সাহিত্য

আবু হেনা মোস্তফা কামালের শব্দের প্রতিভাস

ফকির ইলিয়াস প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৯-২০১৮ ইং ০০:৫৭:৩১ | সংবাদটি ১১০ বার পঠিত

আবু হেনা মোস্তফা কামাল একজন ধ্যানী কবি। যিনি মাত্র ৫৩ বছরেরও কম সময় বেঁচেছিলেন। ১৯৩৬ সালের ১২ মার্চ জন্ম নেয়া এই ক্ষণজন্মা মানুষটি আমাদের ছেড়ে চলে যান ১৯৮৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। না, খুব বেশি তিনি লিখে যেতে পারেন নি। কবি শহীদ কাদরীর ভাষায়, একজন বড় কবিকে খুব বেশি লিখতে হবে কেন!
শহীদ কাদরীই সনাক্ত করেছেন ৫০ দশকের এই কবিকে। যিনি মাত্র তিনটি কাব্যগ্রন্থ লিখেই চমকে দিয়েছিলেন বাঙালি পাঠকের মন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আপন যৌবন বৈরী’ বের হয় ১৯৭৪ সালে। এর পরে বের হয়, ‘যেহেতু জন্মান্ধ’ (১৯৮৪) এবং ‘আক্রান্ত গজল’ (১৯৮৮)। তিনি বাংলা কবিতাকে আধুনিক পাঠকের মননে পৌঁছে দিয়েছিলেন এক নবতর আঙ্গিকে। বলেছেন-
‘আপনাদের সবার জন্যে এই উদার আমন্ত্রণ / ছবির মতো এই দেশে একবার বেড়িয়ে যান। / অবশ্য উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো মনোহারী স্পট আমাদের নেই, / কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না-আপনার স্ফীত সঞ্চয় থেকে / উপচে পড়া ডলার মার্ক কিংবা স্টার্লিঙের বিনিময়ে যা পাবেন / ডাল্লাস অথবা মেম্ফিস অথবা কালিফোর্নিয়া তার তুলনায় শিশুতোষ !
আসুন, ছবির মতো এই দেশে বেড়িয়ে যান / রঙের এমন ব্যবহার, বিষয়ের এমন তীব্রতা / আপনি কোনো শিল্পীর কাজে পাবেন না, বস্তুত শিল্প মানেই নকল নয় কি? / অথচ দেখুন, এই বিশাল ছবির জন্যে ব্যবহৃত সব উপকরণ অকৃত্রিম; / আপনাকে আরো খুলে বলি: এটা, অর্থাৎ আমাদের এই দেশ, / এবং আমি যার পর্যটন দপ্তরের অন্যতম প্রধান, আপনাদের খুলেই বলি, / সম্পূর্ণ নতুন একটি ছবির মতো করে / সম্প্রতি সাজানো হয়েছে।
খাঁটি আর্যবংশদ্ভূত শিল্পীর কঠোর তত্ত্বাবধানে ত্রিশ লক্ষ কারিগর / দীর্ঘ নটি মাস দিনরাত পরিশ্রম করে বানিয়েছেন এই ছবি। / এখনো অনেক জায়গায় রং কাঁচা-কিন্তু কী আশ্চর্য গাঢ় দেখেছেন? / ভ্যান গগ-যিনি আকাশ থেকে নীল আর শস্য থেকে / সোনালি তুলে এনে / ব্যবহার করতেন-কখনো, শপথ করে বলতে পারি, / এমন গাঢ়তা দেখেন নি!
আর দেখুন, এই যে নরমু-ের ক্রমাগত ব্যবহার-ওর ভেতরেও / একটা গভীর সাজেশান আছে-আসলে ওটাই এই ছবির-অর্থাৎ / এই ছবির মতো দেশের-থিম!’ [ছবি]
কী চমৎকার একটি কবিতা! যে কবিতায় তিনি তুলে ধরেছেন তিরিশ লাখ শহীদের রক্তগাঁথার বাংলাদেশ। আহবান জানিয়েছেন, আসুন দেখে যান এই বাংলা! আবু হেনা মোস্তফা কামাল ছিলেন বিরল প্রতিভার অধিকারী একজন সার্থক শিক্ষক। সমকালীন বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান গীতিকার, কবি, প্রাবন্ধিক, সমালোচক ও জনপ্রিয় উপস্থাপক। জীবনের প্রথম দিকে তদানীন্তন পূর্ব বাংলার রেডিও, টেলিভিশনের একজন খ্যাতিমান সংগীতশিল্পীও ছিলেন তিনি।
মনে পড়ছে, সেই সময়ের একমাত্র টিভি বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর উপস্থাপনায় অনেকগুলো অনুষ্ঠান দেখেছি তন্ময় হয়ে। তাঁর বলার ভঙ্গি, তাঁর বাগ্মি ভাষণ সেই সময় শাণিত করতো আমাদের মতো তরুণ-তরুণীদের।
বাংলা কবিতার বাঁক বদলে দিয়েছিলেন তিনি। দেশপ্রেমের পাশাপাশি তাঁর কবিতার বিষয় হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন প্রেম, নারী, যৌবন, জীবন, স্বদেশ ও সমাজকে। প্রেম, প্রধানত নারীপ্রেম বিষয়ে আবু হেনা মোস্তফা কামাল ছিলেন অসাধারণ অনুভূতিপ্রবণ। নারীপ্রেম প্রত্যাশায় তাঁর আকুতি, সমর্পনে পরিণত হয়েছে। অন্যান্য উদার জীবনবাদী কবির মতো আবু হেনা মোস্তফা কামালেরও জীবন ও জগৎ সম্পর্কিত জিজ্ঞাসার নিরন্তর উৎস ছিল এই পৃথিবী ও পার্থিব জীবন।
বাস্তব, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে আবু হেনা মোস্তফা কামাল কিছুটা আশাবাদী, অনেকটা হতাশামগ্ন, সীমাহীন শূন্যতায় আচ্ছন্ন, অতঃপর মৃত্যুচেতনায় প্রোথিত। আপন কবিসত্তা নিয়ে সংশয় ও সাহস দুটোই ব্যক্ত হয়েছে তাঁর কবিতায়। নিজের কবিত্ব নিয়ে তিনি পৌনঃপুনিক অথচ বিশ্বস্ত উচ্চারণ করেছেন।
কবিতার নির্মাণশৈলীতে আবু হেনা মোস্তফা কামাল ছিলেন উপমা আর ঐতিহ্য সমৃদ্ধ আধুনিক কবি। শব্দ ব্যবহারের দক্ষতায়, উপমা-রূপকের মুন্সিয়ানায়, চিত্রকল্পের পরিকল্পনায় তিনি ছিলেন নাগরিক বৈদগ্ধের অধিকারী।
তাঁর এই কবিতাটি এখনও ফিরে পাঠকের কন্ঠে কন্ঠে-
‘আজ আমি কোথাও যাব না। আমি কিছুই করবো না, আজ / সূর্যের পিয়ন এসে দরজায় যতো খুশি কড়া নেড়ে যাক, স্নান ঘরে / অবিরল ঝরুক শাওয়ার, ভেসে যাক প্রভাত ফেরির গান / ক্যাম্পাসের সমস্ত আকাশে, সুগম্ভীর শহীদ মিনারে/ ছাত্রদের প্রগাঢ় অঞ্জলি থেকে ঝরে পড়ুক অজস্র ফুল, মেয়েদের/ সুললিত হাতে / লেখা হোক নতুন আলপনা, / পৃথিবীর সমস্ত বেতার কেন্দ্র থেকে / উৎসারিত হোক রবীঠাকুরের গান, আমি তবু / কোথাও যাবো না আজ আমার নিজস্ব জন্মদিনে।
আমার একুশতম জন্মদিনে শহরের তোরণে তোরণে/ জ্বলে উঠবে আলো, নিঃসঙ্গ মেঘনার মাঝি/ নৌকা বেয়ে যাবে, আজ স্বদেশী ফুলের গন্ধে সমস্ত বাংলার বুক / ভরে উঠবে গভীর স্বস্তিতে, নিষেধের ত্রস্ত ব্যারিকেডে / আজ কেউ তুলবে না সঙ্গীতের সহজ জলসায়, আজ আমার/ নিজস্ব জন্মদিনে
মা, তোমার উষ্ণ কোলে আহত অবুঝ মাথা রেখে / আমি শুধু শুয়ে থাকবো, আমার সোনালী লম্বা চুলে / তোমার নিঃশ্বাস ঢেউ তুলে যাবে, আমি আজ কিছুই করবো না, / শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবো এক অলৌকিক গর্বে দীপ্ত সম্রাজ্ঞাীর মতন তোমাকে।’ [একুশ]
কবিতার পাশাপাশি আবু হেনা মোস্তফা কামাল ছিলেন একজন উৎকৃষ্ট মানের প্রাবন্ধিক। কবিতা দিয়ে সাহিত্যে তাঁর যাত্রা শুরু হলেও প্রবন্ধ ও সমালোচনায় ছিলেন সবচেয়ে সফল। লিখেছেন সমসাময়িক কলামও। আবু হেনা মোস্তফা কামালের জীবদ্দশায় প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ দুটি। প্রথমটি সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধের সংকলন ‘শিল্পীর রূপান্তর’। এই গ্রন্থের আটটি প্রবন্ধের মধ্যে চারটিরই বিষয় উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ ও সাহিত্য। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে। অন্যটি সাহিত্য সমালোচনা বিষয়ক প্রবন্ধের সংকলন ‘কথা ও কবিতা’। এটির প্রকাশকাল ১৯৮১। এই গ্রন্থের মোট ১১টি প্রবন্ধের মধ্যে তিনটিরই পটভূমি উনিশ শতক। এছাড়া ১৯৭৭ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত তাঁর ইংরেজি অভিসন্দর্ভ ‘দ্য বেঙ্গলি প্রেস অ্যান্ড লিটারারি রাইটিং’।
বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে তাঁর নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে একজন কালজয়ী গীতিকার হিসেবে। সে গানগুলো গেয়েছেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পীরা। এখনও সেগুলো গীত হচ্ছে এই প্রজন্মের শিল্পীদের কন্ঠে। ‘আমি সাগরের নীল' (১৯৯৫) তার গানের সংকলন বের হয় তাঁর মৃত্যুর পর।
তাঁর গানের কথায় মিশে আছে আমাদের চাওয়া-পাওয়া, আমাদের স্বপ্ন, আমাদের বাংলাদেশ। এখানে কয়েকটি পঙতি তুলে ধরতে চাই।
১। অপমানে তুমি জ্বলে উঠেছিলে / সেদিন বর্ণমালা / সেই থেকে শুরু দিন বদলের পালা।।
নতুন মন্ত্রে ভরেছিলেন অঞ্জলি / আর নয় ভীরু ফাল্গুনি পদাবলি / কণ্ঠে তোমার বেজেছিল গান দারুণ অগ্নিজ্বালা।।
২। আমি এক রাজার কুমার / দুঃখ পেলেও হাসতে পারি। / বারবার ফিরিয়ে দিলেও / আবার ফিরে আসতে পারি।।
৩। কেন যে আমার কৃষ্ণচূড়ার বনে / গানের লগন রঙের মাধুরী/ ছড়ালো আপন মনে।।
কে তুমি আমার শূন্য হৃদয় ভরে / এত গান দিলে ফাল্গুনের মতো করে / নয়নে পরালে মায়াবী কাজল / ভালো লাগা পরশনে।
৪। অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে / যেন একমুঠো রোদ্দুর আমার দু’চোখ ভরে / তুমি এলে।
৫। নদীর মাঝি বলে এসো নবীন / মাঠের কবি বলে এসো নবীন / দেখেছি দূরে এই সোনালি দিন॥
এমন অনেক দৃশ্যকল্প তিনি দেখিয়ে গিয়েছেন আমাদের, তার শব্দের প্রতিভাসে। তাঁর লিরিক্যাল থিম মিশেছে বাংলার পলিমাটির সাথে। তাঁর প্রিয়তমাকে তিনি লিখেছেন-
তোমার জন্যে হতে পারি লাল কৃষ্ণচূড়া / একটি আহত কবিতার মতো নিভে যেতে পারি যখন তখন / যদি তাই চাও; যদি তাই চাও আগুনের মতন জ্বলতে পারি / তবু একবার তাকাও আমার দিকে / দ্যাখো এই চোখ তোমার জন্যে / বিশুদ্ধ নীলে একটি মহৎ কবিতা রেখেছি লিখে!
[অন্তরঙ্গ গান]
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের পদটি আলোকিত হয়েছিল তাঁর পরশে। তিনি একাধারে যেমন ছিলেন পাঠক, তেমনি ছিলেন গবেষক-লেখক-অধ্যাপক। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের দুর্ভাগ্য বেশিদিন পাওয়া যায় নি তাঁকে এই চরাচরে। হ্যাঁ, তিনি বেঁচে আছেন এবং থাকবেন মননশীল পাঠকের চর্চা ও ধ্যানে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT