ইতিহাস ও ঐতিহ্য

চেলা নদী ও খাসিয়ামারা মোহনা

মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৯-২০১৮ ইং ০০:১৪:৩৫ | সংবাদটি ৩২৫ বার পঠিত

দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তে ভাঙ্গাপাড়া-মাঠগাঁও এলাকার খাসিয়ামারা নদীর মোহনা এ যেন প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দ্যর্যের এক লীলাভূমি। নদীর ওই মোহনার তিন দিকে বাংলাদেশের সীমানায় রয়েছে ছোট বড় টিলা ও সমতল ভূমি। উত্তর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের সুউচ্চ কালো পাহাড়। খাসিয়ামারা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত মাঠগাঁও গ্রাম। ওই গ্রামে রয়েছে অসংখ্য সুউচ্চ টিলা ও ঘনবসতি। পূর্ব তীরে বেশ কয়েকটি টিলার ফাঁকে ফাঁকে সমতলে ফসলি জমির সবুজ দৃশ্য যেন মন ছুঁয়ে যায়। এছাড়া চারি দিকে সারি সারি গাছ পালা, সবুজের সমারোহ, আঁকা বাঁকা নদী পথ যেন প্রকৃতিকে হাত ছানি দিয়ে ডাকছে। পড়ন্ত বিকেলে টিলার উপর দাঁড়িয়ে সমতল ভূমির দিকে তাকালে বুঝা যাবে উন্নত বিশ্বের কোনো এক জায়গায় অবস্থান করছি।
অন্যদিকে উজান থেকে নেমে আসা নদীতে দুই দেশের সীমানায় নুড়ি পাথর আহরণের দৃশ্য প্রশান্তি অনুভূত হয়। টিলার উপর থেকে দেখা যাবে ভারত সীমান্তে কাঁটা তারের বেড়ার ওপারে সীমান্ত রক্ষী বিএসএফের কড়া নজরদারী। ভারতের কালো পাহাড়ে পাখপাখালির কিচিরমিচির শব্দে আরো মোহনীয় করে তোলে এখানকার পরিবেশকে। ভোরে ও পড়ন্ত বিকেলে নদীর উজানে ভারতের সীমানায় সেখানকার বাসিন্দাদের মাছ আহরণের দৃশ্য মন ভরে যায় পর্যটকদের।
প্রতি ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন উপজেলা সীমান্তের সম্ভাবনাময়ী পর্যটন এলাকা ও খাসিয়ামারা নদীর নান্দনিক ওই মোহনায়। উপজেলা সদর থেকে মোটর বাইকে লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের লেয়াকতগঞ্জ (পশ্চিম বাংলাবাজার) হয়ে মাঠগাঁও সীমান্তে ও উপজেলা সদর থেকে বোগলাবাজার হয়ে ভাঙ্গাপাড়া সীমান্তে যাওয়া যাবে।
উপজেলার ওই পর্যটন স্পটটি এখনো সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেনি। প্রতিদিন স্থানীয়রা প্রকৃতির নিঃশ্বাস নিতে সময়ে সময়ে নদীর ওই মোহনায় ভীড় জমালেও দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের তেমন সমাগম হয়না। স্থানীয়রা বলেছেন, প্রতি বছর ঈদে ও বিশেষ দিবসে পর্যটকদের ভীড় জমে এখানে। তবে যাতায়াত ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় দূর থেকে পর্যটকরা আসতে চায়না।
সোনালী চেলার মোহনায় মন ছুঁয়ে যায় : সোনালী চেলা নদীর মোহনার নয়নাভিরাম দৃশ্যে মন ছুঁয়ে যায়। বর্ষায় উত্তাল তরঙ্গ আর শুষ্ক মৌসুমে চারদিকে বিশাল চর। এ যেন নদী নয় ধুধু মরুভূমি। উত্তরে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের সুউচ্চ কালো পাহাড়। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ওই নদী দোয়ারাবাজার উপজেলার বুক চিরে ছাতক উপজেলার বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সুরমা নদীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। পড়ন্ত বিকালে সোনালী চেলার মোহনার নয়নাভিরাম দৃশ্য পর্যটকদের আরো প্রাণবন্ত করে তোলে। জমিদার আমলে ওই নদীর তীরে ছোট-বড় টিলায় প্রচুর কমলা লেবু চাষাবাদ হতো। কালের বিবর্তনে কমলা লেবুর চাষ ও বাগানের বিলুপ্তি ঘটে। শীত মৌসুমে বালির চরে গজে উঠে কাশফুলের বাগান। উত্তরের পাহাড়ি উত্তাল হাওয়ায় কাশফুলের দোলনায় মন ছুঁইয়ে যায় এখানে আসা পর্যটকদের।
ভোরে দুই দেশের সীমান্ত ওই এলাকায় পাহাড়ি পাখ-পাখালির কিচির মিচির শব্দ আর বারকি নৌকার লগি-বৈঠার আওয়াজে এখানকার বাসিন্দাদের ঘুম ভাঙে। সারি সারি বারকি নৌকার যাওয়া-আসার দৃশ্য পর্যটকদের নজর কাড়ে। প্রতিনিয়ত ওই নদী দিয়ে শত শত বারকী নৌকায় করে ভারত থেকে আনা হয় চুনা পাথর। আমদানীকৃত চুনাপাথর দিয়ে ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড এর সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া ওই সব চুনাপাথর দিয়ে ছাতকের বিভিন্ন চুল্লিতে (কোম্পানি) উৎপাদিত হয় চুন। সোনালী চেলায় বারকি নৌকা চলাচল শুরু হয় সম্ভবত ব্রিটিশ আমলে। বারক লি নামক জনৈক ইংরেজ ব্যক্তি এখানকার প্রতিষ্ঠিত এক ব্যবসায়ী সর্বপ্রথম ভারতের পাহাড় থেকে চুনাপাথর এনে সুরমা নদীর পাড়ে সিমেন্ট তৈরিসহ একাধিক চুল্লি প্রতিষ্ঠিত করে চুন তৈরি করতেন। সেই থেকে আজ অবধি ওই নদী দিয়ে বারকী নৌকায় পরিবহন করা হয় চুনাপাথর।
সোনালী চেলায় শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর কমে গেলে স্থানীয়রা নুড়ি কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। এছাড়া ভোর হতে মধ্যরাত পর্যন্ত নদীতে শখের বশে মাছ আহরণ করেন স্থানীয়রা। বর্ষায় প্রচন্ড শ্রোত প্রবহমান থাকে সোনালী চেলায়। উভয় তীরে নদী ভাঙন ও শুষ্ক মৌসুমে বালি ও পলিমাটি ভরাট হয়ে চর গজে উঠায় নাব্য সংকটে রয়েছে ওই নদী।
সোনালী চেলার উভয় তীরে নদী ভাঙনরোধে কার্যকর পদক্ষেপ ও খনন করা হলে দু’দেশের একেবারে জিরো পয়েন্টের সোনালী চেলার মোহনা হয়ে উঠবে উপজেলার অন্যতম একটি আকর্ষণীয় ও নান্দনিক দর্শনীয় স্থান।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • জাতীয় স্মৃতিসৌধ
  • বাংলাদেশের লোকশিল্প
  • উৎলারপাড়ের পোড়া পাহাড় আর বুদ বুদ কূপ
  • চেলা নদী ও খাসিয়ামারা মোহনা
  • সিলেটে মুসলমান সম্পাদিত প্রথম সাহিত্য সাময়িকী
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • Developed by: Sparkle IT