে থাকবেন চিরকাল। ৩৪তম মৃত্যু বার্ষিকীতে তার স্মৃতির প্রতি রইল শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক : সাংবাদিক

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভেজালের বিরুদ্ধে চাই আইনি যুদ্ধ
  • আত্মিক শুদ্ধির দ্বার খুলে দেয় এতেকাফ
  • শিশুর অপরাধ প্রবণতা
  • ধানচাষির বঞ্চনা ও খাদ্য নিরাপত্তা
  • নদীমাতৃক বাংলাদেশ
  • আমার পরানও যাহা চায়
  • যে দূষণ নিয়ে কেউ ভাবেন না
  • সাম্প্রতিক কথকতা
  • ভেজাল নির্মূলে যা প্রয়োজন
  • ফিরে দেখা ১৭ মে
  • বদলে যাচ্ছে নিউজিল্যান্ড
  • ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিÑঅব্যক্ত যন্ত্রণা
  • নারীর নিরাপত্তার দায়িত্ব কার?
  • সুবীর নন্দী
  • বিশ্বব্যবস্থায় গণতন্ত্রের সংকট
  • অর্থনৈতিক উন্নয়নে মানব সম্পদ
  • প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সময়ের দাবি
  • তাকওয়া অর্জনের মাস রমজান
  • সিলেটে ভেটেরিনারী সায়েন্সে ডিপ্লোমা চাই
  • সত্যায়ন প্রক্রিয়া বন্ধ হোক
  • Developed by: Sparkle IT