সাহিত্য

তন্দ্রাহারা রাতগুলো

ডা. এম এ সালাম প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৯-২০১৮ ইং ০১:০৬:২৯ | সংবাদটি ১০৪ বার পঠিত

সুইজারল্যান্ড-এর রাজধানী বার্ণ। বার্ণ সিটি সেন্টারে বাংলাদেশী চার বান্ধবী ঘুরে ঘুরে দেখছিল আর টুকটাক শপিং করছিল। হঠাৎ শপিংমল-এর পাশে কোথাও প্রচন্ড শব্দে ককটেল ফোটার শব্দ হল। লোকজন যে যেদিকে পারছে পালিয়ে বেঁচেছে। পেট্রোল পুলিশের গাড়ীগুলো এলার্ট হর্ণ বাজিয়ে দ্রুত শপিংমলটি ঘিরে ফেলল। ঘটনাস্থলটি হলুদ বেল্ট দিয়ে ঘিরে ফেলল। তড়িঘড়ি এ্যাম্বলেন্স দুটি এসে হাজির। পুলিশ লোকজনকে সার্চ করছে, জিজ্ঞাসাবাদ করছে কিন্তু সন্দেহভাজন কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না। এমনি সময় দারুণ হ্যান্ডসাম ইমিগ্রেশন লইয়ার ব্যারিস্টার লুৎফুর রহমান টিপু শপিংমল-এর তিনতলা থেকে নেমে কার পার্কিং লট-এর দিকে দ্রুত এগুচ্ছিল, তার গলায় আইডেনটিটি কার্ড ঝুলানো থাকায় পুলিশ তাকে স্লাউট দিয়ে ছেড়ে দিল।
হঠাৎ টিপু দেখল শপিংমল-এর সিড়িতে দাঁড়িয়ে সেলওয়ার কামিজ পরা অসাধারণ সুন্দরী, নিশ্চয়ই বাংলাদেশী একটি তরুণী থরথর করে কাঁপছে এবং কাঁদছে। টিপু দৌড়ে গিয়ে তরুণীর হাত ধরে বলল: আপনি খুব ভয় পেয়েছে, বুঝতে পারছি। কাঁদবেন না, আসুন আমার সাথে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কিছু কিছু উগ্র টিনেজাররা মাঝে মধ্যে এভাবে ককটেল ফুটিয়ে ফূর্তি করে। তা, আপনি নিশ্চয়ই বাংলাদেশী? মেয়েটি কৃতজ্ঞতার দৃষ্টি নিয়ে টিপুর দিকে তাকিয়ে বলল: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। চরম বিপদের সময় আপনি আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। আমি এখানে একদম নতুন। রাস্তা-ঘাট, ঘরবাড়ী কিছুই চিনি না। আমি সদ্য বাংলাদেশ থেকে এসেছি আমার আপার কাছে। ওরা এখন এদেশের নাগরিক। দুলাভাই ডাক্তার, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। আমার তিন বান্ধবীর সাথে ঘুরে ঘুরে এই চমৎকার শপিংমলটি দেখছিলাম। হঠাৎ এই প্রচন্ড শব্দে এবং লোকজনের আর্তচিৎকার এবং দৌড়াদৌড়িতে আমার তিন বান্ধবীও কোথায় হারিয়ে গেছে। ওরা আমাকে খুঁজছে, আমি তাদেরকে খুঁজছি। কিন্তু কাউকে না পেয়ে অসহায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছি। আপার বাসার নম্বারটি মনে আছে। কূইন ভিক্টোরিয়া, বাষট্টি নং কটেজ। এইটুকুই জানি, তার চেয়ে বেশি কিছু জানি না। তা আপনি আমার হাত ধরে আছেন, সারাজীবন কি এভাবে ধরে রাখতে পারবেন।’
টিপু একটি মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল: আপনি অনুমতি দিলে, সহযোগিতা করলে নিশ্চিন্তে ধরে রাখতে পারব, ভালোবেসে সংসার গড়তে আমার কোন আপত্তি নেই। মেয়েটি আনন্দে আত্মহারা হয়ে একটি হাসি দিল, টিপুর মনে হল পাহাড়ী ঝর্ণা থেকে কলকল শব্দে পানি ঝরছে। এত মায়াবী হাসি মেয়েদের হয়!’ মেয়েটি বলল: আমরা ইতিমধ্যে অনেক দূর এগিয়েছি কিন্তু এখনও আমাদের পরিচয় হয়নি। হৃদয়ে কাঁপন লাগানো আরেকটি অতি মায়াবী হাসি দিয়ে টিপুর হাতের উপর হাত রেখে বলল: আমার নাম তামান্না জেনিফার জেবা। সবেমাত্র ইংরেজিতে মাস্টার্স করে আপার কাছে এসেছি বেড়াতে। মাস্টার্স ফাস্ট ক্লাস পেয়েছি। থিথিস্ লিখছি। ডক্টরেট করার খুব ইচ্ছে আছে।’ এবার তোমার কথা বল।’
টিপু তৃপ্তির হাসি দিয়ে বলল: আমি ব্যারিস্টার লুৎফুর রহমান টিপু। আমি সুইস সরকারের ইমিগ্রেশন লইয়ার হিসেবে কার্যরত আছি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তোমাকে লিগ্যাল করার কাজটি অনতিবিলম্বে করতে হবে। অবশ্য তোমার সম্মতি থাকলে, আগেই বলেছি, একবার যখন এই মায়াবী হাতটি ধরেছি তখন তো এই দুটি বাহুর আলিঙ্গনে থেকে সারাজীবন কাটাতে চাই। জেবা, ভুল কিছু বললাম না তো? না তো, না। টিপু তুমি আমার মনের কথাটি বলে দিয়েছ। এটা এক সাংঘাতিক পাওনা। আমি অবাক হচ্ছি, ব্যাপারটি স্বপ্নের মতো সংঘটিত হল। ঠিক আছে, অবাক হওয়ার কোন দরকার নেই। এসো, আমার সাথে, বাসায় গিয়ে কফি খেতে খেতে আরো আলাপ-আলোচনা হবে। টিপু জেবাকে হাত ধরে নিয়ে এসে গাড়িতে বসল। কফি ও বার্গার খেতে খেতে টিপু বলল: জেবা তুমি যদি পিএইচডি করতে চাও, আমি তোমাকে সাহায্য করব। আমার পাশের বাসায় বার্ণ ভার্সিটির একজন টিচার থাকেন উনার নাম ডক্টর পিটারসন। আমার সাথে ভালো পরিচয় আছে। উনার এ্যফিলিয়েশন নিয়ে বার্ণ ভার্সিটির এক্সটারন্যাল স্টুডেন্ট হিসাবে ডিগ্রি নিতে পারবে।’
জেবা উচ্চকন্ঠে প্রশংসা করে বলল: মাই ডীয়ার টিপু, তোমাকে ধন্যবাদ জানাবার ভাষা আমার নেই। তুমি এই কাজটি করে দিলে আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব। আমি এক্সাটারন্যাল স্টুডেন্ট হিসাবেই ডিগ্রিটা নিতে চাই।’ টিপু খোশ মেজাজে বলল: সুইট জেবা, আমি অবশ্যই এই কাজটি করে দেব। আফটার অল, তুমি আমার হবু বধু। তোমার কাজ করবো না তো কার কাজ করবো। জেবা কৃতজ্ঞতা ভরা বড় বড় মায়াবী চোখ দু’টি মেলে টিপুর দিকে তাকিয়ে বলল: কি সাংঘাতিক ব্যাপার, টিপু তুমি যখন হঠাৎ এসে আমার হাতটি ধর, তোমার দিকে চেয়ে মনে হয়েছে, আরে! আমি তো ওর খুঁজে দেশ-বিদেশ ঘুরছি। কতো তন্দ্রাহারা রাত কাটিয়েছি। আমি তো ওকেই খুঁজছিলাম। অবশেষে সুইজারল্যা- এসে ওকে পেলাম। টিপু বিশ্বাস কর, তুমি আমার স্বপ্নে দেখা মনের মানুষ যার ছবি হৃদয়ে এঁকে দিনের পর দিন প্রহর গুনছিলাম। তোমাকে পেয়ে গেছি। মনে হচ্ছে গোটা পৃথিবীটা আমার হয়ে গেল। টিপু, আমার আর চাওয়া-পাওয়ার অবশিষ্ট কিছু নেই। তোমাতেই সব, তোমাতেই ইতি।’
টিপু উঠে দাঁড়িয়ে জেবাকে জড়িয়ে ধরে প্রথম প্রেমের একটি মায়াবী কিস দিয়ে বলল: জেবা, আমার প্রিয় জেবা, তুমি আমার স্বপ্ন পূরণ করেছ, আমাকে ধন্য করেছ। আমার বহু কাক্সিক্ষত এবং লালিত বাসনাকে আজ বাস্তবে রূপ দিয়েছ। তোমার মতো আমিও তোমার ছবি হৃদয়ে এঁকে ঘুরছিলাম। বহু মেয়ে দেখেছি, অনেক সুন্দরী মেয়েকেও দেখেছি কিন্তু কাউকে গ্রহণ করতে পারিনি। মন বলে ওরা একটাও তোমার নয়। তোমার পছন্দের পাত্রী এখনও আসেনি। ধৈর্য ধরে পথ চল, একদিন নিশ্চয়ই পেয়ে যাবে। আমার প্রিয় জেবা, তোমাকে পেয়ে গেছি, এসো দু’জনে মিলে একটি সুন্দর সংসার গড়ি। জবা তুমি আমার কোলে বসবে আর দু’জনে মিলে প্রাণ ভরে এই অসম্ভব সুন্দর পৃথিবীটাকে দেখব। দেখবে জীবনটা কতো মধুময়, কতো স্বপ্নময় আর অশেষ তৃপ্তির সমারোহ। এই তৃপ্তির পরিপূর্ণ জোয়ার আসে স্বামী-স্ত্রীর ছন্দময় রাত্রিযাপনে। জবা এই তৃপ্তির পূর্ণতা শুধু কথায় নয়, আমরা দু’জনে মিলে ছন্দময় জীবন যাপনের মাধ্যমে তা প্রমাণ করব, তোমাকে কথা দিলাম।’ জেবা তার চমৎকার দুটি আঁখি মেলে টিপুকে আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করে নীরব একটি হাসি দিল, মনে হলো সদ্য প্রস্ফুটিত শিউলী ফুল ঝরে ঝরে পড়ছে।
জেবা গভীর আবেগে টিপুকে জড়িয়ে ধরে বলল: টিপু, আমার প্রিয় হবু বর, তোমার কামনা-বাসনা পরিপূর্ণ করতে আমি সর্বাত্মক সহযোগিতা করব, এটা আমার প্রতিজ্ঞা।’ টিপু তৃপ্তির হাসি দিয়ে জেবার কপালে একটি মায়াচুম্বন এঁকে দিয়ে বলল: জেবা, তোমার স্বপ্নের সংসার ফুলে-ফলে সমৃদ্ধ করতে আমার সহযোগিতার কমতি হবে না। তুমি যেভাবে চাইবে, আমাকে সেভাবেই সর্বদা তোমার পাশে পাবে, এটা আমার ওয়াদা। আমি দেখছি, তোমার আমার চাওয়া-পাওয়া সমান-সমান, তাই আমাদের দাম্পত্য জীবনটা হবে একটি ছন্দময় কবিতা। আমরা থাকবো, খেলবো, ভালোবাসবো, জীবনটা হবে ছন্দময় তটিনীর মতো সদা চঞ্চল। টিপু জেবাকে জড়িয়ে ধরে বলল: মাই সুইট ডারলিং, তুমি আমার দৃষ্টিতে একজন অসাধারণ সুন্দরী তরুণী। তুমি সুন্দর, তোমার চিন্তা-চেতনা, কথাবার্তা সুন্দর। তোমাকে যত দেখছি, ততই মুগ্ধ হচ্ছি। মাই সুইট জেবা, তুমি ছাড়া জীবন কল্পনা করতে পারছি না। তুমি আমার, শুধু আমার।
মুগ্ধ নয়নে টিপুর পানে তাকিয়ে জেবা বলল: মাই সুইট টিপু, তুমি আমার জান, তুমি আমার প্রাণ। যেদিকে তাকাই শুধু তুমি আর তুমি। তুমি কি মনে করো তুমি ছাড়া আমি বাঁচতে পারব। ডীয়ার টিপু, আমি ইতিমধ্যে তোমার মাঝে বিলীন হয়ে গেছি। আমার আর দ্বিতীয় কোন ভাবনা নেই। তোমার অপেক্ষায় অনেক বিনিদ্র রজনী পার করেছি। কতো কল্পনা, কতো স্বপ্নে সারাবেলা বিভোর থাকতাম। অঙ্ক মেলাতে পারতাম না। অস্থির লাগত। একটা চঞ্চল বিহ্বলতা কাজ করত। কোনভাবেই হৃদয়ে আঁকা ছবি মেলাতে পারতাম না। কষ্ট হতো, সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম না। একটু ঘুম আসলেই স্বপ্নেরা এসে করতো ভীড়, সেই ভীড়ে তোমাকে দেখতাম, সাথে সাথে ঘুম ভেঙ্গে যেত। জাগলেই তোমাকে আর খুঁজে পেতাম না, হতাশা আর অস্থিরতায় ভুগতাম। বলতাম হায়। মনের মানুষটি কোথায় হারিয়ে গেল। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল একদিন তাকে খুঁজে পাবই। টিপু প্লিজ, আমাকে জড়িয়ে ধর। শক্ত করে ধর। টিপু জেবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল: জেবা, চল কোর্টে। আমরা কোর্ট ম্যারেজ করব। সময় নষ্ট করা আমাদের জন্য কল্যাণকর হবে না।’ জেবা বলল: মাই সুইট টিপু, তোমাকে ছাড়া এক মুহূর্তও আমি থাকতে পারব না। তোমার সিদ্ধান্তই উত্তম। আর একবার যখন তুমি আমার হাত ধরেছ, এবার এই পৃথিবীটাকে বদলে দিতে পারি আমি। ঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত, চল কোর্টে যাই।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT