মহিলা সমাজ

ঘুরে এলাম দার্জিলিং ও শিলং

বিনতা দেবী প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৯-২০১৮ ইং ০০:৩০:০০ | সংবাদটি ২২৯ বার পঠিত

ভারত বিশাল আয়তনের আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য। এক সময় ভারত, পাকিস্তান ও বর্তমান বাংলাদেশ মিলে এক অখন্ড ভারত ভূখন্ড ছিলো, অর্থাৎ ১৯৪৭ এর পূর্বে আমরা এক রাষ্ট্র ছিলাম। তাই ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের এক দেশের জনগণের সহিত অন্য দেশের জনগণের আত্মীয়তা রয়েছে, নাড়ীর টান রয়েছে। এছাড়া ভারতে রয়েছে অনেক তীর্থস্থান। এই সুবাদে বিভিন্ন সময়ে তীর্থ দর্শন, আত্মীয় স্বজনের সাথে সাক্ষাৎ, ভ্রমণ, ইত্যাদি কারণে অনেকবারই ভারতে যাওয়া হয়েছে। ভারতের উত্তর প্রদেশের কাশী, এলাহাবাদ, মথুরা, বৃন্দাবন, পশ্চিম বাংলার বৃহত্তর কলকাতা, নবদ্বীপ, মায়াপুর, গুরু পাঠ বেলুড় মঠ, দক্ষিণেশ্বর, আগ্রার তাজমহল।
দিল্লীর বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান, উড়িষ্যার পুরীর জগন্নাথ দর্শন, সমুদ্র সৈকত ও রাজধানী ভুবনেশ্বর। ছেলে স্কলারশীপ নিয়ে পড়ার সুবাধে মধ্য প্রদেশের রাজধানী ভূপালসহ তার অন্যান্য কিছু জায়গাও ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে।
পশ্চিম বাংলার রাজধানী কলকাতায় আত্মীয় স্বজন থাকায় অনেক বারই যাওয়া হয়েছে। কিন্তু আমার বাসস্থান সিলেট এর নিকটবর্তী ‘প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড’ বলে খ্যাত মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলং যাওয়া হয়ে উঠেনি। জুন ২০১৬ তে আমি চাকুরি থেকে স্বেচ্ছা অবসরে যাওয়ার পর মনটাকে চাঙ্গা করতে চাকুরি জীবনের এক ঘেয়েমি কাটাতে শিলং দার্জিলিং ঘুরে আসার পরিকল্পনা করলাম।
শিলং উত্তরপূর্ব ভারতের বেশ জনপ্রিয় একটি পর্যটন শহর। সমতল থেকে প্রায় ৬০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত শিলং শহরটি রূপময় ও অপার সৌন্দর্য্যে ভরা।
সিলেট শহর থেকে সকাল ৮টায় শিরং এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। তামাবিল স্থলবন্দরে পৌঁছলাম সকাল ১০টায়। সেখানে ইমিগ্রেশন, কাস্টমস এর আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে প্রায় ঘণ্টা খানেক লাগলো। সকাল ১১ টায় স্থল বন্দরের ভারত অংশ ডাউকিতে পৌঁছলাম। সেখানে ফরমালিটি শেষ করে ভারতীয় ১৫০০ রুপিতে একটা ট্যাক্সি ভাড়া নিলাম। পাহাড়ি আঁকা বাঁকা পথ তাই প্রায় ৮০ কি. মি. এর দূরত্ব অতিক্রম করতে ট্যাক্সিতে আড়াই-৩ঘণ্টা সময় লাগে শিলং পৌঁছাতে। ডাউকি ঝুলন্ত ব্রিজ পার হওয়ার সময় আমরা বাংলাদেশের জাফলং এলাকা অবলোকন করলাম। উল্লেখ্য জাফলং ভ্রমণে গেলে আমরা দূর থেকে ভারতের এই ঝুলন্ত ব্রিজটি অবলোকন করে মুগ্ধ হই।
শিলং পৌঁছার পর আমরা ‘সিটি গেস্ট হাউসে’ ওঠলাম। ওঠে হাত মুখ ধুয়ে হালকা নাস্তা করে কিছুক্ষণ রেস্টের পর, শহরের আশ পাশের স্পট ঘুরে দেখলাম। পরদিন সকাল ৮টার মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্পটগুলো দেখার জন্য ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমেই গেলাম ‘এলিফ্যান্ট ফলস্’। এখানে তিনটি বড় বড় ঝর্ণা রয়েছে। প্রথমটির সিঁড়ি দিয়ে নামতে হয় দ্বিতীয়টিতে। তারপর দ্বিতীয়টির সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে তৃতীয় ঝর্ণার দেখা। পাহাড়ের গা বেয়ে অবিরাম গর্জনে ঝরছে জল, আহা কি দৃষ্টিমুগ্ধ ঝর্ণা ধারা। এরপর এক এক করে গেলাম ‘লেডি হাইড্রিপার্কে’। পার্কটি ফুলে ফুলে সমাহিতা। পার্কের ভিতর একটি ফরেস্ট মিউজিয়াম রয়েছে। এটা বাচ্চাদের জন্য বিশেষ আনন্দদায়ক। এদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য স্পট হলো ‘শিলং পিক’ ৬০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। এ টাওয়ার থেকে পুরো শিলং ও চেরাপুঞ্জিসহ বাংলাদেশের কিছু অংশ দেখতে পাওয়া যায়।
শিলং এর জনগোষ্ঠির শতকরা ৯০/৯৫ ভাগই হচ্ছে খাসিয়া। তাদের অধিকাংশই ক্যাথলিক খ্রিস্টান। এখানকার কেন্দ্রিয় চার্চ হচ্ছে এই ‘ডনভস্ক চার্চ’। উঁচু টিলার উপর ও নিচ নিয়ে অনেক জায়গা জুড়ে এই চার্চটি খুব সুন্দর দেখার মতো। আরও একটি স্বচ্ছ পানির লেক হলো ‘ওয়াউস লেক’। লেকটির উপর ব্রীজ আছে। আমরা বেশ কিছুক্ষণ ব্রিজে ছিলাম। এরপর শিলং রামকৃষ্ণ মিশনে যাই। সেখানে মিশনের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ স্বামী অচ্চ্যুতেশানন্দ মহারাজের সাথে দেখা হলে তিনি খুব খুশি হলেন, রাতের প্রসাদ আমরা মিশনে পেলাম।
পরদিন সকাল ৭টায় চেরাপুঞ্জির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। চেরাপুঞ্জি যাওয়ার পথে মকডক ও ওয়াকাবাহ ফলস্ দেখে তারপর চেরাপুঞ্জিতে পৌঁছলাম। রামকৃষ্ণ মিশনে গিয়ে অফিসে দেখা করে জানতে পারলাম অধ্যক্ষ মহারাজ কলকাতায়। অন্যান্য মহারাজগণের সাথে কথা হয় এখানেও প্রসাদ পেয়ে মিশনের এনথ্রোলজিক্যাল মিউজিয়াম ঘুরে দেখলাম। এনথ্রোলজিক্যাল মিউজিয়ামে ফটোতুলা নিষেধ ছিলো।
চেরাপুঞ্জি থেকে ফেরার পথে ‘নহকালিকাই ফলস্, মৌসুমী ইকো পার্ক, মৌসুমী ক্যাব, সেভেন সিস্টার’স ফলস্’ ঘুরে আসলাম। এগুলো খুবই সুন্দর আনন্দদায়ক। ভাষায় বর্ণনার মত নয়। প্রত্যেকটি স্থানের সৌন্দর্য স্ব স্ব মহিমায় মহিমান্বিত, প্রকৃতির এক অপূর্ব সৌন্দর্যের লীলা নিকেতন। চেরাপুঞ্জি থেকে ফেরার পথে ওখানকার একটা আদর্শ গ্রাম দেখতে যাই। গ্রামের নাম ‘মৌলেনঙ্গ’ গ্রামটি ঘুরে দেখতে ৫০ রুপির টিকেট কাটতে হয়। খুব সুন্দর পরিপাটি গ্রামটির প্রত্যেকটি বাড়ি যেন এক একটি নান্দনিকতার প্রতীক। গ্রামের উন্নয়ন রক্ষণাবেক্ষণ তাদের নিজেদের শ্রমে পরিচালিত, খুব ভালো লাগল গ্রামটি দেখে।
এ গ্রামেই পৃথিবীর একমাত্র ‘লিভিং রুটস্ ব্রিজ’। অর্থাৎ বৃক্ষের শিকড়ের ন্যাচারাল ব্রিজ দেখতে অবাক লাগে। শেষ মুহূর্তে এ গ্রামের একটি ইকোপার্ক যার নাম রিভার ভ্যালী সেটিও ঘুরে দেখে আসি। সারাদিন ঘুরা ফেরার পর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে কোনো ক্রমে শিলং হোটেলে এসে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।
পরদিন সকাল ৭টায় ট্যাক্সি করে গোয়াহাটি কামাখ্যা মন্দিরে গিয়ে মাকে প্রণাম ও পূজো দেই। ঐ দিন ছিলো মহাসপ্তমী তিথি। খুব জাগ্রত মন্দিরটি। অনেক লোকের সমাগম খুব ভালো লাগছিল। তারপর হোটেল অভিষেক রিজেন্সীতে পল্টন বাজার এ ওঠি। এর পরদিন মহা অষ্টমী সকাল বেলা ঘুম থেকে ওঠে ¯œান সেরে গোয়াহাটি রামকৃষ্ণ মিশনে দূর্গা মাকে প্রণাম ও অঞ্জলী দিতে যাই। সেখানে ‘বিরুবাড়িয়া সারদা সংঘ গোয়াহাটি মায়েদের সাথে দেখা হয়। উনারা পূজোতে একটা ফ্রি পানীয় স্টল দিয়েছেন, তো আমি সিলেট সারদা সংঘের সহ সম্পাদিকা হিসাবে উনাদের সাথে পরিচিত হই। কিছুক্ষণ খুব ভালো কাটল।
অষ্টমীর দিনগত রাত ১১টায় আমরা ট্রেন যোগে গোয়াহাটি রেল স্টেশন থেকে দার্জিলিং এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। উল্লেখ্য গোয়াহাটি থেকে দার্জিলিং যেতে হলে নিউ জলপাই গুড়ি পর্যন্ত ট্রেনে যেতে হয়। এই ট্রেনের টিকেট আমাদের আগে বুকিং করা ছিলো না। গোয়াহাটি পল্টন বাজার যে হোটেলে ছিলাম তার পাশেই একটা ট্রেভেল এজেন্সী আছে। ওখান থেকে অনলাইনে টিকেট বুকিং করতে গেলাম। কিন্তু আমাদের নির্ধারিত তারিখের মাত্র একটা টিকেট আছে। তাও স্লিপার ক্লাসে। আমাদের হতাশ দেখে ট্রেভেল এজেন্সীর লোকটি পরামর্শ দিলেন রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে খোঁজ করতে। শেষ মুহূর্তে ওরা যে টিকেট বিক্রি করে ঐ সিস্টেম কে ভারতের রেলওয়ে তৎকাল নামে অভিহিত করে।
আমাদের হোটেল থেকে রেলওয়ে স্টেশন মাত্র ১০ মিনিটের হাঁটার দূরত্ব। আমরা দু’জন হেঁটেই স্টেশনে গেলাম। তৎকাল কাউন্টারে কাঁচা পাকা চুলের এ ভদ্রলোক বসা। আমার স্বামী উনার কাছে টিকেটের জন্য অনুরোধ করলে তিনি পাশের কাউন্টার দেখিয়ে দিলেন। ঐ কাউন্টারে একটি মেয়ে বসা। সে বিনীতভাবে বললো, আংকেল তৎকাল টিকেট তো উনি ইস্যু করেন। আমার কাছে পাঠালেন কেন? কি করাÑ আবার ঘুরে উনার কাউন্টারে এসে বললাম দাদা, স্লিপার এ যে টিকেট খালি আছে ঐ টিকেটটাই আমাদেরকে দেন। আর একটা স্ট্যান্ডবাই টিকেট দেন। ভদ্রলোক টিকেটের জন্য একটা আবেদন ফরম পূরণ করে দেবার জন্য দিলেন। আমার স্বামী ফরমটা পূরণ করে উনার হাতে দেওয়ার পর একটা মিরাকল ঘটে গেল। মুহূর্তের মধ্যে কাউন্টারে বসা কাঁচা পাকা চুলওয়ালা ভদ্রলোকের চেহারার বিরাট পরিবর্তন ঘটলো। উনি সহাস্যে বললেন, আপনি আগে কেন (অপ কিউ নেহি বাতায়া, হাম সিনিয়র সিটিজেন হো) বললেন না, আপনি সিনিয়র সিটিজেন।
আপনার জন্য সব ক্লাসের টিকেটই আছে বলুন কোন ক্লাসের টিকেট লাগবে? ফরমটা সংশোধন করে দিতে আবার আমার স্বামীর হাতে দিলেন। সাথে সথে কুশল মঙ্গল জিজ্ঞাসা করলেন। যা হোক সিনিয়র সিটিজেনের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ দেখে আমরা অভিভূত হয়ে গেলাম। ফরমটা নিয়ে আমরা যাওয়া আসা দু’টো টিকেটেরই প্রস্তাব করলাম। যাওয়ার ২টা এসি ও টায়ার এবং ফেরত ২টা এসি ও টায়ার আমরা ভাগ্যবান টিকেট তো পেলামই উপরোন্ত ৫০% অফ এ অর্থাৎ অর্ধেক দামে। কামাখ্যা মার অশেষ কৃপা।
যথারীতি রাত ১১টায় আমাদের ট্রেন গোয়াহাটি ছাড়লো। গোয়াহাটি থেকে নিউ জলপাই গুড়ি ৯ ঘণ্টার যাত্রা। পরদিন সকাল ৮টায় আমরা নিউ জলপাই গুড়ি পৌঁছলাম। নিউ জলপাই গুড়ি স্টেশনের প্রায় মাইল দেড় এক এর দূরত্বের মধ্যেই শিলিগুড়ি শহর। এখানে পৌঁছার পরই মনে পড়ে গেল আমার প্রিয় লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও সমরেশ বসুর বহু গল্পের কথা। উনাদের বর্ণনায় শিলিগুড়িকে স্বপ্নের রাজ্য মনে হতো। আজ এখানে স্বশরীরে দাঁড়িয়ে আছি।
শিলিগুড়ি খুব সুন্দর। উত্তরপূর্ব হিমালয় ও পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ার্স অঞ্চলের মধ্যে দার্জিলিং জেলারই একটি শহর। প্রকৃতির বিস্ময়কর দৃশ্য দ্বারা যদি আপনি নিজেকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চান, তাহলে শিলিগুড়ি ভ্রমণ করুন।
দার্জিলিং থেকে ফেরার পথে আমাদের হাতে ৬/৭ ঘণ্টা সময় ছিলো। সে সুযোগে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে শিলিগুড়ির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে স্বাদ নেওয়ার চেষ্টা করলাম। চারপাশে সবুজে ঘেরা চা বাগান আর সেনাবাহিনীর আচ্ছাদন পেরিয়ে ডানে বাক নিতেই সমতর পথ, কিছু দূর যাওয়ার পর গাড়ি উঁচুতে ওঠতে শুরু করলো। আকাশ মেঘে ঘেরা, আমাদের ছুঁই ছুঁই করছিলো। মেঘরাশিকে খুব কাছ থেকে অভিবাদন জানালাম। গা ঘেঁষা মেঘমালা আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেল। পাহাড়ের গা ঘেঁষা মেঘমালার সাথে সখ্যতা করে পাহাড়ের আঁকা বাঁকা পথে চলতে খুবই রোমাঞ্চ হচ্ছিল।
শিলিগুড়ি দেখার তৃষ্ণা মেটার আগেই আমাদের ট্রেনের সময় হয়ে আসলো, তাই এ যাত্রা শিলিগুড়িকে বিদায় জানিয়ে আমরা নিউ জলপাই গুড়ি স্টেশনে ফিরে আসলাম। নিউ জলপাই গুড়ি শহরটি দার্জিলিং, কলিম্পং, গ্যাংটক ও সিকিমের প্রবেশদার।
নিউ জলপাই গুড়ি থেকে দার্জিলিং যাওয়ার জন্য যখন ট্যাক্সিতে চেপে বসলাম। ট্যাক্সি কিছু দূর সমতল ভূমি যাওয়ার পর আঁকা বাঁকা পাহাড়ি পথ বেয়ে আস্তে আস্তে উপরের দিকে উঠতে লাগলো। পাহাড়ের গা ঘেঁষে সবুজের হাতছানি অনেক দূর কুয়াশাচ্ছন্ন টং এর মতো বাড়ি। সে এক অপরূপ দৃশ্য। নিচের দিকে তাকালে গা শিহরণ দেয়। কোথায় কোনো গভীর খাদ! সামান্য ভুলে গাড়িসহ যাত্রী চিহ্ন পর্যন্ত পাওয়া যাবে না। এরকম অবস্থায় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর ভেসে বেড়ানো মেঘের মধ্যে ঘুরানো পেছানো রাস্তা দিয়ে রোমাঞ্চকর অনুভূতি সাথে নিয়ে দার্জিলিং শহরে পৌঁছিলাম।
নিউ জলপাই গুড়ি থেকে দার্জিলিং যেতে শেয়ারে টাটা সমোর ভাড়া ৪০০ টাকা। আমরা ২৪০০ রুপিতে একটা ট্যাক্সি নিলাম। পরে শুনলাম ভাড়া একটু বেশি নিয়েছে, ড্রাইভার ছিল বেশি চালাক। প্রথমে আমরা বুঝতে পারিনা সিলেটি ভাষায় কথা বলে দেখেই নিয়ে নিলাম। ড্রাইভার আমাদের নির্ধারিত হোটেল থেকে একটু দূরে নামিয়ে দেয়। একটা গোর্কা মহিলাকে ডেকে দেয় আমাদের লাগেজ নেওয়ার জন্য। মহিলা এক সাথে তিনটি ট্রলি ব্যাগ ওর পিঠে ঝুলিয়ে প্রায় দৌড়ে সিড়ি বয়ে নিচে নামতে লাগলো। আমরা কোনো অবস্থাতেই পেরে উঠছিলাম না। সমতল রাস্তা থেকে সিঁড়ি বেয়ে প্রায় ১৫-২০ ফুট নিচে নেমে গেল। এক পর্যায়ে আমরা তাকে হারিয়ে ফেললাম। মহাবিপদ লাগেজ নিয়ে পালালো নাকি...।
যা হোক হোটেল কর্তৃপক্ষের সাথে ফোনে আলাপ করে খোঁজে খোঁজে আমরা হোটেলে পৌঁছিলাম। হোটেলে এসে দেখি মহিলা দিব্যি আমাদের লাগেজ নিয়ে হোটেল কাউন্টারে অপেক্ষা করছে। যা হোক ভাড়া মিটিয়ে তাকে বিদায় করলাম। হোটেলের নির্ধারিত রুমে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নিলাম। আমাদের ভ্রমণ সূচি নিয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ হলো, উনারা সব ব্যবস্থা করে দিলেন। উনারা বললেন ২-৩০ টার দিকে আসাদের বের হতে হবে। খাওয়া দাওয়া সেরে নির্ধারিত সময়ে আমরা ‘রক গার্টেন’ দেখতে বের হলাম। রক গার্টেন দার্জিলিং শহর থেকে প্রায় ৩০০০ ফুট নিচে।
আমাদের সাথে দু’জন নেপালি মেয়ে ও চার সদস্যের একটি পরিবার মোট ৮ জন মিলে একটি টাটা সমো গাড়িতে রওয়ানা দিলাম। সে একই কথা আঁকা বাঁকা পথে পাহাড় ডিঙিয়ে গাড়ি আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামতে শুরু করলো। রক গার্টেন যাওয়ার পথে দার্জিলিং এর বিখ্যাত চা বাগানগুলোর মধ্যে অন্যতম ওরেঞ্জ ভ্যালি টি ইষ্টেট পাড়ি দিতে হয়। চা বাগানের কোল ঘেষে আঁকা বাঁকা রাস্তার দু’পাশ জুড়ে ঘন সবুজের গালিচা, তার সাথে দেখতে পাওয়া মেঘ আর পাহাড়ের মিতালী চোখ জড়িয়ে যায়। টিকেট কেটে রক গার্টেন ঢোকার পর চোখ জুড়ালো তার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। প্রথমে চোখে পড়ল একটা কৃত্রিম পদ্মফুল সেখান থেকে মূল ঝর্ণা পর্যন্ত ধাপে ধাপে সিঁড়ি ওঠে গেছে। ঝর্ণার উৎস আরও অনেক উপরে কিন্তু সেখান অবধি যাওয়ার উপায় ছিলো না। রক গার্ডেনে ঘুরে ‘তানজিং রক’ দেখতে রওয়ানা দিলাম। পথে ‘হ্যাপি ভ্যালি টি ইস্টেট’ এর মনোরম দৃশ্যও উপভোগ করলাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো আবার ফিরার পালা। জ্যাম লেগেছে প্রায় ১৫-২০ মিনিট এক জায়গায় বসে রইলাম। রাত ৮-৩০ মিনিটের দিকে আমরা হোটেলে ফিরলাম।
পরের দিনের প্রোগ্রাম হলো টাইগার হিল দেখা, রাত ৩-৩০ মিনিট এ হোটেল বয় এসে আমাদের ডেকে উঠালো। ভোর ৪টায় আমরা টাইগার হিলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। দার্জিলিং অঞ্চলের শীর্ষতম স্থান (৮৪৮২ ফুট) এবং শহর থেকে প্রায় ১১ কি. মি. দূরে টাইগার হিল। টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয়ের স্মৃতি ভোলার নয়। উদীয়মান সূর্যের প্রথম রশ্মি পড়ে কাঞ্চনজঙ্খায়। টাইগার হিল হলো সেই বিরলতম স্থান, যেখান থেকে এভারেস্ট ও কাঞ্চনজঙ্খা এক সঙ্গে দেখা যায়।
বাঙালির প্রিয় তুষার ধবল কাঞ্চনজঙ্খা উচ্চতার নিরিখে ৬৭১০ ফুট বিশ্বে তৃতীয় হলেও বিপদ সঙ্কুলতায় সে হার মানায় এভারেস্টকেও। ফেরার পথে দেখলাম ‘ঘুম মনেষ্ট্রি’ এটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়। খুব সুন্দর এবং সুশৃঙ্খর এই উপাসনালয়। আমরা ভাগ্যবান আমরা যখন টাইগার হিলে পৌঁছি তখন আকাশ পরিস্কার ছিলো। তাই সেখানে এভারেস্ট ও কাঞ্চনজঙ্খার সূর্য্য উদয়ের দৃশ্য অনেকটা প্রত্যক্ষ করা গেছে।
ঘুম মনেস্ট্রি থেকে আমরা আসলাম বাতাসিয়া লুপ। জায়গাটা একটা পাহাড়ের মাথায়। বাতাসিয়া লুপ এবং ঘুম রেল স্টেশন এখন ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অংশ। এই বাতাসিয়া লুপ এবং রেল স্টেশন বা রেল লাইন ও সমুদ্র পৃষ্ট থেকে অনেক উপরে। এই বাতাসিয়া পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু শেষ মাথা ছুয়ে এসেছে রেল লাইন। ২ ফুট শর্ট গেজের রাস্তা। অনেকটা খেলনা রেললাইনের মতো এর জন্যই এর নাম ট্রয় ট্রেন। এখানে আরও যুদ্ধে শহীদদের স্মরণে একটি শ্বেত পাথরে বাঁধানো স্মৃতিস্তম্ভ, চতুর্দিকে রয়েছে সাজানো গোছানো সুন্দর ফুল বাগান। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে এখান থেকেও কাঞ্চনজঙ্খার দৃশ্য অবলোকন করা যায়। রাস্তার পাশে আমরা ছবি তুললাম।
তারপর হোটেলে ফেরা। কিছুক্ষণ বিশ্রাম খাওয়া দাওয়া সেরে শহরটা ঘুরে বেড়াতে এবং আরো কয়েকটা দর্শনীয় স্থান দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। এখানকার চা ‘দার্জিলিং টি’ উল্লেখযোগ্য। পর্যটকরা প্রায় সবাই কিনে। গরম কাপড়ের দাম তুলনামূলক কম। গড় পরতা মানের গরম কাপড়ই এখানকার বাজারে বেশি লক্ষ্য করলাম। দার্জিলিং শহরের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট, বোটানিকাল গার্ডেন, পদ্মজানায়ডু, জুলজিক্যাল পার্ক ইত্যাদিও দেখে নিলাম এ বেলা।
পরদিন ভোর বেলা ফেরার পালা। সকাল ৮টায় ‘টাটাসমো’ গাড়িতে শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। বিদায় দার্জিলিং। দার্জিলিং এর সৌন্দর্য নিয়

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT