সাহিত্য গ্রন্থালোচনা

‘লিভিং ইন অক্সফোর্ড রোড’

বাছিত ইবনে হাবীব প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৯-২০১৮ ইং ০১:০৪:৫৪ | সংবাদটি ১৬৫ বার পঠিত

দুটো দুর্বার তৃষ্ণা আছে মানুষের। মনের তৃষ্ণা ও চোখের তৃষ্ণা। অনিঃশেষ আগ্রহের পাখায় যাঁরা চষে বেড়াতে চান সমগ্র পৃথিবী; সেই দলেরই এক নবীনতম সদস্য ‘লিভিং ইন অক্সফোর্ড রোড’ গ্রন্থের লেখক ইকবাল আহমদ চৌধুরী।
সাহিত্য, রাজনীতি ও বৃটেনের সমাজ ব্যবস্থা বিষয়ক বারোটি নিবন্ধে সাজানো বইটিতে লেখকের অদম্য আগ্রহ, তথ্য সরবরাহ ও ব্যাপক বিশ্লেষণ একজন অত্যাধুনিক বিশ্ব নাগরিকের মতো। কখনও তাঁর বক্তব্য কলামিষ্টের মতো, কখনও প্রতিশ্রুতিশীল রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতো।
বইটির মুখবন্ধে লেখক বলেছেন, তাঁর গবেষণা ছিল ইংরেজি সাহিত্যে তার প্রিয় কিছু লেখকের জীবন এবং কর্মপদ্ধতির উপর। বিশ্ব সাহিত্যে সাড়া জাগানো দুজন কবি ও একজন উপন্যাসিকের জীবনের কিছু চুম্বক অংশ তুলে ধরে তিনটি মূল্যবান লেখা উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে তারই আলোকপাত হয়েছে।
ব্রিটেনের প্রভাবশালী কবি জর্জ গর্ডন বায়রন সম্পর্কে লিখতে গিয়ে পাঠককে অনেক অজানা তথ্য দিয়েছেন লেখক। আমেরিকা সম্পর্কে লর্ড বায়রনের মন্তব্যটি উল্লেখ করার মতো। ‘America is a model of force and freedom and moderation-with all the coarseness and rudeness of its people.’’ (পৃষ্ঠা-২২)
প্রসঙ্গত আমেরিকা সম্পর্কে কবি অ্যলান গিনসবার্গ’র মন্তব্যটি স্মর্তব্য : ‘আমেরিকা আমি আর তোমার নয়, এখন তোমার দৈহিক সম্পর্ক এটম বোমের সাথে।’
বায়রন বলেছিলেন coarseness বা অসভ্যতা ও rudeness বা উগ্রতাই আমেরিকার বৈশিষ্ট। গিনসবার্গ সেখানে তার দৈহিক চরিত্রের স্বরূপ উন্মোচন করে বিশ্ববাসীকে আমেরিকা সম্পর্কে নূতন ভাবে সচেতন করেছিলেন।
জর্জ ওরওয়েলের Animal Farm ও ১৯৮৪ বিশ্বসাহিত্যে দুটো সাড়া জাগানো উপন্যাস। লেখক ইকবাল চৌধুরী ১৯৮৪ উপন্যাসের সারবত্তা প্রতিপন্ন করে সার্থক করেছেন পাঠক স্পৃহাকে।
যেখানে মন্দ সরকার ক্ষমতায় থাকে, জনগণ এক ধরনের ভয় এবং কষ্টের মাঝে বসবাস করে। তাঁদের অধিকার এবং মর্যাদা আগ্রাসী ও কর্তৃত্বপরায়ন সরকার কর্তৃক সমানভাবে মূল্যায়িত হয় না।” (পৃষ্ঠা-২৩)
ইংরেজীতে একটি কথা আছে-End Justifies the means. টি এস ইলিয়টের কবর ফলক ঘোষণা করছে সেই কথাটির। মনে হয় যেন সমাপ্তি বা মৃত্যু বলে কিছুই নেই। মৃত্যু মানে আরেকটি নূতন জগতের সূচনা। “আমার সূচনাতেই নিহিত আমার শেষ, আমার সমাপ্তিতেই নিহিত আমার শুরু”। পৃথিবীর তাবৎ বিশ্বাসী বলয়ের মানুষের জন্য এটি একটি চমৎকার অমিয়বাণী।
ঘরের মানুষের সাথে পরকে মিলাতে পেরে মানুষ একটি পরম তৃপ্তি বোধ করে। ১৯৭৬ সালে অক্সফোর্ড ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো। অপরদিকে ১৯৭৯ সালে অক্সফোর্ড ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ব্রিটেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র স্বামী ফিলিপ জন মে।
তার মানে লেখক বুঝাতে চান ব্রিটেনের রাজনীতি করলে বেনজির ভুট্টোর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা ছিল।
লন্ডন শহরকে যারা দূরে বসে চিনতে চান তাঁদের জন্য বহু চমৎকার তথ্য বইটির অন্যতম আকর্ষণ। যেমন: “লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো ও আকর্ষণীয় পাতাল রেল। এর যাত্রা শুরু হয় জানুয়ারী ১৮৬৩ সালে।” (পৃষ্ঠা-৪৪)
মানুষের সাথে মানুষের মিশেল খুলে দিতে পারে মানুষের সৃজনী সম্ভাবনার দুয়ার। লেখক ইকবাল এবং মিষ্টার রড কোপিং এর মধ্যকার অন্তরঙ্গ আলাপচারিতার ফসল হিসাবে পাওয়া গেলো: “পৃথিবীর সর্ববৃহৎ প্রবালের তৈরি মহা প্রাচীর ‘গ্রেট বেরিয়ার রিফ’ কুইন্সল্যান্ডে অবস্থিত। সমুদ্রের পানির নিচে বিশাল এলাকা জুড়ে এই আশ্চর্য প্রবাল দ্বীপ দেখতে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক লোক অষ্ট্রেলিয়া ভ্রমণে যান। প্রাকৃতিক বৈচিত্রে ভরপুর এ প্রবাল দ্বীপকে পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।” (পৃষ্ঠা-১৫)
লিভিং ইন অক্সফোর্ড রোড কেন? শিরোনামের লেখাটিই এই গ্রন্থের সারবৎসার। কোপিং সাহেবের কথা থেকে লেখক যথার্থই অনুভব করেছেন: ‘পৃথিবী পরিভ্রমণ করলে সহজে এই সত্য উপলব্ধি করা যায়। এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে যাতায়াত করলে বোঝা যায় গোটা বিশ্ব পরিমন্ডলের বিষ্ময়কর গঠন প্রণালী।’ (পৃষ্ঠা-১১)
লেখক সবিনয়ে স্বীকার করেছেন-এদেশে আমার চিন্তা চেতনা বিকশিত করতে মিস্টার রড কোপিং এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। (পৃষ্ঠা-১০)
কবি আলেকজান্ডার পোপ যেমনটি বলেছেন The proper study of mankind is man. আমরাও স্বীকার করি, মানুষকে গবেষণা করলে সবকিছুরই গবেষণা সফল হয়।
আগ্রহী তরুণ, যুবা, শিশু সবার জন্য এই বইটির পাতায় পাতায় রকমারি তথ্যভান্ডার রয়েছে। যেমন ভূগোলের পাঠক জানতে পারবেন-‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভৌগলিক অবস্থান হচ্ছে পূর্ব দিকে আটলান্টিক মহাসাগর, পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণে মেক্সিকো ও মেক্সিকো উপসাগর এবং উত্তরে কানাডা।’ (পৃষ্ঠা-১২)
ইতিহাস অনুসন্ধানী পাঠকেরা নিম্নোল্লেখিত তথ্য পেয়ে নতুন আনন্দে জেগে উঠবেন-অটোম্যান খলিফাদের শাসন ১২৯৯ সালে শুরু হয় তুরষ্কে। সুদীর্ঘ ৬২৩ বছর গোটা অর্ধ পৃথিবী শাসনের পর ব্রিটিশ এবং ফ্রেঞ্চদের হাতে তাদের পতন হয় ১৯২২ সালে। তারপর শুরু হয় সেক্যুলার তুরষ্কের যাত্রা।” (পৃষ্ঠা-২০)
অদম্য আশার কথা হল তুরষ্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট একজন দুঃসাহসী ন্যায়পরায়ণ মুসলিম শাসক।
ব্রেক্সিট প্রসঙ্গ, প্রথম মুসলিম মেয়র সাদিক খানের কৃতিত্ব, ডেভিড লিভিংটনের আবদান, তথ্য প্রযুক্তির বিভিন্ন দিক, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ঝুঁকি, বাংলার মধ্যে ইংরেজি শব্দের মিশ্রণ, থেরেসা মে, ১৯৬৫: 1965: The Year Modern Britain Was Born- এ সবগুলো সময়োপযোগী বিষয়ে ইকবাল চৌধুরীর মেধা ও মননের প্রশংসা করতেই হয়। সাথে অনুরোধ কানাইঘাট, সিলেট এবং বাংলাদেশ যেন তার চেতনার সীমানা থেকে কখনোই বিস্মৃত না হয়।
ইকবাল আহমদ চৌধুরী শুরু করেছেন অক্সফোর্ড দিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে কেম্ব্রিজে গিয়ে শেষ করেছেন। সার্থক হোক তাঁর চিন্তা এবং অক্ষর চর্চার জীবন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT